১৯ মে ২০২২, ০৫ জৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩
`

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা, কার কাজে লাগবে

-

ঘটনা দু’টি। বাংলাদেশ মার্কিন অবরোধের পাল্লায় পড়েছে। আর ওদিকে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক দূরে থেকে দূর অস্তে চলে যাচ্ছে; তাই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও। বাংলাদেশে মার্কিন অবরোধ না হয় দেখা বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু তা বলে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ভাটায় যাবে কেন?
এটা ঠিক, প্রথমটার জন্য দ্বিতীয়টা ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। তবে, সম্পর্কিত। যেমন গত ১০ ডিসেম্বরের মার্কিন অবরোধ আরোপের ঘোষণায় সবার বেলাতেই সাধারণভাবে বলা হয়েছিল মার্কিন অবরোধের কারণ- মানবাধিকার লঙ্ঘন। এর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনের ভাষায়, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি আর মানবাধিকার জড়াজড়ি করে থাকা শুরু হয়েছে... । আর তা থেকেই, হ্যাঁ সেখান থেকেই বাংলাদেশে অবরোধ আরোপ আর ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ঝুলে পড়ার পেছনের কারণ একটাই আর তা হলো মানবাধিকার লঙ্ঘন। যেটা বাংলাদেশের বেলায় র্যাব এই প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা বিষয়টা মুখ্য, আমেরিকা তাই বলছে। আর ভারতের বেলায় মুখ্যত কাশ্মিরের স্বাধীনতা-স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়া, ৩৭০ ধারা বাতিলসহ জবরদস্তি কাশ্মির ভারতের মূল ভূখণ্ড বলে জুড়ে নেয়া, এই মানবাধিকার লঙ্ঘন। ঘটনা দু’টির ‘মিলের জায়গা’ এখানেই।
ভারতে নিজস্ব ব্যবসায়ীদের অর্থে পরিচালিত একমাত্র থিংকট্যাংক ওআরএফ বা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন। এই ওআরএফ-এর এক নিজস্ব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর বাইডেনের শপথ গ্রহণের পরে ২৩ এপ্রিল ২০২১। ওই রিপোর্টের শিরোনাম : হিউমান রাইটস ও মার্কিন ফরেন পলিসি : ভারত ও চীনের ওপর এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া; যার প্রথম অংশে চীনের বিরুদ্ধে উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যতকিছু অবরোধ দেয়া হয়েছে এর তালিকা দিয়ে ভারতের জন্য তা উপভোগের, এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। কিন্তু রিপোর্টের দ্বিতীয় অংশ ভারতের জন্য খুবই হতাশার। সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়েছে উপ-শিরোনামেই। সেটা এমন : ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের (বিরুদ্ধে) ক্যাপিটাল হিল-এর অ্যাডভোকেসি : পরিণতিতে গত তিন দশকের সম্পর্ক অগ্রগতির উল্টা-ভ্রমণ।
‘ক্যাপিটল হিল’ বলতে আমেরিকান কংগ্রেস বা সংসদ বিল্ডিং কমপ্লেক্স বুঝানো হয় যেখানে সদস্যরা আইন প্রণয়নের জন্য বসেন বা মিলিত হয়ে থাকেন। যেখানে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বার্ষিক স্টেট অব দা ইউনিয়নের ভাষণ দিয়ে থাকেন। আর সেখানেই ট্রাম্প আমলের শেষের সময় থেকেই ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রসঙ্গে একের পর এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। তা কখনো ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দু’দলই (বাই-পার্টিজান) মিলে, আবার কখনো একা ডেমোক্র্যাটরা। ওআরএফ-এর ওই রিপোর্ট, পাস হওয়া ওমন সব প্রস্তাবের তালিকা দিয়েছে। আর সেখান থেকেই রিপোর্টটা অনুসিদ্ধান্ত টেনেছে যে, বিগত ৩০ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের যে ধারাবাহিক অগ্রগতি, তা এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব প্রস্তাবের ভেতর দিয়ে উল্টা নিম্নগতি বা ভাটার পথে হাঁটা দিয়েছে; যদিও রিপোর্টটা শুরুতে আমেরিকা এতদিন ভারতকে কত কী খাতির করেছে ও গুরুত্ব দিয়েছে এ নিয়ে অজস্র প্রশংসা ও ভারতের সুখ স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছে। এটাও লিখেছে আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও তৎপরতা বলে যা কিছু আমেরিকা করেছে তা ভারতের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে ও ফোকাসে রেখেই করা হয়েছিল। আর তা থেকেই তা আসলে এখন কত তীব্রভাবে ভেঙে গেছে, তিন দশের ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক অগ্রগতি এখন কতটা উল্টা-ভ্রমণ করছে বলে তা হতাশার, কত গভীর বেদনা-বিধুর তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ওই রিপোর্টে।
কিন্তু পাক্কা তিন দশক বা ৩০ বছর কেন?
দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের কোনো ঘটনায় অনেক স্মৃতি বা পুরানা গুরুত্বপূর্ণ দিক-পটভূমি হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক; কাশ্মির যেখানে প্রায় পঁচাত্তর বছরের পুরানা ঘটনা। এদিকে ভারতের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় অনেকের আজ মনে হতে পারে শুরু থেকেই (১৯৪৭-৪৮) কাশ্মিরিরা বোধহয় ‘সশস্ত্র’ প্রতিবাদ করা জঙ্গি-টেরর, ফলে তারা খারাপ লোক! এই প্রপাগান্ডা ভিত্তিহীন, ফ্যাক্টস লুকানো কথা। গত ১৯৮৭ সালের কাশ্মির রাজ্যের নির্বাচনে রাজীব গান্ধী-ওমর আব্দুল্লাহ (কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও কাশ্মির ন্যাশনাল কংগ্রেসের ফারুক আবদুল্লাহর দলকে জিতানোর) এদের যৌথ ও ব্যাপক কারচুপি করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই কেবল সাধারণ কাশ্মিরিদের সশস্ত্র আন্দোলনের শুরু। তা থেকেই আর নির্বাচন নয়, সশস্ত্রভাবে আন্দোলন ও প্রতিবাদ জড়ো করতে হবে- এই রাজনৈতিক ধারা মূল ফোকাস হয়ে উঠেছিল। আর তাতে আস্তে আস্তে বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ির উত্থান ঘটেছিল। তিনিই প্রথম কাশ্মিরের রাজনীতির এই সশস্ত্র প্রকাশের কারণ হিসেবে ভারতের নিকৃষ্ট কারচুপির তৎপরতা নয় বরং উল্টা ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’ এই ভাষ্য নিয়ে আসেন। অর্থাৎ পাকিস্তান এর জন্য ‘দায়ী’। তারা সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র ও জঙ্গি-টেরর ভারতের কাশ্মিরে পাঠানোর মাধ্যমেই ভারত অশান্ত করা হয়েছে। এই মিথ্যা বয়ান তিনি শুরু করেছিলেন। আর আমেরিকা প্রথমে প্রচ্ছন্নভাবে পরে ২০০১ সালের পর থেকে খোলাখুলি ওয়ার অন টেররের নামে এর ভিত্তিতে ভারতের সাথে জোট বেঁধে ছিল।
গত তিন দশকের ভারত-আমেরিকা সেই সম্পর্কেরই এখনকার নিম্নগতির শোক আর হতাশা নিয়ে এই রিপোর্ট। মজার কথা হলো- এই বাজপেয়িকেই তিনি এক ‘বিরাট নরম মনের মানুষ যিনি কাব্য এবং সাহিত্যচর্চাও করেন’ বলেন। তার কবিতা নিয়ে গান রচনা করা হয়েছে, এভাবে তার ইমেজ নির্মাণের চেষ্টাও আমরা দেখেছি। অথচ তিনি হলেন প্রথম হিন্দুত্ববাদী যিনি সেই থেকে কাশ্মিরকে অশান্ত করা ও হত্যাকাণ্ডকে সাফাই দেয়ার প্রধান নায়ক! ভারত যখন কাশ্মিরে ব্যাপক কারচুপি, এই বিরাট অনৈতিক কাজ করে আত্ম-অপরাধবোধে হতাশায় ভুগছিল তখন এই বাজপেয়িই অসৎভাবে উল্টা পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারতীয়-মনকে আত্ম-অপরাধবোধ থেকে বের করে নিয়েছিলেন।
