০৪ আগস্ট ২০২১
`

কিশোর অপরাধ : মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

-

শিশু-কিশোররাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে দেশ ও জাতির উন্নতি। শিশু-কিশোরদের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশের ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা অপরিসীম। তাদের একটি অংশ কোনো কারণে অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চরম হুমকি ও সুস্থ সমাজ জীবনের প্রতিবন্ধক হোক তা কারো কাম্য নয়। এ জন্যই ইসলাম শিশু-কিশোরদের সুস্থ, স্বাভাবিক ও সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে এবং অপরাধমুক্ত জীবন-যাপনে অভ্যস্ত করতে উপস্থাপন করেছে সার্বজনীন ও কল্যাণকর নীতিমালা। যা বাস্তবে কার্যকর করতে পারলে পরিবার পেতে পারে কাক্সিক্ষত প্রশান্তি এবং দেশ ও জাতি লাভ করতে পারে অমূল্য সম্পদ।
কিশোর অপরাধ প্রত্যয়টির ইংরেজি হলো ঔাঁবহরষব উবষরহয়ঁবহপু। আর উবষরহয়ঁবহপু ল্যাটিন শব্দ উবষরহয়ঁবৎ থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ: ঃড় ড়সরঃ বাদ দেয়া, বর্জন করা, উপেক্ষা করা ইত্যাদি। রোমানরা কোনো ব্যক্তির ওপর আরোপিত কর্ম অথবা কর্তব্য পালনে ব্যর্থতা বুঝাতে উবষরহয়ঁবহপু শব্দটি ব্যবহার করত। ১৪৮৪ সালে উইলিয়াম কক্সসন সর্বপ্রথম এই পরিভাষাটি দোষী ব্যক্তির প্রচলিত অপরাধ বর্ণনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিলেন। এ ছাড়াও ১৬০৫ সালে ইংরেজ কবি শেক্সপিয়রের বিখ্যাত নাটক ‘গধপনবঃয’ এ শব্দটির ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
কিশোর অপরাধ পরিভাষা আলোচনার আগে শব্দ দু’টিকে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করলে এর প্রতিপাদ্য বিষয় সহজেই বোধগম্য হবে। সাধারণত কিশোর বলতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক তথা বাল্য ও যৌবনের মধ্যবর্তী বয়সের ছেলেমেয়েদের বুঝায়। তবে কৈশোর কালের সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও ইসলামী আইনে কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। প্রচলিত আইনে দেশ ও সমাজভেদে নির্দিষ্ট বয়সের ছেলেমেয়েরা কিশোর-কিশোরী হিসেবে বিবেচিত। যেমন বাংলাদেশে কিশোর অপরাধীর বয়স সীমা হলো ৭ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত। এ ছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রচলিত কিশোর অপরাধীর বয়সসীমা নিচের সারণীতে তুলে ধরা হলো: মিয়ানমার ৭ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, শ্রীলঙ্কা ৭ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, ভারত ৭ থেকে ১৬ বছর, পাকিস্তান ৭ থেকে ১৫ বছর, ফিলিপাইন ৯ থেকে ১৬ বছর, থাইল্যান্ড ৭ থেকে ১৮ বছর, জাপান ১৪ থেকে ২০ বছর, ইংল্যান্ড ৮ থেকে ১৭ বছর, ফ্রান্স ১৩ থেকে ১৬ বছর, পোল্যান্ড ১৩ থেকে ১৬ বছর, অস্ট্রিয়া ১৪ থেকে ১৮ বছর এবং জার্মানি ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত।
মহান আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন স্তরে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর অসীম রহমতে মানব সন্তান শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও প্রৌঢ়কাল পেরিয়ে বার্ধক্যে উপনীত হয়।
মানবজীবনের বিবর্তিত স্তরগুলোকে আরবি অভিধানে বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইসলামী আইনবিদরা কিশোর বলতে ওই ছেলেদের বুঝিয়েছেন যাদের ইহতিলাম বা স্বপ্নদোষ শুরু হয়নি এবং কিশোরী বলতে যাদের হায়েজ বা মাসিক ঋতুস্রাব হয়নি এমন মেয়েদেরকেই বুঝিয়েছেন। ইসলামী আইনবিদরা কিশোর-কিশোরীর বয়সের চূড়ান্ত সীমা নির্ধারণের ব্যাপারে বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ: ও মালিকি আইনবিদদের মতানুযায়ী যে ছেলের ইহতিলাম বা বীর্যপাত হয়নি, তার আঠার বছর পূর্ণ বা হওয়া পর্যন্ত সে কিশোর হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যে মেয়ের ঋতুস্রাব হয়নি, তার সতের বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কিশোরী বলে গণ্য করা হবে। অন্য দিকে কোনো ছেলেমেয়ের মধ্যে বয়ঃপ্রাপ্ত কোনো লক্ষণ যদি আদৌ প্রকাশ না পায়, তাহলে পনের বছর বয়সে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত তারা উভয়ই কিশোর-কিশোরী হিসেবে বিবেচিত হবে বলে ইমাম শাফিই, ইমাম আহমাদ, হানাফি আইনবিদ ইমাম মুহাম্মাদ ও আবু ইউসুফ রহ:সহ অধিকাংশ আইনবিদ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
