০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

চুল পরিমাণ হেরফের নেই

-

উইলিয়াম কাউপারের একটি কবিতার নাম, God Made the Countr. কবিতার সারমর্ম, গ্রামবাসীদের সরল জীবন, মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য ও মুক্ত আলো-বাতাস। এসবের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে কবি মনে করেন, ‘গ্রাম ঈশ^রের এবং শহর মানুষের তৈরি’। আমার জন্ম পাড়াগাঁয়ে। যেখানেই যাই, মন পড়ে থাকে গ্রাম্যজীবন ও গাঁয়ের প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাঝে। বিদেশে শহর দেখা যত সহজ, গ্রাম দেখা তত সহজ নয়। গ্রাম্যজীবন ও গ্রামপ্রকৃতি দেখার ইচ্ছা পূরণ করতেই ‘ইউরোস্টারে প্যারিস টু লন্ডন’ ভ্রমণটা পছন্দ করেছিলাম। খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারি, ঢাকা টু কলকাতা ও প্যারিস টু লন্ডন দূরত্ব প্রায় কাছাকাছি। গত ২ ডিসেম্বর ২০১৮ মৈত্রী এক্সপ্রেসে কলকাতা গিয়েছিলাম। আমার সময় লেগেছিল ৯ ঘণ্টার বেশি। এক ভাষার দেশ। তার পরও শুল্ক পরীক্ষার নামে সে কী হয়রানি! দেশভ্রমণে আমার মূলধন বাংলা ভাষা। বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা ভাষা চিটাগাং পার হলেই অচল হতে শুরু করে। ইংরেজি ভাষায় যে ছিটেফোঁটা জানি তা ফ্রান্সে এসেই অচল হয়ে পড়ে। ফরাসিরা রাস্তায় গাড়ি চালানো থেকে শুরু করে অনেক কিছুই ইংরেজদের বিপরীত। ভাষার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক হিসেবে ইংরেজিকে স্বীকার করছে না। ফ্রান্স প্রবেশের আগে আমার সফরসঙ্গী ছিল আনিকা। আনিকা ব্রিটিশ সিটিজেন। গড়গড় করে ইংরেজি বলে। কোপেনহেগেনে আমার অসহায় অবস্থা দেখে,
Ñ নানা ভাই, তোমার একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট দরকার।
Ñ এ কারণেই তো তোমাকে লন্ডন থেকে আনলাম। তুমিই আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট।
Ñ আমি তোমাকে ফ্রান্স দিয়েই লন্ডন চলে যাবো।
Ñ তুমি ট্রেনে লন্ডন যেও। তোমার কাছে পথের বর্ণনা শুনে আমিও যেতে পারব।
উন্নত দেশে সবচেয়ে আরামদায়ক, সহজ ও সাশ্রয়ী ভ্রমণ ট্রেন। সবচেয়ে জটিল ভ্রমণও ট্রেন। লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি বেয়ে কয়েক শ’ ফুট ওঠানামা করতে হয়। কখনো কখনো স্টেশনের দুই দিকেই প্লাটফর্ম। পলকে পলকে দানবের মতো গর্জন করে আসে ট্রেন। এক-দেড় মিনিটের মধ্যে লোক ওঠানামা শেষ। স্বয়ংক্রিয়ভাবে গেট বন্ধ হয়ে অজগরের মতো গর্জন করতে করতে অন্ধকার গর্তে প্রবেশ করে। সামান্য ভুল-বিচ্যুতির কারণে লন্ডনের পরিবর্তে নিয়ে যাবে ইতালি-জার্মান। এই ভয় আমাকে নিয়েও। ভয় দূর করার জন্য চার দিন আগে টিকিট কিনে ট্রেন, কোচ (বগি), সিট নম্বর ও ট্রেনের সময় মুখস্থ করেছি। তিন মেয়েকে নির্ভয় করার জন্য বলেছি, ‘তোমরা আমাকে নিয়ে অযথা ভয় পাও। বিদেশ ভ্রমণে ইমিগ্রেশন পুলিশ বরেণ্য লেখক হুমায়ূন আহমেদকেও জেলে ঢুকিয়েছিল, রাখতে পারেনি। আমাকেও রাখতে পারবে না।’
