২১ মে ২০২২
`

বায়ুদূষণে শীর্ষে বাংলাদেশ

-

গত ২১ নভেন্বর ঢাকার সর্বোচ্চ বায়ুদূষণের মাত্রা ছিল ৩১৫। যেটা বিশ্বের দূষিত নগরীর তালিকায় এক নম্বরে উঠে এসেছে ঢাকা। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ঢাকার অবস্থান ছিল প্রথম। পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। তারপরও পানি ছাড়া মানুষ কয়েকদিন বাঁচতে পারে। কিন্তু বাতাস ছাড়া তিন মিনিটের বেশি কেউ বাঁচতে পারে না। দেশের রাজধানী শহর ঢাকায় সেই বাতাসই দূষণের শীর্ষে অবস্থান করছে।
ঢাকার বাতাসে ভাসছে ধুলা আর ক্ষতিকর নানা রাসায়নিক উপাদান। ফলে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে বায়ুদূষণ। এদিক থেকে ঢাকা ছাড়িয়ে গেছে ভারতের রাজধানী দিল্লিকেও। দূষণের মাত্রা ১০১ থেকে ১৫০ হলেই নগরবাসী বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁঁকিতে পড়তে পারেন। বায়ুদূষণ ১৫১ থেকে ২০০ হলে প্রত্যেকের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ৩০১ থেকে ৫০০ হলে বা তার বেশি হলে বাতাসে দূষণের মান ঝুঁকিপূর্ণ হয়। এ সময় স্বাস্থ্যসতর্কতা প্রত্যেক নগরবাসীর জন্য জরুরি। ঢাকার প্রায় দুই কোটি মানুষ দূষিত বাতাসে প্রতিনিয়ত বসবাস করছেন। নির্মাণকাজের নিয়ন্ত্রণহীন ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা প্রভৃতি কারণে দূষণ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ ছাড়াও উন্নয়নমূলক কাজের কারণে ঢাকার রাস্তাঘাট কাটায় ধুলাবালুতে পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। এক গবেষণায় জানা গেছে, ২০১৫ সালে বিভিন্ন প্রকার দূষণের শিকার হয়ে সারা বিশ্বে ৯০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে সব চেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছে বাংলাদেশে। দূষণজনিত যত মৃত্যু ঘটে তার দুই-তৃতীয়াংশই ঘটে প্রধানত বায়ুদূষণে। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার হেলথ ইফেক্ট ইনস্টিটিউট ও ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক ‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
আর বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। মার্চ, ২০১৯ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এয়ারভিজ্যুয়ালে ‘বিশ্ব বাতাসের মান প্রতিবেদন-২০১৮’ বলা হয়, বিশ্বে সর্বাধিক বায়ুদূষণকবলিত থাকা রাজধানী শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। এই শহরে বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএমের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। একটি বেসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর মারা যাচ্ছে এক লাখ ২৩ হাজার মানুষ আর ভারত ও চীনে মারা গেছে ১২ লাখ মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনা বা ধূমপানের কারণে মৃত্যুর হারের তুলনায় ২০১৭ সালে বায়ুদূষণের ফলে বেশি মানুষ মারা গেছে।
এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। বায়ুদূষণের শিকার হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় প্রতিটি শিশুর ৩০ মাস করে আয়ু কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। যদিও উন্নত দেশগুলোয় এই হার পাঁচ মাসের কম। ক্ষতিকারক পদার্থ বাতাসে মেশার ফলে বায়ুদূষণ হয়। শিল্প, যানবাহন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়ণ বায়ুদূষণের কয়েকটি কারণ। তবে বায়ুদূষণের বড় দু’টি উপাদান হলো- শিল্পকারখানার বর্জ্য ও যানবাহনের ধোঁয়া। নন-কমপ্লায়েন্স শিল্প ও অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে অধিক হারে দূষিত হয়। বাতাসে থাকা রাস্তাঘাট ও নির্মাণাধীন বিভিন্ন স্থাপনার ধূলিকণা, সালফার-ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লুরোকার্বন, কার্বন-মনোঅক্সাইড, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, ওজোন, সাসপেনডেড পার্টিকুলার ম্যাটার, বাতাস দূষণের জন্য বহুলাংশে দায়ী। ইটভাটার ধোঁয়া এ ধরনের দূষণের আর আরেক কারণ। বায়ুদূষণের অনেক কারণই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মরুভূমি অঞ্চলে ধূলিঝড় এবং অরণ্যে দাবানলে নির্গত ধোঁয়া বাতাসে রাসায়নিক ও ধূলিকণাজনিত দূষণ ঘটিয়ে থাকে। পেট্রল, ডিজেল ও কাঠসহ নানা ধরনের কার্বনযুক্ত জ্বালানি আধপোড়া হলে কার্বন মনোঅক্সাইড গ্যাস তৈরি হয়। সিগারেট পোড়ালেও এই গ্যাস বের হয়। এই গ্যাস আমাদের শরীরে অক্সিজেন গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
