০২ ডিসেম্বর ২০২০

ধর্ষণের নানা রূপ

-

দেশে ধর্ষণ এখন মহামারী রূপ ধারণ করেছে। সারা দেশে এই মুহূর্তে ধর্ষণের বিরুদ্ধে চলছে আন্দোলন ও প্রতিবাদ। প্রচার মাধ্যমগুলোতে উচ্চারিত হচ্ছে ঘৃণা। সেই ঘৃণা ধর্ষকদের বিরুদ্ধে যেমন উচ্চারিত হচ্ছে তেমনি উচ্চারিত হচ্ছে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধেও। এক দিনের পত্রিকার কিছু ধর্ষণবিষয়ক খবরের শিরোনাম দেখলেই এর ভয়াবহতা কিংবা মহামারীর চিত্র পাওয়া যাবে। শিরোনামগুলো হচ্ছে :
১. সিলেটে ৫ সন্তানের জননীকে ধর্ষণ : শ্রমিক লীগ নেতা গ্রেফতার।
২. সুনামগঞ্জে অপহৃত মেয়ের সন্ধান চাওয়ায় বাবাকে মারধর।
৩. প্রতিবাদমুখর নোয়াখালী, বাদল, দেলোয়ার ও সোহাগ রিমান্ডে।
৪. সারা দেশে ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভ, দোষীদের মৃত্যুদণ্ড দাবি।
৫. ধর্ষণের প্রতিবাদে ছাত্রলীগের পদযাত্রা ও আলোক প্রজ্বলন।
৬. ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতায় ঢাবি সাদা দলের উদ্বেগ।
৭. চট্টগ্রামে মহিলা দলের মানববন্ধনÑ ধর্ষণ ও দুর্নীতি বাংলাদেশকে অমানবিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
৮. মহিলা সরকারপ্রধান নারীদের ইজ্জতের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।
৯. দেশে চলছে রাষ্ট্রীয় অনাচার : রিজভী।
১০. মহাবিপর্যয় থেকে দেশ বাঁচাতে ফ্যাসিস্ট সরকারকে হটাতে হবে।
১১. কালিয়ায় অজ্ঞাত তরুণীর লাশ উদ্ধার।
১২. মঠবাড়িয়ায় গৃহবধূকে শ্লীলতাহানি ও পিটিয়ে যখম।
১৩. ডিমলায় কলেজছাত্রী ও গৃহবধূর লাশ উদ্ধার।
১৪. সোনারগাঁওয়ে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণ।
১৫. ধর্ষণের প্রতিবাদে ছাত্রশিবিরের মিছিল থেকে তিনজনকে গ্রেফতার ও বিস্ফোরক আইনে মামলা।
১৬. খুবি শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ভাগ্নির।
১৭. ধর্ষণ মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান চান জি এম কাদের।
১৮. নারী শিশু নির্যাতনের প্রতিবাদে তিন দিনের কর্মসূচি বিএনপির।
১৯. করোনার চেয়েও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে ছাত্রলীগ।
২০. ধর্ষণকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিলে সুষ্ঠু বিচার বাধাগ্রস্ত হবে : কাদের (নয়া দিগন্ত, ৭-১০-২০)। এ হচ্ছে পত্রিকার খবর। আর ফেসবুক? ফেসবুকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা, নেত্রী, মন্ত্রী, এমপি ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণের ক্ষোভ যেন ফেটে পড়ছে। স্বাধীনভাবে মন্তব্য করা যায় বলে এমন সব মন্তব্য করা হচ্ছে, যা পড়তে গেলে অস্বস্তিতে পড়তে হয়। কিছু কিছু মন্তব্য অশালীন। আর এসব মন্তব্য প্রমাণ করছে মানুষ কতটা ক্ষুব্ধ। কতটা মর্মাহতো। এসব আন্দোলন আর ক্ষোভের তীব্রতা অনুভব করে ক্ষমতাসীনদের অনেকেই আবোল-তাবোল বলতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ বলছেন বিচার নয়, ধর্ষকদের ক্রসফায়ারে দেয়া হোক। এসব যে মন থেকে বলছেন তা কিন্তু নয়। বলছেন জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য। যেমন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেনÑ ‘ধর্ষণ একটা সামাজিক ব্যাধি, এটা এক ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ধর্ষণকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিলে সুষ্ঠু বিচার বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, সম্প্রতি ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। তবে প্রতিবাদের প্রয়োজন নেই, সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে।’ অর্থাৎ ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকে ভয় পাচ্ছেন। আন্দোলনে সরকারের পতন হয় কি না আবার, এ কারণেই বলছেন আন্দোলনের প্রয়োজন নেই।
সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী কিংবা কর্তা ব্যক্তিরা নিজ দলের অন্যায় অপকর্মে লিপ্ত সন্ত্রাসীর দোষ স্বীকার করেন না। অতি প্রচারে এবং আন্দোলনের কারণে সামাল দিতে না পারলে বলেন এটা এমন কিছু না। বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু এখন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং সাধারণ সম্পাদক বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘সম্প্রতি ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে’। আর এ থেকেই ধর্ষণের মাত্রা ও মহামারী কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, তা স্পষ্ট বোঝা যায়। কিন্তু কেন ধর্ষণ এতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করল? এর কারণ বিচারহীনতা। এটা বিশেষজ্ঞদের অভিমত। যে ধর্ষণ নিয়ে এত কাণ্ড ঘটছে সেই ধর্ষণেরও প্রকারভেদ আছে। যেমনÑ পীড়ন এবং অত্যাচার ও ধর্ষণ। নির্যাতন, দলন এবং শক্তি প্রয়োগে পরাজিতকরণকেও বলা হয় ধর্ষণ। এ বিষয়গুলোকে বিবেচনা করলে বলা যায় বাংলাদেশ ধর্ষণে ধর্ষণে সয়লাব হয়ে গেছে। তবে ধর্ষণ বলতে সাধারণত বলাৎকারকেই বোঝায়। অর্থাৎ বলপূর্বক পরাজিতকরণের মাধ্যমে নারী ধর্ষণ। কিংবা বলা যায় বলপূর্বক নারীর সতীত্ব নষ্ট করা। কিন্তু কেন এই ধর্ষণ? কেন নির্যাতন? নারী-পুরুষের সম্পর্ক সুন্দর হবে, মধুর হবে, এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সেই সুন্দর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে আদিতে অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারী-পুরুষের সুন্দর সম্পর্ক বিরাজমান ছিল বলে জানা যায়। আদিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারীর স্থান ছিল অতি সম্মানজনক। সে সময়ে নারীর প্রতি পুরুষ ছিল অত্যন্ত দয়ালু, বিশ্বস্ত এবং আবেগপ্রবণ। কিন্তু পরে সুন্দর এ সম্পর্ক বজায় থাকেনি। শিক্ষা সংস্কৃতিতে মানুষ যত বেশি উন্নত হচ্ছে, সমাজে নারী নির্যাতনও তত বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সর্বত্র নারী দিবস পালিত হচ্ছে; কিন্তু নারী নির্যাতন কমছে না। নারীর প্রতি সবাই সুন্দর আচরণ করুকÑ এটা আমরা সবাই কামনা করি। ঈশ্বরও সেটাই কামনা করেন। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে। ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেস্ত’ কিংবা ‘যেখানে নারীরা পূজিত হন সেখানে দেবতারা আনন্দ পান’ এসব ধর্মীয় বাণী নারীদের উচ্চ মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এসব বাণী উচ্চারিত হয়েছে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য যে, নারী সব সময়, সব ক্ষেত্রে, সবার কাছে সম্মানিত হবেন। স্ত্রী সম্মানিত হবেন স্বামীর কাছে, প্রেমিকা তার প্রেমিকের কাছে, মা সন্তানের কাছে এবং নারী পুরুষের কাছে। সব ধর্মেই নারীর মর্যাদাকে এভাবেই চিত্রিত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নারীর প্রতি সে সম্মান দেখানো হচ্ছে না। অর্থাৎ নারী নির্যাতনের অবসান হচ্ছে না। নির্যাতনের অবসান কেন হচ্ছে না, কিংবা বলা যায় নির্যাতন কেন কমছে না তারও ব্যাখ্যা নানাজন নানাভাবে দিয়েছেন। যেমন ১৯৩২ সালে এক আলোচনায় বলা হয়েছে যে, যেসব বধূ শ্বশুরালয়ে শ্বশুর, শাশুড়ি, দেবর, ননদ কিংবা স্বামীর দ্বারা নিগৃহীত হয় এবং সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচতে মনস্থ করে সেসব বধূকে অসৎ লোকেরা শ্বশুরালয় থেকে মুক্ত করে বাবার বাড়ি পৌঁছে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যায় এবং অত্যাচার কিংবা নির্যাতন করে নিজের অসৎ প্রবৃত্তি চরিতার্থ করে। কখনো কখনো বাবা-মা গুরুতর অসুস্থ এমন মিথ্যা সংবাদ দিয়ে বাবা-মার কাছে নিয়ে যাওয়ার ছলে বাড়ির বাইরে নিয়ে তাদের সর্বনাশ করে। কোনোরূপ প্রলোভন কিংবা ছলচাতুরী না করে বল প্রয়োগের মাধ্যমেও কুমারী সধবা এবং বিধবাদের ওপর নির্যাতন করে। এ ছাড়া যৌতুক ও অন্যান্য কারণেও নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন।
