২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮, ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৩
`

স্মার্টফোন ও কিল মারার গোঁসাই

তৃতীয় নয়ন
-

সাধারণত বলা হয়ে থাকে, ‘ভোক্তারা বাংলাদেশে অত্যন্ত দুর্বল। কারণ তারা ঐক্যবদ্ধ নয় এবং ভীতু।’ কথাটা মিথ্যা নয়। তবে এবার হঠাৎ গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির পর অনেক ভোক্তাই মুখ খুলেছেন; সাহসী হয়েছেন। এর একটা বড় কারণ, তাদের স্মার্টফোন। এতে গণপরিবহনে ভাড়ার চার্ট ছিল যা মেনে চলা সবার দায়িত্ব এবং যা অস্বীকার করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। আইন মোতাবেক, এই চার্টের বেশি ভাড়া নেয়া ও চাওয়া যেমন অপরাধ; তেমনি সে অতিরিক্ত ভাড়া যাত্রীদের কেউ দেয়াও অনুচিত। অথচ এবার বাস-মিনি বাসের ভাড়া বাড়ানোর পর রাজধানীতেও হরদম সেটাই দেখা যায়।
২০ নভেম্বর শনিবার দেখা গেছে, চার্টে যেসব স্থানের উল্লেখ নেই, সেসব জায়গার যাত্রীদের থেকে পুরো ভাড়া আদায় করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট রুটের। যেমন- মিরপুর রুটে কাজীপাড়ার পর ফার্মগেটের উল্লেখ ছিল চার্টে। মাঝখানে রয়েছে শেওড়াপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও। এসব স্টপেজের যাত্রীরা পুরো ভাড়া দিতে অস্বীকার করায় তাদের থেকে ভাড়া শেষাবধি কিছু কম রাখতে হয়েছে। কোনো কোনো যাত্রী তাদের মোবাইলে যে চার্ট রয়েছে ভাড়ার, সেটা দেখালে পরিবহন কর্মচারীদের মুখে আর দু’কথা শোনা যায়নি। একজন যাত্রী প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, ‘আমি নিজে শেওড়াপাড়া থেকে হেঁটে ফার্মগেট এসেছি, যার দূরত্ব ৫ কিলোমিটার।’ সে হিসেবে এ পথের ভাড়া হওয়া উচিত ১০ টাকা। তাহলে দ্বিগুণ ভাড়া যাত্রীরা কেন দেবেন? ঠিকই দেখা গেল, সরকারের চার্টে এ পথের দূরত্ব ৫ কিলোমিটার এবং তাই ভাড়া হওয়া উচিত ১০ টাকা; এর দ্বিগুণ ২০ টাকা কেন নেয়া হবে?
পত্রিকা ও টিভির খবরে দেখা গেল, পরিবহন ভাড়া বাড়িয়ে দেয়া হলেও ছাত্রছাত্রীদের কনসেশন দেয়া হচ্ছে না। তাই তারা ২০ নভেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর ল্যাবরেটরি মোড়ে আগের মতো হাফ পাসের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছেন। এর আগে, একই ন্যায্য দাবি জানিয়ে শিক্ষার্থীরা মার খেয়েছেন পরিবহন শ্রমিকদের হাতে। এ জন্য কারা দায়ী? মনে রাখতে হবে, যে ছাত্র বা ছাত্রী মিরপুর থেকে ফার্মগেট যেতেন ৬টাকা দিয়ে, তার পক্ষে এখন তো ২০ টাকা ভাড়া দেয়া সম্ভব নয়। এটা আগের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি।
স্মর্তব্য, মিরপুর-মতিঝিল রুটের একটি পরিবহন নিকট অতীতে ভাড়া ২৫ টাকার বদলে ২৮ টাকা রাখা শুরু করেছিল। তবে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে যাত্রীদের প্রতিবাদের মুখে। তাই ভাড়া আবার ২৫ টাকায় নামাতে তারা বাধ্য হন মিরপুর থেকে মতিঝিলগামী যাত্রীদের কাছ থেকে। যারা গাড়ির কোনো জানালা মেরামতের দরকার হলেও করেন না; যাদের কাছে যাত্রীর কোনো মর্যাদা দূরের কথা, তার কোনো মূল্যও নেই; যারা গাড়ির ফ্যানের ব্যবস্থা করতে অনিচ্ছুক কিংবা কোনো ফ্যান নষ্ট হয়ে গেলে মেরামতের সামান্য গরজ বোধ করেন না, তারা তো যাত্রীসেবা না করে গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ানোর অধিকার রাখেন না।
