১৫ আগস্ট ২০২২
`

বায়তুশ শরফের পীর হজরত মাওলানা শাহ সুফি কুতুব উদ্দিন (রহ:)

-

বায়তুশ শরফের মরহুম পীর বাহরুল উলুম শাহ সুফি হজরত মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন ছিলেন এক কালজয়ী প্রতিভা। জ্ঞানে গুণে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। বিজ্ঞ মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও আরবি ভাষাবিদ হিসেবে তিনি সর্বজন প্রশংসিত। তার কাব্যিক প্রতিভাও ছিল অসাধারণ। হক্কানি আলেম, বিখ্যাত ওয়ায়েজ হিসেবে তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। এরূপ বড় বড় পরিচয়, খ্যাতি ছাড়িয়ে তিনি একজন কামিল পীর হিসেবেই সর্বত্র বেশি পরিচিত। আধ্যাত্মিক সাধক মানবপ্রেমিক হিসেবে সব শ্রেণীর মানুষের কাছে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। একই সাথে ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, দেশদরদি মানবপ্রেমিক এবং সমাজসেবক হিসেবেও তার পরিচিতি ছিল সমধিক। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি অত্যন্ত সুনামের সাথে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
মওলানা শাহ মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন বন্দরনগরী চট্টগ্রাম জেলার বৃহত্তর সাতকানিয়া (বর্তমান লোহাগাড়া) উপজেলার অন্তর্গত আধুনগরে সুফি মিয়াজি পাড়ায় ১৯৩৮/৩৯ সালে এক ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত আলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম মওলানা মুসলেহ উদ্দিন এবং মাতা মরহুমা রায়হানাহ বেগম। তার পিতা ছিলেন লোহাগাড়া উপজেলাধীন ঐতিহ্যবাহী চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদরাসার একজন সুযোগ্য শিক্ষক। তার মাতা চরিত্রবতী, পর্দানশিন অত্যন্ত পরহেজগার মহিলা ছিলেন।
কুতুব উদ্দিন চুনতি হাকিমিয়া সিনিয়র মাদরাসার সেরা ছাত্রদের তালিকায় নিজের স্থান করে নেন। এ মাদরাসা থেকে ১৯৫৩ সালে হাফতুম (দাখিল) কৃতিত্বের সাথে পাস করেন। ১৯৫৫ সালে একই প্রতিষ্ঠান হতে ছুয়াম (আলিম) প্রথম বিভাগে ১৬তম স্থান এবং ১৯৫৭ সালে উলা (ফাজিল) প্রথম বিভাগে পঞ্চম স্থান অধিকার করে বিরল কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। চুনতি হাকিমিয়া সিনিয়র মাদরাসায় তার উস্তাদদের মধ্যে ছিলেন মওলানা আবু তাহের মুহাম্মদ নাযের, মওলানা মোজাফফর আহমদ, মওলানা মুহাম্মদ আমীন, মওলানা রশিদ আহমদ, মওলানা মুহাম্মদ কাসেম প্রমুখ।
মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন হাদিস বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘উম্মুল মাদারিস’ (মাদরাসাগুলোর জননী) খ্যাত চট্টগ্রাম চন্দনপুরা দারুল উলুম আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। এ মাদরাসায় অধ্যয়নকালে তিনি ‘কালের সেরা ছাত্র’ ও ‘মাদরাসার গৌরব’ হিসেবে আখ্যায়িত হন। তিনি ১৯৫৯ সালে কামিল (হাদিস) প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করায় ‘গোল্ড মেডেল’ লাভ করেন। এ অনন্য ফল লাভের সুবাদে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড তাকে দু’বছর মেয়াদে গবেষণা করার জন্য বৃত্তি প্রদান করে; কিন্তু পারিবারিক কারণে তিনি সেই সুযোগ গ্রহণ করতে পারেননি।
কামিলে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করার পর তার শ্রদ্ধাভাজন পীর, বায়তুশ শরফের মহান প্রতিষ্ঠাতা হজরত মাওলানা মীর মোহাম্মদ আখতার (রহ:)-এর কাছে দোয়া নিতে এলে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়ে সে দিন বাদ জুমা মাদারবাড়ির তার বাংলোয় (ইবাদতখানা) উপস্থিত সবাইকে মিষ্টি মুখ করান এবং তার কারুকার্যখচিত টুপিটি স্বহস্তে মওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিনের মাথায় পরিয়ে দেন। তার ব্যবহৃত সাদা রুমালখানা দ্বারা মাথায় পাগড়ি বেঁধে দিয়ে ‘বাহরুল উলুম’ (বিদ্যাসাগর) উপাধিতে ভূষিত করেন।
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আহসান সাইয়েদ তার প্রবন্ধে বলেন, “আরবি ভাষায় তার পাণ্ডিত্য সর্বজন প্রশংসিত। তিনি এমন সহজ সাবলীলভাবে অনর্গল আরবিতে কথা বলেন এবং লিখেন যা দেখলে মনে হয়, আরবি যেন তার মাতৃভাষা। একই সাথে উর্দু এবং ফারসি ভাষায়ও তিনি সমান পারদর্শী। তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও বালাগাত (অলঙ্কার শাস্ত্র)-এ সব বিষয়ে তার রয়েছে গভীর জ্ঞান। তার জ্ঞান-গরিমায় মুগ্ধ হয়ে দেশের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিগণ তাকে ‘বাহরুল উলুম’ উপাধিতে ভূষিত করেন।”
মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (রহ:)-এর শৈশব ও যৌবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে অনুমিত হয় যে, তিনি ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে মহত্তর এক শীর্ষস্থানের অধিকারী হবেন। ছাত্রজীবনেই তার মধ্যে বিশ্বস্ততা, সাধুতা, সময়ানুবর্তিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ধৈর্যশীলতা, সত্যানুরাগ প্রভৃতি মহৎ গুণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বস্তুত তার এই মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতাই তাকে মহত্ত্বের উচ্চ শিখরে পৌঁছতে সাহায্য করে। তিনি ১৯৬০ সালে সাতকানিয়া থানার রসুলাবাদ সিনিয়র মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। তার মেধা, বিচক্ষণতা, জ্ঞানের গভীরতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বিবেচনা