১১ আগস্ট ২০২২
`

জীবাণুর বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধে

-

জন্মলগ্ন থেকেই আমরা নানারকম রোগ ও রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে এক অনন্ত যুদ্ধে লিপ্ত। আমরা শরীরের শুধু হাত-পা, চোখ-মুখ ইত্যাদি এনাটমিক্যাল গঠন নিয়েই বেঁচে আছি তা নয়, বরং পুরো শরীর নামক রাষ্ট্রটি পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন ফিজিওলজিক্যাল সিস্টেমের পারস্পরিক সমন্বয়ে। মানুষের শরীরের সবচেয়ে বিস্তৃত এবং বড় ফিজিওলজিক্যাল সিস্টেম হলো ইমিউন সিস্টেম। একটা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্য দরকার হয় স্থল, বিমান ও নৌবাহিনী, বিভিন্ন স্থানে আর্মি ক্যাম্প, সড়ক, নৌ ও আকাশপথ এবং সীমান্ত রক্ষার জন্য বর্ডার গার্ড বাহিনী, চেক পয়েন্ট যা শরীরের ইমিউন সিস্টেমের সাথে তুলনীয়।
আমাদের শরীরে যত সেল আছে তার দশগুণ অণুজীব চামড়া, ইন্টেস্টাইন, নাক-মুখ-গলায় বহন করছি অথচ এদের দ্বারা অসুস্থ হই না। তার কারণ আমাদের শরীর এদের সাথে সহাবস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। আমরা যুদ্ধ করছি ওই সমস্ত ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে যাদেরকে শরীর বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করে। বিদেশী হিসেবে ঠিকমতো চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলাই হলো ইমিউন সিস্টেমের কাজ।
চিনতে ভুল করে নিজের শরীরের টিস্যুকে বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করলে হয় অটোইমিউন ডিজিজ, কম চিনতে পারলে ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি ডিজিজ, বেশি চিনে ফেললে হাইপারইমিউন ডিজিজ। সুতরাং নিজকে চিনতে ভুল করা, কম বা বেশি চিনে ফেলা- সবটাই ক্ষতিকর। আবার ঠিকমতো চেনার পরও বেশি রিয়েকশন দেখালে নিজের ক্ষতি। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রও তো নিজের শরীরই। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো এলার্জিক এনাফাইলেক্টিক রিয়েকশন ও করোনায় ‘সাইটোকাইন স্টর্ম’। এ জন্যই ইমিউন সিস্টেমকে দু’ধারী তলোয়ারও বলা চলে।
ইমিউন ব্যবস্থাকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমত, ইন্যাট বা জন্মগতভাবে অর্জিত ইমিউনিটি যা নন-স্পেসিফিক, ন্যাচারাল, তাৎক্ষণিক, স্থানীয়, সব সময় একই রকম এবং কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না। যেমন ইনফ্লামেশন হওয়া।
