০৪ আগস্ট ২০২১
`

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ : নিয়োগ-বিতর্ক

-

সব ভালো ছাত্র বা ছাত্রীই ভালো পড়াবেন; সেটা নাও হতে পারে। পড়ানোর একটা আলাদা কৌশল আছে, আছে বিধিপ্রদত্ত বলার দক্ষতা। ফলে বেশি জেনেও সবটা ছাত্রছাত্রীদের বিলিয়ে দিতে অনেকেই সক্ষম হন না। অর্থনীতির প্রাজ্ঞজন অনেক উপদেশ দিতে পারেন, তবে একটি দেশের অর্থব্যবস্থা পরিচালনায় এই প্রাজ্ঞজনরা প্রায়ই সফল হন না- এই উদাহরণ দেশে দেশেই আছে। অর্থনীতির জাঁদরেল অধ্যাপক বাস্তব-অর্থনীতি নিয়ে হিমশিম খেতে পারেন। থিওরি আর বাস্তবতা আদপে ভিন্ন ব্যাপার। এই সময়ের একজন সচিবকে তার বুয়েটের স্যারদের সাথে মিষ্টি ঝগড়ায় বলতে শুনেছি, আপনারা পড়ান, আমি সেটা করে দেখাই এবং দেখিয়েছি; আপনারা যা পড়ান সেটা কোনো দিন করে দেখাননি।
সম্প্রতি একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে দু-তিনটা লেখা, বিবৃতি এবং সমাবেশ দেখে কথাগুলো মনে পড়েছে। ওই নিয়োগ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও পক্ষে এবং বিপক্ষে নানা মত প্রকাশ পেয়েছে। ঢাকা থেকে বেশ খানিকটা দূরের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে এই বিতর্ক। জামালপুরস্থ ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে’ একজন পিআরএল ভোগরত কর্মকর্তার নিয়োগ নিয়ে এই বিতর্ক। এই নিয়ে দু’টি উত্তর সম্পাদকীয় চোখে পড়েছে প্রথম আলো ও যুগান্তরে। প্রথম লেখাটির ওপর পাঠকদের নানা মন্তব্যও অনলাইনে দেখা সম্ভব হয়েছে। দু’টি নিবন্ধই লিখেছেন দু’জন অধ্যাপক। বলাবাহুল্য, বিবৃতি এবং সমাবেশ ঘটিয়ে বিপক্ষে যারা বলেছেন, তারাও একই গোত্রের। ফলে এ কথা মনে করা অন্যায় নয় যে, পদটির মূল স্টেক হোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই। নিবন্ধ দু’টি আকারে যাইই হোক না কেন, সারকথা একই। পার্থক্য এটুকুই- যুগান্তরের নিবন্ধটিতে নিবন্ধকার আমলাদের গুণগান গাইতে অনেক বাক্য ব্যবহার করে শেষে দিলেন কোষাধ্যক্ষ পদটিতে তাদের নিয়োগ পাওয়ার যুক্তি। প্রথম আলোয় নিবন্ধকার এই সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আট-দশজন ভিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ এবং সে কারণে অন্যরা আসার সুযোগ পেয়েছেন, এমন বলেছেন। দু’টি লেখার সারকথা এই- একজন আমলা শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত নন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার কিছুই জানেন না বলে অর্থ বরাদ্দে সমস্যা হবে। যদি কিছু মনে না করেন, অধ্যাপকদের লেখায় আরো ধার এবং যুক্তি প্রত্যাশিত ছিল; সেভাবে আসেনি। এর চেয়ে বরং সরাসরি এটুকু বললেই ভালো হতো যে, ওই পদটিতে দীর্ঘদিন শিক্ষক ছিলেন, তাই আমরাই ওই পদের দাবিদার। প্রথম আলোর নিউজের ওপর পাঠকের মন্তব্য একদিন পর আর দেখা যায়নি। ফলে অনেক মন্তব্যের সবটি যথাযথভাবে উদ্ধৃত করা প্রায় অসম্ভব। আগেই বলেছি, পক্ষে এবং বিপক্ষে প্রবল যুক্তি দিয়ে মন্তব্য করা হয়েছিল। বিপক্ষের মন্তব্যে যা হয়; আমলাদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার- দেশ চালাতে পারেন না, এবার বিশ্ববিদ্যালয় দখল। আরো ছিল, আমলাদের দুর্নীতি এবং নির্বাচনে সরকারের পক্ষাবলম্বন।
সামাজিক মাধ্যমে একজন লিখেছেন, এ হয়তো নির্বাচনের পুরস্কার। একজন এমনও বলেছেন, তিনি শিক্ষকদের মতোই একজন (হয়তো নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে চেনেন)। কেউ লিখেছেন, এ তো ডাক্তারদের বিরোধিতার মতোই- স্বাস্থ্য অধিদফতরে পরিচালক প্রশাসন পদে একজন অতিরিক্ত সচিব নিয়োগ দেয়া হলে ডাক্তাররা কালই রাস্তায় নামবেন, কিন্তু কয়েকটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক যে, সেনাবাহিনী থেকে এসেছেন এই নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই। তিনি আরো বলেছেন, ঔষধ প্রশাসন বা কেন্দ্রীয় ঔষধ ডিপোতে ‘পোশাকধারী’ এলে সমস্যা নেই, ‘সমস্যা’ অন্য কেউ এলে। প্রথাগত গণমাধ্যমের মতো সামাজিক মাধ্যমে সম্পাদনার কাঁচি থাকে না বলে ইচ্ছেমতো বলা যায়। কোনো ঘটনায় তেমনি দেখা যায়, অনেকটা যার যার ইচ্ছে। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কমবেশি পঞ্চাশ। সব ক’টিতে ভিসি-প্রোভিসি-ট্রেজারার নেই। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন একটু ভিন্ন এবং তাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ-ইচ্ছের খানিকটা গন্ধ আছে বইকি। পুরনো তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১), রাজশাহী বি. (১৯৫৩), বাকৃবি (১৯৬১), বুয়েট (১৯৬২), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৬), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, (১৯৭০) এরপর আশির দশকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়- এগুলোর স্বায়ত্তশাসনের ধরন একটু ভিন্ন। বিগত নিকট বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ভিসি নিয়োগে তিনজনের নির্বাচিত প্যানেলের কথা নেই। মহামান্য চ্যান্সেলরের অভিপ্রায়ই এ ক্ষেত্রে মূলকথা। প্রোভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলরের ইচ্ছেই সার। তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ভিসি ও প্রোভিসিদের ক্ষেত্রে শিক্ষাবিদ-অধ্যাপকদের নিয়োগ দেয়ার কথা আছে; ট্রেজারারের ক্ষেত্রে ‘শিক্ষক-শিক্ষাবিদ-অধ্যাপক’ বলে কিছু নেই। ব্যতিক্রম ছাড়া এসব নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেজারার পদটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই নিয়োগ দেয়া হতো- এটিই রেওয়াজ। মনে রাখা আবশ্যক, আইনে সুস্পষ্ট কিছু না থাকলে প্রথা বা রেওয়াজ দিয়ে অধিকার সৃষ্টি হয় না; দাবি করাও চলে না। আইনে এ ক্ষেত্রে মহামান্য রাষ্ট্রপতির হাতকে অনেক বেশি প্রসারিত করা আছে।
২০০৮ সালের ডিসি সম্মেলনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ঘটনায় একজন ডিসি প্রশ্ন তুলেছিলেন, পুলিশ সুপাররা অফিসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন কোন আইন বা আদেশে? আইজিপি বলেছিলেন, প্রোভিশন। তখন অন্য একজন দাঁড়িয়ে বলেছেন, বিধিতে স্পষ্ট উল্লেখ থাকলে প্রোভিশন যায় না; আইজিপি তা মেনে নিয়েছেন। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অতিরিক্ত সচিবের নিয়োগ নিয়ে তিনজন সাবেক ভিসি (এর মধ্যে ঢাবি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে) বলেছেন, কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ মহামান্য চ্যান্সেলরের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। একজন বলেছেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় বলে জমি অধিগ্রহণসহ নানা কাজের জন্য একজন আমলাই উপযুক্ত হবেন। আরেকজন বলেছেন, নিশ্চয়ই সরকার ভালো মনে করেছে বলেই দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন ভিসির মতামত, মহামান্য চ্যান্সেলরের সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই- সবই খবরের কাগজ পড়ে জানা। আর শিক্ষক সমিতির একজন নেতা চুপিসারে বলেছেন, চ্যান্সেলর যেহেতু দিয়েই দিয়েছেন তাই এই নিয়োগটি নিয়ে বিরোধিতা নেই; চাই, সামনে যেন এ রকম আর না করা হয়; বলেছেন, আমরা রাজনীতি করি ওসব পদে যেতেই; বোঝেনই তো। এই দেশে শিক্ষকতা করার চেয়ে প্রশাসনিক পদ পেতে মরিয়া প্রায় সবাই। অধ্যাপক থাকবেন না; অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ হবেন; ডিজি-ডাইরেক্টর হবেন। একজন ভালো শিক্ষক প্রধান শিক্ষক হয়ে গেলে ছাত্ররা