১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৩ আশ্বিন ১৪২৮, ১০ সফর ১৪৪৩ হিজরি
`

প্রত্যাশিত তালেবান বিজয় সহজ হবে কি?

অবলোকন
-

তালেবান আন্দোলন হিসেবে পরিচিত ‘ইসলামী আমিরাত আফগানিস্তান’ কয়েক দিন আগেই দেশটির ৮৫ শতাংশ ভূ-খণ্ডের নিয়ন্ত্রণ লাভের ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর আরো বেশ কিছু জেলার নিয়ন্ত্রণ লাভ করে ঈদুল আজহার যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয় এবার। এর মধ্যে সরকার সমর্থক তুলু নিউজ একটি ভিডিও প্রচার করেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে একজন সেনা পোশাক পরিহিত ব্যক্তি ঈদের নামাজ পড়াচ্ছেন। আর ঠিক এই সময় বোমা বা রকেট বিস্ফোরণের মতো কয়েকটি শব্দ শোনা গেলে কয়েকজন নামাজ শেষ না করেই উঠে যান। এই জামাতে আফগান সরকারের প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্টসহ শীর্র্ষ কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছেন। তালেবানরা এ ধরনের কোনো হামলা চালায়নি বলে উল্লেখ করেছে। তবে বাস্তবে, সহানুভূতি আদায়ের জন্য সরকারের তৈরি করা হোক অথবা তালেবান পক্ষের কেউ এটি ঘটিয়ে থাকুক, কাবুলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে বেশ ভঙ্গুর সেটি এই ঘটনায় বুঝা যায়।

ভারতের কৌশলগত বিপর্যয়?
তালেবানরা আফগানিস্তানে আসলে চূড়ান্ত জয় কিভাবে অর্জন করতে চাইছে সেটি নিয়ে বেশ ধোঁয়াশা একটি ধারণা অনেকের মধ্যে। আবার তাদের পদক্ষেপগুলোর মধ্যে বেশ পরিকল্পনার ছাপ রয়েছে বলেও মনে হয়। এখন তালেবানরা বিদেশের সাথে সব সীমান্তÍ প্রবেশ পথের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে নিয়েছে। স্থল সীমানা দিয়ে বাইরে থেকে এখনকার পরিস্থিতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ কাবুল সরকারের পক্ষে হওয়ার মতো অবস্থা আর নেই। এর মধ্যে ভারত থেকে কাবুল সরকারের জন্য বিমানযোগে বেশ কিছু অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের খবর গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে বিভিন্ন সংবাদপত্রে বের হয়েছে। একটি ভারতীয় কন্টিনজেন্ট কাবুল সরকারের পতন ঠেকানোর জন্য তাজিকিস্তানের ভারতীয় ঘাঁটিতে মজুদ করা হয়েছে বলেও খবর বেরিয়েছে। এসব খবর ভারত সরকার অস্বীকার করেছে। তবে ভারত আফগানিস্তানে যে কৌশলগত এক ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তা দৃশ্যমান নানা ঘটনায় স্পষ্ট।
তালেবানরা চীন ইরান তুর্কমেনিস্তান উজবেকিস্তান তাজিক সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণও গ্রহণ করেছে। তালেবানদের এই পদক্ষেপে ভারত সত্যিকার অর্থেই বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। আকস্মিক এই তালেবান নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ব্যাপারে দিল্লি খুব বেশি সচেতন ছিল বলে মনে হয় না, যার কারণে হঠাৎ করেই ৫০০ কূটনীতিককে ভারতীয় সামরিক পরিবহন বিমান পাঠিয়ে দিল্লি ফিরিয়ে নেয়ার খবর বেরিয়েছে। আর আফগানিস্তানের পাক সীমান্ত জেলাগুলোতে আটটির মতো ভারতীয় মিশন অচল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে কান্দাহারের একটি ভারতীয় সীমান্ত শহরের মিশন থেকে তালেবানরা ৫০০ কোটি পাকিস্তানি রুপি উদ্ধার করেছে বলে খবর বেরিয়েছে। ইসলামাবাদের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, এই অর্থ বেলুচিস্তান এবং খায়বার পাকতুনখোয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদ ও অন্তর্ঘাতী কাজে ব্যবহারের জন্য জমা রাখা হয়েছিল।
