০৪ জুলাই ২০২২, ২০ আষাঢ় ১৪২৯, ৪ জিলহজ ১৪৪৩
`

বুলডোজার বাবা

-

বেশি দিন হয়নি, দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরী এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর মুসলমানদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে এ বলে ধ্বংস করে দেয়া হয় যে, এখান থেকে ‘হনুমান জয়ন্তীর’ যাত্রার ওপর পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আপনাদের স্মরণে থাকার কথা, এ অভিযানের সময় সেখানকার জামে মসজিদের বাইরের অংশকেও ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। অভিযানের সময় মসজিদ ও তার মিনারগুলোর দিকেও বুলডোজারের টার্গেট ছিল এবং বুলডোজার ঘুরেফিরে বারবার মসজিদের ওপর আছড়ে পড়ছিল। এ দৃশ্য সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ দেখেছে। এর উদ্দেশ্য মূলত এ কথা বিশ্বাস করানো যে, বুলডোজারের আওতায় শুধু মুসলমানদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং মসজিদ ও মাদরাসাও রয়েছে, যেগুলোকে ‘ইসলামের দুর্গ’ বলা হয়। যদি আপনি গভীরভাবে ভেবে দেখেন, তা হলে দেখতে পাবেন যে, বর্তমানে ভারতে মসজিদ ও মাদরাসাই সবচেয়ে বেশি টার্গেটে রয়েছে। বিষয়টি মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান প্রতিহত করাই হোক কিংবা রাস্তায় আদায় করা নামাজকে বাধা প্রদান হোকÑ সবের উদ্দেশ্য একটাই, যে কোনোভাবে মুসলমানদের ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হওয়ার অনুভব করানো।
এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে ৫ মে ইউপির সবচেয়ে বড় শহর, কানপুরে একটি মাদরাসাকে ‘অবৈধ স্থাপনা’ আখ্যায়িত করে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়া হয়। অভিযানের সময় কুরআনুল কারিম ও হাদিসের গ্রন্থাবলির চরম অবমাননা হয়। কিন্তু বুলডোজার চালকদের সে দিকে কোনো খেয়াল ছিল না। এর আগে উত্তরপ্রদেশেরই মোবারকপুরে জামেয়া আশরাফিয়া মাদরাসার ৩০ বছরের পুরনো কলোনির কিছু অংশে বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। কানপুর থেকে প্রাপ্ত সংবাদ মোতাবেক ঘটমপুরে অবস্থিত মাদরাসায় কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই ভাঙচুর অভিযান চলেছে। মাদরাসার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বৈধ স্থাপনার সব নথিপত্র দেখানো সত্ত্বেও এমনটি করা হয়েছে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষের কোনো কথাই শোনা হয়নি। অধ্যক্ষ ইনতেজার আহমদের বক্তব্য, যেখানে ভাঙচুর অভিযান চালানো হয়েছে, সে জায়গাটি একেবারেই নিষ্কণ্টক ঝামেলামুক্ত। এ ব্যাপারে নগরপালিকার দাবি একেবারে ভিত্তিহীন। বিষয়টি ডিভিশনাল কমিশনারের আদালতে শুনানির অধীন রয়েছে। অধ্যক্ষের বক্তব্য, পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে মাদরাসাকে টার্গেট করা হয়েছে। আর এতে মিউনিসিপ্যালের ইঞ্জিনিয়ারের বিদ্বেষ স্পষ্ট প্রকাশ পেয়েছে। তিনি দ্রুত ইঞ্জিনিয়ারকে বরখাস্ত ও ক্ষতিপূরণের দাবি করেছেন। এ ব্যাপারে নগর কাজী মুফতি মুহাম্মদ সাকিব মিসবাহী ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে সাক্ষাৎ করে নগরমহাপালিকার এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। এ ঘটনায় পুরো শহরে মারাত্মক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে শহরের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তের পর অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ^াস দিয়ে বলেন, শহরে আইনের শাসন বজায় থাকবে। কাউকে আইন হাতে তুলে নেয়ার অনুমতি দেয়া হবে না। এ সময় উত্তরপ্রদেশেরই সন্ত কবিরনগরে সাবেক বিধানসভা সদস্য তাবিশ খানের রাইস মিলকে অবৈধ অভিহিত করে তার ওপরও বুলডোজার চালিয়ে দেয়া হয়েছে। অভিযোগ হচ্ছে, এ রাইস মিল আবাসিক এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে। তাবিশ খানের বক্তব্য, তার রাইস মিলকে শুধু এ জন্য ভেঙে ফেলা হয়েছে যে, তিনি মুসলমান।