ফ্রান্সের পরিজন থেকে বিদায় নিয়ে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টায় আমি গারদো নর্দ স্টেশনের বন্ধ গেটের সামনে। টিকিট ছোঁয়ালেই খুলবে গেট। টিকিট ছোঁয়াই, গেট খোলে না। ‘প্লিজ হেল্প মি’ বলে পেছনে দাঁড়ানো কালো (কৃষ্ণাঙ্গ) মেয়ের সাহায্য চাই। মেয়েটিও ছোঁয়ায়। কিন্তু খোলে না। এগিয়ে আসেন পুলিশ। গেট খুলছে না কিছুতেই। মনে মনে বলি, ‘বিসমিল্লায়ই গলদ’। আমাকে সাহায্যের জন্য বাম দিকের কাউন্টারে পাঠায়। কাউন্টার পরীক্ষা করে টিকিট সঠিক মর্মে প্রত্যয়ন করার পর ভেতরে প্রবেশ করি। এসব বিষয়ে কালো মেয়েটি অনেক সাহায্য করে। জানতে পারি, সেও লন্ডন যাবে। আমি ফ্রেঙ্ক ভাষা জানি না মর্মে অক্ষমতা জানিয়ে ট্রেনের কোচসহ সিট নম্বর খুঁজে দেয়ার জন্য মেয়েটির সাহায্য চাই। মেয়েটি জানতে পারেন, আমি বাংলাদেশী। বাংলাদেশে আসার ইচ্ছে আছে তারও। তাই, আমার ফোন নম্বর রাখাসহ বাংলাদেশ সম্পর্কে তার অনেক আগ্রহ। আমাকে অনেক প্রশ্ন করেন। তিনি মোবাইলে বাংলায় টাইপ করা প্রশ্ন আমার সামনে তুলে ধরেন, আমি বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে উত্তর দিই। মোবাইলে ঝলমলে বাংলা টাইপ দেখে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করি,
Do you know Bengali?
Lady : I don’t know Bengali? I know English and French.
Me : (evsjv UvB‡ci cÖwZ Bw½Z K‡i) How is it possible?
Lady : I type in English and can translate it using Google translator. Digitization has taken care of making the world digital. One day the world will become like a family. But it isn’t possible for anyone to know all the languages of the world. So, if you want to enjoy the benefits of that world family, you have to learn the translation method and join the war of digitalization. Otherwise you will be left behind.
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পজিশনসহ বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। প্রায় চার দশক ধরে কোর্টের আইনজীবী। মোবাইলে এড়ড়মষব-এর কেরামতিসহ নিগ্রো মেয়েটির ইংরেজি বলার ভঙ্গি ও বিশ^ সচেতনতা দেখে নিজকে বড় অসহায় মনে করছিলাম। দেশ থেকে বইপড়া উঠে যাওয়াসহ সব অনিষ্টের মূল মোবাইল। মোবাইলের নেশা কাটানোর জন্য নাতি-নাতনিদের কত বকাঝকা করি। এখন মনে হচ্ছে, ডিনামাইটের মতো অতিশয় অনিষ্টকারী বস্তুরই রয়েছে অতিশয় মহৎ দিক। গুগলের এক দিকে বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার, আরেক দিকে বাস করে শয়তান। বিশ্বের অবহেলিত কালো মানুষগুলো তাদের কৃষ্ণাঙ্গ নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার, ‘It always seems impossible until it is done’এই উক্তি বিশ^াস করে। একসময় কৃষ্ণাঙ্গদের অকারণে গ্রেফতার করাসহ তাদের জন্য পৃথক আইন ছিল। বিশ^াস করে বলেই ওই সময় থেকে উঠে পৌঁছে গেছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে। প্রশাসনিক পদে আজ কৃষ্ণাঙ্গদের দাপটই বেশি।
আমাদের কথোপকথন শেষ হওয়ার আগেই ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সামনে চলে আসি। পাসপোর্টে ডিপারচার সিল বসিয়ে সামনে যাওয়ার পথ দেখান। সামনে কঠিন মূর্তি ধারণ করে বসে রয়েছেন আরো একজন। তিনি আবার কে? জানতে চাই মেয়েটির কাছে। মেয়েটি দ্রুত টাইপ ট্রান্সেলেট করে জানিয়ে দেন, ‘তিনি ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা। আপনি ব্রিটিশ রাজ্যে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। আপনাকে সহজে ছাড়ছে না। আপনার কাছে চাইতে পারেন রিটার্ন টিকিটও।’ রিটার্ন টিকিট লাগেজের ভিন্ন পকেটে রেখেছিলাম। মেয়েটির কথায় হাতে নিই। কাছে গিয়ে বুঝতে পারি, কঠিন মূর্তি ধারণকৃত ইন্সপেক্টর পুরুষ নন, মহিলা। মহিলা দেখলে পুরুষদের বল এমনিতেই অর্ধেক বেড়ে যায়। নির্ভয়ে কাগজপত্র হাতে দিতেই,
IO : Where would you go in London?
