১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৩ আশ্বিন ১৪২৮, ১০ সফর ১৪৪৩ হিজরি
`

কঠিন বর্জ্য : পরিবেশ ধ্বংসের প্রধান কারণ

-

মানব সভ্যতা উন্নয়নের সাথে মানবজাতির যত উপকার সাধন হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সমস্যাও তত প্রকট হয়ে উঠেছে। আজকের পৃথিবীতে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকৃতিকে জীবের বসবাসযোগ্য রাখা। বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে বর্জ্যরে পরিমাণও মাত্রাতিরিক্ত বাড়ছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও একই চিত্র। প্রতিনিয়ত জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্বের সাথে বর্জ্যরে উৎপাদন হচ্ছে অধিকহারে। যার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য নিয়ন্ত্রকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি বছর মাথাপিছু ১৫০ কিলোগ্রাম এবং সর্বমোট ২২.৪ মিলিয়ন টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০২৫ সাল নাগাদ মাথাপিছু বর্জ্য সৃষ্টির হার হবে ২২০ কিলোগ্রাম এবং সর্বমোট বর্জ্যরে পরিমাণ ৪৭ হাজার ৬৪ টনে গিয়ে দাঁড়াবে, যা পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। বর্জ্য বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। কঠিন, তরল, বায়বীয়। কঠিন বর্জ্যরে পরিমাণই বেশি। মানুষের ব্যবহার্য জিনিসপত্র যখন অকেজো অথবা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে তখন এগুলো কঠিন বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। উৎস অনুসারে কঠিন বর্জ্য বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। গৃহস্থালি বর্জ্য, শিল্প কারখানার বর্জ্য, শহরাঞ্চলের বর্জ্য, হাসপাতালে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি, বিপজ্জনক বর্জ্য, কৃষি বর্জ্য ও প্লাস্টিক উল্লেখযোগ্য। যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিনিয়ত পরিবেশের উপাদান ও বসবাসরত জীবের ক্ষতি হচ্ছে। পরিবেশের প্রধান তিনটি উপাদান হচ্ছে মাটি, পানি ও বায়ু। কঠিন বর্জ্যরে কারণে পরিবেশের এ সবগুলো উপাদান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষ যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলে রাখে যার বেশির ভাগই কঠিন বর্জ্য। এগুলো মাটির সাথে মিশে মাটিতে বসবাসরত অণুজীবকে ক্ষতিগ্রস্ত করে মাটির অম্লত্ব ক্ষারকত্ব হ্রাস বৃদ্ধি করে এবং কৃষিজমির ক্ষতিসাধন করে ও এর বন্ধন দুর্বল করে দেয়। আর এই বর্জ্যপদার্থ চুইয়ে গিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষতিসাধন করে। এ ছাড়া বৃষ্টির সময় এসব বর্জ্য খাল-বিল-নদী-নালার পানির সাথে মিশে গিয়ে পানি দূষণ করে। এতে মানুষ, জলজপ্রাণী রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে বাতাস দূষিত করে। এ ছাড়া মিথেন কার্বন-ডাই-অক্সাইড ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস বায়ুতে মিশে বায়ু দূষণ করে। কঠিন বর্জ্যরে সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে শহরাঞ্চলের বর্জ্য। শহরের বর্জ্যগুলো বাসাবাড়ি, হাসপাতাল, কলকারখানা ইত্যাদি থেকে উৎপন্ন হয়। রান্নাঘরের বর্জ্য থেকে শুরু করে পরিধেয়, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, প্লাস্টিক, কাগজ, ব্যাটারিসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর বর্জ্যও উৎপন্ন হয়।
