১৩ আগস্ট ২০২২
`

জ্ঞানের সম্ভব-অসম্ভব সোফিস্ট ও সক্রেটিস

উৎসের উচ্চারণ
-

মানুষের মস্তিষ্ক ধারণ করতে পারে, এমন পরিসরের আওতাভুক্ত যেকোনো বিষয়ের যথার্থ প্রতিনিধিত্বকারী যে অবস্তুগত রূপকে আমরা জ্ঞান বলছি, তা মূলত কোনো বস্তুর আসল রূপের মনোলোকীয় রূপ। আসল রূপে বিষয়টি ঠিক যেমন, মনোজগতের রূপটিকে হতে হবে ঠিক তেমন। বিষয়টি বস্তুগত হোক বা অবস্তুগত, ঘটনা হোক বা অবস্থা, সম্পর্ক হোক বা তাৎপর্য; মনের দুনিয়ায় তার চিত্রটা যখন প্রকৃত অবস্থার সঠিক ও সত্যিকার প্রতিনিধিত্ব করবে, তখন আমরা বলব বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জিত হয়েছে।
এর মানে পরিষ্কার। মনের জানাটা হতে হবে সত্য জানা, সত্যকে জানা, সঠিকতাকে জানা। কিন্তু কিভাবে আমরা সত্যকে জানব? কোনটি সত্যিকার সত্য? তাকে কি অর্জন করা যায়? আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে গ্রিসের একদল দার্শনিক বলতেন সত্য আসলে কিছু নেই। মিথ্যা বলতেও কিছু নেই। একটি বিষয় এখন সত্য হলে অন্য সময় মিথ্যা হয়ে যেতে পারে। একজনের কাছে সত্য হলে অন্যজনের জন্য মিথ্যা হয়ে যেতে পারে। মানুষের তারতম্যে এমন হয়, বাস্তবতার ভিন্নতায় এরকম হয়। অতএব সত্য বা মিথ্যার স্থির কোনো মানদণ্ড নেই। সে কল্পনামাত্র। তাকে পাওয়া যায় না। প্রোতাগোরাস (৪৯০-৪২০ খ্রি.পূর্ব) এমনটি বলতেন, গর্জিয়াস (৪৮৩-৩৭৫ খ্রি.পূর্ব) এমনই ভাবতেন।
প্রোতাগোরাস দেখাতে চাইলেন প্রতিটি মানুষ নিজের কাছে যাকে সত্য বলে মনে করে, তাই সত্য। প্রতিটি নিয়মই নিয়ম। কোনো নিয়মই অন্য নিয়মের চেয়ে ভালো নয়।
জ্ঞান, সত্য, কল্যাণ ইত্যাদির মানদণ্ড হচ্ছে মানুষ। মানুষ মানে ব্যক্তি মানুষ, সমগ্র মানুষ নয়। মানুষই সেই মানদণ্ড যেসব কিছুর সত্যতা নিরূপণ করবে। ব্যক্তি মানুষ যাকে সত্য মনে করবে, সে সত্য।
এর মানে আমার সত্যটা তোমার সত্য নয়। আমি যাকে সত্য ভাবছি, সেটি আমার জন্য সত্য। তুমি যাকে সত্য ভাবছ, সেটি তোমার জন্য সত্য। কিন্তু উভয় সত্য যখন পরস্পরবিরোধী হবে, তখন কোন সত্যকে প্রাধান্য দেয়া হবে? প্রোতাগোরাসের কাছে এর জবাব অস্পষ্ট। কংক্রিট সত্যতা বলতে যদি কিছু না থাকে, তাহলে বস্তুগত সত্যতা বলতে কোনো কিছু থাকে কিভাবে? পৃথিবীর ক্ষেত্রে বস্তুগত সত্য হলো, পৃথিবী গোলাকার। কেউ মনে করল পৃথিবী চ্যাপ্টা। এখন এই মনে করাটাই হবে সত্য? এটিই হবে জ্ঞান? বস্তুত ব্যক্তির নিজ ভাবনার ওপর সত্য নির্ভর করে না। সত্য ও জ্ঞান ব্যক্তির ভাবনার সাথে সঙ্গতি রক্ষা করবে, তা নয়। ব্যক্তিকেই সত্য ও জ্ঞানের সাথে সঙ্গতি রক্ষা করতে হবে। সত্য সম্পর্কে তার এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃতপক্ষে সত্য ও মিথ্যার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। তার এ অবস্থানের পেছনে অনুঘটকের কাজ করেছিল কোন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যক্তির প্রদত্ত বিবরণের বিভিন্নতা এমনকি একই ব্যক্তির বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত বিবরণের বিভিন্নতা, যা দেখে তিনি ভেবেছিলেন সত্য তাহলে আপেক্ষিক। তিনি দেখেছিলেন, সব কিছুই পরিবর্তনশীল, স্থায়ী কোনো কিছু নেই। আসল সত্য হচ্ছে Becoming বা হয়ে ওঠা। তার আগেও এমন ভাবনা ছিল। হেরাক্লিটাস (অনুমানিক. ৫৩৫-অনুমানিক. ৪৭৫ খ্রি.পূর্ব) বলেছিলেন, যা কিছু এ মুহূর্তে আছে, অন্য মুহূর্তে নেই, তা আছে আবার নেই। মানে তা আছে কথাটাও সত্য, নেই কথাটাও সত্য।
এ ভাবনার ফসল হিসেবে প্রোতাগোরাস স্থির করলেন জ্ঞান অসম্ভব।