তার থেকে আর কিছুই পায় না। ভালো ডাক্তার অধ্যক্ষ-পরিচালক হলে রোগী বঞ্চিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো শিক্ষক প্রশাসনিক পদ পেলে ছাত্রছাত্রীরা তাকে আর পায় না; হয় না গবেষণা। তাই বলে এসব পদে বাইরে থেকে কেউ যত্রতত্র আসবেন সেটাও সমীচীন নয়; একদমই আসবে না, তারও মান্যতা দেয়া যায় না- এ কারণেই মহামান্য চ্যান্সেলরের হাত এই ক্ষেত্রে ‘অনেক লম্বা’। দেশে একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই একটি বিশেষ সুযোগ আছে- অধ্যাপক হওয়ার জন্য পদের বালাই নেই, চাকরিতে ক’টা বছর পেরুলেই হলো; অধ্যাপক হওয়ার তিন বছর পর দ্বিতীয় গ্রেড, অতঃপর প্রথম গ্রেড; কিন্তু এটি সিভিল সার্ভিসেও নেই, নেই অন্য কোনো সরকারি নিয়মে। উপরে যাওয়ার এই সুবিধা থাকার পরও চাই প্রশাসনিক পদ; চাই আরো সুবিধা, যা শিক্ষকতার আদর্শের সাথে একদমই খাপখায় না। বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ট্রেজারারের যে দায়িত্ব বিবৃত হয়েছে তাতে লেখাপড়া-পরীক্ষা-গবেষণার বিন্দু পরিমাণ সম্পর্কও দেখা যায় না। বরং কোষাধ্যক্ষের বর্ণিত কাজের সাথে একজন শিক্ষকেরই সম্পর্ক নেই; সমগ্র অধ্যপনা জীবনে তাকে ওসবের কিছুই করতে হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটির প্রধান হলেন উপাচার্য নিজেই। অনেক শিক্ষক আছেন এই কমিটিতে। গবেষণার জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব উত্থাপিত হয় নিজ নিজ বিভাগ থেকে। ফলে কোষাধ্যক্ষের গবেষণা জ্ঞান প্রাসঙ্গিক নয়; যারা বাজেট দেন তাদেরই এই জ্ঞান নেই বলে অভিযোগ। অধিকন্তু, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের সামান্যই থাকে গবেষণার জন্য (অথচ এ নিয়েই গুরুত্ব সহকারে দু’টি নিবন্ধ)। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক পদগুলোতেও শিক্ষক নেই। তবে ‘রেজিস্ট্রার’ পদটির সাথে ভর্তি-বৃত্তির সম্পর্ক আছে- সেটি নিয়ে কথা ওঠা অধিকতর মানানসই।
অক্সফোর্ডের বর্তমান ছ’জন প্রোভিসির দু’জন শিক্ষকই নন। রেজিস্ট্রার ভদ্র মহিলাও অশিক্ষক। ক্যামব্রিজের বর্তমান ভিসি অধ্যাপনা ছেড়ে একটি বিশ্ব সংস্থায় যোগ দিয়েছিলেন; ২০ বছর পর ফিরে এসে তিনি ভিসি- এই বাংলাদেশে এসব করা হলে মহাবিপদ দেখা দেবে। এককালে একজন আমলাও ভিসি ছিলেন এই ভূখণ্ডে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ক্যাডারের আমলা ট্রেজারার হয়েছেন; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তখন চুপ ছিলেন। ক’দিন আগেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন আমলা দু-মেয়াদে আট বছর কোষাধ্যক্ষ পদে ছিলেন। বিওপিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি-প্রোভিসি-ট্রেজারার-রেজিস্ট্রার-ডিন- কোনো পদেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেই। তবুও ভালোই চলছে। ভালো চলছে সম্পূর্ণ আলাদা পেশা থেকে আসা অধ্যক্ষদ্বয়ের পরিচালিত রেসিডেন্সিয়াল মডেল ও রাজউক কলেজ। সহজ কথা, ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০-১৫টির কোষাধ্যক্ষ পদে আমলা-রাজনীতিকদের বসিয়ে দেখি না; দেখা যাক, তারাও নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে ডুবে যান কি না। কেবল শিক্ষকদের দেয়া হলে তুলনা করার সুযোগ কোথায়? সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বিসিএসআরআই, এমই ফাউন্ডেশনে শিক্ষক বসিয়ে সরকার সেটাই দেখতে চাইছে- আমজনতাও সেটি চাইছে। এখানে সেটা হতে এতটা আপত্তির কিছু নেই। আমলা-রাজনীতিক-ব্যবসায়ী-শিক্ষক তো ভিন্ন কিছু নন; এই দেশেই জন্মেছেন। ভালো করার ইচ্ছাটাই আসল। মানুষটি ভালো হলেই রক্ষা। ওই রিটায়ার্ড (টায়ার্ড নন তো!) কর্মকর্তা ভালো করলে অবশ্যই সরকারকে ধন্যবাদ জানাবে মানুষ।



আরো সংবাদ