০২ ডিসেম্বর ২০২০

ইমিউন সিস্টেমকে ভালোবাসুন

-

অতি ক্ষুদ্র অদৃশ্য করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে ত্রাসের সৃষ্টি করেছে। ২৩ অক্টোবর শুক্রবার সকাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে করোনায় সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা চার কোটি ১৫ লাখ ৯৫ হাজার ৯৮০। সুস্থ হয়েছেন দুই কোটি ৮২ লাখ ৬৮ হাজার ৬৪৩ জন। বিশ্বে সুস্থতার হার প্রায় ৬৮ শতাংশ।
এ সময়ে বাংলাদেশের করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখ ৯৪ হাজার ৮২৭ জন। আজকালের মধ্যেই তা চার লাখ ছাড়াবে। করোনায় বাংলাদেশের মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচ হাজার ৭৪৭ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন তিন লাখ ১০ হাজার ৫৩২ জন। বাংলাদেশে করোনায় সুস্থতার হার ৭৮.৬৫ শতাংশ, অর্থাৎ ১০০ জনে ৭৮.৬৫ জন সুস্থ হয়েছেন।
করোনাভাইরাস মারাত্মক ছোঁয়াচে এবং ‘খুবই ধূর্ত’ একটি ভাইরাস। এটি দেহের ভেতরে ঢুকে প্রথমে নাক ও গলার ওপর অংশের কোষগুলোকে সংক্রমিত করে। তাই এতে আক্রান্তদের প্রথমে শুষ্ক ও একটানা কাশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার কিছু ভাইরাস কণা গলা পেরিয়ে আরো নিচের দিকে পেটের ভেতর অর্থাৎ অন্ত্রে চলে যায়। সেখানে অন্ত্রের এসিই-২ এনজাইমের সাথে দৃঢ়ভাবে লেগে যায় ভাইরাসটি। এর ফলে ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। এর চেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার ঘটে যদি ভাইরাসটি বায়ুনল ও ফুসফুসে চলে যায়। আমাদের ফুসফুস এসিই-২ এনজাইমে পরিপূর্ণ। কাজেই এই ভাইরাসের জন্য ফুসফুস হলো ভয়ঙ্কর এক প্রজননক্ষেত্র। ভাইরাসটির মূল টার্গেটই থাকে ফুসফুসে ঢোকা। একবার ভাইরাসটি ফুসফুসে ঢুকে পড়তে পারলে, নিউমোনিয়ার লক্ষণগুলো দেখা দিতে শুরু করে। সময়ের সাথে কাশি, জ্বর, ঘাম, কাঁপুনি, শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট ও বুকে তীব্র ব্যথা দেখা দেয়। তেমনি গলা ব্যথাও দেখা দেয়। এসব লক্ষণের জন্য শুধু ভাইরাসটি দায়ী নয়, এর পেছনে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে শরীরের ইমিউন সিস্টেমের যুদ্ধ করার প্রচেষ্টাও দায়ী।
রসায়নের ছাত্র হিসেবে স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, পুষ্টি ও খাদ্য-বিষয়ক রিপোর্ট করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞদের সান্নিধ্য পেয়েছি। এর ভিত্তিতেই ইমিউন সিস্টেম বিষয়ে এ লেখা, যাতে সাধারণ মানুষ এর থেকে কিছুটা উপকৃত হয়।
করোনাভাইরাসের যে উপসর্গের কথা উল্লেøখ করেছি, সাধারণ সর্দি-জ্বরেও এগুলো আমাদের মধ্যে দেখা যায়। আবার অনেক গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক করোনা রোগীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে এসব উপসর্গ ছিল না বা কোনো উপসর্গই হয়নি। বিবিসির খবরে বলা হয়, ব্রিটিশ সরকারের জরুরি পরিস্থিতিতে বৈজ্ঞানিক পরামর্শ কমিটির সদস্য স্যার মার্ক ওয়ালপোর্ট ২২ অক্টোবর বলেছেন, ‘করোনাভাইরাস এমন একটা ভাইরাস যা কোনো না কোনো আদলে আজীবন আমাদের সাথে থেকে যাবে। আর অনেকটা নিশ্চিত করে বলা যায়, মানুষজনকে বারবার টিকা নিতে হবে’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলেছে, করোনা হয়তো চিরকাল থেকে যাবে। অর্থাৎ ভাইরাসটি সহজে যাচ্ছে না। করোনাভাইরাসের সাথে ‘ঘর-বসতি করাই লাগবে।’ তাই এখন থেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজেদেরকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রস্তুত করে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বে সুস্থ হয়েছে প্রায় ৬৮ শতাংশ রোগী। আর বাংলাদেশে সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা ৭৮.৬৫ শতাংশ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ হওয়া এসব রোগী বেশির ভাগ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭০-৮০ শতাংশের অবদান, শরীরের ইমিউন সিস্টেমের। এখন পর্যন্ত করোনার সুনির্দিষ্ট ভ্যাকসিন এবং ওষুধ আসেনি। যাদের ইমিউন সিস্টেম ভালো বা উন্নতমানের, তারা সাধারণ সর্দি-জ্বর কাশির ওষুধেই সেরে উঠেছেন। আবার যাদের ইমিউন সিস্টেম সুপার-ডুপার লেভেলে তাদের করোনা আক্রান্ত করলেও উপসর্গ দেখা দেয়নি।
ভাইরাসটি শরীরের ভেতরে ঢুকে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছে। তাই প্রত্যেককেই তার শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে ভালোবাসতে হবে। একে শক্তিশালী করে, ভালো করে উপযুক্ত এক লাইফ স্টাইল বেছে নিতে হবে। ইমিউন সিস্টেমকে ক্ষতি করে এমন অভ্যাস, এমন খাবার ছেড়ে দিতে হবে। যেমন সিগারেট, তামাক পাতা, কৃত্রিম খাবার-দাবার। ভালো খাবার-দাবার খেতে হবে। ভালো খাবার মানেই শুধু মাছ-গোশত নয়; সবুজ সতেজ শাক-সবজি, মৌসুমি ফলমূল। বেশি পরিমাণ ভিটামিন সি, শরীরে রোদ লাগানো, নিয়মিত ব্যায়াম, হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম, দুশ্চিন্তামুক্ত জীবন। দুধ-চা বাদ দিতে হবে। গ্রিন টি খেতে হবে। সাথে লেবু চা, আদা, এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, তেজপাতা, তুলসী, পুদিনার চা আর মধু। ওষুধের দিকে, ভ্যাকসিনের দিকে, চাতক পাখির মতো না তাকিয়ে নিজের ইমিউন সিস্টেমকে মেরামত করতে হবে।
ইমিউন সিস্টেমের ক্ষমতা মজবুত করতে হলে শরীরের প্রয়োজন শক্তি এবং পুষ্টি। এ দুটিই নির্ভর করে আমরা কী খাচ্ছি, তার ওপরে। ভাইরাস সংক্রমণের প্রতিরোধে মজবুত ইমিউন সিস্টেম অতি আবশ্যক। তাহলে করোনাভাইরাসই শুধু নয়, ভবিষ্যতে এর চেয়েও ভয়ঙ্কর কোনো ভাইরাস কিংবা অন্যান্য রোগ-জীবাণুই আর সুবিধা করতে পারবে না।

ইমিউন সিস্টেম যেভাবে কাজ করে
দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের দেহকে রোগব্যাধি থেকে রক্ষার জন্যও রয়েছে একটি সুসংহত ও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তের মধ্যে তিন ধরনের সেল বা কোষ রয়েছেÑ লোহিত কণিকা, শ্বেতকণিকা ও অনুচক্রিকা। লোহিত কণিকার কাজ হলো, রক্তে অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই অক্সাইড পরিবহন করা। অনুচক্রিকার কাজ হলো, কোনো জায়গা কেটে গেলে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করা, যাতে অতিরিক্ত রক্ষক্ষরণ হতে না পারে। আর শ্বেতকণিকার কাজ, দেহের রোগ প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও সহায়তা করা। মূলত শ্বেতকণিকাই হলো আমাদের দেহের আসল প্রতিরক্ষাবাহিনী। যেসব শ্বেতকণিকা রোগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অংশ নেয় সেগুলো হলো নিউট্রোফিল, মনোসাইট, ম্যাক্রোফেজ, বি-লিম্ফোসাইট, টি-লিম্ফোসাইট ইত্যাদি। শরীরে কোনো রোগ-জীবাণু প্রবেশের সাথে সাথে এরা সেগুলোকে ধ্বংস করার কাজে উদ্যোগী হয়। এ ছাড়া আছে ন্যাচারাল কিলার সেল নামেই এর পরিচয়। আমাদের শরীরে প্রতিনিয়ত ক্যান্সার সেল তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এগুলো টিউমারে রূপ নেয়ার আগেই ন্যাচারাল কিলার সেল ওগুলোকে ধ্বংস করে দেয়।
