১৮ জানুয়ারি ২০২২
`

গণতন্ত্র সম্মেলন : বিভক্তি না ঐক্য

-

মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ গণতন্ত্র বিষয়ে জো বাইডেনের একটি উক্তি ফলাও করে প্রচার করেছে, ‘গণতন্ত্র দুর্ঘটনাক্রমে ঘটে না। আমাদের এটি রক্ষা করতে হবে, এর জন্য লড়াই করতে হবে, এটিকে শক্তিশালী করতে হবে, এটিকে নবায়ন করতে হবে।’ অর্থাৎ গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য যেখানে প্রয়োজন লড়াই করতে হবে এবং গণতন্ত্রের ধারণাকে আরো সংহত ও শাণিত করার জন্য নবায়ন করতে হবে।
বাইডেন-কমলা প্রশাসন প্রথম দিন থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সময়ের অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র এবং সারা বিশ্বে গণতন্ত্র পুনর্জাগরণ, রিনিউ বা নবায়ন অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে প্রেসিডেন্ট বাইডেন যেমন বলেছিলেন, ‘কোনো গণতন্ত্রই নিখুঁত নয় এবং কোনো গণতন্ত্রই কখনো চূড়ান্ত নয়। প্রতিটি লাভজনক অর্জন, নিরবচ্ছিন্ন কাজ ও পরিশ্রমের ফসল।’
৯-১০ ডিসেম্বর, ২০২১ প্রেসিডেন্ট বাইডেন গণতন্ত্রের জন্য দু’টি শীর্ষ সম্মেলনের প্রথমটি আয়োজন করবেন, যা সরকার, সুশীলসমাজ ও বেসরকারি খাতের নেতাদের একত্রিত করবে গণতন্ত্র পুনর্জাগরণের জন্য, একটি ইতিবাচক এজেন্ডা নির্ধারণের জন্য এবং সম্মিলিত পদক্ষেপের মাধ্যমে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় হুমকিগুলো মোকাবেলার জন্য।
এই শীর্ষ সম্মেলনে গণতন্ত্রের মুখোমুখি চ্যালেঞ্জ ও সুযোগের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হবে এবং দেশে ও বিদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত অঙ্গীকার, সংস্কার ও উদ্যোগ উভয়ই ঘোষণা করার জন্য নেতাদের একটি মঞ্চ কাজ করবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ শীর্ষ সম্মেলন, বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিনেতাদের কথা শোনার, শেখার এবং জড়িত থাকার সুযোগ করে দেবে যাদের সমর্থন এবং প্রতিশ্রুতি বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মনে করা হচ্ছে, এই সম্মেলন গণতন্ত্রের অন্যতম অনন্য শক্তি প্রদর্শন করবে; এর অসম্পূর্ণতা স্বীকার করে তাদের খোলাখুলি ও স্বচ্ছভাবে মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা লাভ করবে, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের মতো ‘আরো নিখুঁত ইউনিয়ন’ গঠনে সহায়তা করবে। বিশ্ব সম্মেলন তিনটি বিষয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেবে, যেমন- কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, দুর্নীতির মোকাবেলা ও লড়াই এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা।
শীর্ষ সম্মেলনের আগে যুক্তরাষ্ট্র বহুপক্ষীয় সংস্থা, পরোপকার, সুশীলসমাজ ও বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে উল্লিখিত তিনটি মূল বিষয় সংশ্লিষ্ট সাহসী, বাস্তবসম্মত ধারণাগুলোর কৌশল প্রাপ্ত হওয়ার চেষ্টা চালাবে। সমালোচনা ও নিন্দাগুলোকেও বিশেষজ্ঞ প্যানেল অধ্যয়ন-গবেষণার মাধ্যমে সংগ্রহ করবে। শীর্ষ সম্মেলনের লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অর্থপূর্ণ অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোগের জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করতে নেতাদের উৎসাহিত করা হবে। এটিই মূলত গণতন্ত্র সম্মেলনের উদ্দেশ্যের নির্যাস।
২৩ নভেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ আসন্ন গণতন্ত্র সম্মেলনে ১১০ জন আমন্ত্রিতের তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকাটিতে জাতিসঙ্ঘের কমপক্ষে অর্ধেক সদস্য দেশের নাম রয়েছে। তালিকাভুক্ত কয়েকটি দেশ ও এলাকা নিয়ে এরই মধ্যে চিত্তাকর্ষক আলোচনা শুরু হয়েছে।