দ্বিতীয়ত, এডাপ্টিপ ইমিউনিটি যা স্পেসিফিক, টি ও বি-লিম্ফোসাইটস, ন্যাচারাল কিলার সেলস এবং এন্টিজেনের ইন্টারেকশনে অ্যান্টিবডি তৈরি করে পরিচালিত হয়। এটি কেবল ভারটিবরেট প্রাণীতেই ঘটে থাকে। লিম্ফয়েড টিসু, ইমিউন সেলস এবং ইমিউন মলিকিউলস- এই তিনের সমন্বয়ে ইমিউন সিস্টেম।
লিম্ফয়েড টিস্যু : এটি প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি লিফয়েড অর্গান- এই দুই ভাগে বিভক্ত। প্রাইমারি লিম্ফোয়েড অর্গান যার একটি হলো হাড্ডির অস্থিমজ্জা বা ‘বোন মেরো’ দিয়ে তৈরি, অপরটি বুকের ঠিক ওপরের দিকে থাকা ‘থাইমাস’ নামক অর্গান দিয়ে তৈরি।
সেকেন্ডারি লিম্ফোয়েড অর্গান তৈরি হয় স্পিলিন এবং সমস্ত শরীরে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লিম্ফেটিক চ্যানেলের পথে পথে গুচ্ছাকারে থাকা ৪৫০-৫০০টি লিম্ফনোড দিয়ে। ইমিউন সেলস দুই রকম- প্রথমত, জন্মগত বা ইন্যাট ইমিউনিটির প্রয়োজনের সেলগুলো হলো- ম্যাক্রোফেজ, মনোসাইট, নিউট্রোফিল, ইয়োসিনোফিল, ব্যাজোফিল ও মাস্ট সেল। এন্টিজেন প্রেজেন্টিং সেল যেমন ডেন্ড্রাইটিক সেল, লেংগারহেন্স সেলও ইমিউন সেল।
দ্বিতীয়ত, এডাপ্টিভ ইমিউনিটির জন্য দরকারি হলো- টি-লিম্ফোসাইটস, ন্যাচারাল কিলার সেলস, লিম্ফোকাইন ও বি- লিম্ফোসাইটস। মলিকিউলসসমূহ যা ইন্যাট এবং এডাপ্টিপ ইমিউনিটি- এই উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজন- অ্যান্টিবডি, সাটোকাইন, কমপ্লিমেন্ট, ক্লাস্টার অব ডিফারেন্সিয়েশন, রিসেপ্টর মলিকিউলস ইত্যাদি ইমিউন পরিবারের সদস্য।
টি-সেল : টি-সেলগুলো বোন মেরো থেকে উৎপন্ন হয়ে থাইমাস গ্লান্ডে ম্যাচিউর হয়। প্রবাহমান রক্তে ৬০-৭০ শতাংশ। রক্তে এরা ইনঅ্যাক্টিভ অবস্থায় চলাচল করে এবং রোগ-জীবাণুর সন্ধান পেলে অ্যাক্টিভ হয়ে যায়। এরা অ্যান্টিবডি তৈরি করে না তবে কেমিক্যাল তৈরি করে ভাইরাস ইনফেক্টেড সেলকে মেরে ফেলে। অ্যাক্টিভ হয়ে ইফেক্টর সিডি ৪ টি-সেল ও সিডি ৮ টি-সেল এবং মেমোরি টি-সেল তৈরি করে। এদের সারফেসে টি-সেল রিসেপ্টর নামক রিসেপ্টর প্রোটিন থাকে যার সাহায্যে জীবাণু শনাক্ত করে। রক্ত ও লিম্ফনোড নালীতে এরা চলাচল করে এবং লিম্ফনোড, স্পিলিন, বোন মেরো, থাইমাসে থাকে। মাত্র এক মিলিলিটার রক্তে শ্বেত কণিকার পরিমাণ ৪-১১ হাজার।
বি-সেল : বোন মেরো থেকে উৎপন্ন হয়ে সেখানেই ম্যাচিউর হয় রক্তে যার পরিমাণ ১০-২০ শতাংশ। বি-সেল সারফেসে থাকা রিসেপ্টর দিয়ে রোগজীবাণু চিনে নেয় এবং অ্যাক্টিভ হয়ে যায়।
এন্টিজেন প্রেজেন্টিং সেল : এদের কাজ হলো- রোগজীবাণু চিহ্নিত করে মেরে ফেলা অথবা মেরে ফেলতে না পারলে ধরে নিয়ে নিকটবর্তী আর্মি ক্যান্টনমেন্ট সদৃশ লিম্ফনোডে পৌঁছে দেয়া। এই সেলগুলোর বেশির ভাগই রক্তে নয় বরং বিভিন্ন টিস্যুতেই থাকে। এদের উৎপত্তি মূলত ম্যাক্রোফেজ থেকে।
