০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

সংবিধানের ব্যক্ত অবস্থানের ভিন্নতা প্রত্যাশিত নয়

সুশাসন
-

বাংলাদেশের সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগের অনুচ্ছেদ ৯৪ থেকে ১১৬ক পর্যন্ত এ ২৪টি অনুচ্ছেদ বিচার বিভাগ সম্পর্কীয়। ষষ্ঠ ভাগে প্রধান বিচারপতি ব্যতিরেকে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের দুই ধরনের বিচারকের পদবির উল্লেখ রয়েছে। এরা হলেন- আপিল বিভাগের বিচারক এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক। সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের দু’টি বিভাগ রয়েছে। এর একটি হলো আপিল বিভাগ এবং অপরটি হাইকোর্ট বিভাগ।
প্রধান বিচারপতি যিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সর্বোচ্চ পদে আসীন তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নামে অভিহিত হন। প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে সংবিধান বা দেশের প্রচলিত আইনের কোথাও অভিহিত বা উল্লিখিত হননি। আর তাই প্রধান বিচারপতিকে সংবিধানের নির্দেশনা বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির ভিন্নতায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে অভিহিতকরণ সংবিধান ও দেশের প্রচলিত আইন অনুমোদন করে না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা গেছে, কেউ ভুলক্রমে প্রধান বিচারপতিকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে অভিহিত বা সম্বোধন করলে তাৎক্ষণিক ভুল ধরিয়ে দেয়া হয়। সংবিধানে প্রধান বিচারপতির যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাতে উল্লেখ রয়েছে ‘প্রধান বিচারপতি অর্থ বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি।’ প্রধান বিচারপতি সাংবিধানিক পদধারী হিসেবে শপথের অধীন। শপথ গ্রহণ ব্যতিরেকে তিনি পদে আসীন হন না। প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথপাঠ রাষ্ট্রপতি পরিচালনা করেন। শপথ গ্রহণ করাকালীন প্রধান বিচারপতিকে সুস্পষ্টরূপে বলতে হয় ‘আমি ..., প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হয়ে সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ করছি যে, আমি আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সাথে আমার পদের কর্তব্য পালন করব; আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করব; আমি বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করব এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করব।’
সংবিধানে বিচারকের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ‘বিচারক অর্থ সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিভাগের কোনো বিচারক।’ সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা প্রধান বিচারপতির ন্যায় সাংবিধানিক পদধারী এবং শপথের অধীন। তারাও শপথ গ্রহণ ব্যতিরেকে পদে আসীন হন না অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার কার্যে নিয়োজিত হতে পারেন না। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে অনধিক দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। এ দুই বছর অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকের বিচারিক কাজ প্রধান বিচারপতির কাছে সন্তোষজনক প্রতীয়মান হলে তিনি তাকে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ প্রদান করে থাকেন। প্রধান বিচারপতির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে একজন বিচারক পুনঃহাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। অতিরিক্ত বিচারক বা হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে শপথ গ্রহণ করাকালীন তাকে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সুস্পষ্টরূপে বলতে হয় ‘আমি..., সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক নিযুক্ত হয়ে ..... ’ যদিও সংবিধানে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারকের জন্য পৃথকভাবে শপথের বিষয়টি উল্লিখিত হয়নি।
আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধানে পৃথক কোনো যোগ্যতার উল্লেখ না থাকলেও অতীতে হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত বিচারকদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ দেয়া হতো যদিও বিগত দু’দশকের অধিক সময় ধরে এ নিয়োগের ক্ষেত্রে অনুগত রাজনৈতিক মতাদর্শী নয় এমন অভিযোগে প্রায় প্রতিটি নিয়োগেই জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের ঘটনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আপিল বিভাগের একজন বিচারককে নিয়োগ-পরবর্তী পুনরায় অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সুস্পষ্টরূপে শপথ পাঠপূর্বক বলতে হয় ‘আমি... সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক নিযুক্ত হয়ে... ’। উপরোল্লিখিত তিনটি ক্ষেত্রে শপথপাঠ অনুষ্ঠান প্রধান বিচারপতি কর্তৃক পরিচালিত হয়।
সংবিধানে বিচারক শব্দটি অনুচ্ছেদ ৯৪-এ পাঁচবার, ৯৫-এ তিনবার, ৯৬-এ ১২ বার, ৯৭-এ একবার, ৯৮-এ সাতবার, ৯৯-এ চারবার, ১০৭-এ চারবার ও ১১৩-এ একবার এবং শপথাংশে তিনবার সর্বমোট ৪০ বার উল্লিখিত হয়েছে। সংবিধানে প্রধান বিচারপতি যেমন প্রতিটি জায়গায় প্রধান বিচারপতি হিসেবে উল্লিখিত হয়েছেন অনুরূপ আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকরা বিচারক হিসেবে উল্লিখিত হয়েছেন। সংবিধানে প্রধান বিচারপতির প্রধান বিচারপতি হিসেবে অভিহিত হওয়া এবং আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের বিচারক হিসেবে অভিহিত হওয়া সংবিধানের ব্যক্ত অবস্থান। সংবিধানের ব্যক্ত অবস্থানের ক্ষেত্রে কখনো কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা বা আবশ্যকতা দেখা দেয় না।
