০২ অক্টোবর ২০২০

ভারতকে বেছে নিতে হবে কোনদিকে যাবে

-

আস্তে আস্তে সব পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। ভারত-চীন সঙ্ঘাত বা বিতর্ক সহসা মিটছে না। তবে কী হলে মিটতে পারে তা ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে।
যে কথাগুলো আমরা প্রায়ই শুনে থাকি : সীমান্ত বা ম্যাপ মানে হলোÑ সীমান্তের দুই পক্ষের ঐকমত্যে একটাই ম্যাপ যেখানে আঁকা হয় আর ওই একই ম্যাপের দুটি কপি দুই পক্ষের হাতে ছাড়া অন্য কোনো ম্যাপ বা এলএসি থাকে না। এটি সম্ভব যখন দুই পক্ষই সীমান্তে একটি প্রশান্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে আর সেই মেজাজে আসবে। বিপরীতে কোনো পক্ষ যখন মনে করবে আমি যেটি আমার রাষ্ট্রসীমা বলে বুঝি সেটিই আমাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর অর্থ সেখানে সীমান্ত চিহ্নিত করা কখনোই ঘটবে না।
কারণ, আপনি অন্যের দাবি উপেক্ষা করে, এর সুসমাধা না করে কোনো ভূমি দখল করে শান্তিতে থাকতে পারবেন না। এখানে চিহ্নিত বা ডিমার্কেশন শব্দের আসল মানে হলোÑ নিজেই নিজের রাষ্ট্রসীমা বলে এককভাবে কিছু দাগানোÑ একবারেই নয়। বরং পড়শিকে সাথে নিয়ে দাগানো। যাতে দাগাবেন একবারই। এরপর এ নিয়ে কেবল শান্তি আর প্রশান্তিই অর্জন করবেন।
এ লক্ষ্যেই আপনাকে কিছু হোমওয়ার্কও করতে হবে। কারণ ডিমার্কেশনের আলোচনা মানেই গিভ অ্যান্ড টেক। পেতে হবে আর ছাড়তেও হবে। কী কী আপনাকে পেতে হবে তা বাদে বাকি সীমানা-বিতর্কে ছাড় দিতে রাজি আছেন এটি বুঝিয়ে দেন। প্র্যাকটিশটা উভয়পক্ষ করলে সহজে কাজ শেষ করা সম্ভব। কিন্তু এটি তখনই সম্ভব যখন আপনি শুধু না, উভয়পক্ষেরই শান্তি লাভ প্রধান লক্ষ্য। সত্যিকারের ডিমার্কেশনের লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছেন। গিভ অ্যান্ড টেক শেষে একটি ম্যাপ আঁকতে এসেছেন। সামরিক শক্তি দিয়ে ভূমি দখল করা যায়, ডিমার্কেশন করা যায় না।
সম্প্রতি ভারতে চীনের রাষ্ট্রদূত সান ওয়েদং একটি ভার্চুয়াল বা অনলাইন কথোপকথনে অংশ নিয়েছিলেন। ‘ওয়াইর’ ভারতের এক ইংরেজি ওয়েব পত্রিকা, যেটি একালে উগ্র জাতিবাদী যুদ্ধবাজ চিন্তাধারী ও হিন্দুত্ববাদীদের ঠিক বিপরীতে সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে রিপোর্ট করে যাচ্ছে। এই ওয়াইর পত্রিকাও উপস্থিত ছিল। তাদের বরাতে আমরা জানছি, রাষ্ট্রদূত সেখানে মোটাদাগে কী বলেছেন।