এর আগে রমজান মাসে উত্তরপ্রদেশের মোবারকপুরে অবস্থিত কেন্দ্রীয় ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া আশরাফিয়াতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। জামিয়ার ক্যাম্পাসে অবস্থিত ৩০ বছরের পুরনো শিক্ষকদের কলোনিকে এ বলে ভাঙা শুরু করা হয়েছিল যে, এটি সরকারি নালার ওপর নির্মিত। এ অভিযানের কারণে পুরো এলাকায় হইচই শুরু হয়ে যায়। বুলডোজারের সাথে তহশিল কর্মকর্তারা ও পুলিশ ফোর্সও উপস্থিত ছিল। উচ্ছেদ অভিযানের সময় শিক্ষক কলোনির সব শিক্ষক রমজানের ছুটিতে নিজ নিজ বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। এই শিক্ষক কলোনিতে ক্লাস চলাকালে বিশের অধিক শিক্ষক নিজেদের পরিবার-পরিজন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ফ্ল্যাটে থাকতেন। দুই বছরের করোনা মহামারী ও বার্ষিক সাধারণ ছুটির সময় সব ছাত্রও অনুপস্থিত ছিল। মাদরাসার দায়িত্বশীলরাও অর্থ সংগ্রহের জন্য সফরে ছিলেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, উচ্ছেদ অভিযানের সময় সেখান থেকে আসবাবপত্র বের করারও সুযোগ দেয়া হয়নি। একের পর এক এসব ঘটনা দেখে অনুমান হয় যে, বুলডোজার এখন আমাদের জাতীয় পরিচিতি লাভ করতে যাচ্ছে। বুলডোজারের শাসনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, দেশে আইনের রাজত্ব শেষ হয়ে গেছে। আদালতগুলো তাদের হাত গুটিয়ে নিয়েছে। বুলডোজারকে সমাজের দুর্বল শ্রেণীর মানুষদের জীবনকে জাহান্নাম বানানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বানিয়ে নেয়া হয়েছে। এমনটি নয় যে, ভারতে অবৈধ স্থাপনা নেই। তবে এ বুলডোজারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি শুধু সেসব লোকের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে, যারা শাসক দলের সাথে মতাদর্শগত বিরোধিতা করে অথবা তারা অন্য কোনো দলের সাথে রয়েছে। এ সময়ের রাজনৈতিক শাসনে ভিন্নমতকে সবচেয়ে বড় অপরাধ অভিহিত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এর সবচেয়ে লজ্জাজনক সূচনা হয়েছে মধ্যপ্রদেশের খারগোন জেলায় রামনবমীর মিছিলের সময়। সেখানকার রামনবমীর মিছিলে পাথর নিক্ষেপের অভিযোগ তুলে এক স্থানীয় মুসলমানকে হত্যা করা হয়। ওই সময় রাজ্য মুখ্যমন্ত্রী নরোত্তম মিশ্রর এ লজ্জাজনক বক্তব্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যেখানে তিনি বলেন, ‘যেসব বাড়িঘর থেকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে, সেগুলোকে পাথরে বদলে দেয়া হবে।’
আমি সম্প্রতি কয়েক দিন পশ্চিম ইউপিতে ঘুরে অনুভব করলাম, সেখানে মানুষের মনে বুলডোজারের ভয় তেমনভাবেই ভর করেছে, যেমনভাবে সিএএ এবং এনআরসির ভয় ভর করেছিল। ওই সময় যেভাবে মানুষ তার নাগরিকত্বের বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও এনআরসি নিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত ছিল, অনুরূপভাবে আজ তাদের ওপর ‘বুলডোজার বাবা’র ভয় এমনভাবে ভর করেছে যে, তারা তাদের বৈধ ঘরবাড়ি ও দোকানপাটের ওপরও বুলডোজার চলার অনুভব করছে। এটি এমন এক মানসিক ভয়, যা বর্তমান শাসকগোষ্ঠী তাদের জুলুম ও পক্ষপাতমূলক আচরণ দ্বারা সৃষ্টি করেছে। মুসলমানদের উচিত, তারা মনোবল ও সাহসের সাথে এ পরিস্থিতির মোকাবেলা করবে এবং নিজেদের মধ্যে কোনো ধরনের ভয়কে স্থান দেবে না। হ
মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক মুম্বাই উর্দু নিউজ ০৮ মে, ২০২২ হতে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট


আরো সংবাদ


premium cement