দেহে ইমিউন সিস্টেম মূলত কাজ করে স্বয়ংক্রিয় ও স্বনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে। যেমন হাত বা শরীরে কোনো অংশ কেটে গেলে সেই কাটা অংশ দিয়ে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। এ সময় দ্রুত নিউট্রোফিল এগিয়ে আসে এবং এই জীবাণুকে ধ্বংস করে। নিউট্রোফিল অযাচিত জীবাণুুকে ধরে খেয়ে ফেলে, প্রতিনিয়ত এভাবে জীবাণুর সাথে যুদ্ধ করে আমাদের বাঁচিয়ে রাখছে। আবার যখন নিউট্রোফিল জীবাণুর সাথে পেরে উঠে না, তখনই ইনফেকশন হয়। সাদা রঙের পুঁজ বেরিয়ে আসে। এই পুঁজ আসলে শরীরের মৃত নিউট্রোফিল। এভাবে প্রতিদিন দেহকে রক্ষা করতে গিয়ে শত সহস্র নিউট্রোফিল অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে।
যক্ষ্মার ভ্যাকসিনের কথা ধরা যাক। শরীরে এই ভ্যাকসিন দেয়া মাত্রই দেহ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্যতম সৈনিক ম্যাক্রোফেজ সেখানে ছুটে যায়, টিকার জীবাণুুটিকে কামড়ে ধরে। কামড় দিয়ে সে বুঝতে পারে যে তাকে ধ্বংস করা তার সাধ্যের মধ্যে নেই। কিন্তু হাল ছেড়ে না দিয়ে ম্যাক্রোফেজ তাকে নিয়ে আসে টি-লিম্ফোসাইটের কাছে। টি-লিম্ফোসাইট তাকে ধ্বংস করে। সেই সাথে হাজার হাজার মেমোরি টি-সেল তৈরি করে রক্তে ছেড়ে দেয়। ভবিষ্যতে যখন যক্ষ্মার সত্যিকার জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে তখন এই মেমোরি টি সেল সেই জীবাণুকে আক্রমণ করে এবং একই প্রক্রিয়ায় ধ্বংস করে দেয়। অর্থাৎ যক্ষ্মা থেকে আপনি বা আপনার শিশু রক্ষা পায়। যক্ষ্মার ভ্যাকসিন বা টিকা এক্ষেত্রে শুধু সাহায্য করছে। একইভাবে হেপাটাইটিস, হাম, পোলিও এবং বর্তমান করোনাভাইরাস ও অন্যান্য রোগব্যাধি থেকে রক্ষা করছে শরীরের ইমিউন সিস্টেম। ভ্যাকসিন এ প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে তুলছে।
বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী বর্তমানে সবচেয়ে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী রোগ। এর আগের আতঙ্ক সৃষ্টিকারী রোগ হলো এইডস। এই রোগটি শরীরে ইমিউন সিস্টেম পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। এইডসে এখন পর্যন্ত বিশ্বে তিন কোটিরও বেশি মানুষ মারা গেছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বলা হয়েছে। এইডস শরীরে ঢোকার পর টি-লিম্ফোসাইটের ভেতরে বাসা বাঁধে। সেখানে সে বংশবিস্তার করে। একসময় টি-লিম্ফোসাইটকে অকার্যকর করে দেয়। এইডস রোগ নিয়েও একজন রোগী অনেক দিন বাঁচতে পারে। কারণ টি-লিম্ফোসাইটের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে তাকে পরাজিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু এইডস রোগীর দেহে যদি অন্য রোগের জীবাণু ঢুকে পড়ে অর্থাৎ যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া কিংবা বর্তমান করোনাভাইরাস, তখন তাকে আর সুস্থ করা সম্ভব হয় না। ইমিউন সিস্টেম তখন অসহায় হয়ে পড়ে।