ন্যাচারাল কিলার সেলস : রক্তে এদের পরিমাণ ১০-১৫ শতাংশ। এরা বড় গ্রানিউল সমৃদ্ধ লিম্ফোসাইট। কোনোরকম রিসেপ্টর ছাড়াই এরা রোগজীবাণু চিনতে পারে এবং ভাইরাস ইনফেক্টেড ও টিউমার সেল ধবংস করে। অপরটি হলো- অ্যান্টিবডি মেডিয়েটেড অথবা হিউমোরাল ইমিউনিটি যা মূলত বি-সেল মেডিয়েটেড বি-সেল, তাদের প্রডাক্ট এবং সিক্রেটেড মলিকিউল অ্যান্টিবডি দিয়ে তৈরি ও এক্সট্রাসেলুলার ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করে।
জন্মগত ইমিউন সিস্টেমের উপস্থিতির কারণে রোগজীবাণু শরীরে ঢুকার সাথে সাথে অনির্দিষ্টভাবে শরীর বাধা দেয়। অর্জনগত বা একোইয়ার্ড ইমিউন সিস্টেমের উপস্থিতির কারণে নির্দিষ্টভাবে রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে মূলত টি ও বি-লিম্ফোসাইট সক্রিয় হয়। এই উভয় লিম্ফোসাইটস সক্রিয় হলে প্রত্যেকেই ইফেক্টর টি ও বি লিম্ফোসাইটস এবং মেমোরি টি ও বি লিম্ফোসাইটসে রূপান্তর ঘটে। ইফেক্টর টি-লিম্ফোসাইটস থেকে হেল্পার ও সাইটোটক্সিক টি-লিম্ফোসাইটস, বিভিন্ন ধরনের সাইটোকাইন সিক্রেশন হয়। ইফেক্টর বি-লিম্ফোসাইটস থেকে প্লাজমা সেল এবং এই প্লাজমা সেল থেকেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, একটি প্লাজমা সেল প্রতি সেকেন্ডে দুই হাজার এন্টিবডি তৈরি করতে পারে।
ইমিউন সিস্টেমের কাজ দু’ধরনের, রোগজীবাণুকে চেনা এবং সে অনুসারে সাড়া দেয়া। রোগজীবাণু চেনার জন্য টি ও বি সেল সারফেসে যথাক্রমে টি-সেল রিসেপ্টর ও বি-সেল রিসেপ্টর নামক প্রোটিন থাকে। এই প্রোটিন রিসেপ্টরগুলোকে আমরা টর্চলাইটের সাথে তুলনা করতে পারি যারা রোগজীবাণু দেখা মাত্রই চিনে ফেলে। সাড়া দেয়া আবার দুই রকম- একটি হলো তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়া, অপরটি হলো ভবিষ্যতের চিন্তা মাথায় রেখে মেমোরি টি এবং বি-সেল তৈরি করে সাড়া দেয়া।
বোন মেরো হলো ইমিউন সেল উৎপাদনের কারখানা, থাইমাস হলো মূলত টি-সেল ম্যাচিউরড হওয়ার একমাত্র কারখানা, সেকেন্ডারি লিম্ফোয়েড অর্গান শরীরের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা লিম্ফনোডসমূহ যাদের কাজ লিম্ফোসাইটস ও অ্যান্টিবডি উৎপাদন, রোগজীবাণু মারা এবং লিম্ফেটিক চ্যানেলের প্রবাহিত লিম্ফ রসের ফিল্টারিং।
লিম্ফনোডগুলো শরীরে প্রধানত দুই ভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। প্রথমত, শরীরের যে সমস্ত অংশ বাইরের জগতের সাথে যুক্ত থাকে সে সমস্ত রাস্তা দিয়ে ঢোকার পথে প্রচুর মিউকাস অ্যাসোসিয়েটেড লিম্ফোয়েড টিস্যু যেখানে লিম্ফনোড গুচ্ছাকারে মিউকাস মেমব্রেনের ঠিক নিচে অবস্থান করে।