দেশের অধিকাংশ পৌর এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেকেলে। রাস্তার পাশে ডাস্টবিনগুলো ময়লা আবর্জনায় উপচানো থাকে। তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। পরিবেশ নোংরা হয়ে থাকে। পৌর কর্তৃপক্ষ সেখান থেকে ময়লা সরিয়ে শহরের আশপাশের খাল বা খানাখন্দে ফেলে রাখে। সেখান থেকে নতুন করে আরো বিশদ আকারে জীবাণু ও দুর্গন্ধ ছড়ায়। শহরের কল-কারখানাগুলো থেকে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয়বহুল বলে অনেক প্রতিষ্ঠান এগুলো মুক্তভাবে শহরের খাল-বিল নদী-নালায় ফেলে দেয়। এগুলোর মধ্যে কাপড়ের রঙ, চামড়া শিল্পে উৎপন্নবর্জ্য, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, কলকব্জা এসব উল্লেখযোগ্য। সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে উৎপন্ন চামড়ার উচ্ছিষ্ট, ঝিল্লিসহ কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো পদক্ষেপ এখনো সম্পূর্ণরূপে গৃহীত হয়নি। আসন্ন কোরবানির ঈদে এ ধরনের বর্জ্যরে পরিমাণ আরো বাড়বে। এ ছাড়া কোরবানির পশুর রক্ত, মল, খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ যত্রতত্র ফেলে রাখলে পানি বায়ু দূষিত হবে। বর্তমান সময়ে শহরগুলোতে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ অধিকহারে চলছে। এ কাজের প্রয়োজনীয় উপাদান ইট, বালু, সিমেন্ট ইত্যাদি রাস্তাঘাটে রেখে রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়। এসব থেকে উৎপন্ন বর্জ্যগুলোর ব্যবস্থাপনার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। দেখা যায়, কাজ শেষে ময়লার ভাগাড়ে এসব ইট, বালু, নুড়ির স্তূপ পড়ে থাকে। এগুলো শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা নষ্ট করে। ফলে শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। শহরবাসী সম্মুখীন হয় কৃত্রিম বন্যার। এতে করে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ কর্মজীবন ব্যাহত হয়। হাসপাতালগুলোতেও কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। ব্যবহৃত ওষুধের প্যাকেট, সুচ, সিরিঞ্জ, ছুরি-কাঁচি ইত্যাদি বর্জ্য বিপজ্জনক এবং কিছু ক্ষেত্রে সংক্রামক রোগের বাহকও বটে। তাই এসব বর্জ্য ঢাকনাসহ বাক্সে রেখে আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা করা উচিত। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে মেডিক্যাল বর্জ্যে নতুন কিছু উপাদান সংযোজিত হয়েছে যেমন মাস্ক, পিপিই, টেস্ট কিট ইত্যাদি।
এসব বর্জ্য ব্যবহারের পর যেখানে সেখানে ফেলা উচিত নয়। কারণ এগুলোর দ্বারা সুস্থ মানুষ আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তা ছাড়া পিপিই প্লাস্টিক হওয়ায় সহজে নষ্ট হয় না। যথাসম্ভব এগুলো পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু মানুষ অসচেতনভাবে যেখানে সেখানে এসব বর্জ্য ফেলছে এবং কফ থুথু ফেলে পরিবেশকে দূষিত করে সংক্রমণ বাড়াচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে কৃষিবর্জ্যও কঠিন বর্জ্যরে অন্তর্ভুক্ত। কৃষি জমিতে ব্যবহৃত সার, কীটনাশক এগুলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। অধিকহারে পেস্টিসাইড ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব খাদ্য শৃঙ্খলে ঢুকে পড়ছে। কৃষিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন গৃহপালিত পশুর থেকেও কঠিন বর্জ্য সৃষ্টি হয়। একটি গরু দৈনিক প্রায় ১২-১৫ কেজি, ছাগল ও ভেড়া ১.৫-২ কেজি, লেয়ার ১০০-১৫০ গ্রাম, ব্রয়লার ১০০-২০০ গ্রাম বর্জ্য উৎপন্ন করে থাকে। বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব ও গ্রিনহাউজ গ্যাস উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে এই বর্জ্য। এ বর্জ্য থেকে উৎপন্ন দুর্গন্ধ মানুষ ও পশুপাখির বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যেমনÑ অস্থি সমস্যা, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি। ক্ষতিকর গ্যাসগুলোর মাত্রাতিরিক্ত সেবন মানুষ ও পশুপাখির মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিপুল পরিমাণ গোবর কৃষিজমিতে প্রয়োগ করার ফলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রবেশ করছে, যা পানি দূষণ ও জনগণের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। পশুসম্পদ বর্জ্য থেকে উৎপাদিত মিথেন বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য ১৫ শতাংশ দায়ী। একটি গবাদিপশু বছরে