ভারতের অভ্যন্তরে এখন আলোচ্য তর্ক হলোÑ কী উপায়ে ‘প্রতিশোধ’ নেয়া যায়। ভারতের ভাষায় ‘মুখ-তোর’ বা বাংলায় ‘দাঁতভাঙা’ জবাব দেয়ার পথ খুঁজছে তারা। কিন্তু ফ্যাক্টস হলো, ভারতের চরম জাতিরাষ্ট্রবাদী রাজনীতির কারণে এর প্রতীক মোদি সরকারকে এলোমেলো করে অপমানিত করে দিয়ে গেছে চীন। যখন অন্তত ২০ সেনার নির্মম মৃত্যুর পর তাকে দিয়ে চীনারা বলিয়ে ছেড়েছেÑ ভারতের ভূমিতে কেউ আসেনি, বেদখল হয়নি। যার মানে দাঁড়িয়েছে অন্তত ওই ২০ জন চীনা ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে চীনাদের হাতে মারা গেছে। এভাবেই গলওয়ান উপত্যকা পুরাটাই চীনাদের, তাই মোদিকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া হয়েছে। যদিও আর অন্যান্য ভূখণ্ড এখনো চীন ছাড়ল না কেন, কবে ছাড়বে, তাদের মুভমেন্ট কীÑ এ নিয়ে প্রতিদিন ভারতে মিডিয়া রিপোর্ট বের হচ্ছে। অথচ সব মিডিয়াই জানে তারা একটা ‘জুয়াচুরি’ খেলছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য যদি হয় চীন-ভারতের কোনো ভূখণ্ড এখন দখল করেনি। তবে এই যে প্রতিদিন রিপোর্ট লেখা হচ্ছে যে, চীন ভারতের ভূখণ্ড, অমুক লেক, অমুক ভূমি ছেড়ে যায়নিইÑ এসবের কী কোনো মানে আছে? সত্যতা আছে?
কোনটা সত্য? চীন ভারতের কোনো ভূমি দখল নেয়নি? নাকি এখনকার মিডিয়া রিপোর্ট। ফ্যাক্টস হলো, সারা ভারত জানে উগ্র হিন্দু জাতিবাদের মোদি মার খেয়ে হেরে গেছে। জাতিরাষ্ট্রবাদী চিন্তায় কোনো সীমান্তবিরোধকে নির্বাচনে ভুয়া হিন্দুত্বের বিজয় হিসেবে দেখিয়ে হিন্দু পোলারাইজেশন ভোট ঘটানো আত্মঘাতী, এরই বড় প্রমাণ এটি। অথচ সীমান্তবিরোধকে তথাকথিত জাতির হার-জিত হিসেবে দেখানোর কী আছে? সীমানা বিরোধকে মিটানোই দুই দেশের ডায়লগের লক্ষ্য, এটা তো কারো কোনো ‘ভূমি বিজয়’ একেবারেই নয়। দ্রুত যেকোনো সীমানা বিরোধ বা বিতর্ককে কথিত ‘হিন্দু জাতির’ হার-জিত হিসেবে দেখানোর মোদির হিন্দুত্বÑ এ ব্যাখ্যার কবলে পড়ে মোদির অপমান এবং তার হিন্দুত্বের পতন বা মার খেয়ে যাওয়া এটিকেই এখন সারা ভারতের অপমান ও মার খেয়ে যাওয়া বলে হাজির করার কসরত চলছে। এ ছাড়াও সারা ভারত জানে সামরিকভাবে ভারত প্রতিশোধ নেয়ার অবস্থায় বা মুরোদে নেই।
অতএব মোদি এখন আরেক স্বপ্ন ছড়িয়েছেনÑ ‘কোয়াড’ আসছে। তারাই নাকি ভারতকে এবার প্রতিশোধ নিয়ে দেবে। কোয়াড কারা? কোয়াডের সংস্কৃতিঘেঁষা বাংলা হলো চতুষ্টয় বা চার মহাজন। এখানে এর অর্থ চার রাষ্ট্রজোটÑ ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু জন্ম থেকেই চলছে এর উত্থান আর পতনের। জাপানে এর জন্ম প্রস্তাব দেয়ার পর ১০ বছর আর খবর ছিল না। ২০১৭ সালে যদিওবা এর জন্ম দেয়া হলো, তাও সেটি কাকের ঘরে কোকিলের জন্মের মতো। ফিলিপাইনে ২০১৭ সালে উদ্যোক্তারা ‘আসিয়ান সম্মেলনে’ এসেছিলেন। কিন্তু এর ফাঁকে মানে সাইডলাইনে বসে জন্ম দিয়ে ফেলেছিলেন কোয়াড নামে এক ব্লকের। কিন্তু জন্মাইছেন এ খবর দিতে প্রথম বিবৃতি দিতে গিয়েই ধরা। মূল বিবৃতিটা চার দেশ চার রকমভাবে নিজেদের কথা ঢুকিয়ে এডিট করে ছেপেছিল। পরিণতি চারটি আলাদা ভার্সন।