তাইওয়ানকে আমন্ত্রণ বিশ্বব্যাপী প্রচার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে; প্রথমত, তাইওয়ান দ্বীপটি তালিকায় ছিল; দ্বিতীয়ত, বেশ কয়েকটি দেশ এ তালিকায় নেই। শুধু চীন ও রাশিয়া নয়, ন্যাটো সদস্য তুরস্ক, হাঙ্গেরি ও এশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। ইসরাইল ও ইরাক ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশ তালিকায় নেই, যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু দেশ সৌদি আরব, মিসর ও আরব আমিরাত এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
তাইওয়ানকে আমন্ত্রণ জানানো সবচেয়ে চোখধাঁধানো বিষয়। সমালোচকরা পররাষ্ট্র বিভাগ থেকে প্রচারিত বাইডেনের প্রথম উক্তির সাথে এর সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। তারা বলছেন, গণতন্ত্র সম্মেলন বড় নাকি গণতন্ত্র রক্ষায় লড়াই বড় তারই মহড়া হবে এই আয়োজনে। তাইওয়ানের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণ হবে সম্মেলনের বড় অর্জন। তাইওয়ানের ডেমোক্র্যাটিক প্রোগ্রেসিভ পার্টি, ডিপিপি বাইডেন প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে শীর্ষ সম্মেলনে তাদের প্রতিনিধিদের নাম ঘোষণা দেয়। প্রসঙ্গত, তাইওয়ান চীন কর্তৃক যেকোনো প্রকার আক্রমণের শিকার হলে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান প্রতিরোধ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
তাইওয়ান দেশ না অঞ্চল সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কিছু জানায়নি। আরো জানা যায়, প্রেসিডেন্ট তসাই ইং-ওয়েন অংশগ্রহণ করবেন না, তার পরিবর্তে ডিজিটালবিষয়ক পোর্টফোলিওবিহীন মন্ত্রী অড্রে তাং এবং তাইওয়ানের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিধি হিসিয়াও বি-খিম কথা বলবেন। বোঝা যায়, বিষয়টি বেইজিংকে আরো বেশি উত্তেজিত করা এড়াতে ওয়াশিংটনের একটি কৌশল। এ জন্য বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পর্দার পেছনে কিছু আলোচনা হয়েছে কি না এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। অন্য দিকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন ও রাশিয়া আশ্চর্যজনকভাবে আমন্ত্রিতদের মধ্যে নেই, বাংলাদেশও নেই। এ মুহূর্তে এ আলোচনা জটিলতার সৃষ্টি করবে, তবে সম্মেলন শেষে অনেক কথার জবাব পাওয়া যেতে পারে। বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়েও কিছু কিছু জবাব রয়েছে।
মার্কিন নির্বাচনী প্রচারণার সময় এবং বাইডেনের দায়িত্ব গ্রহণের সময়, প্রশাসনের প্রথম বছরে গণতন্ত্রের জন্য একটি বৈশ্বিক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। সরকারি ভাষায় সেটিকে ‘জবহবি ঃযব ংঢ়রৎরঃ ধহফ ংযধৎবফ ঢ়ঁৎঢ়ড়ংব ড়ভ ঃযব হধঃরড়হং ড়ভ ঃযব ঋৎবব ডড়ৎষফ’, যেখানে চেতনা ও অংশীদারিত্বকে জোর দেয়া হয়েছে। সম্মেলনে মূল্যবোধের হুমকি মোকাবেলায় এজেন্ডাও নির্ণয় করা হবে।