প্রায় ৭০-১২০ কেজি মিথেন নির্গমন করে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে মিথেন, কার্বন-ডাই অক্সাইড থেকে ২৩ গুণ বেশি দায়ী। কঠিন বর্জ্যরে মধ্যে বেশ কিছু বিপজ্জনক বর্জ্য রয়েছে এর মধ্যে ইলেকট্রনিক বর্জ্য ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য প্রধান। এ বর্জ্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সায়ানাইড বর্জ্য, অ্যাসবেস্টস, রাসায়নিক, বিভিন্ন ধরনের রঞ্জক, ভারী ধাতু ইত্যাদি। এ ধরনের বর্জ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য বিষাক্ত, ক্ষয়কারী, বিস্ফোরক হিসেবে অত্যন্ত সক্রিয়। আর্সেনিক ধাতু পানিতে মিশে আর্সেনিকোসিস, ক্যাডমিয়ামের প্রভাবে ইটাই ইটাই রোগ হয়। জাপানের মিনামাতা উপসাগরের কাছে পারদ ব্যবহার করে পারদটি উপসাগরে ফেলে দেয়া হতো যা মাছের টিস্যুতে প্রবেশ করত। সে অঞ্চলের লোকদের মিনামাটা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি রোগ যেমন হাঁপানি, জন্মগত ত্রুটি, ক্যান্সার, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, শৈশব ক্যান্সার, সিওপিডি, সংক্রামক ব্যাধি, কম জন্মের ওজন এবং প্রাকপ্রসবের মতো রোগের জন্ম দিতে পারে। মাছির দ্বারা পানি এবং খাদ্য দূষণের ফলে আমাশয়, ডায়রিয়া এবং অ্যামিবিক আমাশয় হয়। সংক্রামক রোগ প্লেগ, সালমোনেলোসিস, ট্রাইচিনোসিস, এন্ডেমিক টাইফাস ইত্যাদির মতো রোগ ছড়াতে পারে। শক্ত বর্জ্য দ্বারা ড্রেন ও গলির খাঁজগুলো জলাবদ্ধতার ফলে মশার প্রজননকে সহায়তা করে এবং ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু রোগ ছড়িয়ে পড়ে। কঠিন বর্জ্য প্লাস্টিক, পলিথিন ইত্যাদি পরিবেশের অনেক ক্ষতিসাধন করে।
প্লাস্টিক হলো ইথিলিনের পলিমার। সাধারণত এ ধরনের দ্রব্য ভাঙতে প্রকৃতির অনেক সময় লেগে যায় তাই এগুলো সহজে পরিবেশের উপাদানের সাথে মিশে না। সামুদ্রিক এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মতো কিছু বাস্তুতন্ত্রগুলো প্লাস্টিক দ্বারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এটি মাছ, সিল, কচ্ছপ, তিমি এবং অন্যান্য অনেক জলজপ্রাণীকে প্রভাবিত করে। সামুদ্রিক প্রাণীগুলো প্লাস্টিকের সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং অনেক সময় খেয়ে ফেলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। কারণ জলজপ্রাণী এটি পরিপাক করতে পারে না। কিছু প্রজাতির পাকস্থলীতে যে পরিমাণ পদার্থ খাওয়া হয় তা ভেঙে ফেলার জন্য উচ্চতর অম্লীয় মাত্রা থাকে না। তবে কিছু প্রাণী রয়েছে যারা প্লাস্টিকের টুকরা ১০০ বছর ধরে রাখতে সক্ষম। যখন জীববৈচিত্র্যের কথা আসে আমাদের বর্জ্য সমস্যাটি বিশ্বের প্রজাতির স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে জর্জরিত করে। কঠিন বর্জ্য স্যাঁতসেঁতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পরিবেশকল্পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে নষ্ট করছে। বিশ্ব পরিবেশের সাথে সাথে বাংলাদেশেও গত কয়েক দশকে অবনতি দ্রুত গতিতে চলছে। আমরা যেভাবে বর্জ্য নিষ্পত্তি করি তা হতাশাব্যঞ্জক। একমাত্র এই দশকে বর্র্জ্য নিষ্পত্তি আরো বেশি গাফিল হয়ে পড়েছে। আমাদের চারপাশের পরিবেশের এ বিপর্যয়ের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে বায়ু দূষণ। বায়ু দূষণের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। পৃথিবীর ৯১ শতাংশ মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করে যেখানে বায়ু দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি। বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন দূষিত বায়ু সেবন করে। আমাদের দেশে বায়ু দূষণের বড় কারণ সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব। জলবায়ু পরিবর্তন হয়ে বেড়ে গেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বাংলাদেশে ২২ শতাংশ মানুষ বাতাসে ভাসমান বস্তুকণা ও ৩০ শতাংশ মানুষ জ্বালানি সংশ্লিষ্ট দূষণের শিকার। প্রকৃতির জীববৈচিত্র্য ও ভারসাম্য রক্ষার্থে এখনি সবাইকে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। হ
