০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

স্যার সংস্কৃতি

-

প্রচলিত ধারণা মতে, ‘স্যার’ বলার সংস্কৃতি শুরু হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে। ব্রিটিশরা যখন ভারতে শাসন ক্ষমতায় বসে, তখন চালু হয় ‘ইউর অনার’, ইউর এক্সলেন্সি’ প্রভৃতি শব্দ। ‘অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার’ বা ‘মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়’, ‘ভিসি মহোদয়’, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি’ প্রভৃতি। সরকার-বেসরকারি অধস্তনরা ঊর্ধ্বস্তনদের ‘স্যার’ সম্বোধনের চল শুরু হয়। ‘স্যার’ শব্দটি একপর্যায়ে তোষামোদে পরিণত হয়। বর্তমানের কথা নাইবা বললাম। গত জুলাই মাসের মাঝামাঝিতে একাধিক জাতীয় পত্রিকার শিরোনাম ছিল মিনিটে ১৬ বার ‘স্যার’ বলে ভারতীয় আমলারা। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর উদ্ধৃতি দিয়ে খবরে বলা হয়, ভারতের একজন আমলা একবার, দু’বার নয়, মিনিটে ১৬ বার ‘স্যার’ বলেন। পাঠকদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ভারতের আমলারা যেখানে মিনিটে ১৬ বার স্যার বলেন, সেখানে তো বাংলাদেশের আমলারা কিছুই না। বস্তুত স্যার বলার চেয়ে স্যার শোনার আগ্রহ প্রায় সবারই। সব পেশার লোকেরা চান, সবাই তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করুক।
সরকারি কর্মকর্তাদের স্যার শোনার ক্ষেত্রে একটি মনঃস্তত্ব কাজ করে। তারা মনে করেন অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে সরকারি চাকরিতে নিশ্চয়তা বেশি। এখানে মেধার প্রতিযোগিতা হয়। মেধায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তারা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান; অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার পেছনে তাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এ কারণে সেবাগ্রহণকারী জনগণ সেবা নিতে হলে অবশ্যই তাদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতেই হবে। রাষ্ট্রীয় আইনকানুনের দোহাই দিয়ে তারা সাধারণ মানের যেকোনো অন্যায় করে পার পেয়ে যান। নাগরিকদের যথাযথ সেবা না দিলেও তাদের বেতনে কোনো অসুবিধা হয় না। অবসরে যাওয়ার পর তারা পান মোটা অঙ্কের পেনশন। রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ছাড়াও আছে, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ। তাদের সন্তানদের জন্য থাকে নানা ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা। তাই তারা স্থানীয় পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন না করলে মাইন্ড করেন। এ কারণে তারা প্রত্যাশা করেন, জনগণ তাদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতে বাধ্য। তারা অনেকে নিজেদের এ যুগের সামন্ত প্রভু ভাবতে পছন্দ করেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ধরুন আমার গবেষণার সময় আমি যেটা দেখেছি, একটি উপজেলায় যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রকল্প, তার অর্থ, কাগজে সই এরকম গুরুত্বপূর্ণ কাজের এক্সিকিটিভ অথরিটি একজন ইউএনওর কাছে। আপনি যখন অর্থ-নিয়ন্ত্রণ করেন, প্রকল্প বন্ধ করে দিতে পারেন, তখন সেই ক্ষমতার কাছে আপনি দায়বদ্ধ হতে বাধ্য। সরকারি কর্মকর্তারা এ ক্ষমতার জায়গাটা উপভোগ করেন এবং তা কোনোভাবেই ছাড়তে চাইবেন না, এটিই স্বাভাবিক।
ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তা যখন অধঃস্তন কর্মকর্তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করেন, তখন তার জবাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা বেয়াদবি। বলতে হবে, ‘হ্যাঁ স্যার’ বা ‘না স্যার’। ‘স্যার’ শব্দে সরকারি কর্মকর্তাদের আত্মপ্রত্যয় বেড়ে যায়। তখন সাধারণ জনগণের ‘স্যার’ বলা ছাড়া উপায় থাকে না। স্যার কালচার প্রসঙ্গে আলোচনায় সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। চলতি বছরের ৯ জুলাই মানিকগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) ‘ম্যাডাম’ না বলে ‘আপা’ বলায় ব্যবসায়ী তপন দাসকে লাঠিপেটা করে তার সাথে থাকা পুলিশ। ৩০ মে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাকে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকরা ‘ভাই’ বলায় চরম বিরক্ত হন তিনি। বলেন, আপনাদের ‘ভাই’ বলে ডাকার রেওয়াজ আর গেল না। জানেন, আমাদের এ চেয়ারে বসতে কত কষ্ট করতে হয়েছে। গত এপ্রিলে নেত্রকোনার কলমাকান্দার ইউএনওকে ‘স্যার’ না বলায় থানার ওসি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে হেনস্তা করেন।
সংবাদমাধ্যমে থেকে আরো জানা যায়, সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ না বলায় প্রায়ই হেনস্তার শিকার হন সাধারণ মানুষ।
এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলতে হবে এমন কোনো রীতি নেই। সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কেউ সেবা নিতে গেলে হাসিমুখে আপনার আচরণটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেউ সেবা নিতে গেলে যদি ওয়েলকামিং এটিচ্যুড না থাকে, উল্টো আপনি তিরস্কার বা রেগে যান তা হলে, এগুলোও দুর্নীতি। দুর্ব্যবহারও দুর্নীতির শামিল। এটি করা যাবে না। আপনি সুন্দর ও সাবলীলভাবে কথা বলুন। সুন্দরভাবে কথা বলাটা এমন নয় যে, আপনি ক্ষমতা দেখাতে পারছেন না অথবা আপনি হেরে যাচ্ছেন। দরকার সাধ্যমতো সেবাটি দেয়া। আপনার আচরণ, সরকারেরই আচরণ। সবাই মনে করেন, আপনার অফিস প্রধানমন্ত্রীর অফিসেরই একটি অংশ। প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘স্যার’ শব্দের অর্থ ‘মহোদয়’, ‘ম্যাডাম’ অর্থ ‘মহোদয়া’, জনাব বা জনাবা। রুলস অব বিজনেসে এটি নেই।
সাধারণত ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ‘ইয়েস স্যার’ একটি তেল মর্দন সম্বোধন। এ সম্বোধনে কিছুটা হলেও তাকে অহঙ্কারী করে। ক্ষমতার কারণে অনেক সময় অনেক অযোগ্য লোককেও ‘স্যার’ সম্বোধন করতে হয়। প্রজাতন্ত্রের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীই জনগণের সেবক। সেবাগ্রহণের জন্য জনগণ তাদের ফি দেন। যেটাকে সরকারি ভাষায় বলা হয় ‘ট্যাক্স’ বা ‘কর’। সরকারি কর্মকর্তাদেরই উচিত সেবাগ্রহণকারীদের তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দেয়া। তাই ঔপনিবেশিক কুপ্রথা ‘স্যার’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ‘ইয়েস রুল’ চালু করা এখন সময়ের দাবি। ‘ইয়েস রুল’ সম্বোধনে অনেকগুলো বিষয় জড়িত। ‘ইয়েস রুল’ মানেই ‘আইন মেনে চলা’। অধঃস্তন যখন ঊর্ধ্বস্তনকে বলবে ‘ইয়েস রুল’ অর্থাৎ নিয়মে যা আছে, নিয়ম যা বলে। এর ফলে সব কর্মকর্তার মধ্যে আইন বা নিয়ম মেনে চলার একটি তাগিদ অনুভব হবে। ঔপনিবেশিক কুপ্রথা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে। নিজেকে সামন্ত প্রভু বা জনগণের উপরস্থ ভাবার অবসান হবে। শুদ্ধ চর্চার অনুশীলন হবে। অহঙ্কার কমবে।
রাজনৈতিক নেতা বা দলের চেয়ারপারসনকেও ‘স্যার’ সম্বোধনের ঘোর বিরোধী আমরা; কারণ ‘স্যার’ সম্বোধনের মধ্যে দিয়ে যতটুকু না সম্মান প্রদর্শিত হয়, তার চেয়ে বেশি প্রদর্শিত হয় চামচামি। চামচামির কারণে অনেক যোগ্য ব্যক্তির ওপর অযোগ্য ব্যক্তি ছড়ি ঘুরানোর সুযোগ পায়। দল হয়ে পড়ে তোষামোদপ্রিয়। সঠিক খবর জানা থেকে নেতা বঞ্চিত হন। কাক্সিক্ষত সেবা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জনবান্ধব প্রশাসন প্রতিষ্ঠায় ‘ইয়েস স্যার’ নয়; বলা উচিত ‘ইয়েস রুলস’।
email : emdadulbd636@gmail.com



আরো সংবাদ