০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯, ১০ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে অত্যাবশ্যক করণীয়

সুশাসন
-

বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয় প্রবাসে কর্মরত আমাদের দেশের শ্রমজীবী ও পেশাজীবী মানুষের কথা। এদের বড় অংশ নির্মাণশিল্প, শিল্প কল-কারখানা, দোকান, পরিচ্ছন্নতা কর্ম, কৃষিকাজ প্রভৃতিতে নিয়োজিত। এসব শ্রমিক পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রবাসে একাকী বসবাস করে এবং দীর্ঘ বিরতিতে দেশে প্রত্যাবর্তন করে। প্রবাসে জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম অর্থ রেখে উপার্জিত অর্থের বড় অংশটি দেশে পরিবারের সচ্ছলতার জন্য পাঠায়। অপর দিকে প্রবাসে কর্মরত পেশাজীবীদের অন্যতম চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রতিষ্ঠানে দাপ্তরিক কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি, উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী ও আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় সবাই পরিবারসমেত সেখানে বসবাস করে। এদের অনেকেরই সচরাচর দেশে আসা হয় না এবং দেশে অর্থ পাঠানোর প্রয়োজনীয়তাও দেখা দেয় না যদিও শিকড়ের টানে কেউ কেউ নিজ গ্রামে অনুৎপাদনশীল প্রাসাদপম অট্টালিকা নির্মাণ করে বিত্তশালী দাবিদারে আভিজাত্যের প্রতিযোগিতা করে। এই পেশাজীবীদের একটি অংশের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম প্রবাসে স্থিত হওয়ায় এরা পূর্বপুরুষের ভিটে-মাটি বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ বিদেশে নিয়ে গিয়ে তথাকার স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা গ্রহণ করে।
আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বিগত এক যুগ ধরে ক্রমাগ্রত যে স্ফীত হয়েছিল তার মূল জোগানদাতা প্রবাসে কর্মরত শ্রমিককুল। বর্তমানে রফতানির তুলনায় আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায়, অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্য আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ না থাকায়, আমদানি বিকল্প সৃষ্টিতে যথাযথ কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করায়, বিদেশে চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়ের লাগাম টেনে না ধরায় এবং প্রবাসীদের অর্থ প্রেরণে হ্রাস ঘটায় বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ক্রম নিম্নমুখী। নিম্নমুখিতার এ ধারা রোধ করা না গেলে সামনে যে বিপদের আশঙ্কা তা থেকে উত্তরণ দুরূহ হয়ে উঠবে।
আমাদের দেশের কৃষকরা যে খাদ্যশস্য, শাকসবজি, ফলমূল, আমিষ পণ্য প্রভৃতি উৎপন্ন করে, বন্যা, খরা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্বারা আক্রান্ত না হলে, তা দিয়ে দেশে চাহিদার সম্পূর্ণ অংশ মিটিয়ে রফতানিও সম্ভব। কিছু কিছু যে রফতানি হচ্ছে না তাও নয়; তবে বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে প্রায়ই আমদানির আবশ্যকতা দেখা দেয়। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য আমদানি বিকল্প হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার যে ব্যাপক সাশ্রয় ঘটাচ্ছে এর বিনিময়ে তাদের অবদানের কী কোনো মূল্যায়ন হচ্ছে। আর মূল্যায়ন না হওয়ার কারণেই কৃষকরা অবহেলিত এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত। এ কথাটি অনস্বীকার্য যে, উৎপাদন ব্যয় ও কৃষকের শ্রম নিরিখে প্রতিটি কৃষিপণ্যের বিক্রয় মূল্য কৃষকের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্বাবলম্বন অর্জনে সহায়ক হলে উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষক আরো সচেষ্ট হতো।