বাংলাদেশে আদালত অর্থ সুপ্রিম কোর্টসহ যেকোনো আদালত। সুপ্রিম কোর্ট বলতে উচ্চাদালত বুঝালেও সংবিধানে উচ্চাদালত শব্দটির উল্লেখ নেই। সংবিধানে যে অধস্তন আদালতের উল্লেখ রয়েছে সে আদালতের বিচারকরা বিচার কর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তি এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে অভিহিত। বিচার কর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ পদধারীকে সংবিধানে জেলা বিচারক এবং তার ক্রমনিম্ন পদধারীকে অতিরিক্ত জেলা বিচারক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
জেলা বিচারকের আদালত জেলা জজ আদালত হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত এবং জেলা বিচারককে জেলা জজরূপে সম্বোধন করা হয়। অতিরিক্ত জেলা বিচারককে অতিরিক্ত জেলা জজ বলা হয়। এ দুটি পদের ক্রম নিম্নপদের বিচারকরা হলেন যুগ্ম জেলা জজ, সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজ। ম্যাজিস্ট্রেট নামক স্বতন্ত্র অস্তিত্ববিশিষ্ট কোনো পদ নেই। সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ, যুগ্ম জেলা জজ ও অতিরিক্ত জেলা জজরা ম্যাজিস্ট্রেট, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। জেলা বিচারক ও অতিরিক্ত জেলা বিচারক এ পদ দু’টি সংবিধানে উল্লিখিত পদ হলেও উভয় পদধারী শপথের অধীন না হওয়ায় তারা সাংবিধানিক পদধারী নন।
ইংরেজী Judge শব্দটিকে আভিধানিক বাংলায় বিচারপতি ও বিচারক উভয়রূপে বুঝানো হয়েছে। অনুরূপভাবে আভিধানিক বাংলায় Justice অর্থ বিচারপতি ও বিচারক উভয়ই। আমাদের সন্নিকটবর্তী রাষ্ট্র ভুটানে নিম্ন আদালত ও উচ্চাদালতের বিচারকরা পদে বহাল থাকাকালীন অবস্থায় নামের আগে Justice শব্দ ব্যবহার করেন। য্ক্তুরাজ্যে শুধু Magistrate যে ম্যানুয়ালটি ব্যবহার করেন সেটি Stouts Justice Manual নামে অভিহিত। আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধিতে উচ্চাদালতের সব বিচারককে সমগ্র বাংলাদেশের জন্য পদাধিকার বলে Justices of the peace নামে অভিহিত করা হয়েছে। এর বাইরে সব দায়রা জজ, সব জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং সব মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটদের স্ব স্ব অধিক্ষেত্রের জন্য পদাধিকার বলে Justices of the peace নামে অভিহিত করা হয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশে নিম্ন আদালতের বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটরা পদে বহাল থাকাকালীন নামের আগে Justices শব্দটি ব্যবহার করলেও আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এরূপ ব্যবহার প্রত্যক্ষ করা যায়নি।
আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায় উচ্চাদালতের বিচারকের পদে স্থায়ী হতে না পেরে আগের স্ব পেশায় ফিরে এসে উচ্চাদালতে আইনজীবী হিসেবে পুনঃনিয়োজিত হয়ে নামের আগে বিচারপতি শব্দটি ব্যবহার করছেন। আবার ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায় উচ্চাদালতের হাইকোর্ট বিভাগ থেকে অবসরে যাওয়া বিচারক আপিল বিভাগে আইন পেশায় নিয়োজিত হয়ে নামের আগে অ্যাডভোকেট না লিখে বিচারপতি শব্দটি লিখে আইন ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছেন। উচ্চাদালতের বিচারক পদ থেকে অবসরে যাওয়া পরবর্তী আইন পেশা, আইনি পরামর্শক ও আরবিট্রেটর হিসেবে নিয়োজিত হয়ে নামের আগে বিচারপতি শব্দটি ব্যবহার করে সামগ্রিকভাবে বিচার বিভাগের মর্যাদার যে হানি ঘটাচ্ছেন এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। আমাদের বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ব্যতীত অপরাপর বিচারকের ক্ষেত্রে পদে বহাল থাকাকালীন অবস্থায় নামের আগে বিচারপতি শব্দের ব্যবহার সংবিধান বা আইন দ্বারা সমর্থিত না হলেও তাদের ভাষ্যমতে দীর্ঘ দিনের প্রথার কারণে এটি অনেকটা তাদের নামের অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু নামের এ অংশটিকে উচ্চাদালতের বিচারকদের পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পরও কেউ যদি অব্যাহতভাবে ব্যবহার করতে থাকেন তবে তা কতটুকু আইনানুগ এ প্রশ্নটি আজ অনেকের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে।
একজন বিচারক পদে বা পেশায় বহাল বা নিয়োজিত থাকাকালীন নামের আগে অথবা পরে পদ বা পেশার পদবি বা উপাধি ব্যবহার তার জন্য যথার্থ; কিন্তু পদ বা পেশায় বহাল না থেকে কেউ যদি নামের আগে বা পরে পদ বা পেশার পদবি বা উপাধি ব্যবহার করেন, তবে তার জন্য তা হবে নীতিজ্ঞান ও নৈতিকতাপরিপন্থী, যা প্রকারান্তরে আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল।
প্রণিধানযোগ্য যে, সংবিধানেই উল্লেখ রয়েছে সংবিধান ও আইন মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। সংবিধানের নির্দেশনা বা ব্যক্ত অবস্থানের ব্যত্যয়ে যেকোনো কাজ সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করার সমরূপ। সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সন্নিবেশিত অনুচ্ছেদ ৭ক(১)(খ)-এ একজন ব্যক্তির সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করাকে রাষ্ট্রদ্রোহ সমঅপরাধ গণ্য করা হয়েছে এবং এরূপ অপরাধে সাজার বিষয়ে বলা হয়েছে প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডনীয়।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail : iktederahmed@yahoo.com

 


আরো সংবাদ


premium cement