আবার এদের মুখে গর্বের ফেনা তোলার শেষ নেই। বলা হচ্ছেÑ এটি নাকি ডেমোক্র্যাসিস বা গণতন্ত্রওয়ালাদের জোট। মানে তারা হলো চীনবিরোধী, তাই। তা বোঝানোর এটিই তারা তরিকা হিসেবে নিয়েছে। অথচ জন্ম থেকেই এই ডেমোক্র্যাসি শব্দটা সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নকে খাটো করে দেখাতে জন্ম। আর রাষ্ট্র বোঝাতে ক্লাসিক্যাল মূল শব্দটা হলোÑ ‘মর্ডান রিপাবলিক’। তা বাদ রেখে একটু সরিয়ে রাশিয়াকে বোঝাতে এই শব্দ। তো ভালো! কী আর বলব। হিন্দু উগ্র জাতিরাষ্ট্রবাদী মোদি আর তার অনুসারীরা যদি মুসলমানের বুকের ওপর উঠে; তাকে দিয়ে জয় শ্রীরাম বলানোর ডেমোক্র্যাসি করতে থাকেন আর মোদি তার নেতা হনÑ তাহলে বলতে হয়, হে ডেমোক্র্যাসি দূরেই থাকো, আমার লাগবে না!
এর মানে এ নয় যে, চীনারাষ্ট্রের ক্ষমতার অযোগ্যতা নেই। তবে এই ‘ডেমোক্র্যাসি’র ফেরিওয়ালারা বিপজ্জনক ও ধান্দাবাজ। যারা চারজন পরস্পরকেই বিশ্বাস করে না। তো এই ফেরিওয়ালারা ২০১৭ সাল থেকে ঘুমিয়ে ছিলেন। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ হলো আবার জেগেছে। তাতে চীনাদের হাতে অপমানিত ভারত ও মোদি যেন তিন দিনের ক্ষুধার্ত লোক যাদের প্রথম রুটির দেখা মিলল। এদের মনে আশা, এবার তাদের মনের জ্বালা মিটবে! কিন্তু আদৌ মিটিবে কী?
সন্দেহ আছে প্রবল। চীন-ইরান ২৫ বছরের চুক্তি হচ্ছে এই খবর বাজারে এসে যাওয়ার পর ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সমতুল্য মাইক পম্পেও ইউরোপে গিয়েছিলেন। পরে অস্ট্রেলিয়া যান। কিন্তু পম্পেওকে সেখানকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানালেন, ‘চীনবিরোধিতা প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়া আমেরিকাকে আংশিক সাপোর্ট দেবে’। এই হলো মিডিয়া শিরোনাম। শুধু তাই নয়, ভেতরে লিখছেÑ দক্ষিণ চীনসাগরে চীনবিরোধী জোটের মহড়ায় অস্ট্রেলিয়া যোগ দেবে না। আরো আছে। চীনের সাথে অস্ট্রেলিয়া গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক সে অটুট রাখবে। আর লাগে কিছু? বোঝা গেছে।
ঘটনাটি তাহলে কী? কোয়াড ব্লক দাঁড়ায় না কেন? অথচ ইন্ডিয়ানরা এত ভরসা করে বসে আছে! এমনকি ফিলিপাইনে থাকেন এক ভারতীয় অরিজিন হায়দারিয়ান সম্ভবত খ্রিষ্টান, তিনি এশিয়া টাইমসে লিখেন। তিনিও প্রবল উৎসাহে এই গত সপ্তাহে ২৭ জুলাই কোয়াড নিয়ে রিপোর্ট লিখছেন। কিন্তু লেখার মাঝখানে নিজেই লিখছেন, কিন্তু চীনের সাথে ব্যবসায় লাভালাভের স্বার্থে ইন্ডিয়া আর অস্ট্রেলিয়া এরা কখনো চীনবিরোধী এই জোটে সক্রিয় হয়নি।
তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়?
