২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
`

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিকল্প প্রস্তাব

-

‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’ আজ থেকে প্রায় শত বছর আগে প্রকাশিত ‘শিখা’ পত্রিকার প্রথম পাতায় লেখা থাকত এসব কথা। এটি ছিল সমাজ ও জাতির জন্য নিবেদিতপ্রাণ প্রকৃত গুণীজনদের উপলব্ধি। আর বর্তমান বাংলাদেশের কী অবস্থা! প্রায় দেড় বছর হতে চলল দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ক্লাস নেই, পরীক্ষা নেই। জ্ঞানের দুয়ার বন্ধ। পাবলিক পরীক্ষার সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে অটো পাসের মাধ্যমে। এ এক অকল্পনীয় ব্যাপার।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টানা বন্ধে ঝরে পড়েছে লাখ লাখ শিক্ষার্থী। সরকার অনলাইন ক্লাসের নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে এখনো অসংখ্য পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, সন্তানদের ভরণ-পোষণের চাহিদা পূরণ করতে পারে না, সেসব পরিবারের শিক্ষার্থীদের পক্ষে ইন্টারনেটের খরচ বহন করে অনলাইন ক্লাস করা অসম্ভব। এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কত তার কোনো হিসাব আমরা এখনো দেখিনি। অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মাঝে আরেকটি বিপর্যয়ের চিত্র হলোÑ মফস্বল অঞ্চলে ছেলেদের ক্ষেত্রে অভিভাবকরা পড়াশোনা বন্ধ করে জমিজমা বিক্রি করে হলেও তাদেরকে বিদেশ পাঠিয়ে দিচ্ছেন অথবা দেশেই যেকোনো চাকরি, শ্রমিকের কাজ, তা না হলে ক্ষেতখামারের কাজে লাগিয়ে দিচ্ছেন। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে পড়ালেখা নেইÑ এ অজুহাতে নবম-দশম একাদশ শ্রেণীতে পড়া অসংখ্য মেয়েকে বাল্যবিয়ে দেয়া হচ্ছে। এভাবে অসংখ্য শিক্ষার্থীর নিজেকে সুশিক্ষিত ও দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
শহরাঞ্চলে এখনো ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক সেবার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। মফস্বল এলাকায় নেটওয়ার্ক আরো দুর্বল। নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত হয়নি এখনো। এ অবস্থায় অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে সব শিক্ষার্থীকে শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনা প্রায় অসম্ভব। সরেজমিন দেখা গেছে, ক্লাসের মধ্যে হঠাৎ ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সংযোগ না পাওয়ায় অসংখ্য শিক্ষার্থী ক্লাসে জয়েন করতে পারে না। হয়তো অনেকে ক্লাসের শেষে আবার সংযোগ পেয়ে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিয়েছে আবার অনেকে ইন্টারনেট সংযোগের জন্য চেষ্টা করতে করতে ক্লাসের সময়ই শেষ হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে যদি ক্লাসটি কোনো গাণিতিক বিষয় হয়, তা হলে অসম্পূর্ণ ক্লাস করে একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে সেই বিষয়টি বোঝা দুরূহ ব্যাপার। এ ছাড়া অনেক শিক্ষার্থী আছে যাদের অভাবগ্রস্ত পরিবার তাদেরকে পড়াশোনা করাতে চায় না। স্কুল-কলেজে ঠিকমতো বেতনই পরিশোধ করতে পারে না এমন পরিবারের শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রতি মাসে ইন্টারনেট খরচ বহন করা সম্ভব নয়। সঙ্গতকারণেই এমন অসংখ্য শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারছে না। এখানে দু-একটি বাস্তব সমস্যার চিত্র তুলে ধরা হলো। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে আরো অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বললেই জানা যায়। সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য, ছাত্রছাত্রীদের মানসম্মত শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সরাসরি ক্লাস-পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। দেড় বছর হতে চলল শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে। স্বাধীনতার পর দেশব্যাপী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টানা এত দিন বন্ধের নজির নেই। যদিও ইতঃপূর্বে সরকার কয়েকবার প্রতিষ্ঠান খোলার কথা বললেও কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাবে আবারো বন্ধের সময় বাড়িয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাসে রাজশাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে এক ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকবে। যখন এটি থামবে আমরা তখনি খুলব’ (বিবিসি বাংলা, ২৭ এপ্রিল ২০২০)। এ ঘোষণায় তখন সবাই বুঝতে পারে আগামী অন্তত পাঁচ মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে না। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অপেক্ষায় রইল সব কিছু স্বাভাবিক থাকলে পাঁচ মাস পরে স্কুল-কলেজ খুলবে। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাস আসার পর করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসার কথা জানিয়ে পর্যায়ক্রমে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সময় বাড়ানো হয়। এ সময় ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি বলেন, ‘সীমিত পরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তাভাবনা চলছে। কিন্তু সব কিছু নির্ভর করছে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর’ (প্রথম আলো, ২৯ অক্টোবর ২০২০)। শিক্ষামন্ত্রী তার কথায় ইঙ্গিত দেন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে ১৫ নভেম্বর থেকে সীমিত পরিসরে স্কুল-কলেজ খোলার চিন্তাভাবনা চলছে। কিন্তু খোলা সম্ভব হয়নি। এভাবে বন্ধ বাড়াতে বাড়াতে কেটে গেছে একটি বছর। আটকে যায় এইচএসসি পরীক্ষা ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফলাফল।
শুরু হয় নতুন বছর ২০২১ সাল। এরই মধ্যে টানা বন্ধে এবং সরকারি তেমন কোনো আর্থিক সহযোগিতা না থাকায় স্থায়ীভাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন দিয়ে থাকে। দেশের বেশির ভাগ বেসরকারি স্কুল-কলেজ ভাড়া করা ভবনে পরিচালিত হয়। এমনকি অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রাজধানীতে ভাড়া করা ভবনে চলছে। খোলার আশায় থাকতে থাকতে আয় ছাড়া শুধু ব্যয় করতে করতে ভবন ভাড়া ও শিক্ষকদের বেতনের খরচ বহন করতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান নিঃস্ব হয়ে গেছে; বিশেষত দেশের শত শত কিন্ডারগার্টেন ও প্রাইভেট স্কুল। এ অবস্থায় নিজের নিরলস শ্রম-সাধনায় স্বপ্নে গড়া প্রতিষ্ঠান বন্ধের পাশাপাশি চরম দুর্দশায় নিপতিত হয় অসংখ্য শিক্ষকের জীবন। কারণ কঠোর লকডাউনে টিউশনিও বন্ধ হয়ে যায় তখন। মানবেতর জীবন কাটান বেসরকারি শিক্ষক সমাজ। এ কথা সবারই জানা, বাংলাদেশে যদি শীর্ষ ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা করা হয়, সেখানে বেশির ভাগই হবে বেসরকারি স্কুল-কলেজ। দেশে হাতেগোনা কিছু সরকারি স্কুল-কলেজ ভালো ফল করে। বেশির ভাগ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর অসংখ্য শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মেডিক্যালে সুযোগ প্রাপ্তির তালিকায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। অথচ প্রায় দেড় বছর ধরে বেশির ভাগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন পাচ্ছেন না। কিভাবে চলছে তাদের পরিবার, তা দেখার কেউ নেই। অন্য দিকে প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও সরকারি-এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীরা পূর্ণ বেতন পাচ্ছেন। স্বাধীন দেশে এ বৈষম্য যে কতটা অমানবিক, তা ভুক্তভোগী বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীরাই কেবল অনুভব করছেন।
ইতঃপূর্বে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক সমাজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়, দেশের সব সেক্টরের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অন্তত সীমিত পরিসরে হলেও খুলে দেয়া হোক। কিন্তু গত বছরের শেষের দিকে বলা হল, শীতে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাই শীতকাল শেষ হলে প্রতিষ্ঠান খোলার কথা বিবেচনা করা হবে। কিন্তু শীতের পর গ্রীষ্ম এলো আবারো শীত চলে আসছে, কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হয়নি। নতুন বছরের শুরুতে সংশ্লিষ্টরা আশা করেছিল জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠান খুলবে। কিন্তু খোলেনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ৩০ মার্চ স্কুল-কলেজ ও ২৪ মে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়া হবে। কিন্তু খোলা সম্ভব হয়নি। বন্ধ বাড়াতে বাড়াতে বর্তমানে আমরা পার করছি সারা দেশে লকডাউন পরিস্থিতি। বছরের শেষাংশ চলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খুলে এভাবেই কি ২০২১ সালও শেষ হয়ে যাবে, এ আশঙ্কা শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের। একাধিকবার খোলার সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেও প্রতিষ্ঠান না খোলায় এখন আদৌ কবে স্কুল-কলেজ খুলবেÑ এ নিয়ে হতাশায় সময় কাটাচ্ছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
বাস্তবতা হলো, দেশের কোনো সেক্টরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো ১৫ মাসের বেশি ধরে পুরোপুরি বন্ধ নেই। কঠোর লকডাউনেও সীমিত পরিসরে প্রায় সব সেক্টরেই মানুষ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তা হলে স্কুল-কলেজ বন্ধ রেখে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে ফেলা এবং বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষক-কর্মচারীকে বেকার করে ফেলার যৌক্তিকতা কী। ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাজীবন রক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনেকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সুযোগ রয়েছে বলে দেশের চিন্তাশীল শিক্ষাবিদরা মনে করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিকল্প প্রস্তাবগুলো :
১. প্রথম ধাপে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলার অনুমতি দেয়া যায়। এ কথা সবারই জানা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক প্রতিটি বিভাগ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। পৃথক অনুষদ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সমাজের সবচেয়ে সচেতন নাগরিকদের অন্যতম। তাদের পক্ষে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অসম্ভব নয়। সপ্তাহে দুই দিন একটি অনুষদের শিক্ষার্থীরা আসবে এবং বিভাগগুলো তাদের নিজস্ব পরিকল্পনায় তাদের শিক্ষার্থীদের অন্য বিভাগ থেকে ভিন্ন দিন ভার্সিটিতে আসতে বলবে, একসাথে বেশ কিছু শিক্ষা কার্যক্রম দিয়ে দেবে এবং সেটি পরবর্তী সরাসরি ক্লাসে বুঝে নেবে। এভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালালে একই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী জড়ো হবে না। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত হবে। শিক্ষার্থীরা সেশনজটের অভিশাপ থেকেও মুক্তি পাবে।
উল্লেখ্য, বিরতি দিয়ে হলেও দেশের প্রায় সব পাবলিক প্লেস খুলে দেয়া হয়েছে। বাজার-ঘাট, শপিংমল-মার্কেট, পর্যটন কেন্দ্রসহ বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে হাজার হাজার জনসমাগম চলছে। লকডাউনেও জনসমাগমের সবচেয়ে বড় খাত গার্মেন্ট খোলা রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে এর আগে মার্কেট, গার্মেন্ট, অফিস, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি সুরক্ষিত পরিবেশে যেখানে সর্বোচ্চ শিক্ষিত নাগরিকদের চলাচল সেই প্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি কি দেয়া যায় না?
২. সারা দেশে করোনার প্রভাব এক রকম নয়। সে ক্ষেত্রে যে এলাকায় প্রকোপ কম সেসব অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয় আগে খোলা হোক। এভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে সীমিত আকারে হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলা সম্ভব। ভার্সিটি বন্ধ থাকায় অনার্স শেষ বর্ষের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবনের অত্যন্ত মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ক্যারিয়ার ধ্বংসের পথে। এমনিতেই দেশে বেকারত্বের অভিশাপ রয়েছে, যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের অভাব। মাস্টার্স পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থীর চাকরির বয়স শেষের পথে। তাদের জীবন চরম হতাশায় নিমজ্জিত। শুধু যথাযথ পরিকল্পনা আর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে এভাবে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে?
৩. বিভিন্ন পরিকল্পনায় দেশের কলেজগুলো খুলে দেয়া যায়। বেশির ভাগ কলেজ বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা এই তিন গ্রুপের শিক্ষার্থীদের নিয়ে চলে। করোনা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে প্রতিদিন সব গ্রুপ না এসে বরং সপ্তাহে দুই দিন করে এক বিভাগের শিক্ষার্থীরা কলেজে এলে সমাগম কম হবে এবং এক বেঞ্চে দু’জন শিক্ষার্থী বসালে নিরাপদ দূরত্ব বজায় থাকবে। এভাবে কলেজগুলোয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরাসরি ক্লাস চালানো সম্ভব। প্রয়োজনে এক গ্রুপের শিক্ষার্থীদের দুই ভাগ করে এক দিন করে ক্লাসে আনলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো কমে যাবে। এভাবে এক-দুই দিন করে কলেজে এলে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমবে।
৪. বিশেষত এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে হলেও কলেজ খুলে দেয়া উচিত। অন্তত পরীক্ষার্থীদের সরাসরি ক্লাসে যোগ দেয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। যেমনটি আমরা শুনেছিলাম গত বছরের নভেম্বরে। কিন্তু তখনো সরাসরি ক্লাসের সুযোগ দিতে না পারার ফল হলো দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রের ইতিহাসে অভাবনীয় ঘটনা, অটো পাস। ২০২০ সালে পরীক্ষা না নিয়ে প্রায় ১৪ লাখ এইচএসসি ও সমমান শিক্ষার্থীকে অটো পাস দেয়া হয়। এসএসসির ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে পরীক্ষা ছাড়াই এইচএসসিতে এ প্লাস পায় প্রায় এক লাখ ৬২ হাজার শিক্ষার্থী। দেশের প্রচলিত নিয়মে পরীক্ষা ছাড়া এত বড় পাবলিক পরীক্ষায় সবাইকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করে সার্টিফিকেট দেয়ার সুযোগ ছিল না। তাই এই অটো পাস আইনসম্মত করতে জাতীয় সংসদে নতুন আইন করা হয়। অটো পাস অমনোযোগী শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদ আর পড়–য়া মেধাবীদের জন্য হতাশার কারণ। অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর অভিযোগ, যারা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে এইচএসসিতে ভালো জিপিএ লাভের জন্য দুই বছর নিয়মিত পড়াশোনা করেছে, অটো পাসের ফলে তাদের সেই কষ্ট বৃথা হয়ে গেল। পাশাপাশি এসব পড়–য়া শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার স্কোরে যে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার টার্গেট নিয়েছিল, তাও নষ্ট হয়ে গেল। বিদেশে শিক্ষা নেয়ার ক্ষেত্রেও অটো পাসের সার্টিফিকেট শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলবে। এসব কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ও অটো পাস সিস্টেমে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আশাহত হয়েছে। এরই মধ্যে ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষার নির্ধারিত সময় আরো দুই মাস আগে অতিবাহিত হয়ে গেছে। কবে পরীক্ষা হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না। তা হলে কি আবারো অটো পাসের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে? এই প্রশ্ন পড়াশোনা বিমুখ করে দিচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের। কিন্তু পরীক্ষা নেয়ারও অনেক বিকল্প প্রক্রিয়া রয়েছে। যেকোনো পদ্ধতিতে পরীক্ষার মাধ্যমে সম্মানের সার্টিফিকেট চায় মেধাবীরা। এ কথা ভাবতে হবে দেশের নীতিনির্ধারকদের।
৫. স্কুলপর্যায়েও স্বাস্থ্য সুরক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করে প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ভাগ করে ক্লাসভিত্তিক সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রম চালানো সম্ভব। দেশের অনেক বেসরকারি স্কুলের পরিবেশ অত্যন্ত মানসম্পন্ন। কিভাবে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় প্রয়োজনে এসব স্কুল থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশব্যাপী স্কুলগুলোতে তার প্রতিফলন ঘটানো যায়। অন্তত এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য হলেও স্কুল খোলা উচিত। একজন শিক্ষার্থীর জীবনের প্রথম সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষার সার্টিফিকেট অটো পাসের মাধ্যমে আসা কিছুতেই কাম্য নয়। এসএসসিতে অটো পাস হলে পড়াশোনায় শিক্ষার্থীদের যে দুর্বলতা থেকে যাবে তার প্রভাব ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনেও পড়বে। তাই লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়া রোধে এবং আগামী প্রজন্মকে পড়াশোনা বিমুখ হয়ে পড়ার ক্ষতি থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা এবং পরীক্ষার মাধ্যমে ফলাফল দেয়ার বিকল্প চিন্তা করতে হবে। হ
লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক



আরো সংবাদ