বাজপেয়ি ২০০৪ সাল মে পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ভারতের। আর ওদিকে আমেরিকাও ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক-বন্ধনের যাত্রা শুরু করেছিল এই বাজপেয়ির হাত ধরে এবং ওই একই অসততার ওপর দাঁড়িয়ে; ব্যাপারটাকে আতঙ্কবাদ বা টেররিজমের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্য হিসাবে দেখিয়ে। তাই ত্রিশ বছরের রেফারেন্সটা খুব হালকা কোনো দিন গণনা নয়। তবে ভারত-আমেরিকার ত্রিশ বছরের সম্পর্ক যে এবার ঢলে পড়ছে এর গুরুত্ব বাংলাদেশে ততটা টের পাওয়া না গেলেও গত বছর বাইডেনের আগমন বা শপথের সময় থেকেই তাই ভারত এ সম্পর্কে পরিষ্কার ছিল। বাইডেনের লক্ষ্য ছিল, তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে এর আড়ালে মূলত চীনকে বেকায়দায় ফেলবেন আর এভাবেই চীনের সাথে লড়বেন, এই ছিল পরিকল্পনা। আর এই সূত্রে ভারতকেও বধ করার ইচ্ছা জেগে ওঠে। কারণ এটা আমেরিকার সব দল ও প্রশাসনের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল যে, ভারতকে খাতির করে যা লুটবার তা শেষ হয়েছে। এবার এশিয়ায় আগে বাড়তে গেলে আমেরিকাকে আর মেঘের আড়ালে রাখা না, সরাসরি নিজে মঞ্চে হাজির হতে হবে। আর মূলত এ কারণেই ভারত-আমেরিকা সম্পর্ককে এবার আসলে ঢেলে সাজানো, নতুন রূপ দেয়ার ইচ্ছা বাইডেনের বা ভারতের ভাষায় ‘অধোগতিতে’ প্রবেশ করা। আর এখান থেকে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছা বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর মোতায়েন- ভারত যেটার ঘোরতর বিরোধী; যেটাকে সে তার কুঁড়েঘরের পাশে আমেরিকার সাততলা বানিয়ে সেখান থেকে ভারতের বেডরুমের দিকে নজরদারি হিসাবে দেখে থাকে- সেই সুপ্ত ইচ্ছা এবার ভারতকে উপেক্ষা করে তা বাস্তবায়নের ফেভারেবল সময় হিসাবে দেখছে।
অর্থাৎ বাইডেনের শপথের পর থেকেই ভারত জানত, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় প্রবেশ করে গেছে। তাই তাদের সুখের দিন, নিজেদের ভুয়া হলেও ‘পরাশক্তি’ ভাব ধরার দিন, সেটাও এবার শেষ। এমনকি গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১ বাইডেন মানবাধিকার সম্মেলন বা ডেমোক্র্যাসি সামিট আয়োজনের দু’মাস আগে থেকেই ভারত তৈরি হচ্ছিল। এক মাসেরও আগে থেকে দাওয়াতি কার্ড বিলানো শুরু হয়েছিল এবং মোদিও ওই সামিটে আমন্ত্রিত হন। তবু ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের যে তাল কেটে গেছে এর সবচেয়ে ভালো প্রকাশ হলো প্রথমত মোদি ওই সামিটে অংশ নিয়েছিলেন কিনা আমরা বেশির ভাগ মানুষ তা খেয়াল করিনি। অর্থাৎ মোদির যোগদান তার নিজে দেশেই হাইলাইট পায়নি বা দেয়া হয়নি। ফলে বিদেশ মিডিয়াতেও তাই ঘটেছিল। অথচ মোদি ওই ডেমোক্র্যাসি সামিটে যোগ দিয়ে অনলাইনে বক্তব্য রেখেছিলেন। তবে ওটা মানবাধিকার সামিট হয়ে দাঁড়িয়েছিল মোদি যেখানে এক অনুচ্চারিত আসামি হয়ে ছিলেন!