কয়লা, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানোর ফলে নির্গত হয় কার্বন-ডাই-অক্সাইড। রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনিং মেশিন থেকে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন গ্যাস নির্গত হয়। বাতাসে এই গ্যাস নির্গত হওয়ার পরে স্ট্র্যাটেস্ফিয়ারের চলে যায়। সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মির বিকিরণ থেকে রক্ষা পাওয়ার স্বাভাবিক ক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লেড বা সিসা লেড ব্যাটারি, পেট্রল, ডিজেল, হেয়ারডাই প্রভৃতিতে থাকে। সিসা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর। এটির প্রভাবে হজমের প্রক্রিয়া ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হয়। ক্যান্সারও হতে পারে।
ওজোন গ্যাস বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে পাওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস যা সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির বিকিরণ থেকে পৃথিবীকে বাঁচায়। কিন্তু মাটির কাছাকাছি এই গ্যাস অত্যন্ত বিষাক্ত ধরনের। মাটির কাছাকাছি যে ওজোন পাওয়া যায় তা মূলত কলকারখানা ও যানবাহন থেকে নির্গত। ওজোনের প্রভাবে চুলকানি হয়, জ্বালা করতে পারে। ওজোনের প্রভাবে ঠাণ্ডা লাগার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে নিউমোনিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নাইট্রোজেন অক্সাইডের প্রভাবে ধোঁআশা তৈরি হয় এবং এসিড বৃষ্টি হয়। পেট্রল, ডিজেল, কয়লার মতো জ্বালানি পোড়ানোর ফলে এই গ্যাস নির্গত হয়। নাইট্রোজেন অক্সাইডের প্রভাবে শিশুদের শীতের সময় সর্দিকাশি হতে পারে। ধোঁয়া, ধুলা, বাষ্প এবং একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে বাতাসে ভেসে থাকা কঠিন পদার্থের কণাকে এসপিএম বলে। এটি ধোঁআশা সৃষ্টির অন্যতম কারণ। এ ধরনের পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। মূলত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পোড়ানোর ফলে এই গ্যাস নির্গত হয় যেমন- কাগজ উৎপাদন পদ্ধতিতে, ধাতু গলানোর ক্ষেত্রে।
এক গবেষণায় জানা গেছে, ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা দায়ী ৫৮ শতাংশ, ডাস্ট ও সয়েল ডাস্ট ১৮ শতাংশ, যানবাহন ১০ শতাংশ, বায়োমাস পোড়ানো ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য উৎস ৬ শতাংশ দায়ী।
একজন সুস্থ স্বাভাবিক লোক গড়ে দুই লাখ লিটার বায়ু শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে গ্রহণ করে থাকে। অনেকেই মনে করি, নরমাল বসবাসের রুমের চেয়ে এসি করা রুম বায়ুদূষণমুক্ত। মোটেই ঠিক নয়। সাধারণ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের বায়ুদূষণের পরিমাণ নরমাল বসবাসের রুমের বায়ুদূষণের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতগুণ বেশি হতে পারে। এসি রুমে হয়তো ঠাণ্ডা বাতাস পাচ্ছি, কিন্তু শুদ্ধ ঠাণ্ডা বাতাসের পরিবর্তে অধিকতর দূষিত ঠাণ্ডা বাতাস পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে ৯০-৯৫ শতাংশ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকগুলোতে রোগীদের বায়ুদূষণে সংক্রমিত হওয়া রোধের কোনো ব্যবস্থা নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, হাসপাতালের রুমগুলো এয়ারটাইট এসি করা থাকে। প্রায়ই শোনা যায় অপারেশন সাকসেসফুল কিন্তু ইনফেকশনের কারণে রোগী মারা গেছে। অন্যতম কারণ হচ্ছে, দূষিত বা সংক্রমিত বায়ু।
১০৪৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত স্ট্রোকের ওপর ৯৪টি গবেষণার তথ্য পর্যালোচনা করে গবেষকরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, উচ্চমাত্রায় বায়ুদূষণের মধ্যে বসবাস এবং স্ট্রোকের মাঝে সম্পর্ক বিদ্যমান।
বর্তমানে বায়ুদূষণের বিষয়টিতে বিশ্বে সব শ্রেণিপেশা, ধনী-গরিব সবাই সমহারে আক্রান্ত হওয়ায় সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সবাই বুঝতে শিখেছে বায়ুদূষণ খুবই ভয়াবহ বিষয়। তবু জনমনে কাক্সিক্ষত সচেতনতা তৈরি হয়নি। তাই এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাসহ বায়ুদূষণ প্রতিরোধ ও তার প্রতিকারে সর্বসাধারণের ব্যাপক ভূমিকা পালন সময়ের দাবি।

 


আরো সংবাদ


premium cement