বর্তমান বিশ্বে যেকোনো দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতার ক্ষেত্রে জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা মুখ্য হিসেবে বিবেচিত। আমাদের দেশে বিদ্যুৎ, শিল্পজ ও কৃষিজ পণ্য উৎপাদন, যান্ত্রিক যানবাহন, গৃহস্থালির রান্নায় যে সব জ্বালানি ব্যবহৃত হয় এর মধ্যে অন্যতম হলো গ্যাস, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, পেট্রল, অকটেন, এলপিজি, এলএনজি, খনিজ কয়লা প্রভৃতি। দেশে ব্যবহৃত ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও এলএনজি’র একটি বড় অংশ আমদানি করতে হয়। পেট্রল, অকটেন, এলপিজি ও নাফতা এ চারটি পণ্য গ্যাস উৎপাদন ও অপরিশোধিত তেল পরিশোধনে উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। প্রতিটি গ্যাস ক্ষেত্র হতে উপজাত হিসেবে যে কনডেন্সড বের হয় তার শতভাগ ফ্র্যাকশনাল প্ল্যান্টে পরিশোধন করা গেলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত পেট্রল ও অকটেন এ দুটি পণ্যের আমদানির প্রয়োজনীয়তা থাকবে না।
সম্প্রতি দেশের প্রধানমন্ত্রীর দলীয় অঙ্গ সংগঠনের সভায় ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে প্রদত্ত বক্তব্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ পেট্রল ও অকটেনের চাহিদার সম্পূর্ণটুকু উপজাত হিসেবে উৎপন্ন করে এবং এর বাড়তি কিছু অংশ রফতানি করে থাকে। উপজাত হিসেবে আমাদের উৎপাদনের তুলনায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা না থাকায় বাংলাদেশ প্রতি বছর নামমাত্র মূল্যে নাফতা বিদেশে রফতানি করে থাকে। চলতি বছর দেশবাসীকে হতবাক ও বিস্মিত করে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ভারত থেকে নাফতা আমদানি করেছে। ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল ব্যবহারে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় তা সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, বর্জ্যবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ প্রভৃতি নবায়ণযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে আমদানিনির্ভর ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতার হ্রাস ঘটে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের হাত থেকে দেশ রক্ষা পেত। দেশে যেসব কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে এর একটি ব্যতীত অপর সব আমদানিনির্ভর কয়লা দিয়ে পরিচালিত। দেশে কয়লার যে মজুদ রয়েছে তা সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদা বিবেচনায় উত্তোলন করা গেলে কয়লা আমদানিতে ব্যয়িত অর্থের সাশ্রয় সম্ভব।
পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলের জনমানুষের স্বাস্থ্য উপযোগী ফল অঞ্চল বিশেষে অনাদিকাল থেকে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। প্রক্রিয়াজাত শুকনো ফল ব্যতীত অধিকাংশ ফলই পচনশীল। অতীতে যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় এক অঞ্চলের উৎপাদিত ফল অপর অঞ্চলে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে পাঠানোর অবকাশ ঘটত না। বর্তমানে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় এবং পচনরোধে রাসায়নিকের ব্যবহারে এক অঞ্চল থেকে অপর অঞ্চল এবং এক দেশ থেকে অপর দেশে ফলের ব্যাপক রফতানি হচ্ছে। আমাদের দেশে অতীতের ধারাবাহিকতায় প্রাকৃতিকভাবে যেসব ফল উৎপন্ন হয় এর প্রায় সবই মৌসুমি। এ ফলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, নারিকেল, পেয়ারা, কমলা, মাল্টা, বরই, আনারস, তরমুজ, ফুটি বা বাঙ্গি, আতাফল, শরিফা, ডালিম ও লটকন। এ ফলগুলোর মধ্যে কমলা ব্যতীত অপরগুলোর উৎপাদন দেশের চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত। তা ছাড়া এগুলোর চাহিদা বৃদ্ধি ও রফতানির সম্ভাবনা বিবেচনায় যেকোনো সময় উৎপাদনের পরিধি বিস্তৃতি সম্ভব। পাকা পেঁপের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এটি দেশের সাধারণ জনমানুষের জন্য সহজলভ্য ও মূল্য সাশ্রয়ী নয়। পেঁপে সারা বছর উৎপন্ন হয়। এর উৎপাদন বৃদ্ধি মোটেও কষ্টসাধ্য কিছু নয়। আমাদের কৃষকরা পেঁপের উৎপাদন বৃদ্ধি করে এটিকে পাকা ফল হিসেবে বিক্রি করলে তা তাদের স্বাবলম্বী হতে ইতিবাচক অবদান রাখবে।