১৯৩৩ সালে বঙ্গীয় পুলিশ রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ওই সালে নারী নির্যাতন বেড়েছে। এর আগেও বেড়েছে যে, রিপোর্টে সে কথাও উল্লেখ আছে। সে সময় ঢাকার পুলিশ কর্মচারী এবং কনস্টেবলদের পুরস্কার প্রদানকালে বঙ্গের অস্থায়ী গভর্নর স্যার জন উডহেডও একই রকম মন্তব্য করেছিলেন। সে ৮৭ কিংবা ৮৮ বছর আগের কথা। কিন্তু এতগুলো বছর পরেও নারী নির্যাতন বৃদ্ধির যে খবর প্রকাশিত হতে দেখা যাচ্ছে, তা মহা উদ্বেগের বিষয়। যে নারী স্ত্রী হিসেবে সংসারের যাবতীয় কর্ম সম্পাদন শেষে স্বামী সেবায় আত্মনিয়োগ করেন, যে নারী ১০ মাস পেটে সন্তান ধারণ শেষে সন্তান প্রসবান্তে লালন-পালন করেও সংসারকে স্বর্গে পরিণত করার প্রাণপণ চেষ্টা করেন, যে নারী অফিস স্বামী সন্তান ও সংসারের যাবতীয় কর্ম সম্পাদন করেও ক্লান্তিবোধ করেন না, যে নারী শত দুঃখ-কষ্ট বুকে চেপে হাসি মুখে সবাইকে খুশি রাখতে চান, সেই নারীর প্রতি সমাজ কেন ন্যূনতম শ্রদ্ধাটুকুও দেখাতে পারে না, সেই নারীর ওপর কেন নির্যাতন হয় তা সত্যিই এক রহস্যজনক বিষয়। অনেকেরই অভিমত এ রহস্যের বেশির ভাগই সৃষ্টি হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ঘিরে। রাজনৈতিক বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই সৃষ্টি হয়েছে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মহামারীর অবস্থা। রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং বিচারহীনতাই এর প্রধান কারণ বলে আজ সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। আশার কথা সরকার নারী নির্যাতন ও ধর্ষণকারীদের বিষয়ে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করেছে। সর্বস্তরের জনগণের আন্দোলন ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই দুর্বৃত্তদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বহাল করার সিদ্ধান্তের কথা সরকারের পক্ষ থেকে ভাবা হচ্ছে বলে জানা গেছে। আমিও মনে করি নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মহামারী থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে মৃত্যুদণ্ড বহাল করা অতি আবশ্যক। কারণ নারীরা পুরুষ নামের পশুদের দ্বারা নির্যাতিত ও ধর্ষিত হোকÑ সেটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। নারীর প্রতি সবাই শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুক এটাই আমাদের কামনা। আমরা শিল্পকলার প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখব প্রায় সব শিল্পীই নারীকে প্রেয়সী, স্ত্রী, জননী, মহীয়সী রূপে ক্যানভাসে চিত্রিত করেছেন। শিল্পী ম্যাসাসিও, বরার্ট ক্যামিপন এন্ড্রো ম্যানটেগনা, রাফায়েল, লিওনার্দো-দা-ভিঞ্চিসহ বহু শিল্পী কুমারী মাতা ও শিশু যীশুর চিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে পবিত্র মাতৃত্বের নিদর্শন স্থাপন করেছেন। লিওনার্দো-দা-ভিঞ্চি নারীর রহস্যময়তা প্রকাশের জন্য চিত্রিত করেছেন জগদ্বিখ্যাত প্রাণ স্পন্দনময়ী নারীর উপমা মোনালিসা। নারী যে শরীরী গঠনে, রূপ-লাবণ্যে এবং সর্বোপরি বহু গুণে গুণান্বিত সেই গুণের রহস্য প্রকাশে শিল্পী নারীকে বহু বিচিত্র রূপে চিত্রিত করেছেন। কর্মী রমণী, স্নানরত রমণী, নিরাভরণ রমণী, বসনাবৃত্ত রমণী, দুখী রমণী, সুখী রমণী এমনি শত সহস্ররূপে রূপায়িত করেছেন নারীকে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন অঙ্কিত করেন সাপুড়ে সাঁওতাল দম্পতি, স্নানরত রমণী এবং শিল্পী কামরুল হাসানের কলসি কাঁখে রমণী, জলকেলি, উঁকি, তিন কন্যা, শিল্পী এস এম সুলতানের মাছকাটায় রমণী, ধান ঝাড়ায় রমণী প্রভৃতি নারী বিষয়ক চিত্র নারীদের প্রতি শিল্পীত্রয়ের অপরিসীম শ্রদ্ধার নিদর্শন। সমগ্র বিশ্বের শিল্পী সমাজ এভাবেই নারীদের প্রাধান্য দিয়েছেন তাদের ক্যানভাসে। শুধু শিল্পী নন, সব পুরুষের দৃষ্টিতে এবং হৃদয়ের নারীরা শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত হোক এই কামনা আমাদের সবার। যেন নারী-পুরুষদের সৌহার্দ্যে গড়ে উঠতে পারে স্বপ্নের সুন্দর সোনার বাংলাদেশ। হ


আরো সংবাদ