২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

ফেসবুকে আমরা কী করছি

-

নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কেউ ক্ষতিকর কোনো কিছুতে পুরোপুরি আসক্ত হয়ে পড়লে, সেই শব্দের সাথে ‘খোর’ যুক্ত করে একটি শব্দের ব্যবহার চলে এসেছে। সেখান থেকেই মদখোর, গাঁজাখোর, হেরোইনখোর, ফেনসিডিলখোর ইত্যাদি শব্দ আমাদের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত। কিন্তু ‘ফেসবুকখোর’ নামক নতুন আরেকটি শব্দের সাথে আমরা খুবই কম পরিচিত!
ফেসবুককে পুরোপুরি ক্ষতিকর বা নেতিবাচক অর্থে বলছি না। কিন্তু যেকোনো কিছুতেই প্রচণ্ড আসক্ত হয়ে যাওয়া খারাপ নিঃসন্দেহে।
শব্দটি শুনতে অদ্ভুত অথবা একটু খারাপ লাগলেও এই ক্ষতিকর বাস্তবতা অস্বীকার করা যাচ্ছে না যে, এমন অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী আছেন, যাদের সকাল থেকে সন্ধ্যা হয় ফেসবুকে; যাদের সন্ধ্যা থেকে রাত গভীর হয়ে ভোর হয়ে যায় ফেসবুকেই! যারা হাঁটতে গিয়েও, রাস্তপার হতে গিয়েও চোখ রাখেন মোবাইলের
দিকে! যারা পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলার সময়ও দৃষ্টি রাখেন ফেসবুকের দিকে। বিনয়ের জন্য নয় বরং দিকভ্রান্ত হয়ে সারাক্ষণ মাথা নিচু করে থাকা এক প্রজন্মের সাথে আমরা পরিচিত হচ্ছি। এটিকে প্রযুক্তির ব্যবহার বলে জাস্টিফাই করার কোনো সুযোগ নেই। ফেসবুক-আসক্ত ব্যক্তিরা বরং প্রযুক্তির অপব্যবহার করছেন।
অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী নিজের প্রোফাইলে লিখে রাখেন যে, ‘আমি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা ফেসবুকে থাকি!’ কেউ কেউ লিখেন, “আমি ফেসবুকেই খাই-দাই আর ‘ফেসবুকে’ ‘বুক’ রেখেই ঘুমাই!” এসব
লেখার মাধ্যমে তারা বোঝাতে চান, তারা ফেসবুকে খুবই সক্রিয়! কিন্তু এভাবে যে প্রযুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে, সেটি সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার চলছে ফেসবুকে, ইউটিউবে এবং একাধিক
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। মাত্র কয়েক দিন আগে অপু নামের ‘টিকটক’ ভিডিও নির্মাণ করা একটি ছেলে তার অনেকগুলো বন্ধু নিয়ে উত্তরায় রাস্তা বন্ধ করে সবার অসুবিধা সৃষ্টি করছিল।
সেটি বলতে যাওয়ার কারণে তারা একজন ইঞ্জিনিয়ারকে রাস্তায় মারধর করেছে। বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই অনেকে
জেনেছেন। অপুকে চিনতেন নাÑ এমন একজন বললেন, অপুর ‘মাহাত্ম্য’ নিয়ে কি দুই-এক লাইনের কিছু লেখা যায়? ওকে আমিও চিনতাম না। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করার পর, সে কী কী বিষয় নিয়ে কী ধরনের কাজ করত, একটু দেখার চেষ্টা করলাম। তার নির্মাণ করা বেশ কিছু ‘টিকটক’ দেখে মাহাত্ম্য বর্ণনার জন্য দুই-এক লাইন দূরের কথা দুই-একটি শব্দও পেলাম না! যা দেখলাম, বুঝলাম, তা সবই প্রকাশের অযোগ্য! অথচ তার নাকি ‘কয়েক মিলিয়ন ফ্যান-ফলোয়ার’! তাহলে প্রযুক্তির ভয়াবহ অপব্যবহার হচ্ছে এবং এতে আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটি বিশাল অংশ গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। এটাকে আমরা কোনোভাবেই ভালো বলতে পারি না। আমাদের মনে রাখতেই হবে যে, ফেসবুক বা ইউটিউব বা অনলাইনভিত্তিক যেকোনো প্ল্যাটফর্মে কেউ জনপ্রিয় হয়ে গেলেই, বা কারো ফ্যান-ফলোয়ার বেড়ে গেলেই তিনি ‘আইডল’ হয়ে যান না।
সময় সবার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের বরকত না হলে কোনো কাজ করেই কূলকিনারা পাওয়া যায় না। অনেকে বলেন, ‘এত কাজ! একদম সময় পাচ্ছি না!’ আবার সৃষ্টিশীল অনেক মানুষ একসাথে অনেক কাজ শেষ করে বিশ্রাম নেয়ারও সময় পান! অর্থাৎ সময়ের অপচয় করে ফেললে সময়ের বরকতটাও তখন কমে যায়! অতিরিক্ত ফেসবুক-আসক্তি আমাদের ক্ষুদ্র জীবনের সেই মূল্যবান সময়ের একটি বড় অংশ নীরবে কেড়ে নিচ্ছে।
