১৯ মে ২০২২, ০৫ জৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩
`

শ্রমিকের নিরাপত্তা ও কারখানা পরিদর্শন

-

সারা দেশে শিল্প কারখানার কর্মপরিবেশ ঠিক আছে কিনা তা দেখার জন্য কলকারখানা পরিদর্শন শুরু হয়েছে। সরকার গঠিত দল ১০ জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত আটটি বিভাগীয় শহরে ৮৭৫টি কারখানা পরিদর্শন করেছে। নারায়ণগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫২ শ্রমিক নিহত হওয়ার পর কর্মস্থলে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কারখানার পরিবেশ দেখার জন্য উচ্চপর্যায়ের এক কমিটি গঠন করা হয়। পরিদর্শনের জন্য ১০৮টি দল গঠন করা হয়।
পরিদর্শক দল বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। জানা গেছে, ১১টি দফতরের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পরিদর্শন টিম গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার কারখানা পরিদর্শনের কথা থাকলেও এ পর্যন্ত মাত্র ৮৭৫টি কারখানা পরিদর্শন হয়েছে। পত্রিকান্তরে জানা গেছে, পরিদর্শন টিম নানা অনিয়ম, ত্রুটি পাচ্ছেন। অধিকাংশ কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই, কারখানার নকশা অনুমোদন নেই, যেনতেনভাবে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। নকশার সঙ্গে বিদ্যমান ভবনের মিল নেই। কারখানার পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। এমনকি কোনো কোনো কারখানার ট্রেড লাইসেন্সও পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিদর্শন যদি সঠিকভাবে, নিরপেক্ষভাবে হয় তাহলে এসব কারখানায় নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে আসবে। দেশে শিল্প কারখানায় উৎপাদনের গতি ফিরিয়ে আনতে, শ্রমিকদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য চলমান কারখানা পরিদর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তৈরী পোশাক খাতের বাইরে দেশের এসব কলকারখানা দেশের ভেতরে ও বাইরে পণ্য উৎপাদন ও রফতানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে আকৃষ্ট করতেও কারখানার পরিবেশ নিরাপদ রাখতে হবে। সিপিডির তথ্য মতে, দেশে ছয় মাসে শিল্প কারখানায় ৮২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাতে ১৬৭ জন শ্রমিক নিহত ও ২৬৫ জন আহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার মধ্যে ৬৩.৪১% অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্ঘটনা। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের কারখানাগুলোতেই অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সরকারি তথ্য মতে, দেশব্যাপী এখন পর্যন্ত ৪৫ হাজার কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে খাদ্য উৎপাদনকারী খাতে সর্বোচ্চ ১২৬৭৮টি, দ্বিতীয় সর্বাধিক ৩৩২৬টি বস্ত্র খাতে। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রকৌশল খাত যেখানে ২ হাজার ৭০৪টি কারখানা রয়েছে। সিপিডির এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে পোশাক কারখানা ছাড়া ফিলিং স্টেশন আছে ১৩৭১টি, কাঠ ও নির্মাণ কারখানা আছে ২৭৯৮টি, বস্ত্র কল ৪৩২৩টি, ইটভাটা আছে ৫৬১১টি, খাদ্য উৎপাদন খাতে আছে ১২৬৭৮টি ও অন্যান্য খাতে ১০৫০টি কারখানা আছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য মতে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সারা দেশে যেসব খাতে কারখানায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে গত নভেম্বর ২০২০ থেকে সেগুলো পরিদর্শন করা হচ্ছে। এর মধ্যে তৈরী পোশাকসহ রফতানিমুখী শিল্পকে বাদ দিয়ে সারা দেশে ৩২ খাতের ৪৫ হাজার কারখানা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার কারখানা পরিদর্শন করা হবে। পরে ধাপে ধাপে অন্য কারখানাগুলোও পরিদর্শন করা হবে। পরিদর্শন শেষে প্রতিটি দল সংশ্লিষ্ট কারখানার ত্রুটিবিচ্যুতি প্রতিবেদন তুলে ধরবে। প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় কমিটির কাছে পরিদর্শন রিপোর্ট পেশ করা হবে। জাতীয় কমিটি পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
এখন প্রশ্ন হলো পরিদর্শন দলকে পরিদর্শনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুবিধা, পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও তাদের প্রয়োজনীয় ভাতার ব্যবস্থা মানসম্মত হচ্ছে কিনা তা দেখা দরকার। কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে যেন পরিদর্শন টিমকে কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়তে না হয় সেদিকে কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া উচিত। পরিদর্শনকে গতিশীল ও কার্যকর করতে হলে প্রয়োজনীয় বাজেট ও সাপোর্ট দেয়া উচিত। দেশের শিল্প খাতে গতি ফিরিয়ে আনতে, শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ রক্ষা, পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপন ও কারখানার পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পরিদর্শন দল কর্তৃক প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাই পরিদর্শনে যারা যাচ্ছেন তারা যাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন। চেকলিস্ট অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য যাতে উঠে আসে তাদের সেদিকে নজর দিতে হবে ।
