২৯ জানুয়ারি ২০২২, ১৫ মাঘ ১৪২৮, ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩
`

ঐতিহ্যবাহী কুরআন শিক্ষালয়

-

আমরা ছোটবেলায় দেখতাম, বাড়ির সামনে বাবা একটি মক্তব চালাতেন, যেখানে গ্রামের ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা এসে বাবার কাছে কুরআন শিক্ষা নিতেন। শুধু শিশুরাই নয়, অনেক তরুণ-তরুণী, মধ্যবয়স্ক, এমনকি বয়স্ক ব্যক্তিরাও বাবার কাছে কুরআনের ছবক নিতেন। বাড়ির সামনে আমগাছের তলায় ঝিরঝির বাতাসে পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলো যেন গুঞ্জরিত হতো আর সেই সমধুর শব্দ শুনে অনেক গ্রামবাসীর ঘুম ভাঙত। আমরা দেখতাম, গ্রামের অনেক বাড়িতে ফজরের নামাজের পর সব বয়সের নারী-পুরুষ-শিশু কুরআনের আয়াতগুলো পাঠ করত অত্যন্ত মনোযোগসহকারে। কিন্তু সেই হারানো ঐতিহ্যের ধারক-বাহক গ্রামীণ কুরআনিক পাঠশালার চর্চা কিংবা পাঠ এখন নেই বললেই চলে।
আমরা হারিয়ে ফেলেছি কিংবা ভুলে যেতে বসেছি সেই চিরাচরিত হারানো কুরআনের সূর, হারানো গ্রামীণ ঐতিহ্য। আমরা এখন হাতড়ে বেড়াই সকালের সেই গ্রামীণ শিশির ভেজা তরতাজা পরিবেশ। আমরা এখনো খুঁজে বেড়াই সকালের সূর্যের বর্ণময় মিতালি। কিন্তু হায়! সেই তো হারিয়ে গেল অমানিশার ঘোর আঁধারে। গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় তখন ছিল অনেক কুরআনের পাঠশালা। যেখানে খুদে শিশুরা কুরআনের ছবক নিতেন মসজিদের ইমাম কিংবা মাদরাসার শিক্ষকদের কাছে। সেই গ্রামীণ কুরআনের পাঠশালার আদলে এখন গড়ে উঠেছে শত শত কিন্ডারগার্টেন। আর এটি হলো অন্য রকম সংস্করণ। এখানেও কুরআনের শিক্ষা দেয়া হয় অত্যন্ত যত্নসহকারে।
এখন থেকে শিশুদের কুরআনের অর্থসহ না পড়ালে তাদের জিন্দেগির মানসিক উৎকর্ষ সাধন আদৌ হবে কি না সন্দেহ থেকেই যায়। অন্তত সরল অনুবাদটুকু পড়ালে তারা কুরআনের ভাবার্থ বোঝার সক্ষমতা পেত। আর এটি হতো তাদের জন্য সাফল্যের বাহক। নিজের জীবনচরিত গঠনের ক্ষেত্রে কুরআন বোঝা ও জানার মধ্যে রয়েছে সাবলীল সম্পর্ক, সেতুবন্ধন। কচিকাঁচা শিশু-কিশোরদের এখন থেকেই কুরআন বুঝে পড়ার তাগিদ দেয়া জরুরি বলে মনে করি। আশির দশকের সময়েও পাড়ায় পাড়ায় গুঞ্জন শোনা যেত- কিসের সেই গুঞ্জন? এটি তো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ঐশীবাণী- যেটি শুনলে হৃদয় হয়ে যায় বিগলিত, কেঁপে উঠে অন্তরাত্মা আর প্রসারিত হয় হৃদয়ের প্রকোষ্ঠ, ‘আসলে মোমেন তো হচ্ছে সেসব লোক, (যাদের) আল্লাহকে যখন স্মরণ করানো হয় (তখন) তাদের হৃদয় কম্পিত হয় এবং যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়, উপরন্তু তারা তাদের মালিকের ওপর নির্ভর করে।’ (সূরা আল আনফাল-২)।
যে কুরআন দুনিয়া ও আখেরাতের একমাত্র অবলম্বন সেটিকেই আমরা অযত্নে অবহেলায় উপেক্ষা করছি জিন্দেগিভর। পবিত্র কুরআন মানবজাতির জন্য পথের দিশা, সমস্যাসঙ্কুুল পৃথিবীর একমাত্র সমাধান। বছর বছর কাঠের তাকে সংরক্ষণ করছি এই কুরআনকে। এই কুরআন শুধু পঠিত হয় মিলাদে, পঠিত হয় ইছালে সওয়াবে, পঠিত হয় মৃত ব্যক্তিদের বাড়িতে আর পঠিত হয় শুধু রমজান মাসে। অথচ এ কুরআন শুধু কথনের জন্য আসেনি, আসেনি কেবল জাতীয়-আন্তর্জাতিক কিরাত প্রতিযোগিতার জন্য। এই কুরআনের মর্যাদা এখনো বুঝিনি আমরা। এ কুরআনের সম্মান উপলব্ধি করিনি এখনো। আল-কুরআনকে আমরা এখনো সঙ্গী বানাতে পারিনি নিজেদের জীবনে।
বন্ধু বানিয়েছি বিজাতীয় সভ্যতাকে- যে সভ্যতার দাফন হচ্ছে আল্লাহর জমিনে বারবার। পৃথিবীর অন্য কোনো তত্ত্ব, কোনো মতবাদ, কোনো আদর্শই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আর এটিই কুরআনুল কারিমের পাতায় পাতায় বারবার তাগাদা দিচ্ছেন আল্লাহ, ‘তারা কি আল্লাহর (দেয়া জীবন) ব্যবস্থার বদলে অন্য কোনো বিধানের সন্ধান করছে? অথচ আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে তা ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক, আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করে আছে এবং প্রত্যেককে তো (একদিন) তাঁর কাছেই ফিরিয়ে নেয়া হবে।’ (সূরা আল ইমরান-৮৩)
লেখক : সভাপতি, রাউজান ক্লাব, সিনিয়র কনসালট্যান্ট (ইএনটি), জেনারেল হাসপাতাল, রাঙ্গামাটি


আরো সংবাদ


premium cement