২০০১ সালের পর আমেরিকা আফগানিস্তানের সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংগঠনগুলো পুনর্গঠনের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিল ভারতের হাতে। দেশটি বেশ কিছু অবকাঠামোও তৈরি করে আফগানিস্তানে। সেখানে এ যাবৎ ৯ বিলিয়ন ডলার ভারত খরচ করেছে বলে জানা যাচ্ছে। এই বিপুল বিনিয়োগের পেছনে অর্থনৈতিক কারণের চেয়ে কৌশলগত কারণ যে বড় তা স্পষ্ট হয় ঘোষিত অঘোষিতভাবে দেশটিতে ১৬টির মতো ভারতীয় মিশন চালানোতে। এসব মিশনের অধিকাংশই তালেবান নিয়ন্ত্রণে পড়ার কারণে অচল হয়ে পড়েছে। এখন দিল্লির মাথাব্যথা হলো, নতুন পরিস্থিতিতে ভারতীয় গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আফগানিস্তানে সচল রাখার বিষয়টি।
ভারত গোড়া থেকেই তালেবানের সাথে যেকোনো আলোচনার বিরোধিতা করা সত্ত্বেও আমেরিকা তাদের কথা না শুনে চূড়ান্তভাবে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করছে। ফলে বাধ্য হয়ে রাশিয়া ইরান এবং কাতারের সহায়তায় তালেবানের সাথে তিন দফা বৈঠক করেছে দিল্লি। এসব বৈঠকে ভারতীয় বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সহায়তার আশ্বাস চেয়েছেন দিল্লির কর্মকর্তারা; কিন্তু অন্য কোনো দেশ বিশেষত পাকিস্তান ও চীনের স্বার্থের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করতে না দেয়ার ব্যাপারে তালেবানদের অবস্থান ছিল কঠোর। তারা বলেছে, ভারতের বিরুদ্ধে যেমন তারা আফগানিস্তানের মাটি কাউকে ব্যবহার করতে দেবে না তেমনিভাবে অন্য প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধেও আফগানিস্তানের ভূ-খণ্ড কাউকে ব্যবহার করতে তারা দেবে না।
এই পরিস্থিতিতে দিল্লির নিরাপত্তা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দুই ধরনের মতামতের কথা জানা যাচ্ছে। প্রথমত, কাবুল সরকারকে সব ধরনের সামরিক সহায়তা দিয়ে এবং তালেবান বিরোধী যুদ্ধবাজ গ্রুপগুলোর মাধ্যমে মিত্র সরকারের আয়ুু বাড়ানো আর তালেবানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করা। দ্বিতীয় হলো, তালেবানের সাথে সরাসরি সঙ্ঘাতে না গিয়ে তাদের সাথে সমঝোতার চেষ্টা করা। আর দেশটির পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নীতি বিন্যাস করা। এই গ্রুপের ধারণা, ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্র যেখানে তালেবান প্রতিরোধের সামনে টিকতে পারেনি, সেখানে ভারতের পক্ষে সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অধিকন্তু তালেবানের সাথে নতুন করে সামরিক সঙ্ঘাতে যাওয়ার অর্থ হবে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে তালেবানকে ডেকে নিয়ে আসা। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং ইসরাইলি লবি প্রথম মতের পক্ষে থাকায় আলোচনার ধারাটি এখনো প্রবল হতে পারছে না বলে জানা যায়। তালেবান অবস্থানে সর্বশেষ আমেরিকান বিমান হামলার ঘটনা এই লবির চেষ্টায় হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তালেবানের সাথে কাজ করার প্রস্তুতি
