১৭ এপ্রিল ২০২১
`

গণমাধ্যম ক্রান্তিকালে

-

সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যমের সাথে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। কিন্তু সাংবাদিকতার সূচনালগ্ন থেকে পেশাটি কখনো পুরোপুরি স্বাধীন ছিল- এমন প্রমাণ মেলে না বরং পরাধীনতার মধ্য দিয়েই সময়ে-সময়ে পেশাটি স্বাধীনতার স্বাদ নেয়ার চেষ্টা করেছে। কখনো কিছুটা পেয়েছে। বাকি সময় মানিয়ে চলেছে আর তাল মিলিয়েছে। এটা সেই হাতে লেখা সংবাদপত্র থেকে শুরু করে আজকের তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে ঝকঝকে মুদ্রিত চাররঙা পত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন মিলিয়ে সবার ক্ষেত্রেই সত্য। দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে বরাবরই নিষ্ঠুর তথ্য এটাই।
এ দেশের ক্ষমতাসীনরা কখনোই সমালোচনা সইতে অভ্যস্ত নয়। কী স্বৈরাচারী, গণতান্ত্রিক, নির্বাচিত-অনির্বাচিত সবাই। যা কেবল মাত্রায় কমবেশি মাত্র। তথ্যে ভীষণ ভয় সব সময়ের ক্ষমতাসীনদের। কেবল সাংবাদিকতা নয়, গল্প-কবিতা, কার্টুন-ছড়ায় কিছু বিপক্ষ মনে হলেও। তবে এটা যত না দোষের তার চেয়ে বেশি বৈশিষ্ট্যগত। সরল বিবেচনায় প্রশ্ন করা যায়, সমালোচনা করলে কি সরকার পড়ে যায়? না, পড়ে না। কিন্তু সরকারগুলো পড়ে যাওয়ার আতঙ্কে ভোগে। সব সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমা এঁটে দেয়। ফলে তারা বেশির ভাগ সময় সরকারবিরোধী আর রাষ্ট্রবিরোধী একাকার করে ফেলে। অবশ্য ডিজিটাল আধুনিকতার সুবাদে মানুষের এখন আগের মতো আর তথ্যের জন্য সংবাদপত্র বা টিভি-রেডিওর জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। হাতের মোবাইল এখন সংবাদ ও তথ্যের ডিপো। লাখ-লাখ অ্যাকাউন্ট ফেসবুকে আর ইউটিউবে। যার যা ইচ্ছা লিখছে, বলছে। সত্য-মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। কিন্তু এতে কী হয় বা হবে সরকারের? এখন পর্যন্ত সেই ধরনের কোনো শঙ্কাও নেই। আবার এসব মাধ্যমে সরকারের পক্ষে প্রচারও কম নয়। এতেও কি সরকার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে যাচ্ছে?
প্রসঙ্গ এসেছে কাশিমপুর কারাগারে বন্দী লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর রেশ ধরে। তাকে বন্দী করা হয়েছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। কিসব নাকি লেখালেখি করেছেন তিনি। আবার কারাগারে তাকে নির্যাতন করে মারা হয়েছে এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ কারো কাছে নেই। মেরে ফেলতে হলে কারাগারে নিতে হবে কেন? কিন্তু এতে কিছু পারসেপশন তৈরি হয়েছে পাশাপাশি কিছু কথা চাউরও হয়েছে। মামলা ও রাষ্ট্রপক্ষের মতিগতিতে মুশতাক এক ‘ভয়ঙ্কর’ অপরাধী। ১০ মাস ধরে তাকে জেলে আটকে রাখা হয়েছে। অন্তত ছয়বার জামিন আবেদন করেছেন তিনি কিন্তু বারবারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। একপর্যায়ে সরকারের হেফাজতে তার মৃত্যু হয়েছে।