লেখক : শিক্ষার্থী।
ইমেইল : রভধঃধৎধংযঁপযব৩৩১৫৯@মসধরষ.পড়স


সেনা প্রত্যাহার ভুলÑ বুশের বিলাপ
মো: বজলুর রশীদ
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ গত ১৪ জুলাই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সমালোচনা করেছেন। আমেরিকা ও ন্যাটো সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে নারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘ডয়চে ভেলে’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে বাইডেন প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ আখ্যা দিয়েছেন।
টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে সেনা পাঠায় বুশ প্রশাসন। আজ দুই দশক পর সেখান থেকে সব সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। একে ভুল হিসেবে অভিহিত করে বুশ বলেন, ‘আফগান নারী ও মেয়েরা যে অবর্ণনীয় ক্ষতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তাতে আমি ভীত।’ তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিদেশী সেনাদের সাথে কাজ করা আফগান অনুবাদকদের নিয়ে। ‘তাদেরকে এসব নিষ্ঠুর তালেবানদের হাতে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, যা আমার হৃদয়কে ভেঙে দিচ্ছে।’ এটিও সত্যি যে, সোহেইল পারদিস নামে এক আফগানকে মার্কিন সেনাবাহিনীর পক্ষে দোভাষীর কাজ করায় বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে কিছু দিন আগে তালেবানরা শিরñেদ করেছে।
বুশের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কাবুলভিত্তিক ডয়চে ভেলের সাংবাদিক আলী লতিফি বলেন, ‘এটি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার যে, তিনি হঠাৎ আফগান নারী ও শিশুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন, যেখানে তার লাগিয়ে দেয়া যুদ্ধ অনেককে বিধবা ও অনেক শিশুকে এতিমে পরিণত করেছে।’
রিপাবলিকান মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০১ সালের শরতে আফগানিস্তানে সেনাবহর পাঠানোর সময় দম্ভ করে বলেছিলেন, শত্রুদের নিঃশেষ করা এক সপ্তাহের কাজ। ২০ বছর পর তিনিই বলছেন, আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি। ফক্স নিউজ বলেছে, ‘বুশ এখন বিলাপ করছেন’।
জো বাইডেনের সেনা প্রত্যাহার ঘোষণায় এরই মধ্যে ৯৫ শতাংশ মার্কিন সেনা আফগানিস্তান ছেড়েছে। তিনি এক দশক আগ থেকেই আফগান যুদ্ধকে আমেরিকার জন্য ‘বোঝা’ মনে করতেন। তিনি ক’দিন আগে বলেছেন, ‘আফগানিস্তানের ভাগ্যনির্ধারণ আফগানদের হাতেই।’ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, তা হলে কেন এই দুই দশকের দখলদারিত্ব? এখন আফগান সরকারি সেনারা দেশ রক্ষার কাজে আর তালেবানরা তাদের প্রতিপক্ষ। একধরনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে আফগানিস্তানে; কিছুটা ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন, লিবিয়া, মালি, সুদান বা সিরিয়ার মতো। রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর ৩০ বছরের যুদ্ধের চেয়েও ভয়ঙ্কর হতে পারে এ গৃহযুদ্ধ।
আফগানিস্তানের সাধারণ লোকজন দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন পাকিস্তান, ইরান, তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্তান সীমান্তের দিকে। অনেক দেশ তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। সরকারের পক্ষে কাজ করেছে এমন ৫০ হাজার আফগান প্রাণের ভয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আবেদন করেছে। দেশের ভেতর ও বাইরে হাজার হাজার উদ্বাস্তু, যারা অনেকেই কোভিড-১৯ অতিমারীর টিকা পায়নি। ক্ষুধা, পানীয় জল, রোগবালাই নিয়ে লাখ লাখ আফগান দুর্বোধ্য ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের এই নরক যন্ত্রণায় ছুড়ে ফেলার জন্য কারা দায়ী?
