০৮ মে ২০২১
`

স্বাস্থ্যসেবায় প্রাকৃতিক চিকিৎসাপদ্ধতি

-

প্রত্যেক নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া তার মৌলিক অধিকার। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে এখনো বিপুল সমস্যা বিদ্যমান। যেমন দেশব্যাপী পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাব, চিকিৎসক স্বল্পতা এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসাব্যবস্থা। যাদের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে; তারা বিদেশে চিকিৎসা করাতে পারলেও বিপুল মানুষ চিকিৎসাসুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে অসুস্থ হলেই তাদের জীবন হয়ে ওঠে দুঃসহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হলে একটি দেশ আর্থিকভাবে উপকৃত হয়। সংস্থাটি দেশে দেশে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে প্রাকৃতিক চিকিৎসাপদ্ধতি (আয়ুর্বেদ ও ইউনানি) একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। সংশ্লিষ্ট সবাই এগিয়ে এলে এ চিকিৎসাপদ্ধতি আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে। করোনা মহামারী মোকাবেলায় প্রাকৃতিক চিকিৎসাপদ্ধতি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
মহামারী প্রতিরোধে এখন ঘরবন্দী জীবন-যাপন এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। যেকোনো মহামারী মোকাবেলায় এমন দূরত্বের কথা আয়ুর্বেদশাস্ত্রে ২৫০০ বছর আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। আয়ুর্বেদ চিকিৎসাবিজ্ঞানী চরক-সুশ্রুত আড়াই হাজার বছর আগে রোগ-জীবাণু মোকাবেলার যে পথ প্রদর্শন করে গেছেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন সে কথাই বলছে। তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, জীবাণু হামলায় যখন সভ্যতা বিপন্ন, তখন প্রতিটি রোগী ও তার সংস্পর্শে আসা মানুষকে আলাদা করে রাখা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। অর্থাৎ আইসোলেশন ও সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং।
করোনা রুখতে যে দুই অস্ত্রের ওপর সবাই এ মুহূর্তে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, ভবিষ্যতের দুনিয়া দেখতে হলে বর্তমানের কয়েকটা দিন ঘরে থাকুন। গৃহবন্দী থাকার মেয়াদ সম্পর্কেও আয়ুর্বেদের স্পষ্ট নিদান রয়েছে। বিস্ময়করভাবে আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের সাথে অদ্ভুত মিল রয়েছে তার। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, চীন করোনা সংক্রমণ মোকাবেলায় ভেষজ দ্রব্যাদি ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছে। করোনা মোকাবেলায় আমাদের দেশে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
আয়ুর্বেদ পৃথিবীর প্রাচীন ঐতিহ্যগত চিকিৎসাপদ্ধতি। এটি ব্যক্তির আরোগ্যের ক্ষেত্রে সার্বিক বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে। এর মূল লক্ষ্য দেহ ও মন তথা সার্বিক সুস্বাস্থ্য। আয়ুর্বেদ এখন আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা দিয়ে প্রমাণিত একটি চিকিৎসাপদ্ধতিও। সারা বিশ্বে প্রতিনিয়ত এ চিকিৎসাপদ্ধতির প্রসার ঘটছে। জটিল-কঠিন রোগ তথা এ শতাব্দীর বড় চ্যালেঞ্জ অসংক্রামক ব্যাধিগুলোর চিকিৎসায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা উপকৃত হচ্ছেন এর মাধ্যমে।
আয়ুর্বেদের লক্ষ্য হচ্ছে খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপন পদ্ধতির বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া, যাতে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ব্যক্তিরা তাদের স্বাস্থ্য রক্ষা করে চলতে পারেন। যারা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন তারা তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারেন। প্রাকৃতিক এই চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদের সার্বিক ব্যবস্থার একটি ধারণা দেয়; যা আমরা স্বাস্থ্যকর খাদ্য, ওষুধ ও ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারি। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না, বহু আধুনিক ওষুধ প্রাকৃতিক ঐতিহ্যগত চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণ করে তৈরি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় ভেষজভিত্তিক ঐতিহ্যগত চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ ধরনের উদ্ভিদ ঔষধি গুণসম্পন্ন বলে প্রমাণিত। ঐতিহ্যগত এই চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যবহারের একটি সুবিধা হলো, ব্যয়বহুল বিদেশী ওষুধ আমদানির ওপর আমরা নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারি, পরিবর্তে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেরাই কম খরচে ওষুধ তৈরি করতে পারি।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এটাকে উল্লেখযোগ্য চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ চিকিৎসাপদ্ধতিতে নানাবিধ রোগের আরোগ্য সম্ভব বলে পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন। এ ধারা সাফল্যজনকভাবে অব্যাহত থাকলে এর মাধ্যমে অল্প খরচে চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব হবে। এতে এ দেশের স্বাস্থ্য খাত ও ওষুধ শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে। ভারত ও চীনের দিকে তাকালে দেখা যায়, দুটো দেশই স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ঐতিহ্যগত পদ্ধতি অনুসরণ করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। শ্রীলঙ্কা, ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তানেও এ পদ্ধতি জনপ্রিয় হচ্ছে। ভারত কমিউনিটি স্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবেলায় এ পদ্ধতি ব্যবহার করছে। শ্রীলঙ্কায় বিকল্প চিকিৎসাবিষয়ে আলাদা একটি মন্ত্রণালয় রয়েছে। বাংলাদেশ যে সব স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলা করছে এক্ষেত্রে বলা যায়, আমাদের সব চিকিৎসা-ব্যবস্থার অন্বেষণ ও উন্নয়ন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। প্রাকৃতিক এ চিকিৎসা-ব্যবস্থা আমাদের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে এ অর্থে যে, এটি সহজেই পেতে পারি। একই সাথে যা আমাদের ক্রয়-ক্ষমতার ভেতরেই আছে।
অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় দেশে ডাক্তার, নার্স ও মিডওয়াইফের ঘাটতি রয়েছে। প্রাকৃতিক চিকিৎসার কর্মীবাহিনী ব্যবহারে আমরা স্বাস্থ্য খাতে এই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পারি। এখন সময় এসেছে প্রাকৃতিক এই চিকিৎসাপদ্ধতির সক্ষমতাকে মূল ধারায় অধিকতর সুযোগ করে দেয়া। এতে কর্মরত জনশক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা।
করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে শতভাগ কার্যকর কোনো প্রতিষেধক এখনো নেই। আক্রান্তদের কিভাবে চিকিৎসা হবে, তারও কোনো নির্ভরযোগ্য, সর্বজনগ্রাহ্য পদ্ধতি নেই। আতঙ্কিত মানুষ সুস্থ থাকার উপায় খুঁজছেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কাঁচা হলুদ, কাঁচা রসুন, লবঙ্গ, দারুচিনি, তুলসী, পাতিলেবু, আমলকী বা টকজাতীয় ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার। বাজারে হঠাৎ করে বেড়ে গেছে শাকসবজির চাহিদা- যা কি না প্রাকৃতিকভাবে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। অনেকে সুস্থও আছেন ভেষজ প্রাকৃতিক উপাদান গ্রহণ করে। করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় আয়ুর্বেদ তথা ভেষজ ওষুধ, প্রাকৃতিক উপাদান গ্রহণযোগ্য হতে পারতো, যদি এর সপক্ষে প্রথাসিদ্ধ গবেষণালব্ধ বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত থাকত।
যদিও ভারতীয় উপমহাদেশে হাজার হাজার বছর ধরেই ঐতিহ্যবাহী ভেষজচিকিৎসা প্রচলিত আছে। কিন্তু গবেষণা সেভাবে হয়নি। সে কারণে হয়তো অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকরা আয়ুর্বেদ, ইউনানি বা হোমিওপ্যাথিক ওষুধকে কোনোই গুরুত্ব দিতে চান না। কিন্তু কোষের আণুবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণে এগুলোও যে মানবদেহে রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতাকে উৎসাহিত করে, এমন লক্ষণ দেখা গেছে। কাজেই সঠিক গবেষণা হলে এমনও হতে পারত আয়ুর্বেদ তথা ভেষজ উপাদানগুলোই করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কার্যকর হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু সেই গবেষণার উদ্যোগ বরাবরই দুর্বল থেকেছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে।
আয়ুর্বেদ অ্যান্ড ন্যাচারোপ্যাথি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আয়ুন্স) ঐতিহ্যগত চিকিৎসাপদ্ধতির উন্নয়নে এক যুগ ধরে কাজ করছে। আয়ুন্স মনে করে, এ খাতের উন্নয়ন করা গেলে আমরা স্বাস্থ্য খাতে প্রভূত উন্নতি করতে পারব। এ জন্য আয়ুন্স এই চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর দেশে ব্যাপকভাবে গবেষণা চালানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। কিন্তু এ খাতে কিছু সমস্যা রয়েছে, যেগুলো দূর করতে পারলে আমরা এ খাতে উন্নতি করতে পারি। এক্ষেত্রে সরকারের অধিকতর পৃষ্ঠপোষকতা, ইউনানি ও আয়ুর্বেদ গ্র্যাজুয়েট ও ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সাথে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। দেশের প্রতিটি বিভাগে একটি করে আয়ুর্বেদ ও ইউনানি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন ও প্রতিটি জেলায় ভেষজ বাগান তৈরি করতে হবে। ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ যাতে মানসম্মতভাবে তৈরি করা হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার। বিশুদ্ধ আয়ুর্বেদ-ইউনানি চিকিৎসা ও ওষুধ সময়ের দাবি। দেশের সব মানুষ বিশেষ করে শিক্ষিত সচেতন ব্যক্তিদের এখন চাহিদা ভেজাল, কেমিক্যালমুক্ত বিশুদ্ধ ভেষজ ওষুধ। সঠিক ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় মুনাফালোভী, চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসাকারীদের দৌরাত্ম্যে সত্যিকারের চিকিৎসকরা অবহেলিত, নিগৃহীত। তাই দ্রুত এ কাঠামো নজরদারি করতে বিএমডিসির মতো স্বতন্ত্র একটি কাউন্সিল গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত। জটিল রোগে দেশের অনেকের পক্ষেই বিপুল অর্থ ব্যয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। অথচ ঐতিহ্যগত চিকিৎসাপদ্ধতিতে একজন মানুষ অল্প খরচেই জটিল রোগের চিকিৎসাসুবিধা পেতে পারেন। প্রাকৃতিক পদ্ধতি হওয়ায় ভেষজচিকিৎসার নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, যা অ্যালোপ্যাথির আধুনিক পদ্ধতিতে দেখা যায়।
সংশ্লিষ্ট সবাই যদি সচেতন ও আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসেন এবং ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন, তাহলে প্রাকৃতিক চিকিৎসাপদ্ধতি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই প্রাকৃতিক চিকিৎসা তথা আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসা বিষয়ে জনগণের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। একই সাথে এই চিকিৎসাপদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া অপরিহার্য।
লেখক: চিকিৎসক ও ভাইস চেয়ারম্যান, পাবলিক
হেলথ ফাউন্ডেশন



আরো সংবাদ