পরিবারের সদস্যদের সময় দেয়া প্রয়োজন পারিবারিক স্বার্থে তো অবশ্যই। ফেসবুককে আমরা ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম’ বলছি। সেই মাধ্যম যদি পারিবারিক যোগাযোগকেই কমিয়ে দেয়, তাহলে সেটিকে আমরা কোন মানদণ্ডে ভালো বিবেচনা করব? কারণ, এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেনটেইন করতে গিয়ে পারিবারিক যোগাযোগগুলো শুধু কমিয়েই দেয়া হচ্ছে না, বরং পারিবারিক বন্ধনও শিথিল করে দিচ্ছে। পরিবার ভেঙেও যাচ্ছে! অনেক উদাহরণ আছে। সব পরিবার ভেঙে না গেলেও এমন পরিবারও পাওয়া কঠিন যেখানে ফেসবুকের অতি ব্যবহার নিয়ে পারিবারিক অশান্তি, সাংসারিক মনোমালিন্য, ভুল বোঝাবুঝি লেগে নেই। সুতরাং ফেসবুকের অতি ব্যবহার নিয়ে এর পক্ষে একচেটিয়া সাফাই গাইতে পারি না।
প্রযুক্তির শিখরে অবস্থান করে কোনো প্রযুক্তিকেই আমরা অস্বীকার করতে পারব না। বরং তার যথাযথ উপকারই আমাদের নিয়ে নিতে হবে। তবে যতটুকু উপকার নিলে আমাদের অন্য কোনো ক্ষতি হবে না, ততটুকুই। কোনো সন্দেহ নেই, ফেসবুক থেকে আমরা নানাভাবে উপকৃতও হচ্ছি। এখান থেকে আমরা অনেক কিছু শিখছি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখা, গবেষণার উপাত্ত খুব সহজেই পাচ্ছি। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের তথ্য এ পাড়া-ও পাড়ার খবরের মতো পেয়ে যাচ্ছি! বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পুরনো বন্ধুকে খুঁজে পেয়ে সুসম্পর্কের নবায়ন হচ্ছে ফেসবুকের সুবাদেই। আমরা এই ইতিবাচক দিকগুলোকেই গঠনমূলকভাবে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু ফেসবুক যেন কোনোভাবেই আমাদের নেশা হয়ে না বসে। আমরা যেন ‘ফেসবুকখোর’ অভিধা না পাই।
ফেসবুক আমাদের নৈতিক স্খলন ঘটাচ্ছে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন। নিশ্চিতভাবেই সেই পরিবেশ ফেসবুক সামনে করে দিয়েছে। আমরা গ্রহণ করছি, না বর্জন করছি, সেটি আমাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। অনেকে একটু রসিকতা করে বলেন, ফেসবুকের ইনবক্স হলো গোপন অভিসারের নিরাপদ বক্স! আসলে কিন্তু এই গোপন অভিসার নিরাপদও নয়। আমি-আপনি যা কিছু ইনবক্সে লিখি বা পাঠাই এবং মনে করি, আমরা ছাড়া এগুলোর কথা আর কেউ জানে না; এটি আমাদের বিরাট ভুল ধারণা। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সবই জানে। বিভিন্ন ভাষাতেই তাদের অনুবাদকর্মী আছে। প্রয়োজনে আমাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ড ‘আমলনামা’র মতো উপস্থাপন হয়ে যেতে পারে। সুতরাং আমাদের গোপনীয়তা রক্ষা হওয়ার গ্যারান্টি ফেসবুক দিচ্ছে না! আর স্বচ্ছভাবে ফেসবুক ব্যবহার না করা কোনো আইডি যদি কোনো দুষ্টু হ্যাকারের হাতে পড়ে, তাহলে সেই ব্যক্তিকে কতটা মানসিক অশান্তিতে ভুগতে হয়, কী পরিমাণ খেসারত দিতে হয়, তা ভুক্তভোগীরাই ভালো জানেন। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জবাবদিহিতার প্রসঙ্গ বাদ রেখেও শুধু উপরের কয়েকটি কারণই কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
সুতরাং আমরা যেন সাবধান হই এবং প্রযুক্তির উপযুক্ত ব্যবহার করি। প্রযুক্তির অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অতিরিক্ত কোনোকিছুই ভালো নয়। সবকিছুরই সীমা থাকে। আমরা যেন সেই সীমা অতিক্রম না করি। আমরা যেন খুব সচেতনভাবে ফেসবুক ব্যবহার করি। ফেসবুক যেন কোনোভাবেই আমাদেরকে ব্যবহার করতে না পারে।হ
লেখক : প্রধান নির্বাহী, কুষ্টিয়া প্রকাশন


আরো সংবাদ