দ্বিতীয়ত, লিম্ফেটিক চ্যানেলের নেটওয়ার্কের পথে পথে আর্মি ক্যাম্প বা ক্যান্টনমেন্টসদৃশ গুচ্ছ আকারে থাকা ক্যাপসুলেটেড লিম্ফেনোড গ্রুপ। যেমন- এক্সিলারি লিম্ফনোড, সার্ভাইকাল লিম্ফনোড ইত্যাদি। স্পিলিনের কাজ অ্যান্টিবডি তৈরি, রোগজীবাণু, বৃদ্ধ আরবিসি ধ্বংস করা এবং রক্তের ফিল্টারিং।
ফার্স্ট লাইন অব ডিফেন্স মানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ : ফার্স্ট লাইন অব ডিফেন্স ইন্যাট ইমিউনিটির অন্তর্ভুক্ত একটি প্রতিরোধ প্রক্রিয়া। আমাদের পুরো শরীর চামড়া দ্বারা এমনভাবে সুরক্ষিত যে তা পুরোপুরি ওয়াটার প্রুফ। সব ধরনের ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া থেকে মুক্ত রাখে এই চামড়া। আমাদের শরীরের যে সমস্ত অংশ বাইরের জগতের সাথে সরাসরি যুক্ত সেখানেই আছে হোয়াইট ব্লাড সেলের ম্যাক্রোফেজ থেকে আসা বিশেষ ধরনের ডেন্ড্রাইটিক ও লেংগারহেন্স সেলস। চামড়ার ঠিক নিচে সুপ্রা ব্যাজাল ও ব্যাজাল লেয়ারে প্রচুর পরিমাণে ল্যাংগারহেন্স সেলস থাকে যারা কোনো রোগজীবাণু চামড়ার কাঁটাতারের বেড়া উপেক্ষা করে ঢোকার সাথে সাথে হয় সরাসরি মেরে ফেলবে অথবা ধরে নিয়ে যাবে নিকটবর্তী আর্মি ক্যাম্প তথা লিম্ফনোডে মেরে ফেলার জন্য। বাইরের জগতের সাথে যুক্ত রেস্পিরেটরি, গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টিনাল ট্রাক্ট, জেনিটো-ইউরিনারি ট্রাক্টের লাইনিং এপিথেলিয়াল লেয়ারেও আছে প্রচুর ডেন্ড্রাইটিক সেল যাদের কাজ হলো রোগজীবাণু চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢুকে গেলে সাথে সাথেই আক্রমণ করে মেরে ফেলা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগজীবাণু নাক-মুখ দিয়েই শরীরে ঢুকে। মজার বিষয় হলো- এ জন্য প্রাকৃতিকভাবেই এই পথে যেন কোনো রোগজীবাণু ঢুকতে না পারে সে জন্য আছে বিশেষ ব্যবস্থা। এখানে নাক-মুখ-কান-গলার সংযোগস্থলে ওয়াল্ডেয়ারস রিং নামে একটি লিম্ফনোডের রিং আছে যারা এ পথে রোগজীবাণু ঢুকতে বাধা দেয়। লিম্ফনোডের এই রিং তৈরি হয় এডেনয়েড টন্সিল, দুই কানের দু’টি টিউবাল টনসিল, মুখের দু’টি প্যালেটাইন টন্সিল এবং জিহ্বার গোড়ায় থাকা লিংগুয়াল টন্সিলের লিম্ফনোডের সমন্বয়ে। এই টন্সিলার রিংটিকে আমরা গলার পাহারাদার বা পুলিশের চৌকি বলতে পারি যারা রাত-দিন উপস্থিত থেকে ফুসফুস ও খাদ্যনালীতে যেন কোনো রোগজীবাণু ঢুকতে না পারে তার দেখভাল করে। রোগজীবাণু দূর করতে গিয়ে এরা অসুস্থ হলে আমরাও গলাব্যথা, জ্বর অনুভব করি।