গর্জিয়াস চেষ্টা করেন তিন বচনকে প্রতিষ্ঠিত করতে। সেগুলো হলো (ক) কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। কারণ কোনো কিছুকে অস্তিত্বশীল হতে থাকতে হবে তার উৎপত্তি, হতে হবে তার শুরু। সেই শুরুটা হয়তো সত্তা থেকে হবে, নয়তো অ-সত্তা থেকে হবে। কিন্তু সত্তা থেকে উৎপন্ন হলে, এর শুরু আছে বলা যেতে পারে না। আর যদি অ-সত্তা থেকে উৎপন্ন হয়েছে বলা হয় তাহলে তা হবে অর্থহীন। নিছক নাই থেকে তো কোনো কিছু জন্ম নিতে পারে না। শূন্যতা থেকে উৎপন্ন হতে পারে না কোনো অস্তিত্ব। অন্য দিকে যদি বলা হয় যে, যা আছে তা অনাদিকাল থেকে রয়েছে, তাহলে যা আছে, তাকে অসীম হতে হবে। কিন্তু যা অসীম তা অন্য কিছুতে অস্তিত্বশীল হতে পারে না, বা নিজেতেই অস্তিত্বশীল হতে পারে না। কাজেই তা কোথাও অস্তিত্বশীল নয়। তার মানেই তা অস্তিত্বশীল নয় বা তা সম্ভব নয়। কাজেই কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই। গর্জিয়াসের এ মতামত অনেকের বিচারে দার্শনিকশূন্যতা প্রমাণের চেষ্টা। কিংবা নিজের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে দার্শনিকদের ভাবধারাকে প্রত্যাখ্যানের চেষ্টা।
(খ) যদি কোনো কিছু অস্তিত্বশীল হয়, তাকে জানা যায় না। অতএব জ্ঞান হলো ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষণ নির্ভর এবং ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষণ যেহেতু ব্যক্তিভেদে পৃথক, এমনকি একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে পৃথক বস্তু, তাই তাকে জানা যায় না।
(গ) যদি কোনো কিছু অস্তিত্বশীল হয়, তাকে অন্যের কাছে প্রকাশ করা যায় না। কেননা বস্তুর সংবেদন ব্যক্তিভেদে পৃথক। তা ছাড়া সংবেদন ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাকে অপরের কাছে কিভাবে ব্যক্ত করা যাবে? শব্দের সাহায্যে অপরকে বর্ণের জ্ঞান কিভাবে দেয়া যাবে? কেননা কর্ণ ধ্বনি শোনে, বর্ণ শোনে না। সত্তার একই ছাপ, দুই ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই সময়ে কী করে বিদ্যমান থাকতে পারে, যেহেতু তারা একে অন্যের থেকে আলাদা।
প্রোতাগোরাস ও গর্জিয়াসের ছিলেন অনেক অনুসারী। কূটতর্কে তারা পারদর্শী ছিলেন গুরুদের মতোই। বস্তুত তর্ক ছিল সোফিস্টদের প্রধান হাতিয়ার। যুক্তি উপস্থাপনে তারা ছিলেন পটু। নিজেদের তারা বলতেন জ্ঞানী, সোফিস্ট। অর্থের বিনিময়ে তারা শিক্ষাদান করতেন। বাস্তবতা ছিল তাদের মুখ্য বিষয়। রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে কিভাবে সাফল্য অর্জন করা যায়, প্রধানত সেটিই তারা শেখাতেন। তারা মনে করতেন, এই জগৎ নিয়মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এক সমগ্র (Whole), এক সংহতি (System)। জাগতিক ঐক্যের কথা তারা ভাবলেও জগতের অসীম বৈচিত্র্য, নিয়ত পরিবর্তন ও জগতের বহুত্ব তাদেরকে বিহ্বল করে ফেলে। একের সাথে বহুর, ঐক্যের সাথে বিভেদের সমন্বয়ে তারা চেষ্টা করেন। জ্ঞান লাভ সম্ভব কি না, এ প্রশ্নে তারা সন্দিহান হন মূলত বিশ্বজগতের উৎপত্তি ও তার স্বরূপ সম্পর্কে তাদের প্রচারিত মতবাদের বিরোধ ও দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে। হেরাক্লিটাস ও পারমিনাইডিস (৫১৫-৪৬০ খ্রি.