একটি মৌলিক সমস্যা নিয়ে কথা বলব। সেটি হলো অবজেকটিভ। কিন্তু এর মানে কী? ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প কিংবা সুনামি এ দুর্যোগ সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি। কিন্তু মানুষ কি কখনো এর বিরুদ্ধে, দুর্যোগ থামিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে লড়াই করে এমন আমরা কখনো দেখি না। আমরা সবসময় দেখি খবরটা জেনে নিয়ে এর সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া যায় কী করে; যাতে লক্ষ্য থাকে কম ক্ষতিতে এটি পার করা যায় কিভাবে। মানে কোনো লড়াই নয়, একভাবে স্বাগত জানানোই বলা যায়। এগুলোকেই আমরা অবজেকটিভ ঘটনা বলতে পারি। যা কর্তা মানুষ বা সাবজেক্টের কারণে উঠে আসেনি, ঘটেনি। এই অবজেকটিভ ঘটনাগুলোর প্রতি সাবজেক্ট মানুষের সবসময় আগাম নির্ধারিত ভূমিকা হলোÑ কোনো লড়াই বা যুদ্ধ একেবারেই নয়, তা পাশ কাটিয়ে থাকা যতটা সম্ভব যাতে ক্ষতি কম হয়। বলা যায়, এ ধরনের অবজেকটিভ বা ‘প্রাকৃতিক’ ঘটনার সাথে আমরা ভুলেও লড়তে যাই না। এটি আমাদের কাজও নয়।
ওদিকে গ্লোবাল মানেÑ একটি গ্লোবাল সিস্টেমের প্রয়োজন শুরু হয়; যেকোনো দুটি রাষ্ট্রের পণ্য বিনিময় বাণিজ্যের লেনদেনের প্রয়োজন থেকে। কেন? কারণ ওই লেনদেন বাণিজ্যে দুই রাষ্ট্রের কারো মুদ্রা দিয়েও বাণিজ্য চালানো যায় না। মুদ্রামান, বিনিময় হার জানা ছাড়া বিনিময় অসম্ভব। এখান থেকেই গ্লোবাল মুদ্রা, এর মান এক ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ কার্যকর থাকার প্রয়োজনীয়তা এখান থেকে।
৩০০ বছরের কলোনি দখলের আমলে ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ খুবই সীমিত ছিল। তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গ্লোবাল বাণিজ্যব্যবস্থা কার্যকর চালু ছিল না। এটি প্রথম চালু হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৫ সাল থেকে। আর ‘গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায়’ মেজর লেনদেনের মুদ্রা এখনো ডলার, আর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান মালিকানা শেয়ার ওই আমেরিকারই। বিগত ৭৫ বছর ধরে আমেরিকা নেতার অবস্থান নিয়ে আছে। যদিও এ প্রভাব ইদানীং কমে আসছে, বিপরীতে চীন সে জায়গা নিয়ে ক্রমেই উঠে আসছে। আমাদের বক্তব্যের ফোকাস হলোÑ এই দুই দেশের উঠে আসা বা পড়ে যাওয়াটা যত না সাবজেকটিভ, এর চেয়ে বেশি অবজেকটিভ ঘটনা। দুনিয়ায় উদ্বৃত্ত সম্পদ বা পুঁজির সঞ্চিতি একেক সময় একের দেশে নানা কারণে ঘটেছে। এটি আবার সহসাই চলেও যায় না। কবে আসবে কবে নাগাদ যাবে তাও বলা যায় না। কাজেই যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে চীনের উত্থান ঠেকানো যাবে না।
কিন্তু এরপরও মোদির জিদে ধরা যাক যুদ্ধের দিকে ঘটনা গড়ানো হলো। কিন্তু আরো ঘটনা হলোÑ যুদ্ধ মানে সেটি খুবই সীমিত রাখতে হবে; কারণ তা কোনোভাবেই যেন পারমাণবিক দিকে না যায়। সীমিত যুদ্ধ মানে তা আপস মিটমাটের রাস্তায় নিতে হবে। কিন্তু তাতেও সবচেয়ে বেশি অর্থনীতিতে ক্ষতি হবে চীন বাদে বাকি সবার। কারণ, চীনের ক্ষতি সামলানোর দিক থেকে সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবে। কিন্তু এরপরও ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বলা যায় শুরু। কেন?
