১৩ মে ২০২১
`

‘ঈশ্বরের মৃত্যু’ ও শূন্যতার অভিশাপ

-

জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ নীটশের (১৮৪৪-১৯০০) খ্যাতি বিশ্বময়। খ্রিষ্টধর্মের সমালোচক হিসেবে তিনি বিখ্যাত। নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদীদের তিনি মহাপুরুষ। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হিসেবে তার স্থান এরিস্টটলের ঠিক পাশেই। মানুষের সমান অধিকারের পক্ষে ছিল না তার মতো। অভিজাততন্ত্রের পক্ষে ছিলেন তিনি। মনে করতেন এর মাধ্যমে মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠতম শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। তিনি মনে করতেন, অভিজাততন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রথম কাজ হলো খ্রিষ্টধর্মের বিলোপ সাধন। নৈতিকতার মূল্য তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তার মতে, সার্বিক কোনো নৈতিক নিয়ম নেই, আমরা আমাদের উদ্দেশ্যের অনুকূলে নৈতিক নিয়ম বানাই। ডারউইন তাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন প্রবলভাবে। তার বিশ্বাস ছিল, টিকে থাকবে কেবল শক্তিমানরা।
যেহেতু তারাই টিকে থাকে, ফলে দুর্বলদের রক্ষা করবে তারা, রাজত্ব থাকবে তাদের হাতে। কিন্তু দুর্বলরা তাদের অধীনতা থেকে বাঁচতে তৈরি করেছে নৈতিকতার। একে দুর্বলরাই বেশি মানে। এ দিয়ে তারা শক্তিমানদের হারাতে চায় এবং তাদের চেয়ে সেরা হতে চায়। নীটশে এ জন্য দোষারোপ করেন খ্রিষ্টান নৈতিকতাকে। ইউরোপ একে গ্রহণ করেছে ‘পীড়িত, রুগ্ণ, খোঁড়া, অপরিপূর্ণ, কদাকার, অপদার্থ’ হওয়ার কারণে। নীটশের মতে, খ্রিষ্টধর্ম মানবজাতির অধম ও অপদার্থদের সহায়ক। সে মানবীয় শক্তির বিকাশের পক্ষে নয়। খ্রিষ্টধর্ম এবং এর নীতি-নৈতিকতার প্রচণ্ড সমালোচনা করেন তিনি, যার স্বাক্ষর রয়েছে তার দ্যা এন্টি ক্রাইস্ট গ্রন্থে।
প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মযাজকের সন্তান ছিলেন তিনি। কিন্তু সত্য খুঁজে পাচ্ছিলেন না প্রচলিত ধর্মে, এর তালাশের জন্য তিনি নিরন্তর অনুসন্ধানের পদ্ধতি অবলম্বন করতে বলেন।১৮৫৫ সালে তার পরম ধার্মিক বোন এলিজাবেথকে লেখা চিঠিতেলিখেন, ‘মানুষের পথ বিভক্ত : যদি তুমি আত্মার শান্তি ও আনন্দ কামনা কর তা হলে তুমি বিশ্বাস করো; আর যদি সত্যের অনুরাগী হও তা হলে অনুসন্ধান কর।’ যিশুখ্রিষ্টকেন্দ্রিক খ্রিষ্টধর্মকে তিনি প্রচলিত অর্থে নিতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘যদি খ্রিষ্টধর্ম মানে হয় এক ঐতিহাসিক ব্যক্তি বা ঘটনার প্রতি আস্থা, আমার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এর অর্থ যদি হয় মুক্তির প্রয়োজন আমি একে আগলে রাখতে রাজি।’ ‘খ্রিষ্টধর্মের ঈশ্বরের প্রতিও ছিল না তার আস্থা। তিনি মনে করতেন, এ ধর্মের ক্ষেন্দ্রে আছেন যে ঈশ্বর, তাকে জীবিত রাখা যাবে না।
দ্যা গে সাইন্স এবং দাস স্পোক জরাথুস্ত্রা গ্রন্থে তিনি ঈশ্বরের মৃত্যু ঘোষণা করেন।
সেটি করেন এক পাগলের মুখ দিয়ে। পাগলটি উজ্জ্বল ভোরে সেই একটি লণ্ঠন জ্বালান, ক্রন্দনরত হয়ে বাজারের কাছে গিয়ে চিৎকার করে বলতেন, ‘আমি ঈশ্বরকে খুঁজছি! আমি ঈশ্বরকে খুঁজছি!’ যারা ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস রাখে না তাদের অনেকেই তখন দাঁড়িয়ে মজা নিচ্ছিল। তারা প্রশ্ন করছিল, ঈশ্বরকে তুমি হারালে তা হলে? নিখোঁজ শিশুর মতো হারিয়েছেন ঈশ্বর? নাকি গোপন কোথাও লুকিয়ে আছেন?আমাদের ভয়ে তিনি কি তাহলে ভীত? ঈশ্বর কি সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়েছেন নাকি তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন?
পাগলটি সবার মাঝখানে চলে যায়। সে বলে, ঈশ্বরকোথায়, আমি তোমাদের বলছি।আমরা তাকে হত্যা করেছিÑ আপনি ও আমি সবাই খুনি, ঈশ্বর মারা গেছে। ঈশ্বর মৃত, মৃতই থাকবে।
সে একের পর এক নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে প্রশ্ন করছিল। এমনকি সে জানাতেচায় সবাইকে যে, খোদার কবরস্থানে যারা কবর দিচ্ছিল তাদের কণ্ঠের কথা কি আমরা এখনো শুনি নি? ঈশ্বরহীনতার গন্ধ এখনো কি আমাদের নাকে লাগছে না?
একে অনেকেই নাস্তিকতার জলদমন্ত্র ভেবেছেন। বস্তুত এটি নাস্তিকতার সেøাগান হতে পারে না। নীটশে বলতে পারছেন না, ঈশ্বর বলতে কিছু নেই। রূপকে বলছেন, ঈশ্বরের মৃত্যুর কথা। কিন্তু আক্ষরিকভাবে মারা গেছেন, তাও বলতে পারছেন না। কারণ সত্যিই তিনি মারা গেলে এর আগ অবধি তিনি বেঁচে ছিলেন। কিন্তু ঈশ্বরের বেঁচে থাকা মানলে এটি মানতে হয় যে, ঈশ্বর অবিনশ্বর। কারণ খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসে ঈশ্বরের মৃত্যু নেই!
তার মানে, ঈশ্বর মারা গেছেন ঘোষণা ঈশ্বরের অস্তিত্বহীনতা বোঝায় না। ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস হারানোর বিষয়টিই স্পষ্ট করে। এই বিশ্বাস হারানোতে নীটশে খুশি ছিলেন না। বড় বেদনায় তিনি প্রকাশ করেন একে। ঘোষণাটি তিনি প্রদান করেন এক পাগলের কণ্ঠে। এটি সত্য যে, কোনো পাগল ঈশ্বর সম্পর্কে বিচারক হতে পারে না।
নীটশের জরথুস্ত্ররূপী সেই পাগল মূলত তিনি। এ ঘোষণায় তাকে প্ররোচিত করেছিল পশ্চিমা দুনিয়ার বাস্তবতা। ষোড়শ শতকের পরে ইউরোপে খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসে বড় ধরনের ঝাঁকুনি লাগে। রাজনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত, শিক্ষা, দৈনন্দিন সামাজিক জীবন এবং ব্যক্তির গহন আধ্যাত্মিক জীবনেও ঈশ্বর ভাবনার পুরনো বয়ানগুলো চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে। যদিও খ্রিষ্টধর্ম নানাভাবে কথা বলছিল লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির (১৪৫২- ১৫১৯) শিল্পকর্মে, কোপারনিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩), রনে ডেকার্টে(১৫৯৬-১৬৫০) ও নিউটনের (১৬৪৩-১৭২৭) মতো বিজ্ঞানীর বোধে ও যাপনে, টমাস অ্যাকুইনাস (১২২৫-১২৭৪), ডেকার্টে (১৫৯৬-১৬৫০), বার্কলে (১৬৮৫-১৭৫৩)ও লাইবনিজের (১৬৪৬-১৭১৬) মতো দার্শনিকদের চিন্তাধারায়। কিন্তু ষোড়শ শতকের শুরুতে যে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব শুরু হয়েছিল সেটি প্রাকৃতিক ঘটনাকে বোঝার এমন উপায় প্রস্তাব করে, যাকে চার্চের প্রচলিত ধর্মীয় নীতি বা ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স দ্বারা প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা থেকে স্পষ্টভাবে উচ্চতর মনে করা হচ্ছিল। পরবর্তী শতকগুলোতে বিজ্ঞান, শিল্পায়ন ও বর্ধমান প্রযুক্তিগত ক্ষমতা মানুষকে প্রকৃতির ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি প্রদান করে। এ যাত্রায় চার্চ সহায়তা করতে পারেনি। চার্চের একাধিপত্যের দিন শেষ করে দেয় রেনেসাঁ। যে খোদার নাম করে জ্ঞান-বিজ্ঞান, মুক্তি-স্বাধীনতা, সাম্য-মানবাধিকার প্রভৃতির পথে দেয়াল খাড়া করা হয়েছিল, নতুন ইউরোপ সেই দেয়াল ভাঙতে গিয়ে চার্চের ঈশ্বরকেও ভাঙল। কেউ তাকে করল গৃহবন্দী, কেউকরল প্রত্যাখ্যান; চাইল তার মরণ। নীটশের ঘোষণা অনেকটা সেই পরিস্থিতির সন্তান। ১৮৮৭ সালে, দ্যা গে সায়েন্সের দ্বিতীয় সংস্করণের ৩৪৩ নম্বর ধারাটিতে নীটশের বক্তব্য শুরু হয় এভাবে- ‘সাম্প্রতিক শ্রেষ্ঠতম ঘটনা হলো, ঈশ্বর মারা গেছেন, খ্রিষ্টান ঈশ্বরের বিশ্বাস হয়ে গেছে অবিশ্বাস্য।
নীটশে গবেষক ওয়াল্টার কফম্যান (ডধষঃবৎ অৎহড়ষফ কধঁভসধহহ) ঈশ্বরের মৃত্যুর বয়ান সুনির্দিষ্ট করেন, খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের ঈশ্বরের প্রতি অনাস্থা বলে। এন্টিক্রাইস্ট গ্রন্থে নীটশে এটি স্পষ্ট করেন তীব্রতার সাথে। লিখেন, ‘ঈশ্বরের খ্রিষ্টীয় ধারণা পৃথিবীতেসবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ধারণাগুলোর মধ্যে একটি।’
খ্রিষ্টবাদ ঈশ্বরের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। নীটশে খ্রিষ্টবাদের ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে সেখানে বসাতে চাইলেন মানুষকে। সেই মানুষ দিশা। সেই মানুষ য়্যেবারমেনশ (ঁনবৎসবহংপয) বা ‘সুপারম্যান’, ‘ওভার ম্যান’ কিংবা ‘সুপারহিউম্যান’।নীটশের পাগলবলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের সুপারম্যান শেখাচ্ছি। সে মানুষকে অতিক্রম করে যাবে। সেই সুপারম্যান হবে অভিজাত মানুষ। সম্ভবত এর নমুনা হিসেবে নেপোলিয়ানকে (১৭৬৯ - ১৮২১) ভেবে থাকবেন নীটশে। যার প্রতি তার ছিল বিপুল শ্রদ্ধা।অতিমানবের মাধ্যমে মানুষ উন্নতি করবে। কারণ তার মতে, খ্রিষ্টান অর্থে উন্নতি সেটিই, যা প্রকৃত উন্নতির ঠিক বিপরীত। খ্রিষ্টবাদ মানুষকে বশীভূত ও দুর্বল বলে জানে ও জানায়।
ওয়াল্টার লিখেন, পুরোহিত বাবার কাছে থাকাবস্থায় নীটশে নিজেকে খ্রিষ্টবিরোধী বলে পরিচয় দিতেন।