শুরু থেকেই বাইডেনের কূটনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল মার্কিন গণতন্ত্র পুনর্গঠন এবং গণতন্ত্রের ওপর আরোহণ করে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বনেতা হিসেবে তার অবস্থানে ফিরিয়ে আনা এবং সেই অবস্থানকে শক্তিশালী করা। গণতন্ত্র শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে তার ধারণা অনেক প্রশংসা লাভ করেছে এবং অনেক স্থানে বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। এ আয়োজনটি অনেকটা হাতে ধরে ঝগড়ার কিছু উপাদান সৃষ্টি করার মতো, কেননা যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের ধরন নিয়েও বিশ্বে বহু দিন থেকে বিতর্ক রয়েছে। অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেরাই এটিকে ত্রুটিপূর্ণ বলেছেন। মনে করা হচ্ছে এ সম্মেলনের মাধ্যমে জো বাইডেন আমেরিকার গণতন্ত্রকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর কৌশলের সূত্রপাত করবেন। তা হলে তিনি সব সাধুবাদ পাওয়ার উপযুক্ত নেতা হিসেবে পরিগণিত হবেন।
এ বছরের প্রথম দিকে ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অ্যাকাডেমিক গণতন্ত্র সম্মেলন কেন্দ্র করে একাধিক রচনা লিখে সরকারকে জানান দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রকে আগে নিজকে উপশম করা দরকার। নিজের দেশে নিজের সমস্যা নিয়ে আন্তঃপার্টি কংগ্রেস ও সিনেট নেতা এবং গভর্নরদের নিয়ে গণতন্ত্র সম্মেলন-জাতীয় কিছু করা দরকার; যাতে মার্কিন গণতন্ত্রের প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনরাবৃত্তি করা যায় এবং ভোটাধিকার ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য চাপ দেয়া যায়।
এখন পর্যন্ত পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের গণতন্ত্র শীর্ষ সম্মেলন সম্পর্কে মিশ্র অনুভূতি রয়েছে। এক দিকে তারা গণতন্ত্রের বিষয়বস্তুকে প্রশংসা করলেও অন্য দিকে উদ্বিগ্ন যে শেষ পর্যন্ত এটি কেবল উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তৃতা হবে নাকি কোনো কংক্রিট কাজ হবে? ফ্রিডম হাউজের সভাপতি মাইক আব্রামোভিৎজ মন্তব্য করেছেন এটি কি ফটো সেশন দিয়ে শেষ হবে? নাকি কোনো বাস্তব ইস্যু উপহার দেবে তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন সম্মেলনের তিনটি প্রধান বিষয় নির্ধারণ করেছেন। তা হলে এই শীর্ষ সম্মেলন কিভাবে মতাদর্শ ও মূল্যবোধের সাথে বিভক্ত হবে এবং এটি কোন উদ্দেশ্যগুলো পূরণ করতে পারে? বড় সম্মেলন হবে নাকি ‘দাবাইবাই’ হবে? তাওয়ানি ভাষায় বড় উপাসনা অনুষ্ঠান ও আয়োজনকে দাবাইবাই নামে ডাকা হয়।
দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হতে পারে যেমনটি আলোচ্যসূচিতে বলা হয়েছে; বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করার জন্য একটি মঞ্চ প্রস্তুত করা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ফাঁকগুলো মেরামতের উপায় প্রস্তাব করা।
তৃতীয়টি মার্কিন ও ইউরোপীয় প্রচারমাধ্যমের তথ্য একত্রিত করে, অংশগ্রহণকারীরা প্রত্যেকে তিনটি বিষয়ে কয়েক মিনিটের জন্য কথা বলবেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের ত্রুটিগুলো সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করবেন ও পরামর্শ দেবেন। তারা আরো ভালো করার জন্য শীর্ষ সম্মেলনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবেন এবং তার পরে আগামী বছরের ডিসেম্বরে শীর্ষ সম্মেলনে অগ্রগতি এবং ফলাফল সম্পর্কে একটি আপডেট দেবেন।
এটি এতটাই আদর্শবাদী শোনাচ্ছে যা প্রায় অবাস্তব এবং এটি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ‘আত্মসমালোচনা’ এবং ‘উন্নতির প্রতিশ্রুতি’র মতো। সমস্যা হচ্ছে, যদি এসব দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্তর উন্নত করার অনুপ্রেরণা ও ক্ষমতা থাকে, তবে তাদের গণতন্ত্র শীর্ষ সম্মেলনের তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন কেন হবে? প্রতিটি অংশগ্রহণকারীর এজেন্ডাকে সমর্থন করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোন সংস্থান রাখবে কি না তাও দেখার বিষয় বৈকি?