অথচ যেখানে খুনের বা যাবজ্জীবন দণ্ডিত আসামি পার পেয়ে যাচ্ছে, সেখানে অজানা ধরনের এক লেখককে নিয়ে কেন এমন কঠোরতর ভূমিকা? প্রশ্নটা সেখানেই। সমালোচনা, গালমন্দ, ব্যঙ্গচিত্র আঁকলে ক্ষেপে ওঠা জরুরি মনে করছে কারা? সাংবাদিক বা লেখক শ্রেণীর মানুষগুলো এর চেয়ে বেশি আর কিইবা করে বা করতে পারে? রাস্তাঘাটে, হাটে মাঠে ঘাটে, দোকানে, বাজারে হোটেল রেস্টুরেন্টে, বাসে- লঞ্চে মানুষ কি কেবল সরকারের পিণ্ডি চটকাচ্ছে? আর কাজ নেই মানুষের? সে রকম কিছু করলেই বা কী? সরকার কি এত কমজুরি? এই শ্রেণীর মানুষের বন্দনা পাওয়া খুব জরুরি? মোটেই না। দেশ-বিদেশে সরকারের প্রশংসাও কম নয়। রাষ্ট্রীয় এবং বেসরকারি প্রচারমাধ্যমে বর্তমান সরকারের মতো প্রশংসা অতীতে কোনো সরকারই নিশ্চিত করতে পারেনি। আবার সমালোচনাও দমেনি ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে চেষ্টা অব্যাহত আছে। সোস্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার প্রথমে আইসিটি অ্যাক্ট এবং পরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করেছে। এখানে কঠিন কঠিন সব ধারা। সরকারের সমালোচনা করা, খুন, ধর্ষণ, ব্যাংক লুট, বিদেশে অর্থপাচারের চেয়েও জঘন্য অপরাধ। ফলে প্রতিবাদ ধোপে টিকছে না। আন্দোলনকারীরা সমানে মার খায়। সংখ্যালঘুর মতো পিছু হটে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক খবরের কারণে নানা ধরনের সামাজিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে, অস্থিরতা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার সব সময়ই ছিল। কিন্তু সবকিছুর ওপরেই সাংবাদিকতা। এটা আগেও ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবকিছুই প্রোপাগান্ডা নয়। ইতিবাচক অনেক কিছুও আছে। যেকোনো বিষয়েরই একটি ভিন্ন মাত্রা আছে। পাঠক যখন বুঝতে পারবেন, তিনি সত্য তথ্য পাচ্ছেন না, তখন তারা মুখ ফিরিয়ে নেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কে কিভাবে ব্যবহার করবে ভালো-মন্দ নির্ভর করে তার ব্যক্তিগত মনোভাবের উপর। স্বাধীনতা চর্চার দিক থেকে সাংবাদিকতা এখন সারা বিশ্বে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেকটা স্বাধীন। তাদের জবাবদিহি নেই। গণমাধ্যম সেখানে অসহায়। আমেরিকাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার দেশ মনে করা হয়। বাস্তব তা নয়। দেশটিতে সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মতো একটা অনন্য বিধান আছে, যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। সেই দেশেও কথায় কথায় সাংবাদিকদের হেনস্তা করা হয়।
সাংবাদিকদের নিকৃষ্টতম জীবদের অন্যতমও বলা হয় সেখানে। শুধু আমেরিকা নয়, পশ্চিমা দেশগুলো ছিল স্বাধীন সাংবাদিকতার তীর্থস্থান। সেখানেও সাংবাদিকতা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। সেই বিবেচনায় সাংবাদিকতা দমনকে একটা বৈশ্বিক প্রবণতা বলা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সাংবাদিকতাকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। পাঠকের সামনে এখন সংবাদের অনেক পথ উন্মোচিত। তারা এখন আর খবরের কাগজ, টেলিভিশন ও রেডিওর ওপর নির্ভরশীল নয়। যেকোনো খবর সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎক্ষণাৎ জেনে ফেলছে। শুধু জেনেই ফেলছে না, সে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের অভিমত দেয়ারও সুযোগ পাচ্ছে।