আগেই বলেছি, দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কিছু কোষ সব সময় সদা সতর্ক প্রহরীর মতো চারদিকে টহল দিচ্ছে। এরা দেহে আক্রমণকারী ভাইরাস বা যেকোনো রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে সর্বদা সজাগ। আসলে দেহে আক্রমণকারী কোনো ভাইরাস বা রোগ-জীবাণুর উপস্থিতি টের পাওয়ার সাথে সাথে ইমিউন সিস্টেম এক ধরনের প্রোটিন নিঃসরণ করে। এই প্রোটিনকে বলা হয় ইন্টারফেরন। এরা ভাইরাস কপি বা প্রতিলিপি তৈরির এবং তা ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ বা ইন্টারফেয়ার করে। ভাইরাসটির বংশবিস্তার ঠেকানোর পাশাপাশি ইমিউন সিস্টেমের অন্যান্য অংশকে সক্রিয় করে ইন্টারফেরন। যেমনÑ আক্রমণকারীকে ধ্বংস করার জন্য নিউট্রোফিল নিয়োগ করে। ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাকের বিরুদ্ধে নিউট্রোফিল খুবই কার্যকর। নিউট্রোফিল এগুলোকে ধরে খেয়ে ফেলে। ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে নিউট্রোফিল দু’ধারি তলোয়ারের মতো। এরা ভাইরাসের সাথে টানা যুদ্ধে লিপ্ত থাকে। এই যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে নিউট্রোফিল নিঃশেষও হয়ে যেতে পারে। এটা হলে একে বলা হয় সাইটোকাইন স্টর্ম বা সাইটোকাইন ঝড়।
ইমিউন সিস্টেমের অধীনে নজরদারির ক্ষেত্রে সেরা প্রহরী হলো ম্যাক্রোফেজ। দেহের চার দিকে ঘুরে সন্দেহজনক কিছু পেলেই সেগুলোকে খপ করে খেয়ে ফেলে ম্যাক্রোফেজ। এরপরও একক লড়াই চালিয়ে যাওয়া অনেক সময় তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তখন তারা ইমিউন সিস্টেমের অন্য অংশগুলোকে ডেকে পাঠায়। ভাইরাসের সাথে লড়াইয়ে ইমিউন সিস্টেমের ‘অ্যাডাপটিভ’ বা অভিযোজিত অংশ জড়িত থাকে। এ পর্যায়ে আমরা টি-কিলার সেল বা টি-ঘাতক কোষকে সক্রিয় হতে দেখি। করোনাভাইরাসের কথাই ধরুন। এক্ষেত্রে টি-সেলের কাজ হলো, কোভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রমিত বা দখল করা কোষগুলোকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করা। অ্যাডাপটিভ রেসপন্সে প্লাজমা বি-সেল থেকে কোটি কোটি অ্যান্টিবডি নিঃসরণ হতে থাকে। এরা লুকিয়ে থাকা বা পালিয়ে যাওয়া যেকোনো ভাইরাসকে ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করে। অ্যান্টিবডি বিভিন্ন ধরনের কাজ করে। অন্যতম কাজ হলো ক্ষুধার্ত শ্বেতকোষগুলোকে সক্রিয় করে তোলা। রক্তে অ্যান্টিবডির মাত্রা বেড়ে যাওয়া একটি ভালো লক্ষণ। এর মানে হলো, ইমিউন সিস্টেম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। চীনের উহানের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য স্বাস্থ্যবান ও সক্রিয় ইমিউন সিস্টেম খুব গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের চেয়ে বয়স্করা ভাইরাসে কেন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এ থেকেই বোঝা যায়। বয়স্কদের ইমিউন সিস্টেম বেশ দুর্বল। তাই শরীরকে সুস্থ ও রোগমুক্ত রাখতে ইমিউন সিস্টেমকে সুস্থ রাখা জরুরি। ডাক্তার, ওষুধ, হাসপাতাল হলো সহযোগী শক্তি। সুস্থতার মূল শক্তি হলো একটি কার্যকর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম।

