১৩ মে ২০২১
`

অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আর কত দিন?

তৃতীয় নয়ন
-

এখন বিশ্বজুড়ে মহামারীর ছোবল। আরো উদ্বেগজনক হলো এর টিকার সম্ভাব্য অভাব। দুনিয়ার বহু দেশ আজো টিকা পায়নি। টাকা দিলে নাকি ‘বাঘের দুধও মিলে’, কিন্তু এখন টাকা দিয়েও করোনাভাইরাসের ওষুধ মিলছে না। তবু ভাগ্য ভালো, বাংলাদেশ সরকার আগেই অনেক টাকা দিয়ে পড়শি দেশে এ টিকার জন্য অর্ডার বুক করে রেখেছিল। কিছুটা বিলম্বে আর কিছু কম পরিমাণে হলেও এ টিকা দেশে আসছে। অবশ্য এ দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য তা অপ্রতুল বৈ কি। তবুও মোটের ওপর টিকা প্রদান কার্যক্রম বেশ কিছুটা এগিয়েছেÑ অন্তত ঢাকার মতো বড় শহরে। এ জন্য প্রতিবেশী দেশকেও কিছুটা ধন্যবাদ দিতে হয়। টিকা আমরা ফ্রি পাই বা না পাই, সেটি ভিন্ন কথা। ভারতের নিজের টিকার চাহিদা মেটানোই এক বিশাল ব্যাপার; সেখানে আমাদের দেশের জন্য টিকার অর্ডার পেমেন্টসহ বুক করা থাকলেও, তা পেতে আরো বিলম্ব ঘটলেও আমাদের তেমন কিছু করার ছিল না। কারণ সুযোগ থাকার পরও আমরা স্বদেশে করোনার টিকা উৎপাদনের ব্যবস্থা সময়মতো করিনি। এ ব্যর্থতা থেকে আমাদের অবিলম্বে শিক্ষা নিতে হবে অবশ্যই।
প্রতিবেশী ভারত করোনা টিকার ব্যাপারে যা করেছে, অর্থনৈতিক একাধিক বিষয়ে তাদের কার্যক্রম তার সাথে খাপ খায় না। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই অ্যান্টি ডাম্পিংয়ের কথা বলা যায়। এই করের দরুন ভারতে বাংলাদেশের রফতানি ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ অনেক দিনের। অবিলম্বে এ সমস্যার সুরাহা প্রয়োজন। সম্পতি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং তার সাথে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। এ উপলক্ষে কয়েকটি সমঝোতা স্মারকে সই-সাবুদও হয়ে গেছে। তবে অ্যান্টি ডাম্পিংয়ের বিষয়টির সুরাহা হয়নি বলেই প্রতীয়মান। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ২৯ মার্চ সংখ্যায় সে দিনের প্রধান শিরোনামে লিখেছে, ‘অহঃর ফঁসঢ়রহম ফঁঃু : ওহফরধ পড়ু ধনড়ঁঃ পড়হংঁষঃধঃড়হ.’ এর অর্থ অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি (কর) : ভারত এ নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী নয়।
ভারত আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী দেশ। তদুপরি আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালে সর্বাধিক সাহায্য করেছে। বিশেষত ঢাকার বর্তমান ক্ষমতাসীন মহলের মতে, ভারত বাংলাদেশের সর্বাধিক পরীক্ষিত মিত্র এবং দুই দেশের বন্ধুত্ব অতুলনীয়। তবুও ভারত অ্যান্টি ডাম্পিং কর নিয়ে আলোচনা বৈঠকে বসতেও আগ্রহ দেখাবে না কেন? এ প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক।
যা হোক, আলোচ্য সংবাদপত্রের প্রতিবেদনটি থেকেই উদ্ধৃতি দেয়া হলো, ভারতের বিরোধিতার মুখে, বাণিজ্য সমস্যার প্রতিকার বিষয়ক সমঝোতা স্মারকে (এম ও ইউ) অ্যান্টি ডাম্পিং বিষয়ে, এর বাস্তবায়ন-পূর্ব শলাপরামর্শের বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়েছে। কর্মকর্তারা আরো জানিয়েছেন, গত শনিবার (২৭ মার্চ) দুই দেশ এ স্মারকে স্বাক্ষর করেছে। ঢাকা ও নয়াদিল্লি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সদ্যসমাপ্ত সফরকালে।’
পত্রিকাটি আরো বলেছে, ‘আলোচনার একেবারে শুরু থেকেই ভারত দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে, যাতে সমঝোতা স্মারকে অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটির বিষয়টি না থাকে। কর্মকর্তারা এটি জানিয়েছেন। আরো জানা যায়, ভারত এমনকি এ বিষয়ে বাস্তবায়ন-পূর্ব কোনো আলোচনার বিষয়টিও স্মারকে উল্লেখ করতে রাজি হয়নি। সমঝোতা স্মারকটির ভাষ্যে ভারত রেফারেন্স দিয়েছে দু’টি ধারার। এর একটি হলো, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেডের (গ্যাট) ৫.৫ নম্বর ধারা এবং সাফটা বা দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা চুক্তির ১১ (ক) ধারা। সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট একপক্ষ অন্যপক্ষকে এ দু’টি ধারা মোতাবেক, সাত দিন আগে নোটিশ দেবে।’
