১৩ মে ২০২১
`

বালুমহালগুলো বিলুপ্ত করা যেতে পারে

-

‘অমানুষ মানুষ হয়, অঘাটে হয় ঘাট
দিন গুণে এখন বামনার ক্ষেতে মাঠ।’

কথাটি শতবর্ষী ‘দিদিমা’র মুখে শুনতাম। মর্ম বুঝতাম না। বুঝতে চাইলে বলতেন, সময় হলে নিজে নিজেই বুঝবি।’ মনে হয় এখন সময় হয়েছে। জীবনের পড়ন্তবেলায় পৌঁছে বুঝতে পারি, পালাবদলের খেলায় শেষ মুঘল সম্রাটের নির্বাসনসহ উত্তরসূরি সুলতানার বাস এখন হাওড়ার এক বস্তিতে। সুধীজনের ভাষায় যা ইতিহাসের উত্থান-পতন, দিদিমাদের ভাষায় তা-ই অমানুষের মানুষ হওয়া।
কয়েক দশক আগে যেখানে দেখেছি গাঁ, ফসলের মাঠ, স্কুল, মাদরাসা, মসজিদ সেখানে এখন নদী। যেখানে ঘুম থেকে ওঠে দেখতাম চাষি হাল নিয়ে যায় মাঠে, শিশু চোখ কচলাতে কচলাতে আরবি পড়তে যায় মসজিদে সেখানে এখন থই থই পানিতে জাল ফেলে জেলে। যেখানে ছিল বিল, শীতের অতিথি পাখিরা সকাল-সন্ধ্যা মাছ নিয়ে কাড়াকাড়ি করত, সেখানে এখন বাড়িঘর।
পালাবদলের হাল স্বয়ং বিধাতার হাতে। এই পালাবদলের লীলা চলে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে। কিন্তু ‘বিশ্বের বয়স যখন তিনকাল পেরিয়ে চারকালে পড়বে তখন মানুষের মাঝে শুরু হবে ধর্ম সঙ্কোচন, সত্য থেকে দূরে সরে পড়া, রাজনৈতিক কুটিলতা, শাস্ত্রহীন ব্রাহ্মণ, পুরুষ স্ত্রীর অনুগত, সৎ মানুষের কষ্ট বৃদ্ধি ইত্যাদিসহ ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ মানুষ যখন নিজকে ভগবান ভাবতে শুরু করবে, ঠিক তখনই বিধাতা জগতের হাল ছেড়ে দূরে সরে যাবেন’ (সনাতন ধর্মে কলিকাল)। বহুরূপী করোনার আচরণসহ মানুষের কারণে মানুষের দুর্গতি দেখে অনেকেই ভাবতে শুরু করেছে, ‘সময়টা কী শুরু হয়ে গেছে?’
১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি ক্রেনের সাহায্যে বালু উত্তোলন শুরু হয়। শুরু হয় নদীর দুই পাড়ের ভাঙন। ‘গত কয়েক বছরে মেঘনার ভাঙনে টেকানগর, কালীর চর, সোনামই সম্পূর্ণ রূপে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে ওই ভাঙন অব্যাহতভাবে খাসের চর, রায়পুর, হাড়িয়া, মৈশার চর, নলচর ও রামপ্রসাদের চর গ্রামগুলোকে ভাঙতে শুরু করেছে। নলচর গ্রামটি ভাঙনের ফলে এর বাসিন্দারা নতুন একটি চরে বসতি স্থাপন করছে। নতুন বসতিতে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াসহ অসংখ্য সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। বৈদ্যেরবাজার বা সোনারগাঁও থানা ভবনটি রক্ষা করার জন্য গত বছর সরকারি সাহায্যে প্রচুর খুঁটি পোঁতা হয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে না পেরে এ বছর ভেঙে সরানো হয়েছে।
অন্য দিকে কোথাও কোথাও নতুন চর ভেসে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করছে। ওই নতুন চরের দখল নিয়ে মারামারি ও মামলা মোকদ্দমা লেগেই রয়েছে। নিরীহ জনসাধারণ এক দিকে পৈতৃক ভিটেমাটি হারাচ্ছে, অন্য দিকে নতুন জমি লাভের আশায় জিনিসপত্র বিক্রি করে হয়তো মামলা করছে, নয়তো ঊর্ধ্বতন অফিসের ‘পাওনা’ মেটাচ্ছে।’ চার দশক আগে ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘মেঘনার ভাঙন’ শিরোনামে এই প্রতিবেদকের পাঠানো সংবাদ।
পঙ্গপালের মতো ক্রেনবাহী শতশত জাহাজ ভয়ঙ্কর শব্দ করে নদীর গভীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন শুরু করে। ভাঙন শুরু হলেই কর্তৃপক্ষের কাছে শুরু হয় আবেদন-নিবেদন। এক দিকে গাঁয়ের পক্ষ থেকে ঊর্র্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন, অন্য দিকে আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে বালুখোরদের মামলা। হোমনা থানায় মামলা নম্বর ৪(১০) ৯৭ ও ১৫(৬) ৯৮। জামিন অযোগ্য ৩২৬/৩৮৬/৩৭৯ দণ্ডবিধির মামলা। ধরা পড়লে জামিন নেই। শরীর, সম্পত্তি ও সম্মান রক্ষা করার অধিকার প্রতিটি ধর্ম ও সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে সংরক্ষিত থাকলেও অশুভ শক্তির কারণে অসহায় মানুষ অধিকার প্রয়োগের পরিবর্তে পলাতক অবস্থায়, হাজত খাটার ভয়ে মুচলেকা দিয়ে আপস করা হয়। মুচলেকার প্রধান শর্ত, ‘ইচ্ছামতো বালু উত্তোলনে সহায়তা করা।’
২০০১ সালে মেঘনা নামে কুমিল্লার পৃথক থানা ঘোষিত হলো। প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে ১০০-১৫০টি স্টিমার বালু উত্তোলন শুরু করে। সন্ধ্যা পর্যন্ত বালু উত্তোলনের ফলে শুরু হয় ফসলি জমিসহ বাড়িঘরের ভাঙন। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০০২ সালে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেঘনা থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত ১১টি দফতরে দরখাস্তের কপি দেয়া হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কোনো দরখাস্তই কাজে লাগল না।
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০০২ থেকে ২৩ এপ্রিল ২০০৭-এই পাঁচ বছর কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কারণ যারা অভিযোগ দিতেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তারাই জড়িয়ে পড়েন বালু উত্তোলনের কাজে। শুরু হয় জনরোষ। জনরোষের কারণে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে বাধ্য হয় ক্ষমতার মাঝখানেই। আবার পটপরিবর্তনে ২০০৭ সালের দিকে নতুন করে তিনটি বালুমহাল সৃষ্টি করে নতুন উদ্যমে বালু উত্তোলন শুরু হয়। ২৩ এপ্রিল ২০০৭ আবার শুরু হয় বালু উত্তোলন বন্ধ করার আবেদন। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে ৬ নম্বর সেনের চর ও ২ নম্বর ভাসানিয়া দড়িচর মৌজার ফসলের জমি ও বসতবাড়ি ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করার আবেদন করার কয়েক দিন পর অর্থাৎ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০৭ তলিয়ে যায় গাঁয়ের শতবর্ষের পাকা মসজিদ। ভেতরের কুরআন-কালাম বের করার সময়ও পাওয়া যায়নি। ঝুপঝাপ শব্দে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করে আশপাশের ঘরবাড়ি, গাছপালা ও বিভিন্ন স্থাপনা। রাতেই এ খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ২৯ সেপ্টেম্বর মিডিয়ার লোকজন ভিড় করে গাঁয়ে। ৩০ সেপ্টেম্বর দৈনিক প্রথম আলোর সচিত্র সংবাদ, ‘মেঘনার ভাঙনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে রামপ্রসাদের চর’ শিরোনামে, ‘কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার রামপ্রসাদের চর নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার খবর। এতে বলা হয়েছিল, ইতোমধ্যে গ্রামের বেশির ভাগ এলাকা মেঘনায় হারিয়ে গেছে। গত তিন দিনে গ্রামের ১৫টি বাড়ি, একটি মসজিদ ও প্রায় ৫০ একর ফসলি জমি ভাঙনের কবলে পড়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে দিশেহারা মানুষ নৌকা ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামের চর এলাকায় খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। রামপ্রসাদের চরে ১২০টি পরিবার বসবাস করত। গ্রামসংলগ্ন মেঘনা থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করায় এক মাস ধরে রামপ্রসাদের চর ভাঙছে। ইতোমধ্যে ১০৮টির মতো বাড়ি মেঘনার তাণ্ডবে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে গ্রামে মাত্র ১০-১২টি বাড়ি আছে।’
একই সময়ে প্রায় অভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয় দৈনিক সংগ্রাম, যুগান্তর, ইত্তেফাক, সমকাল, যায়যায়দিন, দিনকাল, ইনকিলাব ও সংবাদ পত্রিকায়। নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সম্পাদকীয় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নামসহ, ‘বিগত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকারের সময়ে এখানে সিন্ডিকেট বাহিনী জোরপূর্বক বালু উত্তোলনের কারণে নলচর, রামপ্রসাদের চর, মৈশার চরসহ গ্রামগুলোর প্রায় তিন হাজার পরিবারের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয় বলে গ্রামবাসী জানায়।’
বাস্তুহারা মানুষের গগনবিদারী আর্তনাদে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে; নড়ে ওঠে সরকারের টনকও। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি ২২ মার্চ ২০০৮ সরেজমিন তদন্ত করতে আসে। পরিশেষে জেলা প্রশাসক কুমিল্লার কার্যালয়ের ১০ মার্চ ২০০৮ সালে ১৯-৫৩ (অংশ) /১০৮০(৫)/ কুম/এস এ নং স্মারকের সুপারিশে গ্রামসংলগ্ন মহাল দুটির লিজ বন্ধ করে দেয়া হয়।
বাস্তুহারা মানুষের স্থায়ী নিরাপত্তার জন্য শুরু হয় বালুমহাল দু’টি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার প্রক্রিয়া। এ উদ্দেশ্যে বালুমহাল ইজারা দেয়াসংক্রান্ত আন্তঃসংস্থা কমিটির গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব নেয়া হয়, ‘মেঘনা নদী বালুমহাল : নলচর মেঘনা নদী ভাসানিয়া বালুমহাল এবং ৬ নম্বর সেনের চর ও ১ নম্বর সাপমারা চরেরগাঁও বালুমহালের বিষয়ে ইউএনও জানান, স্থানীয় জনগণের প্রবল আপত্তি থাকায় এবং নদীভাঙনের সমূহ সম্ভাবনা থাকায় ওই সব বালুমহাল ইজারা দেয়া সম্ভব হবে না। তা ছাড়া মামলা চলমান থাকায় ওই সব বালুমহাল বিলুপ্ত করাও সমীচীন হবে না। মামলা নিষ্পত্তির পর ওই সব বালুমহাল বিলুপ্তির প্রস্তাব পাঠানো হবে।’
এ মর্মে উল্লেখ করার পর প্রায় ১০ বছর লিজ দেয়া বন্ধ ছিল। এর মধ্যে ভাঙন বন্ধ হয়। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগসহ নতুন নতুন রাস্তাঘাট ও কালভার্র্ট হয়। ধুমধাম করে পাকা-সেমিপাকা বাড়িঘর নির্মাণ শুরু হয়ে যায়। নদীর উত্তর দিকে নুনের টেক এলাকায় ভেসে ওঠা চরের নতুন নাম হয় ‘মিনি কক্সবাজার’। শহর থেকে দম ফেলার জন্য পর্যটক আসতে শুরু করে মিনি কক্সবাজারে। পর্যটন স্পট নির্মাণের উদ্দেশ্যে নুনের টেক ও চরহাজী মৌজায় কয়েক শ’ বিঘা জমি কিনে রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট। নদীর দক্ষিণ পাশে বিদেশী কোম্পানি নিউ ডেসকো এবং হাউজিং কোম্পানি ঢাকা গ্রুপ জমি কিনতে শুরু করে। গাঁয়ের বাস্তুহারা মানুষ দক্ষিণের বিলে মাটি ভরাট করে বাড়িঘর নির্মাণ করে।
মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল, এবার স্থায়ীভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ হবে। কারণ, দুই চেয়ারম্যান জনগণের পক্ষে থাকলে বালু উত্তোলন করে সাধ্য কার? কিন্তু না, বন্ধ হয়নি। মেঘনা উপজেলাধীন সেনেরচর ও সাপমারা বালুমহাল ১৪২৭ সনের জন্য মেসার্স নার্গিস ট্রেডার্সকে এবং ভাসানিয়া দড়িচর বালুমহাল মেসার্স ভূঁইয়া এন্টারপ্রাইজকে লিজ দেয়া হয়। ভাসানিয়া দড়িচর লিজকৃত জমির পরিমাণ প্রায় ১৫ একর এবং ১ নম্বর সাপমারা চরেরগাঁও ও ৫ নম্বর সেনেরচর লিজকৃত জমির পরিমাণ (৬০+১৪.৮০) প্রায় ৭৫ একর।
শুরু হয় ভাঙন। গত ৫ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় মানববন্ধনের সচিত্র সংবাদ, ‘প্রতিদিন নদীর পেটে যাচ্ছে আবাদি জমি ও বসতভিটা। এর আগে এলাকাবাসীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, চালিভাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যানসহ এলাকার গণ্যমান্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও নদীভাঙনের ভয়াবহতা নিজ চোখে দেখেন। তিনি এর প্রতিকার চেয়ে ভূমিমন্ত্রী, ভূমি সচিব, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও কুমিল্লা জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেন।’
পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কয়েক শ’ মহিলার ঝাড়ু মিছিলও। পরিতাপের বিষয়, বিশাল মেঘনার বুকে উল্লিখিত স্থানগুলো চিহ্নিত করার কোনো সুযোগ না থাকার ভাসানিয়া দড়িচর লিজকৃত ১৫ একরের স্থলে কয়েক শ’ একর দাপিয়ে বেড়ানোর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সহকারী কমিশনার ভূমি নিজেও প্রত্যক্ষ করেছেন। মেসার্স ভূঁইয়া এন্টারপ্রাইজ তাদের এলাকা ছেড়ে কয়েক শ’ গজ পূর্ব-দক্ষিণে গ্রামঘেঁষে বালু উত্তোলন করে থাকে। নিরুপায় হয়ে আবার শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন করা হয়। গণ্যমান্য ব্যক্তিরা গত ২১ অক্টোবর ২০২০ অভিযোগসহ দেখা করেন জেলা প্রশাসক কুমিল্লার সাথে। জেলা প্রশাসকের সাথে সাক্ষাৎকালে সেনেরচর মৌজার সিএস ও বিএস নকশা খুলে প্রমাণ করেন, ৮০ শতাংশ গ্রামসহ ৫০০ বিঘার বেশি ফসলি জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। ২০ বছরে লিজ থেকে সরকারের কোষাগারে যে টাকা জমা হয়েছে এর কয়েক শ’ গুণ ক্ষতি হয়েছে বাস্তুহীন মানুষের। বিস্তারিত শোনার পর অভিযুক্ত বালুমহাল কয়টি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করার প্রতিশ্রুতি দেন ডিসি। তৎসহ কষ্ট করে কয়েক মাস অর্থাৎ লিজের মেয়াদকালে অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকানোর পরামর্শ দেন।
মেসার্স ভূঁইয়া এন্টারপ্রাইজ কর্তৃক তাদের এলাকা ছেড়ে সেনেরচর মৌজায় গাঁয়ের কাছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মেঘনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার ভূমিকে অবগত করানোর পর তারা কয়েকবার সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। একবার মোবাইল কোর্ট বসিয়ে জেল-জরিমানাসহ আটক করেছিলেন কয়েকটি ড্রেজার। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অভিযুক্ত বালুমহালগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ বা ক্যালেন্ডার থেকে আউট করার জন্য।