বিদেশী ফল হিসেবে পরিচিত স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুট, রাম্বুটান, আনার, আপেল, আঙ্গুর, সৌদি খেজুর প্রভৃতি অতীতে আমাদের দেশে কখনো উৎপন্ন হতো না। বর্তমানে সয়েল ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে এসব ফল সফলভাবে ব্যাপক ভিত্তিতে আমাদের দেশে আবাদ হচ্ছে। আমাদের দেশের প্রচলিত ফল এবং উপরোল্লিখিত বিদেশী ফলগুলোর ব্যাপক আবাদ সত্ত্বেও প্রতি বছর আমাদের দেশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ফল আমদানি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙ্গুর, আনার, নাশপাতি, খেজুর প্রভৃতি। আমাদের দেশের উৎপাদিত ফলের জোগান পর্যাপ্ত হওয়ায় এবং আমদানি করা ফল আমাদের দেশে উৎপাদন সম্ভব বিধায় ফল আমদানির পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে এটা আমাদের জন্য বিলাসিতা। এ বিলাসিতা পরিহার একান্তভাবেই কাম্য এবং তা কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সুফল বয়ে আনবে।
আমাদের দেশে পর্যাপ্তসংখ্যক চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও আধুনিক হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও দুঃখজনকভাবে এ দেশ থেকে প্রতি বছর সাত লক্ষাধিক লোক চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত ও নিকটবর্তী রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতিতে গমন করে। বিদেশে এ বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি চিকিৎসায় যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে তা ৩০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। চিকিৎসায় যে ধরনের উন্নত ও আধুনিক সরঞ্জামাদির প্রয়োজন তা আমাদের আধুনিক ও উন্নতমানের হাসপাতালগুলোতে রয়েছে। আমাদের দেশের চিকিৎসকদের মান কোনো অংশে বিদেশের উল্লিখিত দেশের চিকিৎসকদের চেয়ে নিম্নতর নয়। দেশের শীর্ষ পদে আসীন কিছু ব্যক্তি এবং কিছু রাজনীতিবিদ, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী এ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর মোটেও আস্থাশীল নয়। শীর্ষ পদে আসীন ব্যক্তিরা প্রতি বছর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দাঁত, চোখ ও কানের চিকিৎসার অজুহাতে বিদেশে গিয়ে জনগণের করের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ যেভাবে অপব্যয় করে চলেছেন তা দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। এরা নিজ দেশে চিকিৎসা গ্রহণ না করে উদাহরণ সৃষ্টি না করায় অপরাপর ব্যক্তিরা এদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন। চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গমনেচ্ছুদের নিবৃত্ত করা গেলে আমাদের বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং এ অর্থ নিজ দেশে ব্যয় হলে তা নিঃসন্দেহে আমাদের চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নে সহায়ক হবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশের একশ্রেণীর চিকিৎসক ওষুধ কোম্পানি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে অবৈধ প্রাপ্তির কারণে অনেকটা নীতিজ্ঞান বিবর্জিত হয়ে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করে ওষুধ কোম্পানি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবসায়িক স্বার্থ সংরক্ষণ করে চলেছেন। আমাদের দেশ থেকে যে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশ গমন করছেন তার জন্য অনেকাংশে দায়ী ওষুধ কোম্পানি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বার্থ রক্ষাকারী চিকিৎসকরা। এমনও দেখা যায় একজন রোগী চিকিৎসকের চেম্বার থেকে বের হওয়া পরবর্তী ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা তাকে ঘিরে ধরে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন তাদের নিজ নিজ কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রাইব করা হয়েছে কি না। করা না হয়ে থাকলে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছে চিকিৎসকরা হেনস্তার শিকার হন।