পূর্ব) যে মতবাদ প্রচার করেন, ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষের যথার্থতা সম্পর্কে সে সন্দেহের বিস্তার ঘটাল। হেরাক্লিটাসের মতে, পরিবর্তনই সব তত্ত্বের তত্ত্ব। স্থায়ী কোনো সত্য নেই, অপরিবর্তনীয় কোনো সত্তা নেই। অন্য দিকে পারমিনাইডিসের মতে, সব তত্ত্বের তত্ত্ব হলো শুদ্ধসত্তা। নিত্য পরিবর্তনশীলতার প্রত্যক্ষণ মুখ্য সত্য নয়, এতে আছে ভ্রান্তি। এর মানে দাঁড়াল, ইন্দ্রিয় যা দেখায় ও জানায়, তা যে সুনিশ্চিত জ্ঞান, সে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না।
এই যে বিপরীতমুখী মতবাদ, তা কোনো সদর্থী সুরাহার দিকে অগ্রসর হলো না। জ্ঞান সম্ভব কি না, সে প্রশ্নে বিরাট এক নেতির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকলেন অধিকাংশ সোফিস্ট।
এলেন সক্রেটিস (৪৭০-৩৯৯ খ্রি.পূর্ব)। সোফিস্টদের সাথে তার লড়াই ছিল প্রচণ্ড। তার জ্ঞানতত্ত্ব সরল, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখান, মানুষের সব জ্ঞানই অর্জিত হয় প্রত্যয়ের মাধ্যমে। কনসেপ্ট বা প্রত্যয় বুঝতে হলে সার্বিক ধারণা ও বিশেষ ধারণাকে স্পষ্ট করতে হবে। আমরা যখন ঈগল ও দোয়েলের কথা বলি, দু’টি বিশেষ পাখির কথা বলি। কিন্তু যখন আমরা বলি পাখি ডানা মেলে ওড়ে, তখন আমরা সব পাখিকেই বোঝাই, যারা ডানা দিয়ে ওড়ে। এই যে উড়তে পারা সমগ্র পাখির ধারণা, এটিই সার্বিক ধারণা। মানুষ একটি সার্বিক ধারণা। যেহেতু সব মানুষই প্রাণী হিসেবে বুদ্ধিমান। কিন্তু মানুষে মানুষে পার্থক্যও তো রয়েছে। কেউ কালো, কেউ ধলো, কেউ নারী, কেউ পুরুষ। ধারণার দিক থেকে পার্থক্যের এসব জায়গা অগ্রাহ্য হবে। সাদৃশ্যপূর্ণ দিকগুলো প্রাধান্য পাবে।
সার্বিক প্রত্যয় সব সময় অভিন্ন থাকে। ‘মানুষ’ মানুষই থাকে, বৃক্ষ বৃক্ষই। বদলায় না। মানুষের উদাহরণ বদলাতে পারে, সংজ্ঞা বদলায় না। মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী, এটি স্থির ও বাস্তব সত্য। এটি কারো ধারণার ভিন্নতায় বদলে যাবে না। কারো ধারণা এর অনুকূল না হলে সত্য এর অনুকূল নয়, তা প্রমাণিত হবে না। এর মানে হলো সত্যমাত্রই আপেক্ষিক নয়। এর বস্তুগত অস্তিত্ব রয়েছে। সত্য বা সার্বিক যে প্রত্যয়, তাকে শব্দ দিয়ে ব্যক্ত করার জন্য সংজ্ঞার প্রয়োজন।
সংজ্ঞা নিরূপণের মধ্য দিয়ে সত্য ও সত্যতার বস্তুগত মানদণ্ড হাতে আসে। পাখির সংজ্ঞা যখন গঠিত হয়ে যায়, তখন কোনো কিছু পাখি কি না, তা আমরা নিরূপণ করতে সহায়তা পাই। মানে সেই কিছুর ওপর পাখির সংজ্ঞা প্রযোজ্য কি না, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারি। একটি জ্যামিতি ক্ষেত্র ত্রিভুজ কি না, সে সিদ্ধান্ত নিতে হলে ত্রিভুজ কী, তা আগে নিশ্চিত হতে হবে।