অপরাধের আরবি আল জারিমাহ। ইংরেজিতে একে পৎরসব, ড়ভভবহংব বলা হয়। আল জারিমাহ শব্দটি একবচন, বহুবচনে আল জারাইম, যা আল জুরম থেকে উদ্ভূত। আল জুরর শব্দটির জিম অক্ষরে পেশ যোগে অর্থ পাপ, সীমালঙ্ঘন ইত্যাদি। ইসলামী আইনের পরিভাষায় অপরাধ বলতে শরিয়তের এমন আদেশ-নিষেধের লঙ্ঘনকে বুঝায়, যা করলে হদ্দ অথবা তাজির প্রযোজ্য হয়।
কিশোর অপরাধ প্রত্যয়টির সংজ্ঞায়নে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিশোর বয়সে অবাঞ্ছিত ও সমাজ বিরোধী আচরণ সম্পাদন করাকেই বলা হয় কিশোর অপরাধ। মার্কিন অপরাধ বিজ্ঞানী ঈধাধহ বলেন, সমাজ কর্তৃক আকাক্সিক্ষত আচরণ প্রদর্শনে কিশোরদের ব্যর্থতাই কিশোর অপরাধ। আইনগত দিক থেকে কিশোর অপরাধ বলতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়ে কর্তৃক আইনবিরুদ্ধ দণ্ডনীয় কর্ম সম্পাদনকেই বুঝায়। জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক কিশোর অপরাধের নির্ধারিত সংজ্ঞায় বলা হয়, ঔাঁরহরষব উবষরহয়ঁবহপু ংযড়ঁষফ নব ঁহফবৎংঃড়ড়ফ ঃযব পড়সসরংংরড়হ ড়ভ ধহ ধপঃ যিরপয রং পড়সসরঃবফ নু ধহ ধফঁষঃ, ড়িঁষফ নব পড়হংরফবৎবফ ধ পৎরসব.
কিশোর অপরাধ বলতে কমিশন সে কাজকে বুঝায়, যে কাজ একজন বয়স্ক ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হলে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
উপর্যুক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে কিশোর অপরাধের পরিচয়ে বলা যায় যে, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়ে কর্তৃক সংঘটিত দেশীয় আইন, সামাজিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধের পরিপন্থী কর্মকাণ্ডকেই কিশোর অপরাধ বলে।
কৈশোরকাল মানব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ স্তর শেষ হওয়ার সাথে সাথে প্রত্যেক মানব সন্তানের ওপর বিভিন্ন শরয়ি বিধিবিধান ও সামাজিক দায়দায়িত্ব আরোপিত হয়। এর আগ পর্যন্ত কিশোর-কিশোরীরা গায়রু মুকাল্লাফ বা বিধিবিধান পালনের বাধ্যবাধকতামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। কেননা হাদিসে তিন ব্যক্তিকে শরিয়তের বিধান পালনের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দিয়ে বলা হয়েছে, তিন ব্যক্তি যাবতীয় দায় থেকে অব্যাহতি পেয়েছে; ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, অপ্রাপ্ত বয়স্ক যতক্ষণ না বয়ঃপ্রাপ্ত হয় এবং পাগল যতক্ষণ না সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন হয়।
সে জন্য আল্লাহর অধিকার লঙ্ঘনজনিত অথবা মানুষের অধিকার ক্ষুণœকরণজনিত কারণে তাদের ওপর শরিয়ত নির্ধারিত হুদুদ হুদুদ ও কিসাস পর্যায়ের শাস্তি প্রযোজ্য নয়। তবে জনস্বার্থে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য তাদেরকে সংশোধনমূলক তাজিরি শাস্তি প্রদান করার নির্দেশনা ইসলামী আইনে বিদ্যমান রয়েছে। যেমন রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন, তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছরে পদার্পণ করলে সালাত আদায়ের নির্দেশ দেবে। দশ বছর বয়সের পর সালাত আদায় না করলে তাদেরকে প্রহার করবে এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দেবে।