কী খাবেন, কী খাবেন না
ওষুধ, ইনজেকশন, টিকা নয়। যেকোনো ভাইরাস, যেকোনো সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে বড় শক্তি বা প্রতিরোধ হচ্ছে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। ইমিউন সিস্টেমের ক্ষমতা যত বাড়াবেন, তত সফলভাবে করোনাভাইরাসও মোকাবেলা করা যাবে। সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজন দেহমনের যথাযথ যতœ নেয়া। সুস্থতা মহান আল্লøাহ তায়ালার বড় নিয়ামত। এই সুস্থতার জন্য প্রয়োজন সাত্ত্বিক খাবার। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। পুষ্টি বিজ্ঞানসম্মত খাবার। আর নিয়মিত কিছু ব্যায়াম। যেমন সবুজ গাছগাছালিপূর্ণ জায়গায় হাঁটা আর প্রাণভরে শ্বাস নেয়া। শরীরে রোদ লাগানো এবং সাধারণ ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করার অভ্যাস। তাহলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাড়বে।
সুস্থতা যে কত বড় নিয়ামত এটা একজন মানুষ বুঝতে পারেন, যখন তিনি অসুস্থ হন। শুধু অর্থের পেছনে ছুটলে অর্থ সুস্থতা দিতে পারবে না। এর জন্য প্রয়োজন শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিক প্রতিটি ক্ষেত্রে সুস্থ জীবনদৃষ্টি। শরীরের সিস্টেম যদি নষ্ট হয়ে যায় টেবিলের ওপর নানা খাবার থাকলেও তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। সুস্থতা না থাকলে টাকাও কোনো কাজে আসে না। এই করোনাকালে প্রথম দিকে একজন ধনকুবের কথা সবার জানা। কোটি কোটি টাকা তার কোনো কাজে আসেনি। দুই ভাই মিলে এক ভেন্টিলেটরে ছিলেন, শেষ রক্ষা হয়নি। আরেক ধনকুবের সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, চীনের ডাক্তারদের দিয়ে বোর্ড বসিয়েও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। ডাক্তারদের তিনি বলেছিলেন, তার হাজার কোটি টাকা সম্পদের বিনিময়ে হলেও তাকে সুস্থ করতে, কিন্তু তা পারা যায়নি।
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হচ্ছে খাবার। সহজ ফর্মুলা হচ্ছে, সুপাচ্য সহজ খাবার গ্রহণ করতে হবে। সব খাবারই খাওয়া যাবে, তবে খাবারটা হতে হবে পুষ্টিসম্মত, রুচিসম্মত এবং ধর্মসম্মত। যে মৌসুমে যে শাকসবজি পাওয়া যায়, যে ফলমূল পাওয়া যায় তা এবং মাছ, গোশত, ডিম খেতে হবে। আয়ুর্বেদের সূত্র হচ্ছে, শাকে বাড়ায় মল আর ফলে বাড়ায় বল। মৌসুমি ফলের ব্যাপারে বলা হয়, যে মৌসুমে যে ফল হয় সেই অঞ্চলে সেই মৌসুমের যে রোগ থাকে, সে রোগের প্রতিষেধক থাকে সে ফলে। ফল মানে হচ্ছে দেশজ ফল, আঞ্চলিক ফল এবং মৌসুমি ফল। তাহলেই রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে। পৃথিবীতে যত ফল পাওয়া গেছে বাংলাদেশের কাঁঠাল সবচেয়ে পুষ্টিকর এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। তাই কাঁঠালের সিজনে কাঁঠাল, আমের সিজনে আম। তেমনি কলা, আমড়া, জাম্বুরা, পেয়ারা, আমলকী, জাম, বেল, পেঁপে, কমলা, আনারস অর্থাৎ যে মৌসুমে যে ফল, তা খেতে হবে। শাকসবজির মধ্যে বাঁধাকপি, লালশাক, পুঁইশাক, ডাঁটা শাক, পাটশাক, কচুশাক, কচুর লতি, সজনে পাতা এবং আঁশজাতীয় সবজি বেশি বেশি খেতে হবে। ডিম পুষ্টিদায়ক, ওজনকে নিয়ন্ত্রণ করে। দিনে একটা ডিম খেতে পারলে ভালো। দুই দিন নিরামিষ, দুই দিন ছোট মাছ, দুই দিন বড় মাছ ও