এসব মোদিকে মুখোমুখি হতে হবে; এ তো জানা কথাই ছিল। তাই এর চার দিন আগে ৬ ডিসেম্বর মোদি রাশিয়ার পুতিনের (মাত্র পাঁচ ঘণ্টার) ভারত সফর আয়োজন করেছিলেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাদের কোনো তৎপরতাকে যা মানে দিতে চায় সেই ফরমায়েশ মাফিক রিপোর্টটা পাওয়া যায় দ্য-প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রার লেখায় যেখানে আবার রেগুলার বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং, এটা পাওয়া যাবে ওই একই দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসুর লেখায়। ৬ ডিসেম্বর মালহোত্রা লিখলেন, পুতিনের সফর নাকি এক ‘ডিফাইনিং মোমেন্ট’। কিন্তু ঠিক কী কী ডিফাইন করে বা নয়া মানে দাঁড় করানোর মুহূর্ত সেটা- আজো কেউ জানে না। এর মূল কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এমনকি ইন্ডিয়ান বিবিসিও এর মানে দেয়ার চেষ্টা করেছে যে, তারা চীনের নাম উল্লেখ করে চীনকে মেসেজ দিচ্ছে বলে জানিয়েছে। অথচ ঘটনা তো এখানে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় পড়েছে, খতম হয়ে যাচ্ছে- সেটা! তাহলে চীন কেন?
আসলে বাইডেনের আমেরিকার সাথে ভারতের বিশেষ খায়-খাতির আর ভারত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ বলে সব কিছু বা কোয়াডের সদস্য বলে যে হামবড়া ভ্যানিটি আগে দেখাত সেটার এবার সমাপ্তি না হলেও সব ঢিলেঢালা হয়ে যাচ্ছে; এটা আর লুকানো থাকছে না। আর সেই কথা টের পেয়ে যেন এই ভারত আবার কোনো চীনা হামলার শিকার না হয়ে যায়- মূলত এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়েই পুতিনের সফর এটাকে ভারতের ‘চীনকে দেয়া মেসেজ’ হিসেবে দেখতে বলছে ভারতের মিডিয়া।
এখন অনেকের মাথায় প্রশ্ন আসতে পারে, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এখন ভাটায় চলে গেছে। তার মানে কি এটা আবার আগামীতে কখনো জোয়ারে উঠতে পারে?
অথবা একই প্রশ্নকে অন্য দিক থেকে হাজির করলে- যেমন : ভারতের কাশ্মিরের অথবা একালের প্রায় সারা ভারতের মুসলমানদের নির্মূল করো অথবা এথনিক ক্লিনজিং করো ইত্যাদিতে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে পড়ে ভারত আমেরিকার হাতে অভিযুক্ত হয়ে যাবার ভয়েই কি ভারতের দিক থেকে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া? এটাই কি একমাত্র কারণ?
এর জবাব হলো- না, অন্য আরেক বিশাল কারণ আছে। সেটা হলো, আগামী ২০২৪ সালের নির্বাচন!
আগামী ২০২৪ সালে নির্বাচনে বিজেপি বা ওর হিন্দুত্ববাদই নির্মূল হয়ে যেতে পারে :
একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া মানে হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মতো উৎখাত হয়ে যাবার মতো অবস্থায় পড়েছিল গত বছর। গত মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরাপুরি অনিশ্চয়তা- এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের পরিচয়। আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রী রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কিন্তু তা দেখাতে গিয়েও মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো নিচা; তার সাহায্য সে নিয়েছে এটা কেমন দেখায়?