বুশের আফগান নারীদের অসহায়ত্বের বিষয়টি ফার্স্ট লেডি লরা বুশও সমর্থন করেছিলেন। রেডিও ভাষণে তিনি বলেন, ‘নখে পলিশ নাগানোর কারণে নখ উপড়ে ফেলার কাজ শুধু টেররিস্ট ও তালেবানরাই করতে পারে।’ তবে এ তথ্যের সত্যতা নিয়ে তখন ব্যাপক কথাবার্তা হয়েছে। লরা বুশের সাথে চেরি ব্লেয়ার, তৎকালীন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ারের স্ত্রী, আফগান মহিলাদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের সুখ-দুঃখ ব্রিটিশ পত্রিকায় তুলে ধরবেন বলে অঙ্গীকার করেছিলেন। আফগান মহিলাদের প্রতি হঠাৎ করে বুশ প্রশাসনের এমন মনোভাবের বিষয়ে আমেরিকার পত্রপত্রিকা ব্যাপক প্রতিবেদন ছাপায়। যেমনÑ ‘বুশের নারী জাগরণ ফাঁকা বুলি’ নিউ ইয়র্ক টাইমস। সেখানে প্রশ্ন করা হয়, এসব জাগরণ তেলসমৃদ্ধ দেশের নারীদের বেলায় নয় কেন? অভিযোগ আছে, বুশ ক্ষমতায় থাকাকালে তেলের ব্যবসায় সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং সাদ্দামকে কম দামে তেল সরবরাহের জন্য চাপ দেন। সমালোচকরা আরো বলেন, সৌদি নারীরা ড্রাইভিং করলে কী দোষ? আমেরিকার নারীরা তো হরদম গাড়ি চালাচ্ছে। বুশ প্রশাসন কেন শুধু আফগানিস্তানে নজর দিচ্ছে বোরকা ও নেলপলিশ ইস্যু নিয়ে?
তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি, সেক্রেটারি অব ডিফেন্স রামসফেল্ডসহ সবাই আফগান মহিলাদের নিয়ে কথা বলতে থাকেন। তৎকালীন সেক্রেটারি অব স্টেট কলিন পাওয়েল বলেছিলেন, ‘আফগানিস্তানকে রক্ষা করা মানে, আফগান মহিলাদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া।’ লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস পত্রিকার মেরি ম্যাকনামারা প্রশ্ন তোলেন, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মহিলাদের অধিকার কেন আসবে?’ তালেবানদের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, আমেরিকার দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহু আফগান মহিলা সোচ্চার ছিল যে, তারা দুই দশক ধরে পশ্চিমাদের হাতে বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হয়েছে।’ মনে হয়, ধর্মীয় মনোভাবসম্পন্ন মহিলা সমাজকে পাশ্চাত্য সভ্যতার সংস্কৃতিতে দীক্ষিত করতে চেয়েছে পশ্চিমা জোট।
আমেরিকার মুসলিম নারী নেতৃত্ব ও স্কলাররা পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করছেন। মুসলিম নারী লিগের লায়লা আল মারিয়াতি ও সিমিন ঈসা বলেন, ‘আফগান মহিলাদের বোরকা ও হিজাব নিয়ে টানাটানি বড় বিষয় নয়। তাদের মৌলিক আরো সমস্যা আছে; যেমনÑ সন্তানদের দুবেলা খাবার, লেখাপড়া করে শিক্ষিত হওয়া, দাঙ্গা-হাঙ্গামা থেকে মুক্ত রাখা; এসব নিয়ে কেন কেউ কথা বলছে না?’ শিক্ষিত আফগান মহিলা জোহরা ইউসুফ দাউদ, যিনি ১৯৭৩ সালে ‘মিস আফগানিস্তান’, নিউ ইয়র্কের কনফারেন্সে দাবি করেন, ‘তোমাদের বিকিনি নয়, আমরা তোমাদের গণতন্ত্র চাই।’ ইউএসএ টুডে পত্রিকায় বিশ্লেষণ করা হয় যে, আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত কাবুল প্রশাসন মহিলাদের অশিক্ষা ও বেকারত্ব দূর করতে কিছুই করতে পারছে না। আফগান নারীবিষয়ক মন্ত্রী সীমা সামার বলেন, ‘মনে হচ্ছে মহিলাদের সব দোষ যেন বোরকা।’
