০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

কাশ্মিরে ঘৃণার আগুন

-

কাশ্মির সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান আদৌ সম্ভব কি না, এই প্রশ্নটি সব সময়ই চলমান বিরোধের নিচে চাপা পড়ে যায়। কোনো পক্ষই এই সমস্যার সমাধানের তত্ত্বটিকে ফিনিক্স পাখির মতো ছাইভস্ম থেকে পুনর্জন্ম দেয় না। কারণ তারা চায় না, কাশ্মিরের মানুষ আত্মসম্মান ও মর্যাদা নিয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচুক।
সমাধানের আলোচনায় এই প্রশ্ন উঠলেই ১৯৪৭ সালে কাশ্মির ভাগের ও ভোগের (আসলে দখলের) বিষয়টি সামনে চলে আসে। আর সেটি সামনে এলেই কাশ্মিরের ভোগী ভারত, পাকিস্তান ও চীনের দখলিস্বত্বের স্বার্থ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন এই তিন পক্ষ নিজ নিজ স্বার্থের পথে হাঁটতে থাকে। এই তিন দেশের অনুসারী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা সামরিক ক্ষমতাবানরা তাদের মোচে (গোঁফে) মোচড় দিয়ে বানরের পিঠা ভাগের কৌশলটি আরোপের চেষ্টা চালায়। এই হলো কাশ্মির উপত্যকার স্বাধীনতার বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যাওয়ার নেপথ্য কাহিনী। আমরা প্রতিদিন ও প্রতি বছরই ওই নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কোটি কোটি শব্দের যুক্তি ও পথ দেখানো রচনা প্রকাশ করলেও, তাতে দখলদারদের বিন্দু পরিমাণ পানি দেখা যায় না তাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক চোখে। রাজনৈতিক চোখ শুকিয়ে গোবী মরুভূমি হলেও তাদের মুখে কাশ্মিরের জনগণের জন্য ‘মুক্তি’ শব্দটি বাক্সময় হয়ে ওঠে না। অর্থাৎ কাশ্মিরিদের মুক্তির পথ পরিষ্কার হয় না। দখলদাররা যে রাজনৈতিক হিংসা-দ্বেষ-হানাহানি আর রক্তপাতের দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যে ঘৃণার আগুন জ্বেলেছে উপত্যকায় তা আজ তুষের মতো জ্বলছে। ওইখানে, শ্রীনগরে বা জেলা শহরগুলোতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিদ্যমান ছিল ’৪৭-এর আগে। শুরুটা ওখান থেকেই। ভারত তার স্বাধীনতার সময় কাশ্মির দখল করে নিয়ে (তারা বলবেন কাশ্মির ভারতের অংশ ছিল) কাশ্মিরি জনগণের স্বাধীনতার ইচ্ছাকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। সেই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান দিতে জাতিসঙ্ঘ গণভোটের ব্যবস্থার কথা বলেছিল, কিন্তু ভারত সেটি করতে দেয়নি। এবং মহান জাতিসঙ্ঘ আপন মহিমার আলো জ্বেলে বিশ্বের বিবদমান এলাকায় বা রাষ্ট্রে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নির্দেশ লঙ্ঘন করে ভারত দোষী হলেও জাতিসঙ্ঘ ওই দেশটির বিরুদ্ধে কোনো রকম ব্যবস্থা নেয়নি।