করে অতি অল্প সময়ের মধ্যে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাকে সুপারিনটেনডেন্ট পদে নিযুক্তি দেন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবৈতনিকভাবে তার পীর মরহুম শাহ আবদুল জব্বার (রহ:) প্রতিষ্ঠিত বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। পরে ১ জুন, ১৯৮৯ উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এ পদে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯৭ সালে তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে অধ্যক্ষের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেও অবৈতনিক ওস্তাদ হিসেবে বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসার ছাত্রদেরকে বুখারি শরিফ ও মুসলিম শরিফসহ নানান বিষয়ে পাঠদানের পাশাপাশি মাদরাসা পরিচালনা পরিষদের (গভর্নিং বডির) সম্মানিত সভাপতি ও সহসভাপতি হিসেবে ইন্তেকালের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত বিশেষ অবদান রেখেছেন।
নভেম্বর, ২০০৭ সাল থেকে তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এবং ১৩ জানুয়ারি, ২০০৯ সাল থেকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি আরো বহু দ্বীনি, সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ১৯৯৮ উপলক্ষে তিনি চট্টগ্রাম জেলার ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান’ (অধ্যক্ষ) এবং ২০০০ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক তিনি জাতীয়ভাবে ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান’ (অধ্যক্ষ) নির্বাচিত হন।
শাহ মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিনের গতিশীল নেতৃত্বে ‘বায়তুশ শরফ আন্জুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ’ একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। তার প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা ও ত্বরিত কর্মদক্ষতার ফলে বায়তুশ শরফের বহুমুখী কার্যক্রম সুবিস্তৃত হয়েছে প্রতিনিয়ত। ২৫ মার্চ ১৯৯৮ সালে শাহ আবদুল জব্বার (রহ:)-এর ইন্তেকালের পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তার তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয় অনেক প্রতিষ্ঠান। সেগুলো হলো- ১. মসজিদ-১০০টি ২. মাদরাসা-১৫টি ৩. এতিমখানা-সাতটি ৪. হেফজখানা-১২টি ৫. হাসপাতাল-তিনটি ৬. চুনতি বাজারে সুদৃশ্য মজবুত তোরণ (বাবে মীর আখতর)-একটি। আরো বহু মাদরাসা, মসজিদ ও এতিমখানা নির্মাণাধীন রয়েছে।
ইসলামী সংস্কৃতি বিকাশেও শাহ মাওলানা কুতুব উদ্দিনের অবদান অনন্য। প্রতি বছর অত্যন্ত শান-শওকতের মাধ্যমে ঈদে মিলাদুন্নবী সা: উদযাপিত হয়ে থাকে। এ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ ‘ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা’ বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতি বছর চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে দেয়া হয় গুণীজন সংবর্ধনা। তার তত্ত্বাবধানে ১৯৯৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশের সেরা গুণী ৯০ জন ব্যক্তিত্বকে সংবর্ধনা ও ‘বায়তুশ শরফ স্বর্ণপদক’ প্রদান করা হয়।
হজরত মাওলানা কুতুব উদ্দিন (রহ:) ছিলেন একজন স্বভাবজাত কবি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও অনুষ্ঠানে আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষায় উপস্থিত স্বরচিত কবিতা পাঠ করে তিনি হয়েছেন প্রশংসিত ও নন্দিত। তার বহু কালোত্তীর্ণ হাম্দ, না‘ত পবিত্র মক্কায় কা’বার চত্বরে ও মদিনায় মসজিদে নববীর চত্বরে লেখা; যেগুলো গুলহায়ে আকিদত কাব্যগ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে। তার বহু উর্দু, ফারসি ও আরবি কবিতা পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তার ‘গুলহায়ে আকিদত’ নামে উর্দু ভাষায় একটি অমূল্য কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যাতে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর স্বরচিত প্রায় ৫০০ দুর্লভ কবিতা স্থান পেয়েছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা আটটি।
তিনি ১৯৬৫ সাল থেকে ইন্তেকালের দু’বছর আগ (২০১৭ ইং.) পর্যন্ত ৫২ বারের অধিক পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালন করেছেন। এই আধ্যাত্মিক সাধক, মানবপ্রেমিক, দানবীর তার লাখ লাখ ভক্ত-অনুরক্তকে শোক সাগরে ভাসিয়ে মহামারী করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০ মে ২০২০ সালে পবিত্র শবেকদরের দিন ঢাকার আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। শবেকদরের মহিমান্বিত রাতের শেষে ফজরের নামাজের পর তাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় বায়তুশ শরফ মসজিদের পাশে তার পীর মুর্শিদ হজরত মাওলানা শাহ আবদুল জব্বার (রহ:)-এর কবরের পাশে সমাহিত করা হয়। তার নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন তার একমাত্র পুত্র মাওলানা ছালাহ উদ্দিন বেলাল। দয়াময় মেহেরবান আল্লাহ তাকে তার সুকর্মের জন্য জান্নাতুল ফেরদৌসে দাখিল করুন।
লেখক : সম্পাদক, মাসিক দ্বীন দুনিয়া ও শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়া,
বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ধনিয়ালাপাড়া, চট্টগ্রাম-৪১০০
ই-মেইল : jafardeendunia@gmail.com

 


আরো সংবাদ


premium cement