এ ছাড়াও ফুসফুস নালীর মিউকাস মেমব্রেন লাইনিংয়ে থাকে নানান ধরনের প্রটেক্টিভ সিক্রেশন যেমন- মিউকাস মেমব্রেন, ডেনড্রাইটিক সেল, এন্টিবডি আইজিএ ইত্যাদি যারা রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে প্রটেকশন দেয়। শুধু তা-ই নয়, সারা শরীরের মিউকাস মেমব্রেন লেয়ারের ঠিক নিচে থাকে অসংখ্য লিম্ফনোড গুচ্ছ যাদের এককথায় বলে মিউকাস অ্যাসোসিয়েটেড লিম্ফোয়েড টিস্যু (মাল্ট) যাদের কাজ হলো বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ধরে আনা রোগজীবাণু মেরে ফেলা, রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করা। এখান থেকে তৈরি হওয়া রেডিমেইড আইজিএ অ্যান্টিবডি নিঃসরণের মাধ্যমে রোগজীবাণু ধ্বংস করে। শরীরের ভেতরে ঢোকার রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে গুচ্ছাকারে থাকার এ লিম্ফনোডগুলোকে রাষ্ট্রের বর্ডারে থাকা বিজিবি-আর্মির চেক পয়েন্টের সাথে তুলনা করা যায়। বর্তমানে ভারতে ব্যবহার হচ্ছে ‘ন্যাজাল ভ্যাকসিন’ যা ভাইরাসকে তার প্রবেশপথেই মেরে ফেলে।
যে সমস্ত রেস্পিরেটরি পার্টিকেলের সাইজ ১০-২০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট তা সরাসরি ফুসফুসে ঢুকে যায়, ২০-এক হাজার মাইক্রোমিটার সাইজের হলে রেস্পিরেটরি ট্রাক্টের যে এপিথেলিয়াল লাইনিং থাকে সেখানকার অসংখ্য সিলিয়া যাদের আমরা বলি ‘প্রাকৃতিক ঝাড়ুদার’ ঢুকতে বাধা দেয়। এক হাজার মাইক্রোমিটারের চেয়ে বেশি সাইজেরগুলো নাসারন্ধ্রেই আটকে দেয়ার চেষ্টা করে। তা ছাড়া নাসারন্ধ্রের পথে পথে যে অসংখ্য লোম দিয়ে ‘প্রাকৃতিক ছাকুনি’ আল্লাহ দিয়ে রেখেছেন, তা দিয়ে ধুলাবালু, ময়লা-আবর্জনা ফুসফুসে ঢোকার আগেই আটকে দেয়। ঘরের এক কোণে রাখা একটি টেবিল যদি দু’দিন না পরিষ্কার করি তাহলে এমনিতেই কি পরিমাণ ধুলা-ময়লার আস্তর পড়ে যায়। প্রতি নিঃশ্বাসে আমরা ফুসফুসে টেনে নিচ্ছি গড়ে ৫০০ মিলিলিটার ধুলাবালুযুক্ত বাতাস, তারপরও কিভাবে ফুসফুস ভালো থাকে। আমরা কি কোনোদিন কোনো ঝাড়ু দিয়ে ফুসফুস পরিষ্কার করেছি। বিষয়টি অবশ্যই আশ্চর্যের। এ জন্যই ইবনে সিনা তার কানুন নামক গ্রন্থে বলেছিলেন, মানুষের এই ফুসফুসকে যদি ধুলাবালুযুক্ত বাতাসের মোকাবেলা করতে না হতো তাহলে হয়তো মানুষ হাজার বছর অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারত।
আমরা প্রতি নিঃশ্বাসে যে পরিমাণ বাতাস নিচ্ছি সে পরিমাণটা হলো গড়ে ৫০০ মিলিলিটার/ নিঃশ্বাস; একে বলা হয় টাইডাল ভলিউম। প্রতি মিনিটে নিঃশ্বাস নিচ্ছি ১২/মিনিট। এর মধ্যে অক্সিজেন আছে ২১ শতাংশ।