আমেরিকা ও ন্যাটোর চূড়ান্ত প্রত্যাহার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো তালেবান সরকারের সাথে কাজ করার ব্যাপারে তাদের আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তালেবানকে এখন চিহ্নিত করছে ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠীর পরিবর্তে ‘বিদ্রোহী’ গোষ্ঠী হিসাবে। কাতার রাশিয়া ইরান তুরস্ক সৌদি আরব এর মধ্যে তালেবানকে অফিস খোলার অনুমতি দিয়েছে। এসব দেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক কাবুল সরকারের সাথে আর অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক রয়েছে তালেবানদের সাথে। সব দেশই তালেবানদের আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ সরকার হিসেবে মেনে নেয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছে।
এই ধরনের এক অবস্থায় তালেবান কৌশলটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তালেবানরা আফগানিস্তানের ৪২ শতাংশ পশতুনদের মধ্যে ছিল একচ্ছত্র সমর্থনের দল। তারা অপশতুন ২৭ শতাংশ তাজিক, ৯ শতাংশ উজবেক, এমনকি ৯ শতাংশ হাজারাদের মধ্যেও নিজের প্রভাব বলয় বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে কোনো উল্লেখযোগ্য ‘ওয়ার লর্ড’ এখনো পর্যন্ত তালেবানদের বিরুদ্ধে বড়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে এমনটি দেখা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, বিনা যুদ্ধে তালেবানদের হাতে একের পর এক জেলা শহর ও প্রদেশের পতন। সরকারি বাহিনীর যারা আত্মসমর্পণ করছে তাদের দুই হাজার ডলারসহ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে তালেবান কর্তৃপক্ষ। এতে বিলিয়ন ডলার খরচ করে আমেরিকা কাবুল সরকারের জন্য যে নিরাপত্তাবাহিনী তৈরি করেছিল তার সদস্যরা বিনা যুদ্ধে ইন্দো-মার্কিন অস্ত্র তুলে দিচ্ছে আফগান তালেবানদের হাতে। তালেবান সদস্যরাই কি উদ্দেশ্যমূলকভাবে আফগান বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল, নাকি মনোবল হারিয়ে কাবুল সরকারের শত শত সেনাসদস্য তাদের অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ তালেবানদের দিয়ে ঘরে ফিরে যাচ্ছে- তা নিয়ে রয়েছে একাধিক মত।

অনন্য যুদ্ধ কৌশল
তালেবানের যুদ্ধ কৌশলে বিস্মিত হচ্ছেন খোদ আমেরিকান জেনারেলরাও। তারা তালেবান বাহিনীর সাবেক প্রধান ইব্রাহিম সদরকে এই সময়ের সেরা কমান্ডার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কয়েক মাস আগে মোল্লা ওমরের ছেলে মোল্লা ইয়াকুবকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। তালেবানরা রাসূলের সা: যুগের ইসলামের পুরনো যুদ্ধ কৌশলকে নতুনভাবে ফিরিয়ে এনেছে। তারা প্রথম পর্যায়ে আফগানিস্তানের সব স্থল সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। তাজিক উজবেক তুর্কমেন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেখানে জাতিগত প্রধান সম্প্রদায়ের লোকদেরই দায়িত্ব দিচ্ছে, যাদের মধ্যে জনগণের আস্থাশীল তাজিক উজবেক গোত্র নেতারাও রয়েছেন। এটি করার পাশাপাশি তালেবানরা কাবুল সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রাদেশিক শহর ও জেলা কেন্দ্রকে অবরোধ করে রাখছে, যাতে সেখানে রসদপত্রের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং তালেবানের আহ্বানে আত্মসমর্পণের লোভনীয় অফারে সরকারি সৈন্যরা সাড়া দেয়। এভাবে হাতে গোনা কয়েকটি প্রাদেশিক শহর আর কাবুল ছাড়া বাকি গোটা অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তালেবানদের।