এ ক্ষেত্রে মনে পড়ে রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় একটি দেয়াল লিখনের কথা। একটি ছোট সংগঠনের লেখা হলেও তা অর্থের দিক দিয়ে অনন্যই শুধু নয়, বিরাটও। এ ‘চিকা’র কথাগুলো হলো- ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হন।’
আজ আমাদের দেশের সাম্য মানে, Some are more equal than others. এটা বলেছিলেন প্রখ্যাত ইংরেজ প্রতিবাদী লেখক জর্জ অরওয়েল (১৯০৪-৫৩) তার বিখ্যাত ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এ। কিন্তু কথাটা আজও সত্য। অন্তত আমাদের দুর্ভাগা বাংলাদেশের মতো বহু রাষ্ট্রে। এ দেশে সাধারণ মানুষের সত্যিকার মানবিক মর্যাদা থাকলে, সমাজের সুবিচার নিশ্চিত হলে আজো গণপরিবহনে জনগণের ‘ঘন’ হয়ে ‘মুড়ির টিনের মতো’ উঠতে হতো না চাপাচাপি করে আর মুখবুজে অতি ভাড়া অকারণে গুনতে হতো না প্রতিদিন।
পরিবহনের মালিকরা নানাভাবে কনসেশন পান; কিন্তু শিক্ষার্থীরা পান না কেন? সঙ্গতভাবেই তারা তো অতীতে এটা পেয়ে এসেছেন বিভিন্ন রুটের বাস-মিনিবাসে। এখন তারা উল্টো ‘মার খান’ যেন ‘চুরির সাথে মার মুফতে’ পাওয়ার মতো। তা হলে ‘চোর’ কারা? যারা যাত্রীদের কোটি টাকা সুকৌশলে উজাড় করেছেন তারা; নাকি যারা ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় পথে নেমেছেন; নামতে বাধ্য হলেন, তারা?
দেশে এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন হয়ে উঠেছে যে, আবার হরতাল-অবরোধ-ধর্মঘট ইত্যাদি শুরু হয়ে যেতে পারে। তখন শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত ভাড়া গোনার সামর্থ্য পাবে কেমন করে? কিংবা মহামারীকাল যেহেতু শেষ হয়ে যায়নি এবং আসন্ন শীতে কোভিড বা করোনাভাইরাসের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কা আবার রয়েছে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যে জন্য সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন, সেহেতু আবার দেশে লকডাউন-শাটডাউন শুরু হওয়া অসম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়লে তা সাধারণ মানুষই যেখানে দেয়া সম্ভব নয়, সে ক্ষেত্রে তাদের পোষ্য শিক্ষার্থীরা কেমন করে ৪০-৫০% অতিরিক্ত ভাড়া দেবে?
এমন পরিস্থিতিতে বলতে ইচ্ছা করে, ‘ভাত দেয়ার ভাতার নয়, কিল মারার গোঁসাই’ যেন কোনো কর্তৃপক্ষ না হয়। সে কর্তৃপক্ষ প্রশাসনিক হোক কিংবা বেসরকারি পরিবহন মালিকরা হোক। সোজা কথা, এ উপমহাদেশের অনেক দেশেই আছে শিক্ষার্থীদের ‘হাফ পাস’ বা ছাড় দেয়ার সুযোগ। আমাদের দেশেও সরকারি গণপরিবহন এই সুবিধা দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে। তাহলে অন্যান্য পরিবহনে কেন এই ছাড় পাওয়া যাবে না?
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় গৌরবের বিষয় এবং এই জাতির সংগ্রামের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অংশ। এই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মূল ভিত্তি ১১ দফা দাবি যাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফাও অন্তর্ভুক্ত। ১১ দফায় ছাত্রছাত্রীদের জন্য পরিবহনে ভাড়ায় ছাড় দেয়ার জোর দাবি ছিল। সেটা যদি জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার মানতে পারে, কার্যকর করতে পারে, তা হলে কেন এটা করতে পারবে না স্বাধীন বাংলাদেশের ‘গণতান্ত্রিক’ বলে দাবিদার সরকার? বরং বহু আগেই তা আইনি ভিত্তি অর্জন করাই ছিল উচিত ও স্বাভাবিক। আজো তা না করে বরঞ্চ শিক্ষার্থীদের হেয় এবং গণদাবিকে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। এ অবস্থা আর চলতে পারে না এ দেশে।


আরো সংবাদ


premium cement