এরই ফলে প্রবীর কুমার রায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেঘনা, কুমিল্লা স্মারক নং অস্পষ্ট ৫০৩, তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০২০, বিষয় : মেঘনা উপজেলার বালুমহালসমূহ বিলুপ্তিকরণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের পর বলা হয়, ‘মহালগুলোতে দীর্ঘ দিন বালু উত্তোলনের ফলে কয়েক বছর আগে কিছু ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। ভবিষ্যতেও আবার ভাঙন শুরু হতে পারে মর্মে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সরেজমিন পরিদর্শনে অতীতে যে নদীর পাড়ে ভাঙন হয়েছে তার কিছু প্রমাণ পাওয়া গেল এবং বালুমহালে বালুর স্তর নিচে নেমে গেছে মর্মে প্রতীয়মান হয়। তা ছাড়া এসব বালুমহালের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়।
ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি সব কিছুর মূল লক্ষ্য হলো, মানুষের কল্যাণ। গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন পিয়ন পদধারীসহ সবাই মানুষের সেবক। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে যারা মানুষের অধিকার হরণসহ অকল্যাণ করে তারা নিজেও অকল্যাণের ডালি মাথায় তুলে নেয়। সাম্প্রতিক নিউরোসাইন্সের উদ্ভাবিত বিস্ময়কর বিষয় তো তাই বলে। জগৎ ও জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রত্যেক ভালো-মন্দ কাজের জন্য রয়েছে পুরস্কার ও পরিণাম। এই কাজটি চলতে থাকে ফল্গুধারার মতো অদৃশ্যে, অলক্ষ্যে ও সবার অজান্তে। প্রকৃতিবিজ্ঞান এর নাম দিয়েছে ‘ন্যাচারাল জাস্টিস’। যে জাস্টিসের মর্ম হলোÑ ভালো করলে ভালো পাবেন, মন্দ করলে মন্দ পাবেন, গুম করলে নিজেই গুম হবেন। পালাবদলের অমোঘ নিয়মের মধ্যেই এ বিচার চলতে থাকে। এ বিচারে যারা যত বিশ্বাস করে তারা ভুল তত কম করে।
আপনি বলবেন, অপরাধ করব সাক্ষী রাখব না। সাক্ষী ছাড়া বিচার করবে কে?’ একসময়ের দায়রা জজ নরেন্দ্র কুমার দাস কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘প্রকৃতি নির্জীব, চলৎশক্তিহীন ও সর্বংসহা মনে হলেও আসলে তা নয়; বরং প্রকৃতি নির্মম প্রতিশোধগ্রহণকারী। প্রকৃতি কারো অণু পরিমাণ অপরাধও সহ্য করে না, বরং সময়ের প্রয়োজনে ঠিকই বিক্ষুব্ধ ও সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। অপরাধ ও অপরাধীর প্রতিবিধান হয় প্রকৃতির আদালতে। তবে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নরাই শুধু তা উপলব্ধি করতে পারেন। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষীর অভাবে আদালতও অপরাধীদের শাস্তি দিতে পারে না অনেক সময়। কিন্তু ওরা কখনো প্রকৃতির রূঢ়তা ও নির্মম প্রতিশোধ থেকে বাঁচতে পারে না। কোনো না কোনোভাবে প্রকৃতিগতভাবেই অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয়ে যায়। অপঘাত, অপমৃত্যু, দীর্ঘ যন্ত্রণাদায়ক ও দুরারোগ্য রোগভোগ, দুর্ঘটনা, পারিবারিক ও সামাজিক কলহ-বিবাদ, গণমানুষের রুদ্ররোষ, রাষ্ট্রাচারের বিচ্যুতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পারিবারিক অশান্তি, মহামারীসহ নানাবিধ প্রতিকূলতার মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। আর এই প্রাপ্য শাস্তি হয়ে থাকে মানুষের কল্পনারও অতীত। হ
লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
adv.zainulabedin@gmail.com



আরো সংবাদ