সীমান্ত অঞ্চলে তালেবান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে নিরাপত্তা নিয়ে যেমন বেকায়দায় পড়েছে কাবুল সরকার তেমনিভাবে সরকারের রাজস্ব আদায়ও ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে। একপর্যায়ে বাইরে থেকে জরুরি অর্থ সহায়তা না পেলে কাবুলের সরকার চালানো আশরাফ গনির পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্য দিকে বিজয়ী শক্তি হিসেবে তালেবানকে সহায়তা করার জন্য অনেক পক্ষই এগিয়ে আসছে।
আফগানিস্তানে পপিজাত ড্রাগ ব্যবসার প্রতিও নজর রয়েছে অনেক মাফিয়া গোষ্ঠীর। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অধ্যাপক তাজ হাশমি উল্লেখ করেছেন, হেলমন্দ প্রদেশেই মূলত পপির সবচেয়ে বেশি চাষ হয়। এক কেজি পপি থেকে উৎপাদনকারীরা যে অর্র্থ পায় তা ড্রাগ বানিয়ে ৫০ থেকে একশত গুণ মূল্য সংযোজন হয়ে ভোক্তাপর্যায়ে যায়। ফলে এর সাথে যুক্ত রয়েছে হাজার হাজার কোটি ডলারের মাদক ব্যবসা। হাশমির তথ্য অনুসারে, এই ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্রিটিশ বর্তমান বা সাবেক জেনারেলদের সংযোগ রয়েছে।
মোল্লা ওমরের পরিকল্পনা
তালেবান আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও আধ্যাত্মিক গুরু মোল্লা ওমরের রয়েছে এই আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর অসাধারণ আধ্যাত্মিক প্রভাব। এই নেতা ২০১৪ সালে মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, তাদের ক্ষমতা হারানোর দুই দশকের মধ্যে বিদেশী দখলদারিত্বের অবসান ঘটবে আফগানিস্তানে। এরপর শত বছর ধরে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ আফগানদের হাতে থাকবে। তিনি বলে গিয়েছেন, ২০১৯ সাল থেকে আমেরিকান সেনারা চলে যেতে শুরু করবে। আফগানরা ফিরে পাবে তাদের নিজ দেশের নিয়ন্ত্রণ। একেবারে সাদামাটা ও আধ্যাত্মিক জীবনযাপনকারী এই নেতার প্রভাব তালেবান আন্দোলনে এতটা প্রবল যে, তার জীবৎকালে এবং মৃত্যুর পর তালেবান আন্দোলনে অনেক চেষ্টা করেও বড় কোনো বিভক্তি আনা যায়নি। অথচ একাধিক তালেবান আমিরকে আমেরিকান বিমান বা ড্রোন হামলায় হত্যা করা হয়েছে। এখনো পর্যন্ত বজায় থাকা তালেবান আন্দোলনের ঐক্য ও সংহতির পেছনে রয়েছে মোল্লা ওমরের আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা।
আফগানিস্তানের ব্যাপারে মোল্লা ওমর একটি বিশদ অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও দিয়ে গেছেন বলে তালেবান সূত্রগুলো উল্লেখ করছে। এই ফর্মুলার বাস্তবায়ন হলে আফগানিস্তানকে আর বিদেশী সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হবে না। এই ফর্মুলা অনুসারে আগের তালেবান শাসনের মতোই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর পপি বা আফিম চাষ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হবে। এর বিকল্প হিসেবে আফগান চাষিরা আবাদ করবে জাফরান। পপি চাষ থেকে চাষিরা যে অর্থ উপার্জন করবে সে একই পরিমাণে অর্থ জাফরান চাষ থেকে আয় সম্ভব হবে। এর বাইরে আঙ্গুর ও বেদানা চাষকেও উৎসাহিত করা হবে। দ্বিতীয়ত, যে প্রাকৃতিক ও খনিজসম্পদ আফগানিস্তানের রয়েছে সেটিকে সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে রয়েছে : কয়লা, তামা, আয়রন আকরিক, লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম, বিরল ধাতব উপাদান, ক্রোমাইট, সোনার, দস্তা, ট্যালক, বারাইট, সালফার, সিসা, মার্বেল, মূল্যবান ও অর্ধ-মূল্যবান পাথর, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পেট্রোলিয়াম। ২০০৭ সালে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ দ্বারা প্রক্ষেপণ অনুসারে, আফগানিস্তানের অনুত্তোলিত খনিজ মজুদের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যমানের। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের মাইকেল ই ওহানলন অনুমান করেন যে, আফগানিস্তান যদি খনিজ মজুদ থেকে বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করে, তবে এর সামগ্রিক জাতীয় উৎপাদন থেকে আফগান নিরাপত্তাবাহিনী এবং অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সরবরাহ করতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ (ইউএসজিএস) ২০০৬ সালে প্রক্ষেপণ করেছে যে, উত্তর আফগানিস্তানে গড়ে ২.৯ বিলিয়ন বিবিএল অপরিশোধিত তেল, ১৫.৭ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ৫৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এই প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগানো গেলে আফগানিস্তানে সম্পদের অভাব হবে না। তৃতীয়ত, সব দেশের সাথে যৌক্তিক সম্পর্ক বজায় রেখে আফগানিস্তানের পুরনো বাণিজ্য রুটগুলো সচল করা। এ ক্ষেত্রে চীনের রোড অ্যান্ড বেল্ট উদ্যোগ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ জন্য আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ জাতিগোষ্ঠীগুলোর সাথে সংহতি ও সৌহার্দ্যরে সম্পর্কও গড়ে তুলতে হবে। তালেবানরা এর মধ্যেই তাদের বিজিত অঞ্চলে মোল্লা ওমরের এই ফর্মুলা যতটা সম্ভব কাজে লাগিয়ে ‘অসাধারণ’ সাফল্য পাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।

তালেবান পরিকল্পনা
তালেবানদের পরিকল্পনা সম্পর্কে যতটা জানা যাচ্ছে তাতে তারা আমেরিকার প্রত্যাহারের শেষ মাসটিতে প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে রাখবে। কাবুল সরকারের সরবরাহ লাইনকে যথাসম্ভব সঙ্কুচিত করার চেষ্টার পাশাপাশি নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের আত্মসমর্পণ ও পক্ষ ত্যাগের এমন এক প্রবাহ তৈরির চেষ্টা করবে যাতে চূড়ান্ত সমঝোতা বা আলোচনায় কাবুল সরকারের নিজেদের নিরাপদ প্রস্থানের বাইরে বড় রকমের কোনো পাল্টা চাপ সৃষ্টির অবস্থা আর না থাকে। এর পর আফগানিস্তানে তালেবান অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা তৈরি করবে যার আওতায় পশতুন তাজিক উজবেক নির্বিশেষে সকল জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা আফগানিস্তান শাসনে অংশীদার হতে পারে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি থাকবে তালেবানদের হাতে।
তালেবানরা ‘ইসলামিক আমিরাত’ প্রতিষ্ঠার ধারণা থেকে কিছুটা সরে এসে ‘ইসলামিক নেজামত’ প্রতিষ্ঠার অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এই ব্যবস্থায় এক দিকে রাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের থিওলজিক্যাল নিয়ন্ত্রক কাঠামো থাকবে, আর রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কর্ম পরিচালনা করবে প্রতিনিধিত্বশীল জিরগা বা সংসদীয় ব্যবস্থাভিত্তিক সরকারকাঠামো। ৫ বছরের অন্তর্বর্তী সময়ে আফগানিস্তানের উপযোগী একটি ইসলামী মডেলের গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে। তালেবান মুখপাত্র জবিহউল্লাহ মুজাহিদের বক্তব্যেও এর ইঙ্গিত রয়েছে।

তুুরস্কের সাথে টানাপড়েনের অবসান
আফগানিস্তানের প্রতিবেশী পাকিস্তান চীন ইরান রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার এই কৌশলগত সংযোগ ভূ-খণ্ডে শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যে তাদের স্বার্থ দেখতে পাচ্ছে। বৃহত্তর পরিসরে প্রভাব বিস্তারকারী তুরস্কের সাথে আফগানিস্তানে ভূমিকা নিয়ে তালেবানের সাথে যে টানাপড়েন দেখা দিয়েছিল সর্বশেষ খবর অনুসারে তার অবসান ঘটেছে কাতার-পাকিস্তানের মধ্যস্থতায়। আফগানিস্তানের তাজিক (২৭ শতাংশ) উজবেক (৯ শতাংশ) ও তুর্কমেনরা (৩ শতাংশ) মূলত তুর্কি বংশোদ্ভূত। এই তিন জাতিগোষ্ঠী মিলে আফগানিস্তানে মোট জনসংখ্যা ৩৯ শতাংশ যা পশতুনদের চেয়ে ৩ শতাংশ কম। এদের পাশাপাশি শিয়া হাজারাদের সমর্থনের ওপর ভিত্তি করেই একসময় নর্দার্ন জোট আমেরিকান সহায়তায় ক্ষমতা দখল করেছিল। তুরস্ক এই তুর্কি জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রে অবস্থান বা ভূমিকা নিশ্চিত করতে চায়।
আঙ্কারার ধারণা হলো, সব জাতিগোষ্ঠির যৌক্তিক অংশীদারিত্ব আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করবে। তালেবানরা এই বিষয়টি তাদের ওপর ছেড়ে দেয়া এবং ন্যাটোর অংশ হিসেবে আফগানিস্তান থেকে অন্যদের সাথে বিদায় হয়ে পরে প্রয়োজন অনুসারে মুসলিম দেশ হিসেবে আফগানিস্তানে তুরস্কের আগমনকে স্বাগত জানাতে চায়। তুরস্ক নিশ্চিত করেছে যে, আফগানিস্তানের বৈধ সরকার ও জনগণের ইচ্ছার বাইরে আঙ্কারা আফগানিস্তানে কোনো ভূমিকা নেবে না। তবে তালেবানের যুদ্ধজয়ের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলে সেটি শান্তি নিশ্চিত করবে বলে আঙ্কারা মনে করে। সম্ভবত এ ব্যাপারে দু’পক্ষ একটি বোঝাপড়ার কাছাকাছি এসেছে।

আবারো গৃহযুদ্ধের ডঙ্কা বাজানোর চেষ্টা?
আফগানিস্তানে কি আসলেই শান্তিসময় ফিরে আসবে নাকি আবারো গৃহযুদ্ধের ডঙ্কা বাজানোর চেষ্টা করা হবে? পরাজয়ের অনুভূতি নিয়ে পরাশক্তি আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে বিদায় নিচ্ছে আর ন্যাটোভুক্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশ একটি উদার সেক্যুলার আফগানিস্তান গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনেক সম্পদ ব্যয় করে এখন নিজেদের ব্যর্থতাকে সামনে দেখছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে নানা কারণে প্রভাবশালী ইসরাইল পশতুন এলাকাকে নিজেদের হারানো ইহুদি ট্রাইবের বসতির অংশ মর্মে বিশ্বাস থেকে ভারতকে সাথে নিয়ে পাকিস্তান ভাঙার ডক্ট্রিন নিয়ে কাজ করছে মর্মে উল্লেখ করা হয়। তালেবানের বিজয়ে তারা সবাই কি আফগানিস্তান থেকে হাত গুটিয়ে নেবে?
এই প্রসঙ্গে ইসরাইলি থিংকট্যাংক আইএনএসএসের এক নিরীক্ষণে বলা হয়েছে, ‘আফগানিস্তানে আমেরিকান আক্রমণ তার প্রাথমিক লক্ষ্যগুলো অর্জন করেছিল, আল-কায়েদার ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল এবং তালেবান সরকারের পতন ঘটিয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে আমেরিকা তালেবানদের পুনরায় ক্ষমতা অর্জন আটকাতে ব্যর্থ হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে আবার আক্রমণ করা হলে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে আফগানিস্তানের প্রতিবেশীরা এই প্রত্যাহারের ফলে শূন্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উদ্বেগের সাথে ভবিষ্যতের দিকে তাকাচ্ছে। এ ছাড়া পরাশক্তির উপর মৌলবাদী ইসলামী প্রতিরোধের বিজয় সম্পর্কে তালেবান ও আল-কায়েদার পক্ষ থেকে যে বিবরণ প্রচার করা হবে তা মধ্য প্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের অন্যান্য সংস্থার অনুপ্রেরণার কারণ হতে পারে। পশ্চিমে ইসরাইল এবং তার মিত্রদের এই সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত করা উচিত যে, আফগানিস্তান বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের ভিত্তি এবং অনুকরণের একটি মডেল হয়ে ফিরে আসবে।’
মূল্যায়নটিতে আরো বলা হয়, “আফগানিস্তানে তার উপস্থিতির ২০ বছরের সময়কালে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিল এবং রাষ্ট্রপতি বাইডেন নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন যে, আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বিনিয়োগের জন্য কোনো রিটার্ন পেল না। তদুপরি, তালেবান সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়ান, ইরান, তুর্কি এবং চীনা প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করেছে, বর্তমানে একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি এবং বৈধতা উপভোগ করেছেÑ এমন সুবিধাগুলো ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর তাদের অর্জনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। আমেরিকার প্রত্যাহারের পরে তালেবান এবং আল-কায়েদা সম্ভবত আরো একটি বিদেশী সাম্রাজ্যের মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য এবং ‘সাম্রাজ্যের কবরস্থান’ হিসেবে পরিচিত আফগানিস্তান থেকে বিতাড়নে তাদের ক্ষমতা এবং ‘কাফের’ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জিহাদের বিজয় ঘোষণা করবে। আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের ফলে যে শূন্যতা থাকবে তা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের আশপাশের অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।”
ইসরাইলি থিংকট্যাংকের এই মূলায়নে স্পষ্ট, দেশটি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রধান মিত্র ভারত তালেবান জয়কে কিভাবে দেখছে। এই মূল্যায়নের পাশাপাশি তারা প্রতিরোধমূলক কিছু কর্মসূচি নেয়ারও চেষ্টা করতে পারে। কাবুল সরকারের জন্য সামরিক সহায়তা প্রদানের যে রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে, এর সাথে যোগসূত্র থাকতে পারে এর। তবে সম্ভবত এই সময়টা ইসরাইল ও তার মিত্রদের জন্য আগের মতো অনুকূল নয়। ২০০১ সাল আর ২০২১ সাল বিশ্বের জন্য সম্পূর্র্ণ ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে এসেছে। বিশ্ব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। নতুন লড়াইয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চীন-রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। এই সময়ে ভারসাম্যকারী শক্তিতে পরিণত হতে পারে মুসলিম বিশ্ব। তাদের গুরুত্ব আগামী দিনগুলোতে অনেক বাড়বে। এর পটভূমি তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে আফগানিস্তানের তালেবান আন্দোলনের বিজয় পরিস্থিতি। হ
mrkmmb@gmail.com



আরো সংবাদ


কাবুলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে রকেট হামলা (১৬০০২)তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র চাইলেন মাসুদ (১৫৭০৩)মালয়েশিয়ায় স্বদেশীকে অপহরণের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি ৪ বাংলাদেশী (১২৮৭১)মার্কিন সফরে মোদির ঘুম কেড়ে নেয়ার হুঁশিয়ারি শিখ গ্রুপের (১১৩৬১)নতুন ঘোষণা আফগান সেনাপ্রধানের (৯৮৫২)বিমানে হিজাব পরিহিতা দেখেই চিৎকার ‘মুসলিম সন্ত্রাসী’ (৭৩২১)ভারত সীমান্ত থেকে চীনের সেনা সরিয়ে নিতে জয়শঙ্করের হুঁশিয়ারি (৬০৯৮)যাত্রীবেশে উঠে গলা কেটে মোটরসাইকেল ছিনতাই (৬০১৫)রিকসা চালকের তথ্যে নিখোঁজ তিন ছাত্রী উদ্ধার (৫৯১৯)ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনতে চায় সৌদি আরব (৫৬৯১)