০৪ জুলাই ২০২২, ২০ আষাঢ় ১৪২৯, ৪ জিলহজ ১৪৪৩
`

স্ম র ণ : অধ্যক্ষ আল্লামা মুহাম্মদ ফখরুদ্দীন (রহ:)

-

আজ ২৬ মে মাদরাসা আলিয়া ঢাকার সাবেক মুহাদ্দিস, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এবং চট্টগ্রামের চুনতী হাকিমিয়া কামিল মাদরাসার শায়খুল হাদিস অধ্যক্ষ আল্লামা মুহাম্মদ ফখরুদ্দীন (রহ:)-এর ১১তম ওফাতবার্ষিকী। ২০১১ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। প্রখর মেধা ও ধীশক্তির অধিকারী এই মনীষী তার ৬২ বছরের জীবন পঠন-পাঠন ও জ্ঞান গবেষণায় অতিবাহিত করেছেন। তিনি ১৯৪৯ সালের ১ মার্চ চট্টগ্রামের চন্দনাইশে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন খ্যাতনামা আলিম মুফতি শাফিউর রহমান (রহ:)।
শিক্ষাজীবনের সর্বত্র মুহাম্মদ ফখরুদ্দীন (রহ:) প্রথম বিভাগ ও মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছেন। ১৯৫৬ সালে দাখিল, ১৯৬০ সালে আলিম, ১৯৬২ সালে ফাজিল, ১৯৬৪ সালে কামিল (হাদিস) প্রথম বিভাগে দ্বিতীয়, ১৯৬৬ সালে কামিল (ফিকহ) প্রথম বিভাগে প্রথম, ১৯৬৭ সালে ডিপ্লোমা ইন-আদিব প্রথম বিভাগে প্রথম, ১৯৬৮ সালে ডিপ্লোমা ইন-আদিব-ই-কামিল প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা আলিয়ার স্কলারশিপ নিয়ে আল্লামা আবদুুর রহমান কাশগড়ীর তত্ত্বাবধানে ‘ফোকাহায়ে ইস্ট পাকিস্তান কে ফিক্হি কারনামে’ অভিসন্দর্ভ রচনা করে তিনি রিাসার্চ স্কলার সনদ লাভ করেছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলিয়া মাদরাসায় শায়খুল হাদিস মাওলানা আমিন (রহ:) ও মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (রহ:)সহ অনেক বড় বড় আলিমদের কাছে ইলম হাসিল করেন। সেখান থেকে যান ঢাকা আলিয়া মাদরাসায়।
সাইয়্যেদ মুফতি আমিমুল ইহসান বারকাতি (রহ:), আল্লামা আবদুর রহমান কাশগড়ী (রহ:), মাওলানা আবদুস সাত্তার বিহারি (রহ:), মাওলানা আলাউদ্দিন আল আজহারী (রহ:) ও খতিব মাওলানা উবায়দুল হক (রহ:)-এর মতো বিখ্যাত আলিমের কাছে হাদিস, আরবি সাহিত্য ও দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করেন।
পরে ঢাকার মাদরাসা-ই-আলিয়ায় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগ দেন। তদুপরি, হোস্টেল সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায় অধ্যক্ষ পদে বহুদিন কর্মরত ছিলেন তিনি। অবসর নেয়ার পর চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ড. আবু বকর রফিক সাহেবের অনুরোধক্রমে তিনি চুনতী হাকিমিয়া আলিয়া মাদরাসায় শায়খুল হাদিস হিসেবে যোগদান করেন। খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও সুযোগ্য প্রশাসক হিসেবে তিনি স্বল্প সময়ের মধ্যেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হন। তার ভাষাদক্ষতা, সুন্দর বাচনভঙ্গি, দূরদর্শিতা, সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা এবং আকর্ষণীয় উপস্থাপনায় শিক্ষার্থীরা মুগ্ধ হতেন।
আল্লামা মুহাম্মদ ফখরুদ্দীন (রহ:) ছিলেন অ্যাকাডেমিশিয়ান ও গবেষক। হাদিস ও ফিকহে ইসলামীর পাঠদান করার সময় তিনি আধুনিক বিষয় নিয়ে উপমা দিতেন, যাতে শিক্ষার্থীরা সহজে কথা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। কোনো দলের সাথে যুক্ত ছিলেন না; তবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির খবরাখবর রাখতেন। নিয়মিত দৈনিক পত্রিকা অধ্যয়ন করা ছিল মরহুমের অভ্যাস। ছাত্র-শিক্ষকদের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইলমি আলোচনা করতেও ক্লান্তি অনুভব করতেন না। অনেকসময় রাতের বেলায়ও হাদিসের দরস দিতেন।
ফখরুদ্দীন (রহ:)-এর অনেক ছাত্র সরকারি-বেসরকারি কলেজ, মাদরাসা, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ড. খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ:), ড. নকিব মুহাম্মদ নসরুল্লাহ, ড. আবুল কালাম আজাদ, ড. আবদুস সালাম আজাদী, ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, ড. আহসান উল্লাহ ফায়সাল (রহ:), অধ্যাপক আবদুল কাদির সালেহ প্রমুখ তার ছাত্র।
নীতির প্রশ্নে ফখরুদ্দীন (রহ:) ছিলেন অটল। অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথা নত করেননি। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সরল, বন্ধুবৎসল, উদার, বিনয়ী, কষ্টসহিষ্ণু ও অনুপম চরিত্রের অধিকারী। মানুষকে সহজে আপন করে নেয়ার মহৎ গুণ ছিল তার। তাকওয়া, পরহেজগারি ও আতিথ্য ছিল তার জীবনের অনন্য বৈশিষ্ট্য। জীবনের কোনো মুহূর্ত তিনি হেলা ও অবহেলায় নষ্ট করেননি। প্রায় সময় তিনি কিতাব পড়তে পড়তে ঘুমাতেন। আল্লাহ তায়ালা এ মনীষীকে জান্নাতে উচ্চ মাকাম নসিব করুন। আমিন।
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

 


আরো সংবাদ


premium cement