দুই দশকের যুদ্ধে আফগান মহিলারা দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়ে পড়েছে, স্বাস্থ্য চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিশ্বে শিশুমৃত্যুর হার ও মাতৃমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি আফগানিস্তানে। পশ্চিমা এক হিসাবে জানা যায়, ২০ হাজার সার্ভিসম্যান যুদ্ধে আহত হয়েছে, ৪০ হাজার বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। হাজার হাজার আফগান মহিলা প্রতি বছর প্রসবজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করছে, অথচ সাধারণ চিকিৎসায় তারা বাঁচতে পারত। ২০১৬-২০ সময়ে এক হাজার শিশু সে দেশে বোমাবর্ষণে মারা গেছে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২০ শতাংশ মহিলা, ক্যান্সারে ৯ শতাংশ, ডায়াবেটিসে ৩ শতাংশ মহিলা মৃত্যুবরণ করছে। এই হলো নারী ও শিশুদের জন্য হাহাকার করার নমুনা। আরেক হিসাবে দেখা যায়, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যাপক খরচের হাত। যেমনÑ ২০০১ সালে আফগান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মারা গেছেন এক লাখ ৭২ হাজার ৩৯০ জন। যুদ্ধে আফগানিস্তানের সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর প্রায় ৬৬ হাজার সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন, সাধারণ নাগরিক মরেছে ৪৭ হাজার ২৪৫ জন, তালেবান ও অন্যান্য বিরোধী যোদ্ধা মারা গেছেন ৫১ হাজার ১৯১ জন। যুদ্ধে ত্রাণকর্মী ৪৪৪ জন ও সাংবাদিক ৭২ জন মারা গেছেন।
যুদ্ধ করতে ২০২০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় এটি প্রায় ১৬৯ লাখ ৫৪ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। যুদ্ধে খরচের জন্য দুই ট্রিলিয়ন ডলার জোগাড় করতে যে ঋণ নেয়া হয়েছে তার সুদ হিসেবে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯২৫ বিলিয়ন ডলার দেয়া হয়েছে। ২০৩০ সালে এ সুদের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে, যা যুদ্ধের খরচের সমপরিমাণ। খরচ সেখানেই শেষ হচ্ছে না। ২০৫০ সাল নাগাদ সুদের পরিমাণ হতে পারে সাড়ে ছয় ট্রিলিয়ন ডলার। যুদ্ধ শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের খরচ শেষ হচ্ছে না। যুদ্ধে অংশ নেয়া প্রায় ৪০ লাখ সেনাকে আজীবন দেখভাল করতে হবে, এতে প্রায় ১.৬ থেকে ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে বলে জানিয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।
প্রসঙ্গত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ২০০৩ সালে ইরাকে আক্রমণ চালিয়ে সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দেন। ১৩ বছর পর ২০১৬ সালে ব্লেয়ার সিএনএনকে এক সাক্ষাৎকারে দুঃখ প্রকাশ করেন। বলেন, ভুল হয়ে গেছে। আমাদের ভুলের জন্য কিছু লোক (লাখ লাখ) অযথাই মারা গেছে। স্যার জন চিলকোটের নেতৃত্বে ইরাক যুদ্ধের তদন্ত হয়, তাও সাত বছর লাগে। কমিশন ব্লেয়ারকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। কমিশন ঘোষণা দেয়, সাদ্দামের কাছে কোনো জীবাণু অস্ত্র বা ব্যাপক জীবন বিধ্বংসী অস্ত্র ছিল না। চিলকোট কমিশন বুশ ও ব্লেয়ার দু’জনকেই যুদ্ধাপরাধী ঘোষণা দেয় এবং বিচারের সম্মুখীন করার পক্ষে মতপ্রকাশ করে। বুশ কোনো মন্তব্য না করে চুপ থাকেন; ব্লেয়ার প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। এতে কি কোনো অপরাধ মওকুফ হয়ে যাবে? কলিন পাওয়েলের চিঠি ফাঁস হওয়ায় জানা যায়, ২০০২ সালেই বুশ-ব্লেয়ার টেক্সাসে ইরাক আক্রমণের চূড়ান্ত রূপরেখা টানেন; অর্থাৎ আফগানিস্তান ও ইরাকে আক্রমণ কোনো হুজুগ ছিল না। বিচারের কথা বলা হলেও তাদের কোনো বিচারের সম্ভাবনা নেই। বুশের