সুতরাং এক মিনিটে বাতাস নিচ্ছি ছয় লিটার এবং অক্সিজেন ১.২৬ লিটার, এক ঘণ্টায় বাতাস ৩৬০ লিটার এবং অক্সিজেন ৭৫.৬ লিটার। এক মাসে বাতাস দুই লাখ ৫৮ হাজার লিটার এবং অক্সিজেন ৫৪ হাজার ১৮০ লিটার। এক বছরে বাতাস ৩০ লাখ ৯৬ হাজার লিটার এবং অক্সিজেন ছয় লাখ ৫০ হাজার ১৬০ লিটার। এভাবেই ৭০ বছরের জীবনে বাতাস ২১ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার লিটার এবং অক্সিজেন চার কোটি ৫৫ লাখ ১১ হাজার ২০০ লিটার। ভাবতেও অবাক লাগে, এই যে সারা জীবন বিনা পয়সায় এত পরিমাণ বাতাস আর অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে আছি অথচ ফুসফুস ন্যাচারালি পরিষ্কারই থাকছে। এভাবেই উপরি উক্ত বাধা প্রদানকারী বস্তুগুলো অনেকটা সীমান্তের পাহারাদার বা বিজিবির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
ফুসফুস নালীর মিউকাস মেমব্রেনের ভেতরে থাকা অসংখ্য লিম্ফনোড গুচ্ছ, হিস্টিওসাইটস ও অন্যান্য ইমিউন সেল ও তাদের সিক্রেশন একযোগে রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হিস্টিওসাইটস বা ম্যাক্রোফেজগুলো ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু খেয়ে ফেলে অথবা পার্শ্ববর্তী লিম্ফনোডে ধরে নিয়ে যায়। এগুলোই হলো রোগজীবাণু মেরে ফেলার কার্যকর ইন্নেট সেল্যুলার এবং মলিকুলার প্রক্রিয়া যা মূলত নন-স্পেসিফিক ও তাৎক্ষণিক।
এদের বাধার ফলে শরীরে জ্বরসহ অন্যসব উপসর্গ দেখা দেয়। রোগজীবাণু ঢুকার শুরু থেকেই এদের কাজ শুরু হয়ে শেষ অবধি চলতে থাকে। এমনকি বিশেষ করে করোনাভাইরাসকে আক্রমণ করতে গিয়ে এত পরিমাণ সাইটোকাইন প্রডাকশন দেয় যে, নিজের অজান্তেই শরীর নিজের অন্য ভালো সেলগুলোকে আক্রমণ করে সর্বনাশ ডেকে আনে, একেই বলে সাইটোকাইন স্টর্ম।
এক ন্যানোমিটার হলো এক সেন্টিমিটারের এক কোটি ভাগের এক ভাগ মাত্র। মানুষের কোষের গড় সাইজ হলো ২০-৩০ মাইক্রোমিটার। সবচেয়ে ছোট কোষ হলো লোহিত কণিকা (৭-৮ মাইক্রোমিটার) এবং সবচেয়ে বড় কোষ হলো মেয়েদের ওভাম (১২০ মাইক্রোমিটার)।
সেই হিসেবে একটি করোনাভাইরাসের গড় সাইজ যদি ৩০ ন্যানোমিটার ধরি আর মানুষের একটি কোষের গড় সাইজ ধরি ৩০ মাইক্রোমিটার তাহলে প্রায় এক হাজার ভাইরাস দিয়ে একটি মানব কোষ পূর্ণ হয়ে যাবে। ফুসফুসের যে স্থানে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইডের আদান-প্রদান হয় সে স্থানকে এলভিউলাই বলে (গড় সাইজ ২০০ মাইক্রোমিটার) মানুষের প্রতি ফুসফুসের ভেতরে শুধু এলভিওলাই আছে গড়ে ৪৫ কোটি। প্রতিটি এলভিওলাসে আবার আছে