আমাদের দেশে সরকারি ও বেসরকারি, সাধারণ ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটলেও শিক্ষার মান ক্রম নিম্নমুখী হওয়ায় এ দেশ থেকে প্রতি বছর স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়নের জন্য বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিদেশে গমন ঘটে। দেশের শিক্ষার মান উন্নীত করা গেলে এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হলে সরকারদলীয় লেজুরভিত্তিক ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের দৌরাত্মের অবসান ঘটানো গেলে এগুলো মেধাবী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য বসবাস উপযোগী ও শিক্ষা সহনীয় পরিবেশের আবহ তৈরি করত। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিগত দু’দশকের অধিক সময় ধরে মেধার পরিবর্তে দলীয় রাজনীতির অনুগামী বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের কারণে, শিক্ষকরা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে অন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে অধিক মনোযোগী হওয়ায়, শিক্ষকদের এনজিও প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে সময়ক্ষেপণ, দলবাজ শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির প্রতি একনিষ্ঠ হওয়ায়, অধিকাংশ শিক্ষকের শিক্ষা দেয়ার মান কাক্সিক্ষত মানের অনেক নিম্নে হওয়ায় আমাদের কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথিবীর সেরা এক হাজারের তালিকায় ঠাঁই নেই। শিক্ষা সংশ্লেষে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে এর জন্য মূলত দায়ী দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী ও দলীয় লেজুড়বৃত্তিক অযোগ্য শিক্ষক। ছাত্রসংগঠনের রাজনীতি দলীয় প্রভাবমুক্ত করা গেলে এবং মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ করা গেলে বিদ্যমান সার্বিক অসহনীয় করুণ চিত্রের পরিবর্তন ঘটত।
আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট থাকার পরও দেখা যায় বিভিন্ন বিলাসপণ্য যেমন দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি, ঘড়ি, মোবাইল ফোন, প্রসাধনী, সুগন্ধি প্রভৃতির আমদানি থেমে নেই। এসব পণ্য আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। এসব পণ্য এমন নয় যে, এগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের জন্য একান্ত আবশ্যক। আর তাই সঙ্কট বিবেচনায় এ পণ্যগুলোর আমদানি পরিহার সময়োপযোগী ও যথার্থ বিবেচিত।
বর্তমানে আমাদের দেশে দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। আমাদের একশ্রেণীর রাজনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা, কিছু সামরিক বেসামরিক আমলা এবং কিছু ব্যবসায়ী প্রতি বছর শ্রমজীবী মানুষের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার করে দেশের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে চলেছেন। এরা প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ পাচার করে তা রোধ করা সম্ভব হলে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কটের উদ্ভব ঘটত না। আবার এরা যে পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করে নিয়েছেন তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে দেশে বর্তমানে উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট যেসব প্রকল্প রয়েছে এর কোনোটিতেই বৈদেশিক ঋণের আবশ্যকতা দেখা দিতো না।
দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনীতিবিদদের ওপর ন্যস্ত। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলনে সরকার গঠিত হলে তা জনহিতকর ও জবাবদিহিমূলক হয়। যেকোনো জনহিতকর ও জবাবদিহিমূলক সরকার সর্বাগ্রে দেশের উন্নয়ন ও জনগণের মঙ্গলের বিষয়ে চিন্তা করে। জবাবদিহিতার অনুপস্থিতিতে স্বেচ্ছাচারিতার উদ্ভব ঘটে, যা প্রকারান্তরে জনস্বার্থের পরিপন্থী হয়। সে নিরিখে এমন সরকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে করণীয় নির্ধারণপূর্বক কতটুকু সফলতা দেখাতে পারবে তা ভেবে দেশের সুধীজনদের অনেকেই উদ্বিগ্ন।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

 

 

 


আরো সংবাদ


premium cement