এক দিন গোশত তো সবসময় সুষম খাবার। মাছের ক্ষেত্রে সামুদ্রিক মাছ যত খাওয়া যায়, তত ভালো। গোশত যত বেশি, তত কোলেস্টেরল। চিংড়ি-কাঁকড়ার অনেক পা, কোলেস্টেরল সবচেয়ে বেশি। তারপর খাসি, গরুর চার পা। হাঁস-মুরগির দুই পা। মাছের কোনো পা নেই। কোলেস্টেরলও নেই। অতিরিক্ত মসলা, তেল-ঝাল, ভাজাপোড়া বর্জন করাই ভালো। প্রতিদিনের খাবার তালিকায় এককোষ রসুন, ২০-৪০টা কালিজিরা, এক গ্লাস দুধ, একটা কলা এবং একটা ডিম রাখা খুবই ভালো পুষ্টিবিদদের মতে। তেমনি রাখতে হবে সবুজ সালাদ এবং টক দই, যাকে ইয়োঘার্ট বলে। চাল একটু কমিয়ে বিকল্প হিসেবে সাথে আলু রাখা যায়। চালের ক্ষেত্রে খোসাসহ চাল খাওয়ার অভ্যাস করলে ভালো। লাল চাল, ঢেঁকিছাটা চাল হলে খুবই ভালো।
চিকিৎসকদের তথ্যানুযায়ী, করোনাভাইরাসে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে হিংস্র্র সংক্রমণ হয়েছে সিগারেট, অ্যালকোহল, এনার্জি বা সফট ড্রিংকস এবং প্যাকেট ও টিনজাত খাবার গ্রহণকারীদের ওপর। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমার পেছনে ফাস্টফুড, সফট ড্রিকস, এনার্জি ড্রিংকস এবং ধূমপান ও অ্যালকোহল মারাত্মক ক্ষতিকারক। ফাস্টফুড টেস্টি হওয়ার পেছনে আছে চর্বি বা তেল ব্যবহার। যত বেশি তেল খাবেন তত বেশি তেলতেলে হবেন, ওজন বাড়বে, স্থূলকার হবেন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা লোপ পাবে। সফট বা এনার্জি ড্রিংকস কিডনির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বৈজ্ঞানিক কারণটা হচ্ছেÑ সফট ড্রিংকস টেস্টি হয় যখন এটা ‘চিলড’ অবস্থায় থাকে। যত ঠাণ্ডা তত স্বাদ। পানি সবচেয়ে ঠাণ্ডা ও ঘন হয় যখন এর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে পৌঁছায়। সফট ড্রিংকস যাতে বরফ না হতে পারে সে জন্য কোম্পানিগুলো একটি অ্যান্টিফ্রিজার কেমিক্যাল ব্যবহার করেÑ ইথিলিন গ্লাইকল। এটা সফট ড্রিংকসের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রিতে নিয়ে স্থির রাখে, আর নামতে দেয় না। এই কেমিক্যাল ইথিলিন গ্লাইকল কিডনির জন্য খুবই ক্ষতিকারক। তাই এগুলো না খেয়ে নিয়মিত ডাব খাওয়া খুব ভালো। ডাবের মধ্যে ১৯টি উপাদান রয়েছে। কচি ডাবের পানি ও রক্তের যে ফ্লুইড, তরল অংশ, একই উপাদানে তৈরি। রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ডাব খুব উপকারী।
গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবহার শতকরা প্রায় ৮০ ভাগই নিয়ন্ত্রিত হয় ক্ষুদ্রান্ত্র দ্বারা। আর ক্ষুদ্রান্ত্রকে সুস্থ রাখতে পারে এরকম তিনটি খাদ্য হলোÑ আদা, রসুন ও মধু। এ ছাড়াও গ্রিন টি বা সবুজ চা ও ইমিউন সিস্টেম সংহত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ব্যায়াম বিশেষ করে শ্বাসের ব্যায়াম ফুসফুসের জন্য খুবই জরুরি। করোনার টার্গেট ফুসফুস, সে ক্ষেত্রেও শ্বাসের ব্যায়াম ভালো। প্রতিদিন সকালে অন্তত ২০ মিনিটের মিস্টি রোদ বা সূর্যের কিরণ শরীরে লাগালে ভিটামিন ডি’র ঘাটতি দূর হয়ে যায়। তাই প্রাকৃতিক খাবার, মৌসুমি ফলমূল, সব বিজ্ঞানসম্মত খাবার এবং নিয়মিত ব্যায়াম একটি কার্যকর ইমিউন সিস্টেম গড়ে তুলতে সহায়তা করে। হ
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সাম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব

 


আরো সংবাদ