মূলত তিন ধরনের কোষ। এপিথেলিয়াল টাইপ ওয়ান এবং টাইপ দুই এবং এলভিওলার হিস্টিওসাইটস। দুই ফুসফুসে এলভিওলাই হবে ৯০ কোটি। সুতরাং করোনাভাইরাস যদি কেবল ফুসফুসের সব কোষকে আক্রমণ করতে পারে তাহলে শুধু এলভিওলাইয়ের মধ্যেই করোনাভাইরাস হবে কয়েক শ’ হাজার কোটি। এ ছাড়াও ভাইরাসের আক্রমণ করার মতো রেস্পিরেটরি ট্রাক্টে আছে আরো কোটি কোটি কোষ।
ফুসফুসে যে রাস্তা দিয়ে বাতাস চলাচল করে অর্থাৎ নাক থেকে শুরু করে এলভিওলাই পর্যন্ত তার দৈর্ঘ্য হবে দুই হাজার ৫০০ কিলোমিটার লম্বা। আর এলভিওলাইয়ের যে অংশে কার্বন ডাই অক্সাইড ও অক্সিজেনের আদান-প্রদান হয়, সে অংশটুকুর আয়তন একটি বাসার মেঝের ৭৫০ স্কয়ার ফুটের সমান। এখানে এলভিওলাইয়ের মধ্যে যে এলভিওলার হিস্টিইওসাইটস থাকে তারও কাজ হলো ভেতরে ঢোকা রোগজীবাণু মেরে ফেলা। এত লম্বা নালী এত বড় ফ্লোরই হলো এত কোটি রোগজীবাণু ও মানুষের যুদ্ধক্ষেত্র।
উপরি উক্ত সমস্ত বাধা অতিক্রম করে রোগজীবাণু যখন টিস্যু ও রক্তে ঢুকে যায় তখন শুরু সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্সের কাজ। সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্সে জড়িত থাকে মূলত টি এবং বি লিম্ফোসাইটস ও তাদের দ্বারা তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডিসহ অন্যান্য প্রডাক্ট। সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্স হলো একোয়ার্ড বা এডাপ্টিভ ইমিউনিটির অন্তর্ভুক্ত। এডাপ্টিভ ইমিউনিটি আবার দুই ধরনের ইমিউন রেসপন্স দেখায়। একটি হলো- প্রাইমারি ইমিউন রেসপন্স, অপরটি হলো- সেকেন্ডারি ইমিউন রেসপন্স। আমাদের শরীর প্রাইমারি ইমিউন রেসপন্স দেখায় তখনই যখন নতুন রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হই যার ব্যাপারে আমাদের শরীরের পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা থাকে না এমন ক্ষেত্রে।
সেকেন্ডারি ইমিউন রেসপন্স হয় তখনই যখন একই ধরনের জীবাণু দ্বারা দ্বিতীয়বার বা তার চেয়ে বেশিবার কেউ আক্রান্তের শিকার হয়। রোগজীবাণুর এই দুই ধরনের সংক্রমণ এবং মানুষের প্রতিরোধ ধরন একরকম হবে না। প্রাইমারি ইমিউন রেসপন্সে অ্যান্টিবডি তৈরিতে সময় নেয় অন্তত ছয়-সাত দিন এবং তা আইজি-এম ধরনের অ্যান্টিবডি যা বাঁচেও মাত্র তিন-চার সপ্তাহ। সেকেন্ডারি ইমিউন রেসপন্সে দ্রুত অর্থাৎ মাত্র তিন-চার দিনের মাথায় আইজি-জি অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং ইতোমধ্যে টিস্যুতে ঢুকে পড়া রোগ-জীবাণুকে নিউট্রালাইজ করে ফেলে।
