১২ এপ্রিল ২০২১
`

দৃষ্টিপাত : উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা ও দুর্নীতি

-

প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মচারীদের ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আমরা সারা দিন খেটে এত কাজ করে শেষ পর্যন্ত যদি দুর্নীতির কারণে সেই অর্জন নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সেটি হবে দুঃখজনক। দেশের উন্নয়ন যেন দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি গুরুত্বের সাথে দেখার জন্য সরকারি কর্মচারীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানিয়েছেন। দুর্নীতি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্নীতির ব্যাপকতায় দুদক নিজেই হিমশিম খাচ্ছে। দুদকের মধ্যেও দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের কর্মকাণ্ডে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই লজ্জিত। দেরিতে হলেও প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবিচল থাকার ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন, যা যথার্থ। দুর্নীতি শুধু বাংলাদেশে নেই, জাপানের মতো দেশেও দুর্নীতির জন্য প্রধানমন্ত্রীকে বা মন্ত্রীদের সরে যেতে হয়। সেই ঐতিহ্য বাংলাদেশে কম। রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, কোথায় নেই দুর্নীতি? মনে হয় বাংলাদেশটাকে দুর্নীতি গ্রাস করতে বসেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতার অভাব ও সেবা প্রাপ্তির সঙ্কটের মাঝে দেশে অস্বাভাবিকভাবে দুর্নীতি বেড়েছে। পুলিশ, ভূমি, হাসপাতাল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওয়াসা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির মহোৎসব চলছে। তবুও যেন দেখার কেউ নেই। সরকারি কর্মচারীদের এসব প্রতিষ্ঠানে তিন বছরের অধিক, এমনকি, ১০-১২ বছর পর্যন্ত একই প্রতিষ্ঠানে থাকার কারণে দুর্নীতির ব্যাপকতা অনেক বেড়েছে। জেলা প্রশাসকের অফিস বা আদালতপাড়া, ব্যাংক, বীমা, সরকারি টেন্ডারগুলো এমনকি হাসপাতালে যে হারে দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে, এটা রোধ করার জন্য দুদক নয়, কর্মচারীদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য। ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, দেশে এখন ত্রাণসামগ্রী চুরি করার মতো কোনো লোকই নেই। ত্রাণ অধিদফতর বা মন্ত্রণালয় তো এ ক্ষেত্রে পারদর্শী। ত্রাণসামগ্রী সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা হলে দেশের লাখ লাখ বন্যাকবলিত মানুষ আজো কেন তা পায়নি?
ত্রাণের দাবিতে মানুষের হাহাকার কে দেখবে? এখন ক্রয়-বিক্রয় বা বেচাকেনায় কমিশনের নামে দুর্নীতি চলছে। অনেকে দুর্নীতির টাকা দেশে না রেখে বিদেশে পাচার করছেন। অনেকে ‘সেকেন্ড হোম’ ক্রয় করে বিদেশে বিনা বাধায় নিয়ে যাচ্ছেন টাকা। সে জন্য সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের অবৈধ টাকার পাহাড় দিন দিন গড়ে উঠছে যার কোনো সীমা বা পরিসীমা নেই। দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিধি আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কারণ দুর্নীতির এমন ব্যাপকতা দেশব্যাপী দেখা দিয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী নিজেও শঙ্কিত। দুর্নীতির আরেকটি জায়গা হচ্ছে মন্ত্রণালয় বা তার অধীনস্থ অধিদফতর বা প্রতিষ্ঠানে সরকারি খাতে বরাদ্দ করা টাকার ব্যাপক অনিয়ম ও অপচয়। সরকারি অডিটের প্রতিষ্ঠানগুলোতেও চলছে দুর্নীতি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজস্ব খাতের টাকা সঠিকভাবে ব্যয় না হয়ে এখানে বিভিন্ন উপায়ে মিথ্যা ও ভুয়া বিল তৈরি করে লাখ লাখ টাকা কৌশলে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে গোপন তদন্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। মন্ত্রণালয়ে বা সরকারি অফিস-আদালতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দুর্নীতির আরেকটি কৌশল। সেবার পরিবর্তে ফাইল আটকিয়ে রাখা বা কাজের অনুমোদন না দিয়ে ঘুরানো বা এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা মানেই, যে যত বেশি টাকা দেবে তার কাজটি তত দ্রুত করা হয়ে থাকে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রীরা আমলানির্ভর হয়ে পড়েন আর এতেই ঘটে বিপত্তি। মন্ত্রীদের দুর্বলতার কারণে পেয়ে বসেন আমলারা। অনিয়মকে প্রশ্রয় দেয়া ঠিক হবে না। লুটপাট, অপচয়, রাষ্ট্রের ক্ষতি প্রভৃতি বন্ধ করা এবং দুর্নীতি থেকে আমলাদের বের করা একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সম্ভব। তিনি মোটেও দুর্নীতি পছন্দ করেন না। সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চুরি, লুটপাট, দুর্নীতি এবং অপচয় বন্ধ করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সাহসী পদক্ষেপ হবে নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কোনো অবস্থায় যেন দুর্নীতি দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে সে জন্য প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সচিবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। হ
মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী



আরো সংবাদ