সর্বশেষে, ২০১৯ সালে মোদি সরকার কাশ্মিরের বিশেষ অধিকার ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে নিলে সাম্প্রদায়িক ঘৃণার অনলে ঘি ঢালা হয়। মোদি সরকার চাইছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মিরে জনসমতা আনতে। অন্য রাজ্য থেকে মানুষ এনে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। অর্থাৎ হিন্দু পুনর্বাসন করে মুসলমানদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করাই মোদির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিপ্রায়। এর অভিঘাতে সংবিধান থেকে ৩৭০ অনুচ্ছেদের উৎপাটন। ফলে সঙ্ঘাত ও বিরোধ ছড়িয়ে পড়ছে কাশ্মিরের সব দিগন্তে। যারা এতকাল গলায় গলায় ভাব নিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে পাশাপাশি বাস করছিল, তারাই এখন একে অন্যকে ঘৃণা আর সন্দেহের চোখে দেখে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। ঠিক এই ঘৃণার সুযোগটি নিয়ে অজ্ঞাত পরিচয় সন্ত্রাসীরা ‘লক্ষ্যবস্তু’ করে খুন করছে হিন্দু ‘পণ্ডিত কিংবা শিখ ও মুসলমানদের’। মনে হচ্ছে ওই অজ্ঞাত খুনে সন্ত্রাসীরা হিন্দু-মুসলিম-শিখ বা অন্য কেউ নয়, তৃতীয় কোনো সন্ত্রাসী পক্ষ। আর ওই তৃতীয় পক্ষ চায় না কাশ্মিরে সম্প্রীতি দীর্ঘজীবী হোক, শান্ত হোক কাশ্মির উপত্যকা এবং একটি স্থিতি নেমে আসুক সেখানে।
কিন্তু সেটি হবার নয়। মোদি সংবিধান থেকে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করায় ওই রাজ্যের সাংবিধানিক অধিকার আর নেই। ৩৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কাশ্মিরের নিজস্ব সংবিধান ছিল। শুধু সামরিক, যোগাযোগ ও পররাষ্ট্র ছাড়া আর সবই ছিল তাদেরই নিয়ন্ত্রণাধীন। মোদি সরকার সেটিই বাতিল করায় রাজ্যের মৌলিক স্ট্যাটাস ধূলিসাৎ করেছেন। জন্ম নিয়েছে সাম্প্রদায়িক বিরোধের ঘৃণা। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে অনেক হিন্দু পরিবার কাশ্মির ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এটাই বাস্তবতা। এখন আর কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। কিন্তু সাধারণ মানুষ এখনো সহাবস্থানকেই পরম বলে মনে করে। কারণ তারা নিজেদের আদি কাশ্মিরি বলে মনে করে এবং এটাই তাদের জন্মভূমি। ভারতের অন্য জায়গাকে তারা নিজেদের জন্মভূমি মনে করে না।
গত ৫ সেপ্টেম্বর হত্যার শিকার হয় মাখনলাল বিন্দ্রু নামের এক ওষুধ ব্যবসায়ী। তিনি কাশ্মিরি ‘পণ্ডিত’ পরিবারের মানুষ। বর্তমানে কাশ্মিরে ৮০০ পণ্ডিত ফ্যামিলি বাস করে। বলাই বাহুল্য, মাখনলাল হত্যার পর অনেক পণ্ডিত ফ্যামিলি অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছে। যদিও এটা ব্যক্তিগত স্তর থেকে জেনেছেন বিবিসির সংবাদদাতা। প্রকাশ্যে কেউ এই চলে যাওয়ার কথাটা বলছে না। ২ সেপ্টেম্বর দু’জন মুসলিমকে অজ্ঞাতনামা বন্দুকধারীরা হত্যা করেছে ঠিক একই কায়দায়। এর আগে একাধিক শিখ হত্যার শিকার হয়েছে। এসব হত্যাই টার্গেট করে সংঘটিত হয়েছে। বিরোধ উত্তপ্ত কাশ্মিরিদের কোনো পক্ষই বলেনি যে তারা হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। অজ্ঞাত হত্যাকারী কারা, এটাই হচ্ছে আপাতত এসব ঘটনার মূল অনুসন্ধান। আমরা বলতে পারি, যারা কাশ্মিরকে নিজেদের দখলে রাখতে চায় তারা এটা করছে। কেউ বলতে পারেন, তাহলে তাদের হাতে পণ্ডিত ফ্যামিলির হিন্দুরা কেন হত হচ্ছে? তাদের টার্গেট তো মুসলমানরা। রাজনীতিতে এগুলো খুবই জটিল অঙ্কের বিষয়। কোথায় মারলে তা কোথায় গিয়ে লাগবে, সেই নকশা তাদের গবেষকরা নিয়তই করতে থাকেন। এই অন্তহীন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের খেলায় কাশ্মিরি মানুষ আজ দ্বিধাবিভক্ত। তবু তারাই আহত-নিহত পরিবার পরিজনের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, দাঁড়িয়ে এটাই প্রমাণ করতে চায় তাদের ভেতরে কোনো রকম সম্প্রদায়গত বিরোধ ও ঘৃণা নেই।