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে। ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য অর্থনৈতিক বিভিন্ন খাত, বিভাগগুলোর বিভিন্ন দুর্বলতা, শ্রমিকের নিরাপদ কর্মপরিবেশের সমস্যাসহ কারখানার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে তার সুষ্ঠু সমাধান করা সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে শিল্প কারখানা পরিদর্শনে গতি আনতে হবে। প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পরিদর্শনের তথ্য-উপাত্ত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা উচিত। পরিদর্শনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে হবে। বিডার কার্যক্রমকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত। চলমান পরিদর্শন দলে সিপিডির সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনে আইএলওকে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে পরিদর্শন কার্যক্রমে গতি আসবে। পরিদর্শন শেষে প্রতিটি দল সংশ্লিষ্ট কারখানার ত্রুটিবিচ্যুতির প্রতিবেদন জাতীয় কমিটির কাছে তুলে ধরবে।
জাতীয় কমিটি তা যাচাই বাছাই করে যে সিদ্ধান্ত নেবে তা দেখার বিষয়। ওই সিদ্ধান্তে যাতে কারখানাগুলো কাজের গতি ফিরে পায়, পরিবেশ রক্ষা হয়, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসম্মত কাজের পরিবেশ নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধিসহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা থাকবে বলে সবার বিশ^াস। দেশের শিল্প উৎপাদনকে বেগবান করতে ও রফতানিমুখী শিল্পগুলোর উৎপাদনের পরিবেশ টেকসই করতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে তৈরী পোশাক, ডেনিম, কৃত্রিম ফাইবার, গার্মেন্টস এক্সেসরিজ, ওষুধ, প্লাস্টিক পণ্য, জুতা (চামড়া জাত) ও অচামড়া জাত ও সিনথেটিক এবং পাটজাত পণ্য ও বহুমুখী পাটজাত পণ্য, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ফল, হালকা প্রকৌশল পণ্য (বাইসাইকেল, অটোপার্টস, মোটরসাইকেল, ব্যাটারি), জাহাজ ও সমুদ্রগামী ফিশিং ট্রলার, হোমটেক্সটাইল, হোমডেকর, লাগেজ, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইন গ্রেডিয়েন্টস, চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদন ও বিপণনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।
করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন নিয়ে আশঙ্কার মধ্যেও আমদানি রফতানিসহ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেছে। যদিও বর্তমানে করোনার ওমিক্রন ও ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের প্রভাব আবার বেড়ে চলেছে। মানুষ নতুন করে আবার আক্রান্ত হচ্ছে যা অর্থনীতির সূচকে লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে আশঙ্কা সৃষ্টি করছে। কোভিড-১৯ অতিমারী শুরুর আগে বাংলাদেশ ২০১৫-২০১৬ হতে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে ৭.৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয় ৮.১৫ শতাংশ। তবে অতিমারীর কারণে এই প্রবৃদ্ধির ধারা ব্যাহত হয়। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৩.৪৫ শতাংশ। এর পরের ২০২০-২০২১ অর্থবছরে হয় ৫.৪৩ শতাংশ। এদিকে বিশ^ব্যাংকের গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপ্রেক্টাস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে চলতি ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬.৪ শতাংশ। যদিও সরকার চলতি অর্থবছরে বাজেটে ৭.২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য মতে ঘোষণা করেছে। সেবা খাতের কর্মকাণ্ড ও তৈরী পোশাক খাতের রফতানি বাড়ার গতি অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে বিশ^ব্যাংক আশা প্রকাশ করেছে।
দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের প্রবৃদ্ধির গতি ঊর্ধ্বমুখীকরণের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশের উত্তরণের জন্য টেকসই শ্রম পরিবেশ একান্ত প্রয়োজন। শ্রমিকদের জন্য বিশেষ জরুরি সহায়তা তহবিল গঠন, করোনার টিকা ও চিকিৎসা প্রদান, তাদের জন্য বীমাব্যবস্থা প্রবর্তন করা উচিত। বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিকদের ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। ছোট মাঝারি আকারের কারখানাগুলো এখনো বিভিন্ন সঙ্কটে আছে। কাঁচামাল সঙ্কট ও প্রয়োজনীয় দক্ষ শ্রমিক সঙ্কটও রয়েছে। স্বল্প সময়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে বেকারদের কিভাবে কাজে লাগানো যায় সে ব্যাপারে সরকারের আলাদা পদক্ষেপ নেয়া উচিত। হ
লেখক : ব্যাংকার
ইমেইল : main706@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement