২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
`

ধর্ম ও বিজ্ঞানের আলোকে মাদকাসক্তি ও প্রতিকার

-

এ লেখার আগের পর্বে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, কুরআন কিভাবে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের তুলনায় সুস্পষ্টভাবে মাদকাসক্তির পর্যায়ক্রমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। (নয়া দিগন্ত ১৮/০৭/২১ সংখ্যা)
কুরআনের বাহক রাসূল সা:-এরও মদের ব্যাপারে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন নীতিমালা রয়েছে। গৌতম বুদ্ধের মতো যুবক বয়সে তিনি মদপান করেননি বা যিশু খ্রিষ্টের মতো সঙ্গীদেরকে পানি থেকে মদ বানিয়ে পরিবেশন করেননি। রাসূল সা: মদের সাথে জড়িত ১০ শ্রেণীর লোকদের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন : মদ প্রস্তুতকারী, মদ পরিবেশনকারী, মদ প্রস্তুতের পরামর্শদাতা, মদ বিক্রেতা, মদপানকারী, মদের মূল্য গ্রহণকারী, মদ বহনকারী, মদ ক্রয়- বিক্রয়কারী, যার কাছে মদ বহন করা হয়, যার জন্য মদ ক্রয় করা হয়। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
রাসূল সা: মাদকের ব্যাপারে সত্যিকারভাবে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণ করেন। একজন সাহাবী শরাবকে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করার ব্যাপারে জানতে চাইলেন। রাসূল সা: বললেন : এটা কোনো ঔষধই নয় বরং এটা নিজেই একটা রোগ। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল আশরিবাহ) আধুনিক বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণও একই কথা প্রমাণ করছে। তিনি মদের প্রতি জিরো টলারেন্সের অংশ হিসেবে যেসব বিশেষ পাত্রে মদ পরিবেশন করা হতো সেগুলোর ব্যবহারও নিষিদ্ধ করেন। (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল আশরিবা)
মহান আল্লাহ তাঁর মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও তাঁর রাসূলের মাধ্যমে মাদকদ্রব্যের ব্যাপারে এমন নৈতিক শিক্ষা প্রদান করেন যে, তার প্রভাবে অধিকাংশ মানুষ মদ খাওয়া ছেড়ে দিলো। সে সমাজে শত শত পুলিশ সদস্য, শক্তিশালী প্রচারমাধ্যম, ভীতিকর গোয়েন্দা সংস্থা ছিল না। অথচ এই সবকিছু থাকার পরও পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র শুধু নৈতিক শিক্ষার অভাবে মাদকাসক্তির মতো ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধিকে নির্মূল করতে ব্যর্থ হলো।
ইসলাম শুধু নৈতিক শিক্ষা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, পাশাপাশি অপরাধের উৎস, উপকরণ ও আইনের যথার্থ প্রয়োগ ও শাস্তিরও ব্যবস্থা করেছে। ওমর রা:-এর সময় তাঁর ছেলে মিসরে থাকাকালে মদপান করে। ওখানকার গভর্নর তার মর্যাদার কথা বিবেচনা করে তাকে লঘু শাস্তি প্রদান করেন। এ খবর জানতে পেরে ওমর রা: খুব রাগান্বিত হন এবং গভর্নরকে আদেশ করেন যেন এই ছেলেকে উটের পিঠে করে কাঠের ওপর বসিয়ে মদিনায় প্রেরণ করা হয়। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। খলিফা নিজেই তাকে বেত্রদণ্ড প্রদান করেন, তাতে তার মৃত্যু হয়। এই ছিল আইনের প্রয়োগ।
আমাদের দেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা যাক। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (উঘঈ) রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের আগে আমাদের দেশে মাদকদ্রব্যের প্রচলন খুব কম ছিল। মেথর, ডোম, চা বাগানের শ্রমিক ইত্যাদি শ্রেণীর মধ্যে ঘরে তৈরি মদ, ভাং ইত্যাদি সীমিত আকারে ব্যবহার করা হতো। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ফেনসিডিল, হেরোইন, প্যাথিড্রিন ইত্যাদি নারকোটিক দ্রব্য উৎপন্ন হয়। এগুলো চোরাইপথে আসা শুরু হলে ক্রমান্বয়ে ফেনসিডিল, হেরোইন ইত্যাদির ব্যবহার বাড়তে থাকে। গত কয়েক বছরে নতুন ড্রাগ ইয়াবা সংযোজন হয়েছে, যা প্রধানত উৎপন্ন হয় মিয়ানমারে। আমাদের জনসংখ্যার ৫২% এর বয়স ১৫-৩৫ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে মাদকাসক্তি বিশেষ করে ইয়াবার ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে এটি ট্যাবলেট আকারে পাওয়া যায় এবং সহজে বহনযোগ্য। উঘঈ-এর মতে, বর্তমানে আমাদের দেশে প্রায় চল্লিশ লাখ লোক মাদকদ্রব্য সেবন করে থাকে। বিভিন্ন ঘএঙ-এর মতে এ সংখ্যা প্রায় সত্তর লাখ। ২০২০ সালে করোনা মহামারীর মধ্যেই প্রায় চার কোটি ইয়াবা আটক করা হয়। আর ২০২১ সালের প্রথম চার মাসেই তিন কোটি ইয়াবা আটক করা হয়েছে। চোরাইপথে আসা ইয়াবার মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ আটক হয় আর বাকি ৯০ শতাংশ মার্কেটে চলে আসে। ইন্টারনেট মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে ইয়াবার হোম ডেলিভারির রিপোর্টও পাওয়া যাচ্ছে।
আমাদের পুলিশ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, মাদকদ্রব্যকে সীমান্তে বা প্রবেশমুখেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মিয়ানমারের সাথে ১৩০ মাইলব্যাপী সীমান্তে নিয়োজিত বিজিবির বক্তব্য হচ্ছে তাদের জনবল এই কাজের জন্য অপ্রতুল। ৩৮ মাইলব্যাপী নাফ নদীর আন্তর্জাতিক সীমানা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কোস্টগার্ডের বক্তব্যও একই। বেশ প্রশস্ত এই নদীতে সেন্টমার্টিনগামী প্রমোদতরী থেকে শুরু করে শতশত নৌযান প্রতিদিন চলাচল করে থাকে। বিশেষ করে ইয়াবা পাচার হয় অনেক সময় মোবাইল ফোন, পুরুষ ও মহিলার শরীরের ভেতরে রেখে, মোটরসাইকেলের ফুয়েল ট্যাংক, গাড়ি, ট্রাকের গোপন চেম্বার ইত্যাদির মাধ্যমে। অন্যান্য মাদকের চেয়ে ইয়াবা পাচার সুবিধাজনক হওয়াতে এর লালচে রঙ ও রুটও বর্তমানে পরিবর্তন করা হচ্ছে। এ কারণে সীমান্তে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক অন্যান্য সংস্থার মতে দুর্বল সীমান্ত ও কাস্টমস নিয়ন্ত্রণের কারণে বাংলাদেশে আশঙ্কাজনকভাবে মাদকাসক্তি বেড়ে চলেছে এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক চোরাচালানের রুট হিসেবেও এ দেশ ব্যবহৃত হচ্ছে। মাদকের ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে আমাদের দেশে সম্প্রতি ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৯০ সালের মাদক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ সংশোধন করে ২০১৮ সালে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। আগে ৫০ গ্রাম মাদক পেলে শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। বর্তমানে পাঁচ গ্রাম মাদকদ্রব্য প্রধানত ইয়াবা পেলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। আশা করি, এ আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ হলে আমরা সুফল পেতে শুরু করব।
আমাদের দেশের ভেতরে মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধে বিজিবি, কাস্টমস, কোস্টগার্ড ও পুলিশের সবারই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অভিযোগ, পুলিশ, কাস্টমস ইত্যাদি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো কোনো সদস্য মাদক কারবারের সাথে জড়িত। সম্প্রতি ওসি প্রদীপের নানারকম অপকর্ম ও নিষ্ঠুর আচরণ পুলিশ বিভাগের ভাবমর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুণœ করেছে। ওই অফিসার পুলিশ চেকপোস্টে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করেছে নিরস্ত্র মেজর সিনহাকে (অব:) যার রয়েছে বর্ণাঢ্য অতীত। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে, মাদক কারবারের তথ্য উদঘাটন করতে যাওয়াই তার জন্য কাল হলো। কিছু দিনের মধ্যে সিনহা হত্যাকাণ্ডের বর্ষপূর্তি হবে। তার পরিবার আশায় বুক বেঁধে আছে যে, এই অপরাধীর যথার্থ সাজা হবে। এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডটির যদি যথার্থ বিচার না হয়, তাহলে তা হবে দেশের মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অশনিসঙ্কেত।
গত ২৮ জুন পত্রিকা প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে, কক্সবাজার পুলিশের পিবিআইএর এসআই শেখ মাসুদ রানা নিজে গাড়ি চালিয়ে আসার সময় ১১ হাজার ৫৬০ পিস ইয়াবাসহ র্যাবের হাতে ধরা পড়েন, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০-৪০ লাখ টাকা। ৩৫ বছর বয়স্ক এই অফিসার তার নিজের সন্তানের মাদকাসক্তির ব্যাপারে হয়তো বর্তমানে চিন্তিত নন। কিন্তু এমন একদিন আসতে পারে যে, তারই সন্তান জুয়া খেলে আর ইয়াবা খেয়ে তার অবৈধ সম্পদ নষ্ট করে আরো টাকার জন্য তারই পিস্তল দিয়ে তাকে গুলি করতে পারে।
আমাদের সংবিধানের ১৮তম ধারা অনুযায়ী মাদকদ্রব্য ও জুয়া নিষিদ্ধ এবং এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের পক্ষে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো প্রধানত এই দায়িত্ব পালন করে থাকে। এই সংস্থাগুলোর কেউ যদি মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকেন, তিনি শুধু সাংবিধানিক শপথই ভঙ্গ করেন না, তিনি জননিরাপত্তা ও দেশের নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ। তাই সীমান্তে বসবাসরত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোনো ব্যক্তির মাদক পাচারের অপরাধের তুলনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্যের একই অপরাধ অনেক বেশি গুরুতর। সুতরাং ঘটনা দুটোর ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি আপসহীনভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার। এসব ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে যদি গড়িমসি করা হয় তাহলে তা হবে সমগ্র দেশ ও জাতির জন্য আত্মঘাতী পদক্ষেপ। তাদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করার অর্থ হবে এসব বাহিনীর অন্য সদস্যদেরও হেরোইন, ইয়াবা ইত্যাদির মাধ্যমে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা।
ওপরের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, যেকোনো অপরাধ দমনের যে তিনটি উপাদান আলোচনা করেছি তার মধ্যে আইনের শাসনের অভাব ও অপরাধের উপকরণের সহজলভ্যতা আমাদের দেশে পরিলক্ষিত হচ্ছে। নৈতিক শিক্ষা যদি স্কুল-কলেজে না দেয়া হয়, তাহলে পুলিশ, কাস্টমস, বিজিবি ও কোস্টগার্ডে ওসি প্রদীপের মতো লোক তৈরি হবে। পৃথিবীর সব দেশে অপরাধী চক্র থাকে। কিন্তু আইনের শাসনের কারণে তাদের কর্মকাণ্ড থাকে সীমিত।
প্রশ্ন হচ্ছে, মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে নৈতিক শিক্ষা আমাদের মুসলিমপ্রধান দেশে কোথা থেকে আসবে, বিশেষ করে স্কুল কলেজে? যুক্তরাষ্ট্র সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কোটি কোটি ডলার খরচ করেছিল, তাতে কাজ হয়নি। আর আমাদের তো সেই সক্ষমতাও নেই। অথচ আমরা ন্যূনতম খরচে আমাদের স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচিতে নৈতিক শিক্ষাকে ভালোভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি। মাদক অধিদফতরের স্লোগান ‘মাদককে না বলুন’ এটা একজন শিক্ষার্থীর মনে যতটা না প্রভাব ফেলবে, মদসংক্রান্ত রাসূল সা:-এর হাদিস বিশেষ করে দশজন লোককে রাসূল সা: অভিশাপ দিয়েছেন এই হাদিসটি তার মনে অনেক বেশি দাগ কাটতে বাধ্য। মাদকদ্রব্যের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানাতে হবে শিক্ষার মাধ্যমে।
আমাদের স্কুলের পাঠ্যবইগুলোতে নৈতিক শিক্ষার মান মোটেই সন্তোষজনক নয়। অথচ ব্রিটিশ কারিকুলামে (ঙ খবাবষ, অ খবাবষ) গল্প, কবিতা, জীব-জন্তুর কথোপকথন ইত্যাদির মাধ্যমে শিশুদেরকে অনেক বেশি নৈতিক শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে শিশুদেরকে নৈতিক শিক্ষাদানের বিষয়টি উপেক্ষা করা হচ্ছে। শিক্ষা বিভাগের এ রকম পদক্ষেপ বঙ্গবন্ধুর নীতিরও পরিপন্থী। বঙ্গবন্ধু এ রকম দেশ চাননি যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আদর্শ আল্লাহর রাসূল, তাঁর খলিফা ও সাহাবীদের জীবনীকে উপেক্ষা করা হবে। বঙ্গবন্ধু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুভূতির কথা বিবেচনা করে রেডিও, টিভিতে কুরআন তেলাওয়াত ও আজান প্রবর্তন করেছিলেন, মদ নিষিদ্ধ করেছিলেন, ঘোড়দৌড়ের জুয়া বন্ধ করেছিলেন। আমরা যদি সত্যিই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন করতে চাই তাহলে এর অর্থ হবে নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করে মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, ন্যায়নীতি, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করা।
রাসূল সা: ও তাঁর খলিফাদের শিক্ষা হচ্ছে অসম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় রাসূল সা: ও তাঁর খলিফারা দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য যে ন্যায়পরায়ণ ও ইনসাফপূর্ণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা সবার জন্যই অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। তাদের জীবন থেকে অমুসলিমরাই বরং বেশি শিক্ষা নিচ্ছেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা গান্ধীজি বলেছেন, ‘আমি জীবনীগুলোর মধ্যে সেরা একজনের জীবন সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম যিনি আজও লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ে অবিতর্কিতভাবে স্থান নিয়ে আছেন। যেকোনো সময়ের চেয়ে আমি নিশ্চিত যে, ইসলাম তরবারির মাধ্যমে সে দিনগুলোতে মানুষের জীবন ধারণ পদ্ধতিতে স্থান করে নেয়নি। ইসলাম প্রসারের কারণ হিসেবে কাজ করেছে নবীর দৃঢ় সরলতা, নিজেকে মূল্যহীন প্রতিভাত করা, কঠোরভাবে ওয়াদা/চুক্তি পালন, বন্ধু ও অনুসারীদের জন্য নিজেকে চরমভাবে উৎসর্গ করা, অটল সাহস, ভয়হীনতা, ঈশ্বর এবং তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বে অসীম বিশ্বাস।’ (ণড়ঁহম ওহফরধ, ১৯২৪) ( ইয়ং ইন্ডিয়া ১৯২৪)
গান্ধীজি ব্যারিস্টার হওয়ার পর একসময় স্যুট টাই পরতেন। নিজেকে মূল্যহীন প্রতিভাত করে নবীজির মতোই তিনি পোশাকে, খাদ্যে, জীবন ধারণে সহজ সরল নীতি গ্রহণ করেন। নবীজি তৎকালীন সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত শ্রেণী, দাসদের মুক্তির লক্ষ্যে অনেক ব্যবস্থা নেন। গান্ধীজিও হরিজনদের উন্নতির লক্ষ্যে কাজ করেন। রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও নবীজি আরবীয় ঘোড়া বাদ দিয়ে গাধার পিঠে চড়তেন, তাও একজন সঙ্গীসহ। উদ্দেশ্য, শাসকদের জন্য অহঙ্কারমুক্ত জীবনের নজির স্থাপন করা। গান্ধীজি ব্রিটিশভারতের মুকুটবিহীন সম্রাট হয়েও ট্রেনে তৃতীয় শ্রেণীতে ভ্রমণ করতেন। নবীজিকে কিছুটা অনুসরণের ফল গান্ধীজি হাতে নাতে পেয়ে গেলেন। অখণ্ড ভারতের অধিকাংশ মানুষ তার আচরণে মুগ্ধ হয়ে তাকে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বরণ করে নিলো।
পশ্চিম আফ্রিকার আইভরি কোস্টে এক বছর জাতিসঙ্ঘ বাহিনীর হাসপাতালে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। অত্যন্ত সম্পদশালী হওয়ার পরও দেশটি গৃহযুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত। ফরাসিরা সুকৌশলে এ জাতিকে দু’ভাগে ভাগ করে রেখেছে। তাদের যুবসমাজ নাইট ক্লাব, মদ আর এইডসের আক্রমণে এতই বিপর্যস্ত যে, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিয়ে চিন্তা করার মতো সময় তাদের নেই। তাই দুই কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশটিতে ফরাসিরা মাত্র সাত হাজার সৈন্য ও অনুগত কয়েক হাজার জাতিসঙ্ঘ বাহিনীর মাধ্যমে ওই দেশের অর্থনীতিকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করছে। মাদকাসক্তিকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে আমাদেরকেও একই পরিণতি বরণ করতে হতে পারে। আশার কথা, আমাদের কাছে মাদকের ব্যাপারে রয়েছে নৈতিক শিক্ষার শক্তিশালী হাতিয়ার যা তাদের কাছে নেই। তা ছাড়া আমাদের শক্তিশালী ঐতিহ্যও রয়েছে। দিল্লির শক্তিশালী মোগল সম্রাটের বিরুদ্ধে বাংলার বার ভূঁইয়ারা স্বাধীনতার ঝাণ্ডা উত্তোলন করেছিলেন। একাত্তরের ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধেও আমাদের গৌরবময় সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা শক্তিশালী পাকিস্তানী বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে ফেলেন। প্রকাশ্য শত্রুর চেয়ে গোপন শত্রু আরো ভয়ঙ্কর, ট্রোজান যুদ্ধে ঘোড়ার ভেতর লুকিয়ে থাকা শত্রুদের মতো। যখন এরা আত্মপ্রকাশ করে তখন পরাজয়ই হয় অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। মাদকাসক্তি হচ্ছে তেমনি এক গোপন শত্রু। আমাদের দেশ ও জাতিকে মাদকাসক্তির বিষাক্ত ছোবল থেকে বাঁচাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যথার্থ নৈতিক শিক্ষা দেয়া এবং ‘জিরো টলারেন্সের’ যথার্থ প্রয়োগই হচ্ছে সময়ের অপরিহার্য দাবি। হ
লেখক : মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ



আরো সংবাদ