গ্যাটের ৫.৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো তদন্ত শুরু করার আবেদন প্রচার করাকে কর্তৃপক্ষ পরিহার করে চলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না এ তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ব্যাপারে যথাযথ নথিপত্রসমেত দরখাস্ত পাওয়ার পরে এবং এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট পণ্য রফতানিকারী দেশকে নোটিশ দেবে কর্তৃপক্ষ।’
আর সাফটার ১১ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী স্বল্পতম উন্নত দেশগুলোর সাথে পরামর্শ করা উচিত অ্যান্টি ডাম্পিং তদন্তের আগে। এ প্রসঙ্গে ১১ (ক) ধারায় বলা হয়, অ্যান্টি ডাম্পিং অথবা পাল্টা কোনো পদক্ষেপ বিবেচনার সময়ে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পরিস্থিতির দিকে বিশষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে আলোচনা করার সুযোগ দিতে হবে।
তবে ঢাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, সমঝোতা স্মারকের ভাষ্যে আলোচনা বা শলাপরামর্শের সুযোগ দেয়ার কোনো উল্লেখ ছিল না। বলা হয়েছে, অ্যান্টি ডাম্পিং তদন্তের সাত দিন আগে নোটিশ দেয়া হবে।
এতক্ষণ ‘অ্যান্টি ডাম্পিং, কথাটা বারবার বলা হয়েছে। কিন্তু এর অর্থটা কী? অর্থ হলো, অবাঞ্ছিত এমন কোনো পণ্য বিদেশে কম দামে বিক্রি করা।’
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রফতানি পণ্য পাটজাত দ্রব্যের ব্যাপারেও ভারত অ্যান্টি ডাম্পিং কর বসিয়েছে। ভারত বাংলাদেশের ব্যাপারে এমন তদন্ত শুরু করেছিল বেশ কয়েক বছর আগে। তবে ঢাকাস্থ কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশের সাথে আলোচনা ছাড়াই ২০১৭ সালে আমাদের দেশের পাটজাত পণ্যের ওপর অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি বসানো হয়। এভাবে গ্যাট ও সাফটার বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে এবং ভারত তা মানতে বাধ্য বলে কর্মকর্তারা মনে করেন। জানা গেছে, তখন বাংলাদেশ এনিয়ে আপত্তি করলেও দিল্লি কান দেয়নি ঢাকার এ উদ্বেগের প্রতি। এ অবস্থায় বাংলাদেশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, তখন তারা আইনগত চাহিদা পূরণ করেননি। তাই পাটসহ বাংলাদেশী পণ্যের ওপর অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটির কার্যকারিতা নেই।
এমনিতেই নানা প্রতিবন্ধকতায় বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘিœত, এসব ট্যারিফ, প্যারাট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ বাধার সাথে ভারতের অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি ও পাল্টা পদক্ষেপ মিলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য নিদারুণ উদ্বেগের সঞ্চার হয়েছে। ভারতের অ্যান্টি ডাম্পিং কর বাংলাদেশের পাটপণ্য, মাছধরার জাল এবং হাইড্রোজেন পার অক্সাইভ রফতানির বেলায় প্রয়োগ করা হচ্ছে।
জানা যায়, ভারত ২০১৭ সালের প্রথম মাসেই বাংলাদেশের পাটজাত সুতা, চট ও ব্যাগের ওপর, প্রতি টনে ১৯ মার্কিন ডলার থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি চাপিয়ে দেয়। একই ধরনের কর বসানো হয় এপ্রিল ২০১৭ সালে এটি আরোপ করা হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে ভারতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রফতানির বেলায়। এর পরিমাণ প্রতি টনে ২৭ দশমিক ৮১ থেকে ৯১ দশমিক ৪৭ ডলার করে। ২০১৮ সালে ভারত একই ডিউটি বা কর ধার্য করে বাংলাদেশের মাছ ধরার জালের ওপর। এর হার কেজি প্রতি ২ দশমিক ৬৯ ডলার।
বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে আলোচনা করেও ভারতকে রাজি করাতে পারেনি অ্যান্টি ডাম্পিং কর প্রত্যাহার করে নিতে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক যথাযথভাবে বিকশিত হতে পারছে না।

দ্বিতীয় ডোজের অভিজ্ঞতা
করোনার টিকার পয়লা ডোজ নিয়েছিলাম ১৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার। স্থান রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট। নিয়ম হলো একই জায়গাতে এবং আট সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে। এ জন্য কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে এসএমএস মারফত অবগত করার কথা। আমাকেও যথারীতি জানিয়ে দেয়া হলো, ১৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফার কোভিড টিকা নিতে হবে। সে মোতাবেক ১১ তারিখে অফিসে জানালাম, ১৫ তারিখে অফিসে যাওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু ১২ তারিখে হঠাৎ জানানো হয়, পরদিনেই টিকা দিতে হবে।’ অতএব তা করতে হলো। এমনিতেই কয়েক দিন ধরে আশঙ্কা যে, টিকা পাওয়া যাবে না। সুতরাং শুভকাজে বিলম্ব করা অনুচিত।
নির্দিষ্ট তারিখে বাংলাদেশ হৃদরোগ চিকিৎসার জাতীয় প্রতিষ্ঠানটিতে হাজির হলাম। সেখানে সব সময়ের মতো রোগীর ভিড় এবং মানুষের জটলা। করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে সাথে করে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং টিকার প্রথম দফার কার্ডটি সাথে করে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। তা করতে ভুল হওয়ার কথা নয়। নির্ধারিত স্থানে গিয়ে জানলাম, টিকার কার্ডের ফটোকপি করাতে হবে। অতএব, ডাবল খরচে কার্ডের সিঙ্গেল কপির ফটোকপি করিয়ে নিলাম। অল্প সময়েই টিকাদানের কাজটি নিষ্পন্ন হলো আল্লাহ তায়ালার রহমতে। তবে নিচ তলার যেখানে গুরুত্বপূর্ণ এ কাজটি করা হয়েছে, সেখানে অন্তত কাগজে লিখে দিকনির্দেশিকা দেয়া দরকার ছিল। এটি না থাকায় বহু লোকের অসুবিধা হয়েছে। ছয়তলায় ছিল ভিন্ন চিত্র। সেখানে কোভিডের টিকা দেয়ার জন্য নারী-পুরুষের ভিড় ও দীর্ঘ সারি; সাথে দিকনির্দেশিকা ছিল দেখার মতো। দেশের সবাই এ টিকা পাবেন বলেই আশা করছি। হ

mizanulkarim1956@gmail.com



আরো সংবাদ


সকল