কিন্তু কাশ্মিরের পুলিশ প্রধান বলেছেন, এ বছর অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন সন্দেহভাজন জঙ্গিদের হাতে। জঙ্গি শব্দটি যুদ্ধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আবার তা বিচ্ছিন্নতাবাদী কাশ্মিরি বা স্বাধীনতাকামী কাশ্মিরিদের বোঝানো হয়। পুলিশ প্রধান বোঝাতে চেয়েছেন যে, মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদী যারা কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে, তারাই হত্যা করেছে ওই ২৮ জনকে। আসলে তাদের টার্গেট তো ভারতীয় সেনা বা পুলিশ সদস্য, তারা কেন, কোন যুক্তিতে নিরীহ খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষ ও ‘পণ্ডিত’দের হত্যা করবে? ‘অজ্ঞাত’ কথিত হত্যাকারীদের পরিচয় উদ্ঘাটিত হলেই ওই নিশানা করে হত্যার রহস্য উন্মোচন হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যখন ৭০ জন মন্ত্রী কাশ্মির গেছেন জনগণকে বোঝাতে যে, ৩৭০ ধারা বাতিল করার সুফল হচ্ছে--- এই, এই। তখন হত্যাকারীরা টার্গেট করেছে সাধারণ মানুষ। তার মানে, তারা দেখাতে চায় মন্ত্রীদের যে, তারা কাজটা ভালো করছেন না। কাশ্মিরের আসল সমস্যা ওই ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক সঙ্কট। এর সমাধান সরকারের মন্ত্রীদের গুণকীর্তনের মধ্য দিয়ে হবে না। মাখনলাল হত্যা সেই কথাই বলছে। সেটি সরকার ও সেখানকার ক্ষমতাসীনদের উপলব্ধি করতে হবে। গায়ের জোরে কাশ্মির দখলে রাখা যাবে ঠিক, কিন্তু শান্তি, স্বস্তি ও সাম্প্রদায়িক পরিবেশ সুন্দর ও স্বাভাবিক রাখা যাবে না।
পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে বাজারঘাট, অফিস-আদালত, স্কুল কলেজে নিরাপদ রাখা সম্ভব, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কি তারা দিতে পারবেন? নিহত মাখনলাল বিন্দ্রুর বাড়িতে এখন নি-িদ্র নিরাপত্তা, ভাবখানা এই যে, তার পরিবারের অন্যরা যেন অজ্ঞাতদের হাতে হত বা আহত না হতে পারে। কিন্তু অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা তো বোকা নয় যে সশস্ত্র সেনা বা পুলিশের মাঝে এসে গুলি চালাবে। নিরাপত্তাবাহিনীর লোকেরা যেদিন চলে যাবে, তখন তো তার পাড়া-প্রতিবেশীরাই চার পাশে থাকবে। তারাই তো তার বা তাদের আসল স্বজন। সেটি বেরিয়ে এলো নিহত মাখনলাল বিন্দ্রুর মেয়ে শ্রদ্ধার মুখে। তিনি বলেছেন, আমার মনে হয় না এ জায়গা ছাড়ার কোনো কারণ আমাদের আছে। লোকজন আমাদের চার পাশেই আছে। উল্লেখ্য, মাখনলাল বিন্দ্রুর হত্যার পর তার বাড়িতে যারা শোক ও সান্ত্বনা জানাতে গেছিলেন, বিবিসির ভাষ্য অনুযায়ী তাদের ৯০ ভাগেরও বেশি মুসলমান। তাহলে শ্রদ্ধা কেন তার জন্মভূমি ছেড়ে অন্য রাজ্যে চলে যাবে? তাই তিনি না যাওয়ার কথাই বলেছেন। তবে, এটা মানতেই