খবরের কাগজের পাঠকের সেই সুযোগ ছিল না; তাকে সম্পাদক বরাবর চিঠি লিখতে হতো, সেই চিঠি ছাপা হতো কি হতো না, হলে কয়দিন পরে ছাপা হতো ইত্যাদি অনেক সমস্যা ছিল। কিন্তু এখন যার হাতেই একটা স্মার্টফোন আছে, সে তার মতামত প্রকাশ করতে পারছে। তার মতামত একসাথে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। নাগরিকপর্যায়ে তথ্য আদান-প্রদান ও মতপ্রকাশের এমন স্বাধীনতা ও তার এত ব্যাপকতা সাংবাদিকতার ইতিহাসে কোনো সময়ই ছিল না; এমনকি সভ্যতার ইতিহাসেই ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের খবরাখবরগুলোর সত্য-মিথ্যা যাচাই-বাছাই করা হয় না। সেগুলো অসম্পাদিত। কিছু বলায় বাছবিচার নেই, যার যা খুশি তাই বলে দিচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের মতো এডিটোরিয়াল কন্ট্রোল বা সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ সামাজিকমাধ্যমে নেই। এতে যে লাভবান তার কাছে তখন মাধ্যমটি ভালো, উৎকৃষ্ট। আর যে ক্ষতিগ্রস্ত তার কাছে নিকৃষ্ট। তিনিও তখন ডিজিটাল আইন খোঁজেন। পৃথিবীর অনেক দেশ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে। আর দুঃখের বিষয় হচ্ছে সেখানে পেঁচিয়ে ফেলা হচ্ছে সাংবাদিকতাকে। সাংবাদিকতা-অসাংবাদিকতাকে গুলিয়ে ফেলার বিরোধিতাও হচ্ছে দেশে দেশে। সবমিলিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতা ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আইনি বিপদ সাংবাদিকতায় আগেও কম ছিল না। তবে প্রয়োগ কম ছিল।
এক সময় মানহানির মামলায় সাংবাদিকদের নাজেহাল করা হতো। মানহানির মামলা দুই রকমের হতো। একটি ফৌজদারি এবং আরেকটি দেওয়ানি। সাধারণ নাগরিক কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মানহানি মামলা করতে গেলে আদালত হয়তো মামলা গ্রহণ করবেন না কিন্তু যদি কোনো প্রভাবশালী বা টাকাওয়ালা লোক মামলা করতে যান, তাহলে তার মামলা নেয়া হবে এবং সেটা নেয়া হবে ফৌজদারি আইনে; সাথে সাথে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হবে। তা ছাড়া আইনে স্পষ্ট লেখা আছে, মামলা করতে পারবেন শুধু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি, অন্য কেউ নয়। যার মানহানির অভিযোগ উঠল, শুধু তিনিই মামলা করতে পারবেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তার বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী, সমর্থক, অনুসারীরা মামলা করে এবং সেসব মামলা গ্রহণ করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেটরা কিন্তু এসব মামলা না নিলেও পারেন, আইনে তাদের সেই ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা এসব মামলা গ্রহণ করেন। এতে একই অভিযোগে ১০, ১৫, ২০টা মামলা হয়। আইনে আরো বলা হয়েছে, একটা মানহানির ঘটনায় একের বেশি মামলা হতে পারবে না। সেখানে একাধিক মামলা হয়, হচ্ছে। এখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আর মানহানির মামলা- দুয়ের তোড়ে সাংবাদিকতায় সেলফ সেন্সরশিপ বেড়ে গেছে। চাচা আপন প্রাণ বাঁচানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
ডিজিটালাইজেশনের ফলে বিজ্ঞাপনদাতারা এখন বেশি করে ঝুঁকছে ডিজিটাল প্রকাশমাধ্যমের দিকে। সারা বিশ্বেই এটা ঘটছে। এতে মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমের বিজনেস মডেল সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পৃথিবীর অনেক দেশে নামকরা অনেক সংবাদপত্রের ছাপা সংস্করণ বন্ধ হয়ে গেছে, তারা শুধু অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করছে। টেলিভিশনের দর্শকও ভীষণভাবে কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।



আরো সংবাদ