শুধু নীটশেনয়, আমরা দেখব, উনিশ শতকের শেষ নাগাদ ইউরোপের সর্বাধিক সংখ্যক বুদ্ধিজীবী ও লেখক প্রথাগত খ্রিষ্টবাদ পরিত্যাগ করেছিলেন। এটি কেন হলো? প্রশ্নটি জটিল। এর পেছনে কি শিল্প ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রভাব ছিল? নাকি এটি চার্লস ডারউইন (১৮০৯-১৮৮২) এবং বিবর্তনবিষয়ক তার রচনার ফলাফল? উইলসন বই লিখেছেন ঈশ্বরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পর্কে। এতে রয়েছে সন্দেহবাদিতা ও অবিশ্বাসের নানা সূত্র, যা অনেক ব্যাপক, অনেক বৈচিত্র্যময়।
ঈশ্বরকে ছেড়ে বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, শিল্প ও পুঁজিকে ঈশ্বর বানিয়ে আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তির নায়করা এগিয়ে চলছিলেন। সেখানে সাধারণত খ্রিষ্টবাদের ঈশ্বর হয়েছিলেন অবাঞ্ছিত, নয় মৃত। ঈশ্বরের প্রতি অনাস্থা থেকেই এ অনাস্থার সৃষ্টি, তা বলা যাবে না এককথায়। এ অনাস্থার অন্যতম কারণ ছিল সেইসব শ্রেণী ও প্রতিষ্ঠান, যারা নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে দাবি করত। তাদের কাছে জীবনের নানা সঙ্কটের সমাধান আছে, সেটি বিশ্বাসযোগ্যভাবে তারা পেশ করতে পারেনি। উল্টো বরং তারা হয়ে উঠেছিল মানবতার অগ্রগতির পথে নানামুখী আপদের বাহক। ঈশ্বরের নামে স্বেচ্ছাচারীদেরসমাজ ও সরকার চালনা সঙ্কট তৈরি করেছিল।
আধুনিক ইউরোপ পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায়সিদ্ধান্ত নিলো, সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আর ঐশ্বরিক অধিকারের কোনো বৈধতা নেই, বরং শাসিতের সম্মতি ও যুক্তি দ্বারা পরিচালিত এবং ঈশ্বরের উপস্থিতি বা ঐশ্বরিক আদেশ ছাড়াই নৈতিক তত্ত্ব দ্বারা সরকারব্যবস্থা পরিচালিত হবে।
নীটশে এর মধ্যে প্রতিপত্তিশালী খ্রিষ্টীয় সেই ঈশ্বরের মরণ দেখতে পেলেন, যার নামে সেখানকার জীবনকে শাসন করা হতো।
কিন্তু ঈশ্বরকে হারানোর ফলে পশ্চিমা জীবনে বিরাট শূন্যতা আসবে, বস্তুঈশ্বর যা পূরণ করার ক্ষমতা রাখে না। নীটশে তা লক্ষ করেছিলেন। তিনি সতর্ক করেন, এ শূন্যতা হবে অশুভ, সর্বগ্রাসী, ধ্বংসাত্মক। নানা বিশ্বাস, ধারণা ও নীতি জন্ম নেবে একে পূরণ করতে। কিন্তু এগুলোকেও গ্রাস করবে বিরাট সেই শূন্যতা। শেষ অবধি জীবন বিঘিœত হবে নির্মমতায়, যুদ্ধে, সন্ত্রাসে। নীটশের সেই ভবিষ্যৎবাণীকে করতালি দিয়ে সমর্থন জানায় পরবর্তী দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ। পৃথিবী এখনো কাঁপছে সন্ত্রাসে, নিষ্ঠুরতায়। আধুনিকমানুষের জীবন সীমাহীন শূন্যতার তরঙ্গে ফেনার মতো ভাসমান।
ঈশ্বরকে হত্যা বা খোদা থেকে পলায়ন করে সর্বাত্মক এ শূন্যতা থেকে যেমন বাঁচার পথ নেই, তেমনিঅসৎ, নির্জ্ঞান ও নির্বিবেক মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের হাতে ঈশ্বরের নামে স্বেচ্ছাচারের লাগামহীন চর্চা জারি রাখারও সুযোগ নেই।
লেখক : কবি, গবেষক



আরো সংবাদ