Me : I will go to 40 Cecil Road, Chadwell Heath.
IO : Who will you visit?
Me : I will visit my elder daughter and her family.
IO : How long will you stay?
Me : Until 20th May.
IO : Do you have a return ticket?
Me : Yes, I have.
IO : Why did you went to France?
Me : I went to see my daughter and her family.
IO : Where did you stay in France?
Me : I went to Rosny-sous-Bois.
IO : Have you ever been to France before?
Me : No, this was my first time.
ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার কাজ শেষসহ মালামাল স্ক্যান করে মেয়েটির পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকি। হাতে সময় মাত্র ১৪-১৫ মিনিট। উপরতলা থেকে নিচতলায় নামতে কয়েকটা সিঁড়ি। যাত্রীর জটলা এড়ানোর জন্য, প্রতিটি সিঁড়ি বরাবর কোচ নম্বর লেখা রয়েছে। কালো মেয়েটির কোচ নম্বর ১১। আমার কোচ নম্বর ৪। ট্রেনের সামনের দিকে। আমাকে ৪ নম্বর কোচের সিঁড়ি বরাবর পৌঁছে দিয়ে মেয়েটি ১১ নম্বর কোচের সিঁড়িতে চলে যায়। ট্রেনে উঠে দেখি, কোচ খালি। কাউকে জিজ্ঞেস করে সাহায্য নেব, সে লোকও নেই। কোচের মাঝামাঝি ৫৩ নম্বর সিটে দেখি এক স্বর্ণকেশী। তার কাছে ট্রেনের টিকিট মেলে ধরে জানতে চাই, আমি ভুল করছি কি না। টিকিট দেখে স্বর্ণকেশী,
Ñ I am right you are wrong.
শুনেই মাথাটা চক্কর খায়। সময় বাকি দুই মিনিট। লাগেজ টেনে নিচে নামিয়ে পরের কোচে প্রবেশের আগেই যদি গার্ডের হুইসেল বেজে ওঠে? চোখ যায় টিভি স্ক্রিনের দিকে। টিভি স্ক্রিনে ঈড়ধপয ৪ লেখা ভেসে উঠতেই স্বর্ণকেশীর দৃষ্টি আকর্ষণ করি। স্বর্ণকেশী স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ‘I am wrong you are right. বলে লাগেজ নামাতে শুরু করে।
চলতে শুরু করে ট্রেন। কয়েক মিনিটেই ছাড়িয়ে যায় শহর। সামনেই সেন্ট ড্যানিশ। তৃতীয় শতাব্দীর সাধু। ধর্ম ও ন্যায়ের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। এ বিষয়ে রয়েছে বিয়োগবিধূর ঘটনা। প্যারিসের বাম পোর্টালে সেন্ট ড্যানিশের কর্তিত মস্তকের মূর্তি এখনো সংরক্ষিত আছে।
এর পরই মাঠ, ছোট শহর ও হাটবাজার। ছবির মতো গাঁও-গেরাম। গাঁয়ের সামনে সবুজ মাঠ, পেছনে বন। তার পর ফসলের জমি, কর্ষিত ভূমি, ঝোঁপ-জঙ্গল, খাল-নালা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত উইন্ড ফার্ম। উইন্ড ফার্ম পরিচালিত খামারগুলো বিস্তৃত এলাকাজুড়ে। পরিবেশবান্ধব এসব উইন্ড ফার্ম সুইডেন ও লন্ডনেও দেখেছি।