সোফিস্টরা ভালো-মন্দের আপেক্ষিকতা দিয়ে যে ধূম্রজাল তৈরি করেন, এ থেকে উত্তরণের জন্য দরকার ছিল ভালোত্ব ও মন্দত্ব নিশ্চিত করার মানদণ্ড। সে জন্য সংজ্ঞায়নকে ব্যাপক গুরুত্ব দেন সক্রেটিস। সোফিস্টদের আপেক্ষিকতা দাবি করছিল, ভালো ও ন্যায় এর বস্তুগত কোনো মানদণ্ড নেই। প্রতিটি ব্যক্তির ন্যায় ঠিক তার মতো। প্রতিটি জাতি, সম্প্রদায় বা রাষ্ট্রের ন্যায় ঠিক তার মতো। সার্বিক ন্যায় বলতে কোনো কিছু নেই। সক্রেটিস ন্যায় ও সত্যের সংজ্ঞায়নকে প্রাধান্য দিলেন যাতে অন্তর প্রকৃতি স্পষ্ট হয়ে যায় আর এর সাধারণ সংজ্ঞা সব মানুষ, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। যখন সত্যতার সংজ্ঞা নিরূপিত হবে, তখন কোনো কিছু সত্য না অসত্য, তা নিশ্চিত করা যাবে সংজ্ঞার আলোকে। তখন ব্যক্তির তারতম্যে সত্য-মিথ্যার তারতম্য নির্দেশ করা যাবে না; যা প্রকৃতপক্ষে সার্বিক সত্যকে অস্বীকার করে সত্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে।
সক্রেটিসের দার্শনিক তর্ক সত্য আবিষ্কারের জন্য নিবেদিত ছিল। সত্যকে আমাদের জানতে হবে আমাদের প্রয়োজনে। সত্যকে উন্মোচন করতে হবে সত্যের জন্যও। যদি সত্যকে না জানি, তাকে অবলম্বন করব কিভাবে? যদি ভালোকে না বুঝি, কিভাবে করব ভালোকে অবলম্বন? যে আত্মা নিয়ে আমরা বেঁচে আছি, তাকে যদি না জানি, তাহলে কিভাবে জানব নিজেকে? অতএব জ্ঞানের জরুরত। জ্ঞান অসম্ভব হলে কিভাবে এ জরুরত পূরণ হবে? জ্ঞান অর্জন সম্ভব। তা অর্জন করে বিজ্ঞতা লাভ করতে হবে। সেই জ্ঞান ও বিজ্ঞতার জন্য সক্রেটিস যে পদ্ধতি অবলম্বন করেন, এর নাম ধাত্রীবিদ্যা। সন্তান যখন জন্ম নেবে, ধাত্রী সহায়তা করে, যেন সে জন্ম নেয়। সক্রেটিসের তর্ক পদ্ধতিও প্রতিপক্ষের মনে জ্ঞানের আগমনে সহায়তা করত। প্রতিপক্ষের মনে যে ভ্রান্তি রাজত্ব করছে, তাকে তিনি বিতাড়িত করতেন প্রতিপক্ষের বোধ জাগ্রত করে। যেসব সত্য তার অজ্ঞাত, কিন্তু নিহিত আছে তার ভেতরেই, সেগুলোকে বের করে আনতেন প্রশ্নের প্রক্রিয়ায়। তার ভাবনা যেন সত্য অবধি উপনীত হয়, সে জন্য তার পায়ে সে এগিয়ে যাক, এ সদিচ্ছা থেকে সক্রেটিস আরোহ প্রণালীর আশ্রয় নিতেন। যুক্তিসম্মত সংজ্ঞার (Logical Definition) উদ্ভাবন এ প্রক্রিয়ার বিশেষ গরজ।
