১৯ অক্টোবর ২০২১, ৩ কার্তিক ১৪২৮, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

গুম বিষয়ে সরব ইমরান খানের আশ্চর্যজনক নীরবতা

-

সচল, তিন বছরের এক পাকিস্তানি শিশু। সম্প্রতি সে তার দাদীর সাথে ইসলামাবাদের একটি আদালতের বাইরে বসে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছে। সে তার বাবার খবর শোনার জন্য অপেক্ষা করছিল, যাকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে যখন তার বয়স মাত্র কয়েক মাস। ২০১৮ সালে আগস্ট মাসে যখন পরিবার ছুটি কাটাচ্ছিল, তখন সচলের বাবা সাংবাদিক ও কবি মুদাসসির নারু হঠাৎ গায়েব হয়ে যান। এরপর থেকে আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। সচলের মা সাদাফ, যিনি গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের খোঁজ পেতে সাহসী নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দৃঢ় সন্ধান চালিয়েছেন, তিনি গত জুন মাসে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। বিগত তিন বছরের অসহনীয় যন্ত্রণা তার মারাত্মক হার্ট অ্যাটাকে ভূমিকা রাখে। দুঃখের বিষয়, জোরপূর্বক গুম করে ফেলা, যার দ্বারা মানুষকে তার প্রিয়জনদের থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়, এটা পাকিস্তানে নতুন নয়। এই অন্যায়ের শেকড়ের গোড়া সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের শাসনকাল। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজনকে গ্রেফতার না করে অপহরণ করে আইনের বেষ্টনীর বাইরে রাখা হয়। মোশাররফ ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে এই ধারার সূচনা করেন। আজ তার বিপরীতে, নারুর মতো লোকেরা ফেসবুকে ২০১৮ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট করার পর গুম হয়ে যান। মোশাররফের সময় গুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠের কয়েকজন রাজনীতিবিদের অন্যতম ছিলেন ইমরান খান, যিনি এখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।
সে সময় ইমরান খান পার্লামেন্টে তার দলের একমাত্র সদস্য ছিলেন। ইমরান খান তার Pakistan : A Personal History নামের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে গর্বের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, তার নেতৃত্বে পার্লামেন্টের বাইরে (২০০৩ সালে) গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারকে নিয়ে প্রথম বিক্ষোভ করা হয়। খান বিশেষ অতিথি হিসেবে জিও টিভির টকশো ক্যাপিটাল টকে এসেছিলেন, যার উপস্থাপনা থেকে এখন আমাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি প্রমাণ ছাড়া মানুষকে অপহরণের জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমালোচনা করেছেন।
আমার অনুষ্ঠানে ইমরান খানের উপস্থিতি মোশাররফের রাগ বাড়িয়ে দেয়। একদিন তৎকালীন একনায়ক আমাকে তার বাসভবনে ডেকে নেন। তিনি আমাকে বলেন, আপনি প্রতি দ্বিতীয় দিনে এই পাগলা খেলোয়াড়কে আমন্ত্রণ জানান। তিনি সন্ত্রাসবাদে জড়িত অভিযুক্ত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সমর্থনে কথা বলেন। তাকে আর আমন্ত্রণ জানাবেন না; কিন্তু আমি মোশাররফের আদেশ অগ্রাহ্য করি। একদিন পার্লামেন্টের বাইরে এক বিক্ষোভ অনুষ্ঠানে ইমরান খান আমিনা মাসউদ জাঞ্জুয়ার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ব্যবসায়ী মাসউদ জাঞ্জুয়ার স্ত্রী, যাকে ২০০৫ সালে অপহরণ করা হয়েছে। আমার পরিচিত সাহসী লোকদের মধ্যে আমিনাও রয়েছেন। স্বামীকে শেষ দেখার পর ১৬ বছর ধরে তিনি নির্ভয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি একবার খানের সাথে আমার শোতে অংশ নিয়েছিলেন। ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গত তিন বছর ধরে তিনি তার সাক্ষাতের জন্য ধরনা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি তাকে এবং অন্যান্য স্ত্রী, মা, বোন ও মেয়েকে দেয়া ইমরান খানের প্রতিশ্রুতিগুলো, যারা তাদের প্রিয়জনের কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চান। হাজার হাজার মানুষ ইমরান খানের দিকে আশা নিয়ে তাকিয়েছিল। তাদের অন্যতম শাম্মি বালুচ। তার বাবা মুহাম্মাদ বালুচ, যাকে ২০০৯ সালে নিরাপত্তাবাহিনী অপহরণ করে নিয়ে গেছে। শাম্মির বয়স তখন মাত্র ১১ বছর। তিনি প্রতিবাদ করতে ২০১০ সালে প্রথম ইসলামাবাদে আসেন। চার বছর পর, তিনি অন্যান্য নিখোঁজ হওয়া পরিবারের সাথে নিজ প্রদেশ বালুচিস্তান থেকে এক হাজার ৬০০ মাইল পথ পাড়ি দেন। তবে কোনো জবাব ছাড়াই তাকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি চলতি বছর মার্চ মাসে আবার চেষ্টা করেছিলেন। আশা করেছিলেন, খানের সরকার অন্যরকম হবে। তিনি আমাকে বলেন, ইমরান খান সর্বদা আপনার শোতে দাবি করেছিলেন, ‘তিনি জোরপূর্বক গুম হওয়ার ধারার অবসান ঘটাবেন। তাকে তার কথা স্মরণ করিয়ে দেবো এবং সাহায্যের জন্য আবেদন করব।’ তিনি খানের সাথে দেখাও করেছেন, তবে ফিরে এসেছেন বাবাকে ছাড়া। যারা গুম হয়েছেন, তাদের পরিবারগুলোর বেশির ভাগই বেলুচিস্তান, সিন্ধু ও খায়বার পাখতুনখাওয়াতে বিক্ষোভ করছে। বেলুচ পরিবারগুলো চার হাজার দিনেরও বেশি দিন ধরে কোয়েটা প্রেস ক্লাবের বাইরে বসে আছে। সিন্ধি পরিবারগুলো করাচি প্রেস ক্লাবের বাইরে বেশ কিছুদিন ধরে অনশন কর্মসূচিতে রয়েছে। তারা উপস্থিত হয়েছে এমন সব স্থানে, যেখানে সবাই তাদের দেখতে পাবে। কিন্তু হাতেগোনা কিছু লোকই শুধু তাদের কথা শোনার জন্য থেমেছে।
বেলুচিস্তান ন্যাশনাল পার্টির (বিএনপি-এম) সভাপতি আখতার মেঙ্গলের মতো রাজনীতিবিদরা ২০১৮ সালে ইমরান খানের সরকারকে সমর্থন করেন এবং পার্লামেন্টে শুধু বেলুচিস্তান থেকেই নিখোঁজ পাঁচ হাজার ১২৮ জনের একটি তালিকা তুলে ধরেছিলেন। মেঙ্গল ২০২০ সালে খানের প্রতি তার সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন। তিনি আমাকে বলেছেন, এই তিন বছরে নিখোঁজ পাঁচ হাজার ১২৮ জনের মধ্যে মাত্র ৪৫০ জন ফিরে এসেছেন এবং এই সময়ে আরো এক হাজার ৫০০ জন নিখোঁজ হয়েছেন। পাকিস্তানে একমাত্র সত্য ও ন্যায়বিচার দ্বারা জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়ার এই উন্মুক্ত ক্ষত সারানো সম্ভব।
পাকিস্তানি মহিলাদের বিক্ষোভগুলো ল্যাটিন আমেরিকায় অনুরূপ দুঃখভোগীদের তাদের সেই আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়, যারা অতীতে স্বৈরাচারী শাসক কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। ট্র্রুুথ কমিশনগুলো তাদের কিছু ব্যক্তি সম্পর্কে খোঁজ পেতে সহায়তা করেছে। ল্যাটিন আমেরিকার অনেক রাষ্ট্র জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে পাকিস্তানের কাছে আবেদন করেছে, তারা যেন ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং বলপ্রয়োগপূর্বক গুম করার নিষ্ঠুর অনুশীলন বন্ধ করে। জোরপূর্বক গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সম্পর্কে তদন্তের জন্য একটি কমিশন ২০১১ সাল থেকে পাকিস্তানে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তার খুব একটা প্রভাব পড়েনি। ইন্টারন্যাশন্যাল কমিশন অব জুরিস্টস (আইসিজে) গত বছর এই তদন্ত কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছিল।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তান সরকার সম্প্রতি গুম হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে একটি বিল উত্থাপন করেছে। এটি ভালো পদক্ষেপ, তবে এটাই যথেষ্ট নয়। আইন যখন কার্যকর হয় না, তখন এটাকে তুচ্ছ মনে হয়। সচল, আমিনা ও শাম্মির মতো পাকিস্তানিদের সত্যটা জানা দরকার যে, তাদের প্রিয়জনদের সাথে কী ঘটেছে? তদুপরি প্রতিটি পাকিস্তানির এই নিশ্চয়তা থাকা দরকার যে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে নয়। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান যখন ক্ষমতার বাইরে ছিলেন, তখন তিনি এই নীতিগুলোর পক্ষে ছিলেন। তাকে তার নিজেরই কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়া দরকার।
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট



আরো সংবাদ