হবে, কাশ্মিরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেবল ঘোলাই করা হয়নি, হত্যা ও পাল্টা হত্যার এই বর্বর সামরিক-নীতির ফলে কাশ্মিরিদের নিরাপদে বেঁচে থাকার সাংবিধানিক অধিকার হরণ করে নেয়া হয়েছে। প্রথমবার সেটি হয়েছিল নেহরুর হাতে আর দ্বিতীয়বার হলো সাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদির হাতে। কিমাশ্চর্যম, জওয়াহের লাল নেহরু ছিলেন ব্রিটিশ পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের আজ্ঞাবহ ধারক এবং স্বাধীনতার পতাকাবাহী যোদ্ধা, তার হাতে কাশ্মির, হায়দ্রারাবাদের নিজামসহ অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যের স্বাধীনতা হরিত হয়েছিল। তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীর হাতে স্বাধীনতা হারিয়েছে ল্যান্ডলকড সিকিম দেশটি। আর মোদির হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসনের মধ্যে নিপতিত হয়েছে পুনরায় কাশ্মির। তিনি এবং তার দল চায় কাশ্মির হোক হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই তিনি ইসরাইলি নীতি গ্রহণ করেছেন। জর্দান নদীর পশ্চিমতীরে ইসরাইল যে কায়দায় জুয়িশ পরিবার পুনর্বাসন করছে, ঠিক সেই কায়দায়ই মোদি হিন্দুদের পুনর্বাসিত করছে কাশ্মিরে। পরিকল্পনার রোডম্যাপ অনুমান করা কঠিন নয়। বোঝা যায়, কারা শিখ, হিন্দু প্রভাবশালী পণ্ডিত ও মুসলমানদের হত্যা করছে অজ্ঞাতে থেকে। এই ক্যামোফ্লেজের কারণ বিশ্ববাসীকে জানানো ও বোঝানো যে ওই অজ্ঞাতরা সীমান্ত পেরিয়ে এসে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে বা দেশের অভ্যন্তরে জামিনে থাকা জঙ্গিরাই এসব করছে। পুলিশ এর মধ্যেই ৩৫ হাজার জামিন পাওয়া মুসলিমকে ডেকে পাঠিয়েছে, তাদের জেরা করে জেনে নেবে, অজ্ঞাত কারা।
কাশ্মিরে মানুষ হত্যার শিকার হচ্ছে। কারা মারছে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে কেন তারা হত্যার শিকার হচ্ছে। কী তাদের অপরাধ? আর কী সেই বিরোধ? সেই বিরোধের মূলোৎপাটন করতে পারলেই তো সমস্যার সমাধানটি হয়ে যায়। যারা আজ ভারতীয় চোখে জঙ্গি, তারাই কাশ্মিরিদের চোখে মুক্তিযোদ্ধা। তারা কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। আমরা যেমন পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশ হানাদার ও দখলদার মুক্ত করেছি, ওরাও চায় তাদের দেশটি দখলদারমুক্ত হোক। কার না সাধ জাগে স্বাধীন হওয়ার।
সেটি ভারত, পাকিস্তান ও চীনকে বুঝতে হবে। এই বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। ন্যায় ও কল্যাণ ভাবনাই একে অর্থবহ করে তুলতে পারে। অন্যদের দেশ দখল করে রাখার মধ্যে কৃতিত্ব নেই, কৃতিত্ব নিহিত আছে কোটি কোটি মানবেতর জীবনের প্রকৃত মানোন্নয়নে। ভারতের কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, তাদের সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবায়ন করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। কাশ্মিরি মানুষকে অধিকার-হারা করে নিজেদের ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হবে না।



আরো সংবাদ