ইন্দ্রিয়সংবেদ ও প্রত্যক্ষতাকে জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে দেখার ফলে সোফিস্টদের একটি প্রবণতা যথার্থ জ্ঞানকে অসম্ভব বলে দাবি করেছিল। কারণ সত্য, জ্ঞান ইত্যাদি ব্যক্তির উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে। ব্যক্তির উপলব্ধি পৃথক হবেই। ব্যক্তিভেদে জ্ঞান যেহেতু পৃথক হয়, ফলে তার সেই ভিত্তি থাকে না, যা ব্যক্তিনিরপেক্ষ, যা সর্বজনীন। থাকে না ব্যক্তিনিরপেক্ষ বাস্তবতাও, বস্তুগত সত্যতাও। থাকে না সেই সত্য, যা সব মানুষের সত্য, সবার জন্য সত্য।
সক্রেটিস এই আপেক্ষিকতাকে প্রত্যাখ্যান করলেন বুদ্ধিকে জ্ঞানের ভিত্তি ঘোষণা করে। তিনি জ্ঞানের উৎস হিসেবে ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষকে করলেন অস্বীকার। তিনি দেখালেন, সত্য সেটিই, যা বুদ্ধির কাছে গ্রহণীয় হবে। আর বুদ্ধি সব মানুষের ক্ষেত্রে একরূপ। জ্ঞান আর প্রত্যয় অভিন্ন। প্রত্যয়ের সাহায্যেই সত্য নিরূপণ করে বুদ্ধি। তা যেমন ব্যক্তি নিরপেক্ষ, তেমনি তার আছে বস্তুগত ভিত্তি। ব্যক্তি সত্য মনে করলেই কোনো কিছু সত্য, তা নয়। বরং সত্যের আছে মানদণ্ড। সেই মানদণ্ডের সাথে কোনো ব্যক্তির জ্ঞানের সঙ্গতি থাকলেই জ্ঞান সত্য।
কিন্তু বুদ্ধিকে কি নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করা যায়? বুদ্ধি তো প্রায়ই ভুল করে। বুদ্ধিজাত প্রত্যয়ও অনেক সময় ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে যায়। আর যেখানে অনেক সময় ভুল হতে পারে, সেখানে অধিকাংশ সময়ও ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর মানে ইন্দ্রিয় যেভাবে নিশ্চিত নির্ভরতা দেয় না, বুদ্ধিও তেমনি। কিন্তু উভয়েই জ্ঞানের মাধ্যম। এ ছাড়া আরো উচ্চতর মাধ্যম রয়েছে জ্ঞানের।
তবে সোফিস্টরা যেভাবে জ্ঞানকে ‘তোমার’ ও ‘আমার’ করেন, সত্য, কল্যাণ, উত্তমতা ইত্যাদিকে যেভাবে একেক ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের নিজস্ব অনুভবের হাতে সঁপে দেন, তার আধুনিক চিত্রায়ন দেখা যায় ক্ষমতাগর্বী গণবিরোধী রাজনীতিতে। যে মানদণ্ডের কথা বলেছেন সক্রেটিস, যে সংজ্ঞায়নকে দিয়েছেন গুরুত্ব, সেই মানদণ্ড হয়ে ওঠেন ক্ষমতাগর্বী নিজেই। নিজেই চাপিয়ে দেন আপন স্বার্থের হাত দিয়ে সাজানো সংজ্ঞা। যেখানে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের জন্য এক ন্যায় ও সত্য বরাদ্দ রাখেন, অন্যদের জন্য বরাদ্দ রাখেন অন্য ন্যায়। যার কোনোটাই আসলে ন্যায় নয়, সত্য নয়, জ্ঞান নয়।
লেখক : কবি, গবেষক
71.alhafij@gmail.com

 


আরো সংবাদ


premium cement

সকল