মানুষ মারা যাবার পরে একটু সম্মানজনক সৎকারও যদি নাই জোটে তাহলে আর বেঁচে থাকতে আমি হিন্দু কি না, আমার হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠ কি না এসব গল্পে কাম কি? এসব কোনো কাজে লাগবে? এর কি কোনো জবাব আছে? মূল কারণ, মানুষ যেকোনো মৃতব্যক্তির লাশের মধ্যে নিজেকে দেখে, দেখতে পায়, সে মরলেও তাকে কোনো অশ্রদ্ধা অসম্মান করা হবে কিনা- ব্রিজের উপর থেকে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হবে কি না! কিংবা নদীর ধারের বালিতে লাশ ফেলে পালিয়ে আসবে কি না কিংবা নদীর পাড়ে কোনোমতে বালিচাপা দিয়ে পালাবে কি না... ইত্যাদি। ভারতের মানুষেরা নিজের এই অপমান অশ্রদ্ধা দেখে ফেলেছে। এসব কাণ্ড যেকোনো মানুষের জন্য নিজের বেলায়ও ঘটতে পারে, এই অনুমান- আর এই অনুমান নিয়েও এর পরে বেঁচে থাকা অর্থহীন! আর এসব ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন মোদি! এটা একা কোনো ভারতীয় মানুষ নয়। সারা ভারতের মানুষের কাছে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল এই জীবন, তাদের এই বেঁচে থাকা অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন? হিন্দুত্বের মোদি ভারতের প্রতিটা মানুষকে এমন অভিজ্ঞতা ও অনুভব এনে দিয়েছিলেন!
সেই ঘটনাকাল ছিল মোদির দ্বিতীয় টার্মের মাত্র দ্বিতীয় বছর। তবু মোদি বুঝে যান, আশঙ্কিত হন যে, তার হিন্দুত্ববাদের আয়ু এবার এসব হতাশ মানুষের হাতে শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই তখন থেকে মোদি বিজেপি-আরএসএস এর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়, ২০২৪ সালের নির্বাচনে হবু বিপর্যয় অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদের সম্ভাব্য নির্মূল হয়ে যাওয়া- এটা যেকোনো উপায়ে ঠেকানোই তাদের বাকি তিন বছরের একমাত্র কাজ!
কিন্তু তাতে কী? ঘুরেফিরে সব কথার শেষে সেই একই কথা। মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ- এটাই একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফিরানোর একমাত্র উপায়। এ কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে- কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই তার রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় যার সোজা মানে আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নাই বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত।
কাজেই বাংলাদেশেও সরকারের সাথে ভারতপ্রীতির সম্পর্ক ঠিক যেমন আমরা আগে ২০১২ সালের পরে দেখেছিলাম, তেমন আর হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। অর্থাৎ মার্কিন অবরোধ হয়েছে বলে, ভারতপ্রীতির সম্পর্ক আগের মতো পুনরায় উত্থিত হচ্ছে না। মূল কারণ, এখনকার ভারত নিজেই বাইডেন প্রশাসনের চোখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আসামি বলে দূরে দূরে থাকছে। ইতোমধ্যেই এর ছাপ পড়া শুরু হয়েছে ভারতের থিংকট্যাংক রিপোর্টে। আমেরিকা অনেক দূরের; কেউ এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা লিখছে আর সাথে আমেরিকার এশিয়ায় উপস্থিতিতে কী খামতি সেখানে আছে এমন মৃদু সমালোচনাও সেখানে এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। অনেকটা ডিভোর্স হয়ে যাওয়া বউয়ের সাথে সামাজিকভাবে দেখা হয়ে গেলে যেমন হয়, সেরকম! আমেরিকান থিংকট্যাংক কলামিস্ট রাইটার কুগেলমানও ব্যাপারগুলো আমল করছেন, দেখা যাচ্ছে। এক নয়া গ্লোবাল পোলারাইজেশন আসন্ন হয়ে উঠছে মনে হচ্ছে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 


আরো সংবাদ


premium cement