কারণ, এই কথিত ডেমোক্র্যাসিসরা তাদের ভেঙেপড়া অর্থনীতি আবার চাঙা ও পুনর্বাসন করতে দুনিয়ায় সাহায্য দেয়ার মতো একমাত্র বেঁচে থাকবে চীনই। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখতে পারেন ঠিক এ ঘটনাই ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। যুদ্ধে হিটলারের জোটের বিরুদ্ধে যারাই আমেরিকার পক্ষে ছিল; সবাইকে যুদ্ধের খরচ দিয়েছে আমেরিকা, এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নকেও। আবার যুদ্ধ শেষে পুনর্বাসনের অর্থ জুগিয়েছে, ধার দিয়েছে ওই আমেরিকা। এ ছাড়া তখন আবার পতিত হিটলারের জার্মানি, তার বন্ধু জাপান বা ইতালি এদেরও পুনর্বাসনের অর্থ জুগিয়েছে আমেরিকা। ইতালিতে তো দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। যে আমেরিকার বিরুদ্ধে মুসোলিনি যুদ্ধ করেছিল; ইতালীয়রা সেই আমেরিকার কাছেই ভিক্ষা চেয়েছিল, দুই হাত তুলে তাদের গডের কাছে মিনতি জানিয়েছিল আমেরিকাকে সুমতি দিতে এবং আমেরিকা হাত খুলে সাহায্য এবং পুনর্বাসন সব কিছু অর্থ ঋণ-অনুদান দিয়েছিল।
দুনিয়া খুব কঠিন জায়গা। ইতিহাস পড়েন, একই ভুল দ্বিতীয়বার করার মানে হয় না। রেললাইনে মাথা দিয়ে আবার বুঝার দরকার নেই যে মাথা কাঠা যাবে। কাজেই প্রথম কাজ জিদ ত্যাগ করুন, প্রতিশোধের স্পৃহা ত্যাগ করেন। এটি নেগেটিভ এনার্জি। এটি সবার ক্ষতি করবে। মানুষের স্বভাব বা কাজ না অবজেকটিভিটির বিরুদ্ধে লড়া। নিজের স্বার্থে লড়ার আরো অনেক পথ আছে, সেগুলো খুঁজেন, ইনোভেটিভ হন। রাস্তা পাবেন। কেবল সতর্ক থাকেন কোনগুলো ধ্বংসাত্মক। আস্থা রাখেন দিন আপনারও আসবে।
কিন্তু এখনই একটি টেস্ট করিয়ে নিন। আমেরিকার ট্রাম্প যে কোয়াডে তাল দিচ্ছেন তাতে তিনি নিজে থাকবেন তো? নাকি? ২০১৭ সালে জন্মের সময় কিছুটা ঢিলা দিয়েছিলেন। কারণ সেবারই সবার আগে তার চীন সফর ছিল। সমস্যা হয়েছিল চীন ঠিক কত কী বাজারসুবিধা দিতে রাজি; তা ক্যালকুলেট করতে সময় লাগছিল বলে তত দিনে ট্রাম্প ফিলিপাইনে এসে কোয়াডের জন্ম ঘোষণা করে দেয়ার পরই চীন থেকে বাজারসুবিধা দেয়ার তালিকা এসে পড়াতেই ট্রাম্প আর কোয়াড থেকে শক্ত অবস্থান নিতে যা কথা হয়েছিল তা আর এমনকি যৌথ বিবৃতিতেও হাজির করতে রাজি থাকেননি। আর তা থেকেই অন্তত যৌথতায় ভাঙনের একটি কারণ।
তাহলে এবার? এবার আমেরিকাকেই পরীক্ষা করতে বলছি। মূলত ট্রাম্প চীনবিরোধী যত গরম গরম কথা বলেছেন এর কোনগুলো বা কত শতাংশÑ সেওলা আমেরিকার রাষ্ট্রের নীতি-পলিসি আর কতটা ট্রাম্পের নির্বাচনী ভোট টানতে চেয়ে তা আগে পরিষ্কার হতে হবে। কেন?