চতুর্থ সম্ভাবনাটি হলো মার্কিন ভূরাজনৈতিক স্বার্থগুলো তুলে ধরা। দুই দিন ধরে প্রকাশিত অসংখ্য মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমন্ত্রিতরা প্রধান পশ্চিমা সংগঠন, যেমন ফ্রিডম হাউজ প্রদত্ত গণতন্ত্রের র্যাংকে নির্ধারিত হয়নি এবং ওই সব দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ ছিল না। আমন্ত্রিত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান ও ইউক্রেনের মতো পশ্চিমা মানদণ্ডে কম গণতন্ত্রের রেটিং যুক্ত দেশগুলো এবং ব্রাজিল, ভারত, ফিলিপাইন ও পোল্যান্ডের মতো গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর ‘ব্যাকস্লাইডার’ দেশগুলো। এসব দেশ যে তালিকায় রয়েছে তা প্রমাণ করে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা।
শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র শীর্ষ সম্মেলন এমনকি বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক শাসনের উন্নতি শুরু করার আগে, এটি এরই মধ্যে বিশ্বকে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘স্বৈরতন্ত্র’ শিবিরে বিভক্ত করে ফেলেছে, যা বিশ্বব্যাপী পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
এ অবস্থায় ‘গণতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্র’, ‘আমরা বনাম তারা’, ‘গাজর নতুবা লাঠি নইলে লাঠি আর লাঠি’ তত্ত্বগুলো আজকের বিশ্বের জটিল এবং পরস্পর নির্ভরশীল বাস্তবতার সাথে বেমানান। বলাবাহুল্য, অনেক দেশ এখনো চায় যে আমেরিকা একটি প্রধান শক্তি হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করুক, কিন্তু আমেরিকা যে বিশ্বে ফিরে যেতে চায় তা ভিন্ন। অনেক দেশ চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো পক্ষ বেছে নিতে রাজি নয়। যখন আমেরিকা মানবাধিকারের আলোকবর্তিকা নিয়ে তার ভাবমর্যাদা বজায় রাখতে চায়, তখন আফগানিস্তান থেকে সরে আসায় সে ভাবমর্যাদা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইভাবে সিরিয়া, ইয়েমেন ও লেবানন পরিস্থিতি ওয়াশিংটনকে স্বাধীনতা ও মানবতার বিষয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ মুহূর্তে গণতন্ত্র শীর্ষ সম্মেলন করে, আমেরিকা সম্ভবত তার আন্তর্জাতিক অবস্থান বাড়ানোর চেষ্টা করার সাথে সাথে বাইডেন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ভাবমর্যাদাকেও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
নিঃসন্দেহে গণতন্ত্র শীর্ষ সম্মেলন অন্তত একটি প্রভাব ফেলবে এবং তা হলো গণতন্ত্রের মূল্য নিশ্চিত করা। বাইডেনের গণতন্ত্র শীর্ষ সম্মেলনের পরোক্ষ চাপের মুখে চীনকেও এর প্রতিক্রিয়া সামাল দিতে হবে। চীন যাচ্ছে তার গণপ্রজাতন্ত্রী বা পিপলস রিপাবলিক ধারণাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে। এর জন্য চীন সম্মেলন ছাড়াও ‘ওয়ান টু ওয়ান’ যোগাযোগ কার্যকর করবে। ফলে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘গণপ্রজাতন্ত্র’ দু’টি পৃথক ধারা আবারো নতুন মঞ্চে পেখম তুলবে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ে কোল্ড ওয়ারভিত্তিক আরেকটি ফ্রন্টে মুখামুখি অবস্থানে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র সম্মেলন নিয়ে অনেক বিতর্ক এরই মধ্যে জমা হয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার পরিষদ স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ২০১০ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে। একই সাথে গুয়ানতানামো বে কারাগার বন্ধ ও বিদেশে মার্কিন সেনাদের নির্যাতনের ঘটনার তদন্তের আহ্বান জানায়। ইরান জানায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার অজুহাত দেখিয়ে সিআই এ গোপন অভিযান চালিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। একই সালে ইউরোপীয় দেশগুলো আওয়াজ তোলে যে ওয়াশিংটনের উচিত মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করা, বর্ণবৈষম্য দূর করা। মেক্সিকো বলে অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ন্ত্রণে সীমান্তে প্রাণঘাতী বাহিনীর আক্রমণ বন্ধ করা উচিত।
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেছিলেন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রতি পশ্চিমাদের সমর্থন সত্য নয়। মানবাধিকারের কথা তুলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে মৃত্যু সাজাপ্রাপ্ত এক নারীর মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল, অথচ ওই সময়, সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে, যুক্তরাষ্ট্রে ৫৩ জন নারী মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়। জনাব আহমাদিনেজাদ পশ্চিমাদের এ আচরণকে ‘ভণ্ডামি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। প্রশ্ন তোলা হয়েছে, গাজায় পৈশাচিক আক্রমণ, পূর্ব জেরুসালেমে মুসলমানদের ঘর থেকে বের করে তাদের নিজের ঘরে ভাড়া দিয়ে রাত গুজরান কোনো ধরনের মানবতা তার উত্তর সম্মেলনে পাওয়া যাবে কি না? কাশ্মির, হায়দরাবাদ, আসামে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি না? গণতন্ত্রের সমস্যা ও মানবাধিকার সমস্যার এ ফিরিস্তি অনেক বড়।
আজকের বিশ্বে গণতন্ত্র একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু যখন গণতন্ত্র ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত বা ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত একটি অস্পষ্ট ধারণা হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের ধারণাটি ফাঁপা হয়ে যায়। তবে এ ধরনের সম্মেলনে সব স্বঘোষিত ‘গণতান্ত্রিক’ দল একত্রিত হয়ে, গণতন্ত্রের মান নিয়ে বিতর্ক করলে এবং গণতন্ত্র প্রচারের কৌশল নিয়ে আলোচনা করলে সম্মেলন আরো উপকারী হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার


আরো সংবাদ


premium cement