মতে, ইরাক আক্রমণ করা হয় গণবিধ্বংসী অস্ত্র বিনাশের জন্য আর আফগানিস্তানে তালেবানদের হাত থেকে মহিলাদের অধিকার রক্ষার জন্য; দুটো বিষয়ই কি ছেলেখেলার মতো নয়? দুটো দেশ ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধবিধস্ত, দুটো দেশেই চলছে গৃহযুদ্ধ। কখন সব কিছু শেষ হয়ে দুটো দেশ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পল ক্রেগ রবার্ট তার এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, “কোনো পাগল বিশ্বাস করবে যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজ জনগণের তোয়াক্কা করছে না। সে অর্ধ বিশ্ব দূরে আফগানিস্তানের ভালোর জন্য রক্ত ও অর্থ ব্যয় করে ‘উন্নয়ন’ ও ‘নারী স্বাধীনতা’র জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।”
আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো জানায়, তালেবানদের সময় কোনো মহিলার সামান্য শরীরের অংশ দেখা গেলেও শাসনের চাবুক এসে পড়ত; তা সত্ত্বেও মহিলারা বোরকা পরে বাজার ঘাটে নিরাপদে যেতে পারত; কেউ উত্ত্যক্ত করার সাহস পেত না। কিন্তু পরে সেসব মহিলা দিনেও বাড়ির বের হলে ধর্ষণের শিকার হতো। তালেবান আমলে নারীরা বেশি নিরাপদ ছিল। বিদেশী সাহায্য কর্মীরা স্বীকার করেন, তালেবান আমলে নারীদের কোনো প্রকার নিপীড়ন করা অসম্ভব ছিল। তা ছাড়া যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে নারী ছাড়াও শিশুদের নিপীড়নের অজস্র উদাহরণ রয়েছে। গা শিউরে ওঠার মতো সেসব ভীতিকর কাহিনী এ লেখার কলেবর বৃদ্ধি করবে।
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে চারটি বিমান হাইজ্যাক করে নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে হামলার দায়ভার আলকায়েদার ওপর পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী পাল্টা আঘাতের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আলকায়েদা আর ওসামা বিন লাদেনকে টার্গেট করার পরিবর্তে বুশ আফগানিস্তান দখল করে ‘নারী জাগরণবান্ধব’ হিসেবে আফগানিস্তানকে গড়তে চেয়েছেন। আক্রমণ শুরু হলে বিন লাদেন ও আলকায়েদা নেতারা দুর্গম তোরাবোরায় আশ্রয় নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যান।
২০০২ সালের শুরুতে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে বুশ আমেরিকানদের প্রচণ্ড ভীতিকর ও বোমা ফাটানো ‘বোগাস’ সংবাদ পরিবেশন করেন। তিনি বলেন, ‘আলকায়েদা যেসব গুহা ব্যবহার করে সেখানে আমাদের সেনারা পরমাণু প্লান্ট ও পরিষ্কার পানির জলাশয় আবিষ্কার করেছে। সিনিয়র সিআইএ ও এফবিআই কর্তারা মিডিয়ায় বিশদভাবে এগুলো ব্যাখ্যা করেন এবং আলকায়েদা কিভাবে আমেরিকার পরমাণু স্থাপনা ও নিরাপত্তার জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে তার বর্ণনা দেন। দুই বছর পর বুশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে, প্রেসিডেন্টের ওই বক্তব্য পুরোপুরি মিথ্যা, আফগানিস্তানে কোনো পরমাণু প্লান্টের ডায়াগ্রাম পাওয়া যায়নি। নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি কমিশনার এডওয়ার্ড ম্যাকগাফিগ্যান বলেন, আসলে বুশের স্পিচ রাইটারের কোনো যোগ্যতা নেই। মানে দোষটা প্রেসিডেন্টের বক্তব্য লেখকের। আফগানিস্তানের পরমাণু ভীতির বোগাস সংবাদটি ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দামের জীবাণু অস্ত্র ও গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ধুয়া তুলতে কাজ করেছে!