আকাশে ইতস্তত ভাসমান সাদা মেঘ, পার্কিং করা শত শত গাড়ি, পাশে রেললাইন, কখনো কখনো সারিবদ্ধ গাছ, টিলা ও পাহাড়। কোনো কোনো পাহাড়ের চূড়া পৌঁছে গেছে মেঘের দেশে। খাদ, সেচ প্রকল্প, সেতু, পাওয়ার প্লান্ট, রেলওয়ে জংশন, মাঠের ওপর আঁকাবাঁকা মেঠো পথ, সরিষা ফুলের হলুদ জমি, রঙিন ফুলের ঝোঁপ, গবাদি পশুর খামার ও ভেড়ার পাল। ফ্রান্সের গারদো নর্দ থেকে ঈশ্বরের তৈরি প্রকৃতি দেখতে দেখতে ১৪১ কিলোমিটার পার হয়েছি। সামনেই কালাইস। কালাইসের ৪৮ কিলোমিটার পরেই ডোভার।
ডোভারের সুড়ঙ্গপথ পার হতে সময় লেগেছিল ২০ মিনিট। ডোভার পার হয়ে ২৫ কিলোমিটার পরেই কেন্ট ডাউন ন্যাচারাল রিজার্ভ। ন্যাচারাল রিজার্ভের ৪৫ কিলোমিটার পরই রিভার মিডওয়ে। দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের একটি বিখ্যাত নদী। ১১৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নদীটি হাই ওয়েল্ড, ইস্ট সাসেক্স, টনব্রিজ মেডস্টোন ও কনুরবেশনের মধ্য দিয়ে উঁচু-নিচু স্থানে সাপের মতো এঁকেবেঁকে পরিশেষে রিভার টেম্পসে মিলিত হয়েছে। নদীতে ভাসমান ছোট-বড় অনেক নৌযান।
পথের পাশে কখনো কখনো লাল, হলুদ, সাদা, বেগুনি ও গোলাপি রঙের ফুলের ঝোঁপ। প্রাকৃতিকভাবে গজিয়ে ওঠা নানা বর্ণের ফুলের ঝোঁপ দেখলে মনে হয় কোনো চিত্রকরের দোয়াতের রঙ ছিটকে পড়েছে। এসব দেখতে দেখতে দুই ঘণ্টা কখন পার হয়ে গেল, টের পাইনি। এসব দেখে শরৎচন্দ্রের মতো হাতজোড় করে বলতে ইচ্ছা করছে, ‘ভগবান! এ চোখ দুটো যেমন তুমিই দিয়েছিলে, আজ তুমিই তাহাদের সার্থক করিলে।’
মাথার ওপর থেকে লাগেজ নামিয়ে প্রস্তুত হতে না হতে ৫৬ কিলোমিটার পার হয়ে ট্রেন চলে আসে সেন্ট প্যানক্রাস। লন্ডনের ব্যস্ততম পুরনো রেলওয়ে স্টেশন সেন্ট প্যানক্রাস ইন্টারন্যাশনাল, বয়স ১৫৪ বছর। ইউরোস্টার থেকে নেমে মিনিট দুয়েক হাঁটার পর সামনেই শতবর্ষের পুরনো ঐতিহাসিক ঘড়ি। ঘড়িতে সময় ১২:৩২। আমার টিকিটে Arrival 12:30 Local time । ২০১৮ সালে সেন্ট প্যানক্রাস ইন্টারন্যাশনালের ১৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ঘড়ির নিচে want my time with yo গোলাপি রঙের লেখাটি শিল্পী ট্রেসি এমিন আরএ (Tracey Emin RA)-এর হাতের লেখা। শত বছরের পুরনো ঘড়ি ও আধুনিক ইউরোস্টার, সময়ে চুল পরিমাণ হেরফের নেই। হ
লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
E-mail : adv.zainulabedin@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement