১৭ এপ্রিল ২০২১
`
সময়-অসময়

আন্তর্জাতিক ভোটার দিবস ও ইসির বাগি¦তণ্ডা

-

২ মার্চ নীরবে নিভৃতে চলে গেল তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভোটার দিবস। ভোটার দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা তো দূরের কথা আন্তর্জাতিক ভোটার দিবসের কথা জনগণ জানতেই পারল না; প্রচার হয় নাই কোনো মিডিয়াতে, খবর প্রকাশিত হয়নি কোনো পত্রিকায়। সরকারি দল বা সরকার কর্তৃক ভোটার দিবসটি পালন করার কথা জনগণ শুনছে বলে দৃশ্যমান হয়নি।
সরকার বা সরকারি দল কোন মুখে আন্তর্জাতিক ভোটার দিবস পালন করবে, এ নিয়েও রসালো আলোচনা আছে। সরকার বা সরকারি দল আন্তর্জাতিক ভোটার দিবস কেন উদযাপন করবে এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ বর্তমান আমলে সরকার গঠন করতে তো ভোটারের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় পুলিশ, প্রশাসন এবং একটি আজ্ঞাবহ চাটুকার নির্বাচন কমিশনের। এ দেশের ভেঙে পড়া নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য দেশবাসী একটি জোরালো আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের পদ্ধতি সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পরে সংবিধানে সংশোধনী এনে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন’ পদ্ধতি বাতিল করে দেয়। এর পর থেকেই শুরু হয় নির্বাচনে হরিলুটের ব্যবস্থা, দিনে দিনে নির্বাচনী হটকারিতা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। নির্বাচন করতে গেলে এখন আর ভোটারের প্রয়োজন হয় না। সরকারের নির্দেশনায় পুলিশের দেয়া গায়েবি মোকদ্দমা, ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক রিমান্ড মঞ্জুর এবং পুনরায় পুলিশের রিমান্ড বাণিজ্য প্রভৃতি মোকাবেলা করতেই বিরোধী দলের ত্রাহি ত্রাহি ভাব ছুটে যায়। অধিকন্তু রয়েছে সরকারি দলের সশস্ত্রবাহিনী কর্তৃক বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, যে নির্যাতনের কারণে তারা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতিটা এমনই দাঁড়িয়েছে যে, মাইর (আঘাত) ও মামলা, এ দুটোই যেন বিরোধী দলের পাওনা। কোমড় ভাঙা জাতীয় নির্বাচন কমিশন মুখে মুখে অনেক সুন্দর সুন্দর বাণী প্রচার করলেও স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও নির্ভরযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য তাদের কোনো পদক্ষেপ নেই। ফলে নির্বাচনে ভোটারের কোনো প্রকার গুরুত্ব নেই বলেই আন্তর্জাতিক ভোটার দিবসটি সবার অগোচরে মর্যাদাহীনভাবে চলে গেল।
নির্বাচনী ব্যবস্থায় যদি এমনিভাবে হরিলুট হতে থাকে তবে ভবিষ্যতেও ‘আন্তর্জাতিক ভোটার দিবসটি’ জনগণের অজান্তেই চলে যাবে, এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তবে এ দিবসটি উপলক্ষে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরোধ যে বিতণ্ডায় রূপ নিয়েছে তা জনগণের কাছে দিনে দিনে প্রকাশ পাচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন যে, ‘নির্বাচন কমিশনকে হেয় করতে যা যা দরকার সবই করেছেন (সিনিয়র নির্বাচন কমিশনার) মাহবুব তালুকদার।’ অন্য দিকে মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন চললে কমিশনের প্রয়োজন হবে কি না সেটাই বড় প্রশ্ন।’ নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ দু’জন কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কোনটি গ্রহণযোগ্য তা বিবেচনা করবেন জনগণ এবং জনগণের পক্ষে দেশের চলমান রাজনৈতিক দল।
দেশে নামেমাত্র লোক দেখানো একটি ‘নির্বাচনী’ খেলা হয়, যা একতরফা খেলামাত্র। কিন্তু এ নির্বাচনে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। চট্টগ্রামের রাউজান পৌরসভার ২৮-০২-২০২১ নির্বাচনে মেয়র ও ১২ জন কাউন্সিলর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। রাউজানে বিরোধীদলীয় কোনো প্রার্থীকে দাঁড়াতেই দেয়নি। এমনি অবস্থা চলছে গোটা বাংলাদেশে যেখানে বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের নির্বাচনে প্রচার ও ভোটকেন্দ্রে অবস্থান করতে দেয়া হয় না। এ জন্যই সিনিয়র নির্বাচন কমিশনার আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘সারা দেশে যদি চট্টগ্রামের রাউজান মডেলে সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জনপ্রতিনিধি হতে পারেন তা হলে নির্বাচনে অনেক আর্থিক সাশ্রয় হয় এবং সহিংসতা ও হানাহানি থেকে রেহাই পাওয়া যায়। এতে নির্বাচন কমিশনের দায়দায়িত্ব তেমন থাকবে না। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের আর প্রয়োজন হবে কি না, সেটা এক প্রশ্ন’ বক্তব্যটি পর্যালোচনার দাবি রাখে। কারণ বাংলাদেশে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার জন্য রাষ্ট্রের সহস্র কোটি টাকা খরচ হয়, যা জনগণের টাকা, এ টাকা প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচনের জন্য ব্যয় না করে আরো একটি পদ¥া সেতু নির্মাণ করলে জনগণ বেশি উপকৃত হতো। নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা না থাকার আর একটি বহিঃপ্রকাশ হলো যে, ভোটাররাও নিরাপত্তার অভাবে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হচ্ছে না।