প্লাজমা সেল তৈরিকৃত এই অ্যান্টিবডিগুলো আর কিছুই না বরং ইংরেজি বর্ণমালা ওয়াই আকৃতির ইমিউনোগ্লোবিউলিন গ্লাইকোপ্রোটিন মাত্র। রোগজীবাণু প্রতিরোধী অ্যান্টিবডিগুলো প্রয়োজন অনুপাতে মূলত লিম্ফনোডে তৈরি হয়। পাঁচ ধরনের অ্যান্টিবডি হলো- আইজি-জি, আইজি-এম, আইজি-এ, আইজি-ই ও আইজি-ডি। আমাদের শরীরের রক্ত ও লিম্ফেটিক নালী সারা দেহে জালের মতো বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। সারা দেহের সব রক্তনালী একত্রে জোড়া লাগালে এর দৈর্ঘ্য হবে এক লাখ কিলোমিটার। এসব রক্তনালীতে শ্বেত কণিকা, লোহিত কণিকা, প্লাটিলেট, অ্যান্টিবডি, গ্লুকোজ, প্রোটিন ইত্যাদি বাহিত হয়। লিম্ফেটিক চ্যানেলের বিভিন্ন স্থানে লিম্ফনোড গুচ্ছাকারে অবস্থান করে আর্মি ক্যান্টনমেন্টের মতো। লিম্ফেটিক চ্যানেলে লোহিত রক্ত কণিকা ছাড়া রক্তে চলাচলকারী প্রায় সব উপাদানই থাকে। সুতরাং অ্যান্টিবডি জলপথ (রক্তনালী) এবং স্থল পথ (লিম্ফেটিক চ্যানেল) এই দু’টি পথেই শিকারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। রক্তনালী ও লিম্ফেটিক চ্যানেলে সবচেয়ে চলাচলকারী অ্যান্টিবডি হলো আইজি-জি যার পরিমাণ প্রতি ১০০ মিলিলিটার রক্তে গড়ে এক হাজার ২০০ মিলিগ্রাম (৭৫ শতাংশ)। কিন্তু এরা রক্তে আবির্ভূত হয় আইজি-এমের পরে এবং মূলত টিস্যু ফ্লুইডে প্রবশ করা ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া থেকে সুরক্ষা দেয়। এরা গর্ভস্থ থাকা অবস্থায় মা থেকে শিশুকে প্রটেকশন দেয়ার জন্য প্লাসেন্টাল ব্যারিয়ার ক্রস করে শিশুর রক্তে প্রবেশ করতে পারে।
বিপরীতে রিয়েকশন হিসেবে যে বিভিন্ন অ্যান্টিবডিগুলো তৈরি হচ্ছে তা শরীরে ঢোকার পথেই মিউকাস মেমব্রেনের সারফেস থেকে শুরু করে রক্ত হয়ে টিস্যুর ভেতর ঢোকা পর্যন্ত যথাক্রমে- আইজি-এ সারফেস মেমব্রেনে থাকা রোগজীবাণু, আইজি-এম রক্তে থাকা রোগজীবাণু এবং আইজি-জি রক্ত ভেদ করে টিস্যুর ভেতরে ঢুকে পড়া রোগজীবাণুগুলোকে পর্যায়ক্রমে মেরে ফেলে। অর্থাৎ রোগজীবাণু শরীরের যেখানেই ঢুকুক না কেন, সেখানেই প্রটেক্টিভ অ্যান্টিবডি প্রস্তুত আছে। কী অপূর্ব আল্লাহর সৃষ্টি করা আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।
আমাদের দেহের ইমিউনতন্ত্র জীবাণু থেকে ভ্যাকসিনের তফাৎ করতে পারে না। তাই ভ্যাকসিন প্রয়োগের ফলে আমাদের দেহ আক্রান্ত ব্যক্তির মতোই অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে। ভ্যাকসিন প্রয়োগে অ্যান্টিবডি প্রাপ্তির সুবিধা হলো- তাকে আক্রান্ত হয়ে রোগভোগ করতে হয় না।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা।


আরো সংবাদ


premium cement