১৯ অক্টোবর ২০২১, ৩ কার্তিক ১৪২৮, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

হাতুড়িপেটার চর্চা!

-

মানুষকে মানুষ হওয়ার জন্য চেষ্টা করতে হয়; কিন্তু পশুকে পশু হওয়ার জন্য কোনো চেষ্টা করতে হয় না। কারণ সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ আর পশেুর মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। পশুর পরিচয় তার দেহে। মানুষের পরিচয় তার মনুষ্যত্বে। মানবিক গুণাবলি মানুষের মধ্যে আছে বলেই মানুষ সৃষ্টির সেরা আশরাফুল মাখলুকাত। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়Ñ তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশুপাখি সহজেই পশুপাখি, কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় তবে মানুষ। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রে কিছু মানুষ পশুর মতো আচরণ করে। তা না হলে মানুষ কিভাবে মানুষকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আহত করে। লোহাকে সোজা করা হাতুড়ির কাজ। মানুষ পেটানো হাতুড়ির কাজ নয়! অথচ ক্ষমতার দাপটে বেপরোয়া হয়ে কিছু মানুষ হাতুড়ি দিয়ে মানুষ পিটিয়ে খবরের শিরোনাম হচ্ছে। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের মানসে এ দেশের লাখো মানুষ একাত্তরে জীবন দিয়েছিল। অথচ স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও কাক্সিক্ষত মানের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেনি। যার ফলে মানুষে মানুষে বৈষম্য প্রকট হয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতিতে গণতন্ত্রের মোড়কে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য কার্যকর হলেও প্রতিবাদ হচ্ছে না। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের সব স্তরেই ক্ষমতাবানের জুলুম-নিপীড়ন ক্ষমতাহীনের ওপর প্রয়োগ হচ্ছে।
মানুষের পাশবিকতার বহিঃপ্রকাশ সবসময় ঘটে না। হঠাৎ করে সংঘটিত হয়। কয়েক বছর আগেও হেলমেট বাহিনী কিংবা হাতুড়িপেটা খবরের শিরোনাম ছিল না। এই সরকারের শাসনামলেই হেলমেট বাহিনী ও হাতুড়িপেটার সৃষ্টি হয়। মানুষকে হত্যা করা কিংবা খুন করার ইতিহাস বেশ পুরনো; কিন্তু হাতুড়িপেটার ঘটনা নতুন। গুম, খুন, অপহরণের সাথে হাতুড়িপেটা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কেন বাড়ছে! এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে বিচারহীনতা সংস্কৃতি চর্চার ফলে কিছু মানুষের ভেতরে হতাশা বাড়ছে। মানুষ বেপরোয়া হচ্ছে। হাতুড়িপেটার সংস্কৃতি কারো জন্য মঙ্গলজনক নয়। চিরদিন কারো সমান নাহি যায়। নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা নি¤œরূপÑ
গত ৩ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে প্রকাশ্যে ঠিকাদার শহিদুর রহমানকে এলজিইডি কার্যালয়ের সামনে হাতুড়িপেটা করা হয়। ঠিকাদারি কাজের দরপত্র বিরোধে এই ন্যক্কারজনক হামলার শিকার হন শহিদুর। এ ঘটনার জন্য তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে দায়ী করেন।
গত ২ জুলাই ২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে শিক্ষার্থীরা পতাকা মিছিল বের করলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রামদা, লোহার রড, হাতুড়ি দিয়ে হামলা করে। এ মিছিলে শিক্ষার্থী তরিকুলকে লাঠি ও হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হয়। পিটুনির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। তাতে দেখা যায় একজন এসে তার কোমরে হাতুড়ি দিয়ে মারছে।
১৯ জানুয়ারি ২০২০ শরীয়তপুর কলেজে জুনিয়র সিনিয়র নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ছাত্রলীগের কলেজ শাখার সভাপতি মেহেদী হাসান ও তার সহপাঠীরা মিলে একাদশ শ্রেণীর ছাত্র দাউদ ইব্রাহিমকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আহত করে।
২৫ এপ্রিল ২০২১ সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেনের নির্দেশে সাংবাদিক সাদ্দাম হোসেনকে হাতুড়িপেটা করার অভিযোগ ওঠে। সাদ্দাম ভোরের দর্পণ পত্রিকার সুনামগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চল প্রতিনিধি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণজাগরণ সবসময় ঘটে না। মাঝে মধ্যে সংঘটিত হয়। যখন হয় তখন নতুন ইতিহাসের অধ্যায় রচিত হয়। গেল কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দু’টি আন্দোলন গড়ে ওঠে। একটি কোটা সংস্কার আন্দোলন। অপরটি নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। দু’টি আন্দোলনই ছিল অরাজনৈতিক। অথচ রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে দু’টি আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর নিপীড়নের খড়গ প্রয়োগ করা হয়। ২০১৮ সালের এপ্রিলে ১০ দফা দাবি নিয়ে শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তায় তখন এ আন্দোলন দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সৃষ্টি হয় হেলমেট বাহিনী ও হাতুড়ি বাহিনীর নিষ্ঠুর নিপীড়ন।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলন কিংবা কোটা সংস্কার আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক ইস্যু ছিল না। শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব এবং একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী দিয়া খানম মিম বাসচাপায় নিহত হলে শিক্ষার্থীরা ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর রোডে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবি নিয়ে রাস্তায় নামে। তারা সপ্তাহব্যাপী অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করে। এটি নেতাবিহীন একটি আন্দোলন ছিল। তারা রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনা চোখে আঙুল দিয়ে দেশবাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে এ আন্দোলন লিপিব্ধ হয়ে থাকবে।
কারণ এ আন্দোলন রাষ্ট্রের দানবীয় চেহারাটার মুখোশ কত ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর ও অমানবিক হতে পারে তা জাতির সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে। তারা ক্ষমতার পতন কিংবা কাউকে ক্ষমতার বসানোর জন্য আন্দোলন করেনি। তারা ঘাতক বাসচালকের বিচার চেয়েছিল। আইনের চোখে সবাই সমান। সবার ক্ষেত্রে আইন সমানভাবে প্রযোজ্য। যারা অপরাধ করবে তাদেরকে আইনে আওতায় আনার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব বন্ধ না হলে হাতুড়িপেটার সংস্কৃতি যেমন বন্ধ হবে না, তেমনিভাবে মানুষ বিচার ব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়বে। হ

 



আরো সংবাদ