সাংবাদিকরা প্রশ্ন করে ট্রাম্পকে তাড়া করে বেড়াচ্ছেন যে ‘কিছু দিনের মধ্যেই লকডাউন থেকে তড়িঘড়ি করে সব খুলে ফেলার চাপের কারণেই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এ জন্যই দেড় লাখের বেশি আমেরিকানের মৃত্যু হয়েছে। এটি ট্রাম্পের চরম ব্যর্থতা কী না? আর ততই তিনি ভোটারদেরও এই মনোভাব বেড়ে যাওয়ার কারণে চীনা ভাইরাস বলে সব কিছুর জন্য চীন দায়ী বলে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা তুঙ্গে নিচ্ছেন। কাজেই কোনটা চীনবিরোধী রাষ্ট্রের অবস্থান আর কোনটা ট্রাম্পের ভোটের বাক্স ভরানোর প্রপাগান্ডা তা একমাত্র আলাদা হয়ে যাবে নভেম্বরের ৩ তারিখের নির্বাচনের পর। কাজেই মোদি যা আস্থা বিশ্বাস রাখছেন এর ভিত্তি আছে তো?
আবার দেখেন ট্রাম্প সরকারের আয়ু মূলত আর তিন মাস। কারণ নির্বাচনী ফল হয়ে যাওয়ার পর সেটি মূলত রুটিন সরকার। তাহলে এই তিন মাসের জন্য পম্পেওর দৌড়াদৌড়ি, কোয়াডের প্রপাগান্ডা এটি কি একটু বেশি নয়, অসঙ্গতিপূর্ণ নয়? এগুলো একমাত্র সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে যদি না নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে পম্পেওর দৌড়াদৌড়িÑ সেটি খুবই পারফেক্ট টাইমিং। কিন্তু মোদির জন্য? হিন্দু জাতিবাদী মোদির সমর্থকরা এদের জন্য কী হবে? হতাশায় আত্মহত্যা করবেন?
ওদিকে আরেক ঘটনা তৈরি হচ্ছে। এখন ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক জাতীয় বিদ্বানের কিভাবে চীনের বিরুদ্ধে খোঁচাখুঁচি লাগানো যায় তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্কে তাদের দিন যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে উপরের জনপ্রিয় আলাপটা হলো, চীনের একচীন নীতি বা তিব্বত বা হংকং নীতি ভারত ভাঙলে চীন কেমন শায়েস্তা হবেÑ এই হলো তাদের আলোচনার ফল। অর্থাৎ এদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো ট্রট বা আচরণ করা বা মর্যাদা দেয়া। কিন্তু এতে প্রধান ভায়োলেশনটা হবে, চীন যেকোনো দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পাতানোর পূর্বশর্ত হলোÑ এগুলো কোনো স্বাধীন ভূমি নয়, চীনেরই অংশ বলে গণ্য করতে রাজি হতে হবে। অর্থাৎ এই বিদ্বানেরা বলতে চাইছেন; তারা মোদির ভারতকে পরামর্শ দিচ্ছেনÑ মোদি যেন চীনের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। কিন্তু এত দূর পরিণতি কী তারা মেপে কথা বলছেন? আমরা নিশ্চিত নই।
যাই হোক, উপরে ভারতের চীনা রাষ্ট্রদূতের কথা বলছিলাম। তিনি ওই আলাপে এ প্রসঙ্গগুলো নিজে এনে পরিস্থিতি সম্পর্কে পাকা বোঝাবুঝি রেখে কাজ করতে বলেছেন। ভদ্র ও বক্তব্য নরম রাখতে বলেছেন। উভয় পক্ষেরই উচিত হবে পরিস্থিতি সম্পর্কে উভয় পক্ষ (মানে চীনা পক্ষও) যেন ভালো আর পুরো বোঝাবুঝি করে এরপর পদক্ষেপ নেয়। তবে সীমান্ত নিয়ে তিনি কিছু সোঝা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সেটিার প্রসঙ্গে বলেই আজকের লেখা শেষ করব।