সরকার এখন রাষ্ট্র শাসন করছে পুলিশ দিয়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই ভোট দেয়ার কাজ সম্পন্ন করে। এ কথা মানতে হবে যে, শুধু ‘ভোটের’ দিনই ‘ভোট’ হয় না। সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য সারা বছরই রাজনৈতিক দলগুলো ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে প্রচার কার্যসহ সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে যেতে পারে এ জন্য প্রয়োজনীয় ও যুক্তিসঙ্গত পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে এমপি/মন্ত্রী, পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যোগসাজশে এমনি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে যাতে সরকারি দল ছাড়া বাকি সবাই ভয় এবং আতঙ্কের মধ্যে থাকে। বিএনপির কোনো নেতা যদি নিজ এলাকায় সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে যায় সেখানে সরকারি দল অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা করে।
সরকার পুলিশকে জনগণের মুখামুখি দাঁড় করিয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোনো রাজনৈতিক দল প্রতিবাদ সভা করার প্রস্তুতি নিলে বিনা উসকানিতে পুলিশ বেপরোয়াভাবে লাঠিচার্জ, কাঁদানি গ্যাস নিক্ষেপসহ যতভাবে পারে আক্রমণ শুরু করে। গত দু-এক দিনে বিশেষ করে ০৪-০৩-২০২১ পুলিশ জাতীয় প্রেস ক্লাবকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে। পুলিশের অনুমতিক্রমে বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়নি বলে বিক্ষোভ সভা তারা পণ্ড করে দিয়েছে বলে পুলিশ মিডিয়াকে বলেছে, যা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে লাইভ দেখানো হয়েছে। এতে করে ইচ্ছাকৃতভাবে বিনা উসকানিতে পুলিশ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে হামলা চালায়। ছাত্রদল যখন প্রেস ক্লাবের ভেতরে আশ্রয় নেয় তখন পুলিশ প্রেস ক্লাবের ভেতরে চলে যায়। পুলিশের ভাষ্য ছাত্রদের ইটপাটকেল নিক্ষেপে কয়েকজন পুলিশ আহত হয়েছেন। অথচ এরচেয়ে বেশ কয়েকগুণ বেশি ছাত্র পুলিশের হামলায় আহত হয়েছেন।
দেশে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা নাই বলে গণমানুষ সরকারের চালানো অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছে না, কোনোগোষ্ঠী প্রতিবাদ করার পদক্ষেপ নিলে সেখানে শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ এবং গ্রেফতার ও রিমান্ড। কারাগার একজন কারাবন্দীর জন্য সবচেয়ে বেশি নিরাপদ স্থান হওয়ার কথা ছিল। প্রতিটি কারাগারে মূল গেটে লেখা রয়েছে যে, ‘দেখাবো আলোর পথ, রাখিবো নিরাপদ’। বাস্তবে এখন বাংলাদেশের কারাগারও কোনো প্রতিবাদী মানুষ নিরাপদ নয়। সম্প্রতি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকাবস্থায় লেখক মুশতাক আহম্মদের মৃত্যু হয়।
পাকিস্তান সরকার বাঙালিদের অধিকার বা তথা ভোটাধিকার হরণ করার কারণেই বাঙালিরা অস্ত্র হাতে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। জনগণের ভোটাধিকার তাদের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। সেই মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার থেকে জনগণ বঞ্চিত। রাষ্ট্রীয় এ বঞ্চনার বিরুদ্ধে জনগণের রুখে দাঁড়ানোর সময় বয়ে যাচ্ছে। নতুবা স্বাধীনতার মূল্যবোধ এ দেশের গণমানুষের কাছে হয়ে যাচ্ছে অর্থহীন ও মূল্যহীন।
নির্বাচন কমিশন গণমানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এটাই তাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। সরকার সবসময়ই তাদের আজ্ঞাবহ একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সরকারের প্রতি অতিমাত্রায় আনুগত্য প্রকাশ করায় নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ব্যর্থ করে দিয়েছে। ফলে দেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন ‘নির্বাচন’ যা বর্তমানে জনতার সামনে একটি সার্কাসে পরিণত হয়। এ সার্কাস জনগণকে বানিয়েছে একটি তামাশার পাত্র। এ থেকে উত্তরণের জন্য চাই সঙ্ঘবদ্ধ আন্তরিক প্রচেষ্টা।
লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন) taimuralamkhandaker@gmail.com



আরো সংবাদ