ওবামার মার্কিন প্রেসিডেন্ট রূপে অভিষেকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পত্রপত্রিকাগুলো বুশের চরম ব্যর্থতা আর অপকীর্তির ফিরিস্তি দিয়ে নিন্দার তীর ছুড়ে দেয়। ইরাক-আফগানিস্তানে যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা, উদ্বৃত্ত বাজেট থেকে দেশকে ঘাটতিতে নামানো, ঋণের বোঝা চাপানো, ভুল পরিবেশ নীতি আর বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, গুয়ানতানামো বে ও আবু গারিবে মানবাধিকার লঙ্ঘনÑ এসব তালিকায় শীর্ষে রেখেই বুশের ফিরিস্তি লিখেছে পত্রিকাগুলো। তবে সব ইসরাইলি পত্রিকা বুশের একচ্ছত্র প্রশংসার শ্লোক লিখেছে। জেরুসালেম পোস্ট লিখেছে, গত ৬০ বছরে সব মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে ইসরাইলের জন্য বুশের চেয়ে বড় বন্ধু খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
ব্রিটেনের সানডে টাইমস লিখেছে, একটি দেশ আর একটি অর্থনীতিকে ছোবড়া বানিয়ে রেখে গেছেন বুশ। ডেইলি মেইল জানায়, বুশ যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন আমেরিকার বাজেট উদ্বৃত্ত ছিল ১২৮ বিলিয়ন ডলার, তিনি যখন বিদায় নিচ্ছেন তখন ঘাটতি ছিল ৪৮২ বিলিয়ন ডলার! যুক্তরাষ্ট্রের সর্বকালের সবচেয়ে নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থা, বিশ্বকে মহামন্দা-পরবর্তী সবচেয়ে বড় সঙ্কট আর মধ্যপ্রাচ্যকে আগুনের গোলার মধ্যে ফেলে গেছেন তিনি। মুক্ত বাণিজ্য, অভিবাসন সংস্কার ও চীন ইস্যুতে দ্য ইকোনমিস্ট প্রশংসা করলেও সার্বিক মূল্যায়ন ছিল নেতিবাচক। পত্রিকার মতে, সবচেয়ে কম জনপ্রিয় আর জাতিকে সবচেয়ে বেশি বিভক্তকারী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি বিদায় নিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার ভাবমর্যাদায় সবচেয়ে বিপর্যয়কর অবস্থায় ফেলেন তিনি। হ
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার



আরো সংবাদ


কাবুলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে রকেট হামলা (১৬০০২)তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র চাইলেন মাসুদ (১৫৭০৩)মালয়েশিয়ায় স্বদেশীকে অপহরণের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি ৪ বাংলাদেশী (১২৮৭১)মার্কিন সফরে মোদির ঘুম কেড়ে নেয়ার হুঁশিয়ারি শিখ গ্রুপের (১১৩৬১)নতুন ঘোষণা আফগান সেনাপ্রধানের (৯৮৫২)বিমানে হিজাব পরিহিতা দেখেই চিৎকার ‘মুসলিম সন্ত্রাসী’ (৭৩২১)ভারত সীমান্ত থেকে চীনের সেনা সরিয়ে নিতে জয়শঙ্করের হুঁশিয়ারি (৬০৯৮)যাত্রীবেশে উঠে গলা কেটে মোটরসাইকেল ছিনতাই (৬০১৫)রিকসা চালকের তথ্যে নিখোঁজ তিন ছাত্রী উদ্ধার (৫৯১৯)ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনতে চায় সৌদি আরব (৫৬৯১)