কথাগুলো অনেকটা দুষ্ট সন্তানকে সামলাতে মায়েরা অনেক সময় শর্ত দিয়ে কথা বলেন। বলেন যে, পায়েস তিনি আজ রেঁধেছেন, তুলেও রেখেছেন বাটিতে। কিন্তু শান্ত ও বুঝমান সন্তানের মতো আচরণ যারা করবে তারাই কেবল ওই পায়েসের বাটির হকদার হবে। ঠিক সে কথা মনে রাখলে আমরা চীনের পদক্ষেপগুলোর অর্থ বুঝতে পারব।
চীনের সাথে ভারতের এবারের সঙ্ঘাত মূলত লাদাখ অঞ্চলে। কিন্তু এখানেই কেন? কারণ ভারত গত বছর ৫ আগস্ট এই লাদাখেরই স্ট্যাটাস বদলিয়েছে। কেন? ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মির ভারতেরই অঙ্গীভূত করে নেয়ার সময়। এতে বিজেপির হাতে পড়ে কাশ্মির মোদির কাছে জাস্ট একটা হিন্দু পোলারাইজেশন ঘটিয়ে ভোট পাওয়ার ইস্যু। যাতে মোদি ব্যাপারটাকে ‘হিন্দুজাতির বীরত্ব’ হিসেবে দেখিয়ে আরো বেশি ভোট পেতে পারেন। এতে কাশ্মিরিদের কী হবে অথবা পড়শিদের কাছে কী ম্যাসেজ যাবে এ নিয়ে তিনি পুরো বেপরোয়া থাকবেন।
যেমন ম্যাসেজ কী গেছে?
চীন-ভারত যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬২ সালে। ওই যুদ্ধের আগে ও পরে লাদাখ অঞ্চলের বহু অংশই চীন দখলে নিয়ে নিয়েছিল। পরে আস্তে আস্তে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ১৯৯৩-৯৬ ভারতের জন্য ছিল খুবই নির্ধারক। এ সময়কালেই লম্বা সময় ধরে আলোচনা চলেছিল। পুরনো ১৯৫৮-৬০ সালের সেই এলএসি দেখিয়ে চীন যেসব ভূখণ্ড দাবি করত সেসব দাবির বড় বড় অংশ ১৯৯৩-৯৬ সালের আলাপের সময় (যেটি চীনা ভাষায় শান্ত ও প্রশান্তির কামনা ও আকাক্সক্ষায় দুই দেশের সীমান্ত আলাপে এগিয়ে আসা ছিল) চীন ভারতকে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু গত বছর কাশ্মির ও লাদাখের স্ট্যাটাস মোদির খেয়ালি একক ইচ্ছায় বদলানো এটা ওই ১৯৯৩-৯৬ আলোচনার সময়ে তৈরি হওয়া যে পারস্পরিক বোঝাবুঝি তা পুরো উপেক্ষা ও ভেঙে ফেলা হয়েছে বলেই চীন এখন ১৯৫৮-৬০ সালের দাবির এলএসি ধারণাতে ফিরে গেছে। তাই চীন এখানে পরামর্শে ও ইঙ্গিতে বোঝাতে চায় যে, ভারত যদি ফের শান্তি চায় আর যেসব বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাবুঝিতে সম্পর্কের অনেক অগ্রগতি হয়েছিল তা ফিরিয়ে আনে, তবেই একমাত্র চীন ১৯৯৩-৯৬ সালের এলএসিতে আবার ফিরে যাবে। ভারতকে ভূখণ্ড ছাড় আবার দেবে। আর যদি উল্টা ভারত আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠে আর এক-চীন নীতি ভাঙাসহ নানা হুমকি দিতে থাকে তবে সীমান্ত ১৯৫৮-৬০ সালেরটাই বহাল থাকবে। শান্তি চাওয়া সৎ প্রতিবেশী হলে একরকম আর উল্টাটা হলে আরেক রকম।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