২৫ মে ২০২২
`
প্রকল্পে ধীরগতির নানা কারণ

কোটি কোটি টাকা গচ্চা

-

দেশে কোনো প্রকল্পই যথাসময়ে এবং নির্ধারিত ব্যয়ে সম্পন্ন হচ্ছে না। উন্নয়ন প্রকল্পই হোক বা স্থানীয় পর্যায়ের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট, কোনোটিই সময়মতো সম্পন্ন করা হচ্ছে না যে কারণে জনগণকে বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে; জনগণেরই কষ্টার্জিত রাজস্ব গচ্চা যাচ্ছে বেশুমার।
এসবের কারণ হিসেবে দায়িত্বশীলরা নানা রকমের ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছেন। কেউ বলছেন, সীমাবদ্ধতার কথা। কেউ বলছেন, দুর্নীতি দায়ী। কারো মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত পক্ষ বা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাই মূল কারণ। এসব ব্যাখ্যার মধ্যে সত্যতা হয়তো আছে, কিন্তু দায়িত্বশীলতা কতটুকু আছে, সেটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে থাকছে।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, চট্টগ্রামে শুধু পাঁচটি প্রকল্পেই বাড়তি খরচ হচ্ছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মূল কারণ হলো সময়মতো প্রকল্প সম্পন্ন না হওয়া। বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প সম্পন্ন করতে সময় বাড়ানো হয়েছে মোট পাঁচবার। আর এতে ব্যয় বেড়েছে ৯ গুণ। এ ছাড়া ওয়াসার ভান্ডালজুড়ি প্রকল্পেও মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে পাঁচবার। ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের খাল খনন প্রকল্পে সময় বেড়েছে তিনবার, ব্যয় বেড়েছে চার গুণ। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে সময় বাড়ানো হয় মাত্র একবার, কিন্তু তাতেই ব্যয় বেড়ে গেছে দ্বিগুণ। জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মূল প্রকল্পের সময় বেড়েছে দু’বার, যার ফলে ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ হবে। যেসব কারণে প্রকল্প যথাসময়ে শেষ হচ্ছে না এবং বারবার ব্যয় বাড়াতে হচ্ছে তার মধ্যে কিছু কারণ উল্লেখ করার মতো। যেমন, প্রকল্প নেয়ার আগে যথাযথ সমীক্ষা না করা, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া, চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ না পাওয়া, তদারকির দুর্বলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘নানা সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পে দেরি হচ্ছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হতো।’ পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, এর নেপথ্যে রয়েছে ‘দুর্নীতির দুষ্টচক্র’। চট্টগ্রামের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। ওয়াসা, পিডিবি, সড়ক বিভাগ, গণপূর্ত কেউ কাউকে পাত্তা দেয় না।’ সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘সংশ্লিষ্টদের অদক্ষতা, অসততা আর জবাবদিহিতার অভাবে প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখছে না। দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতার আওতায় না আনলে গচ্চার পরিমাণ বাড়তেই থাকবে।’
লক্ষণীয়, স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় যেকোনো কাজে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? দুর্নীতির দুষ্টচক্র যদি নেপথ্যে থেকে থাকে সেই চক্র ভেঙে শতভাগ সততার সঙ্গে কর্মসম্পাদন নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? সেবা সংস্থাগুলো পরস্পরকে পাত্তা দেয় না, এ কথা যদি সত্য হয়, তাহলে মানতে হবে যে, দেশে সরকারি সংস্থাগুলোর ওপর সরকারের ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণও নেই। তাহলে প্রশ্ন আসে, প্রশাসনযন্ত্র কি অকার্যকর হয়ে পড়েছে? তারই প্রতিফলন কি দেখা যাচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নে অচলাবস্থার মধ্যে?
মূলত দলীয়করণ ও স্বজনতোষণের যে ধারা দীর্ঘ এক যুগ ধরে চলে আসছে এ সবই হলো তার ভয়ঙ্কর পরিণাম। কাউকে মন্ত্রী বানানো থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রশাসনে বা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে নিয়োগ পর্যন্ত সবখানে যোগ্যতা, দক্ষতার পরিবর্তে দলীয় লোকজন ও কাছের মানুষদের প্রাধান্য দেয়া হলে যা হওয়ার সম্ভবত তা-ই হচ্ছে।


আরো সংবাদ


premium cement