এ প্রসঙ্গে ড. আব্দুল আজিজ আমিরের অভিমতটি উল্লেখ করা যেতে পারে। তার মতে, একজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু-কিশোর ব্যভিচার, চুরি বা ডাকাতির মতো অপরাধ করলে সামাজিকভাবে তাকে অপরাধী বলে গণ্যই করা হবে নাÑ এমনটি মনে করা সঠিক নয়, কেননা তা হবে আইনের অপব্যাখ্যা মাত্র। বরং উত্তম হলো যে, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির অপরাধের ন্যায় শিশু-কিশোরের অপরাধও আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। শুধু পার্থক্য হলোÑ শর্তপূরণ না হওয়ার কারণে শিশু-কিশোরদের ওপর সুনির্দিষ্ট শাস্তি যেমন হুদূদ, কিসাস প্রয়োগ করা যাবে না। তবে কোনো শিশু-কিশোর যদি শরিয়তের সুনির্দিষ্ট শাস্তিযোগ্য গুরুতর অপরাধ করে অথবা সুনির্দিষ্ট তাজিরি অপরাধগুলোর মধ্যে কোনো একটি অপরাধ সংঘটন করে তাহলে তার অপরাধের মাত্রা ও বয়সের উপযুক্ততা বিচার করে সংশোধনমূলক কোনো শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে ইসলামী আইনে কোনো বাধা-নিষেধ নেই।
অতএব, ইসলামের দৃষ্টিতে কিশোর অপরাধ বলতে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে কর্তৃক শরিয়াতের এমন আদেশ-নিষেধের লঙ্ঘনকে বুঝায়, যা করলে তা’জির প্রযোজ্য হয়।
আর্থসামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাবে মানসিক গুণাবলির সুষ্ঠু বিকাশ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের অভাবে শিশু-কিশোররা অপরাধ প্রবণ হয়ে ওঠে। এ জন্যই প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড অবদমিত কামনাকে অপরাধের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ ব্যাপারে বার্ট্রান্ড রাসেলের মন্তব্যটিও প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, বেশির ভাগ নিষ্ঠুরতার জন্ম হয় শৈশবকালীন বঞ্চনা এবং নিপীড়নের কারণে। মানুষের স্বাভাবিক বিকাশের পথ রুদ্ধ হলে মনের কোমল অনুভূতিগুলো নষ্ট হয়ে তার বদলে জন্ম নেয় হিংসা, নিষ্ঠুরতা এবং ধ্বংসাত্মক মনোভাব। প্রফেসর মো: আতিকুর রহমান, সামাজিক সমস্যা এবং সমস্যা বিশ্লেষণ কৌশল। এ ছাড়া ব্যক্তিগত আবেগীয় সমস্যাও কিশোর অপরাধের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত। এ ধরনের কিশোররা খুব সহজেই অনিয়ন্ত্রিত আবেগে আক্রান্ত হয়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণের মাধ্যমে সুখ ও সন্তুষ্টি লাভে সচেষ্ট হয় এবং অপরাধ সংঘটন করে। এ জন্যই মার্কিন মনোবিজ্ঞানী হিলে ও ব্রুনার কিশোর অপরাধের জন্য বাধাগ্রস্ত আবেগকে দায়ী করেছেন। ড. এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান, সামাজিক সমস্যা।
কিশোর অপরাধ সংঘটনে উপর্যুক্ত কারণগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সক্রিয় থাকতে পারে। তবে কিশোর অপরাধের প্রধান ও মূল কারণ হলো মানসিক। কেননা মানুষের প্রতিটি কর্মই মনের পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়ে থাকে। আর মানসিক বিকাশ সঠিক ও সুন্দর প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন না হলে শিশু-কিশোরদের আচরণে বিরূপ প্রভাব পড়ে এবং তাকে অপরাধপ্রবণতার দিকে ধাবিত করে। মানব মন মহান আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। এর সুষ্ঠু লালন ও বিকাশ সাধন করলে তা ভালো কাজ সম্পাদন করে। আর লালন পালন ও বিকাশ সাধনে ত্রুটি হলে তা দ্বারা মন্দ কর্ম বা অপরাধ সংঘটিত হয়। মনের এ বিপরীতমুখী দ্বিবিধ আচরণের বাস্তব তত্ত্ব তুলে ধরে আল্লাহ তায়ালা বলেন, প্রাণের শপথ, আর শপথ সে সত্তার, যিনি তাকে সুসংহত করেছেন। অতঃপর তাকে দিয়েছেন ভালো-মন্দের অনুভূতি। যে তাকে পরিচ্ছন্ন রেখেছে, সে নিশ্চিত কল্যাণ লাভ করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তাকে মলিন করেছে। আল কুরআন, ৯১ : ৭-১০।
নুমান ইবন বাশির রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, সাবধান শুনে রেখো, দেহ বা শরীরে একটি গোশতের টুকরা আছে, যখন তা সুস্থ ও ভালো থাকে তখন সমস্ত দেহ ও শরীর ভালো থাকে এবং তা যখন নষ্ট ও বিকৃত হয়ে যায় তখন সমস্ত দেহ ও শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রেখো, সেটি হলো কলব বা অন্তর। হ



আরো সংবাদ