২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

অ্যাডভোকেট রওশন আলী

-

যশোর শহরতলীর নওদাগা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯২১ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলা পয়লা বৈশাখ রওশন আলী জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন মনে-প্রাণে একজন নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক। জনগণের নেতা। একজন ত্যাগী, সৎ, ভালো মানুষ। আলোকিত সাদা মনের মানুষ।
সুদীর্ঘ শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার সুবাদে অ্যাডভোকেট রওশন আলীর সাথে আমার নিবিড় ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। খুব কাছ থেকে তাকে দেখার সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রওশন আলীর সান্নিধ্যে থেকে বিধ্বস্ত, কাজী নজরুল ইসলাম কলেজের উন্নয়ন এবং সাংবাদিকতার লেখনীর মাধ্যমে দেশগড়ার কাজে তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতাম। রওশন আলী এ দেশের সমবায় আন্দোলনের একটি নাম, একটি ইতিহাস। এ তার গতিশীল নেতৃত্বে একসময় যশোরে মমিননগর সমবায় শিল্প ইউনিয়ন লিমিটেড বাংলাদেশের মধ্যে বস্ত্রশিল্পে একটি সেরা সমবায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তখন এখানকার উৎপাদিত গামছা, লুঙ্গি, শাড়ি সারা দেশে খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
এত ভালো মানুষের ওকালতি পেশা শোভা পায় না। সারা জীবন জনসেবা করতে গিয়ে নিজ পেশার প্রতি সময় দিতে পারেননি। তার সহকর্মীরা একই পেশায় থেকে গাড়ি, বাড়ি ও অনেক ধনসম্পদের অধিকারী হয়েছেন। তবে এটি তার ব্যর্থতা নয়। মানবকল্যাণে সময় দিয়ে তিনি লাভ করেছেন এ দেশের মানুষের শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা। আমি আমার কর্মজীবনে তার সাথে সে সময়কার সব মন্ত্রী, নেতাদের কাছে গেছি। তারা রওশন আলীর প্রতি যে শ্রদ্ধা, ভক্তি, সৌজন্য প্রকাশ করেছেন তা স্মৃতিতে এখনো চির অম্লান। তার কথায়, ব্যক্তিগত আচরণে কেউ ব্যথা পেয়েছেন এমন কথা কোনো দিন শুনিনি। দলমত নির্বিশেষে সবার কাজে সহযোগিতা করাই ছিল তার মূলনীতি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। টেলিফোনে বা সাক্ষাতে আমলা বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে কোনো সুপারিশ জানানোর সময় তিনি যেভাবে বিনয়ের সাথে বিষয়টি উপস্থাপন করতেন এতে তারা বিব্রতবোধ করতেন। অপরকে সম্মান জানাতে কার্পণ্য করেননি। তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে কারো প্ররোচনায় কাউকে মানসিক কষ্ট বা অযথা হয়রানি করেননি। স্বাধীনতার পর আমরা রওশন আলীর সাথে বৃহত্তর যশোর জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সভা ও অনুষ্ঠানে প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ সংগ্রহের কাজে ঘুরে বেড়াতাম এবং নিবেদিতপ্রাণ, দেশপ্রেমিক মানুষটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সংবাদপত্রের পাতায় তুলে ধরতাম।
দেশ স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যশোরে প্রথম আগমন উপলক্ষে সাংবাদিক কাজী রফিককে ‘মুক্তি বিশেষ সংখ্যা’ প্রকাশনার জন্য নগদ দুই হাজার টাকা অনুদান প্রদান এবং কিছু বিজ্ঞাপন সংগ্রহে বিশেষ সহযোগিতা করেন তিনি। যশোরে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ তারই অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠে। তিনি ছিলেন এর প্রধান উপদেষ্টা। ১৯৭৫ সালে অভ্যুত্থান ঘটলে রওশন আলী সপরিবারে তার বিরুদ্ধে হুলিয়ার কারণে আশ্রয় নেন প্রতিবেশী দেশে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। তারই উদ্যোগে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর সংসদ সদস্য রওশন আলী কাজী নজরুল ইসলাম কলেজের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অ্যাডভোকেট গজনবী ছিলেন কলেজের সম্পাদক। আমি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলাম। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মতো তখন কলেজের অবস্থাও ছিল খুবই শোচনীয়। কলেজের কাজ নিয়ে ঢাকা গিয়েছিলাম, উদ্দেশ্য কলেজের সভাপতি শিক্ষামন্ত্রীকে দিয়ে কিছু আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করবেন। তিনি তখন এমপি হোস্টেলে অবস্থান করছিলেন। সাথে তার অসুস্থ স্ত্রী। ঢাকায় ভালো ডাক্তার দেখাবেন। এমপি হোস্টেল থেকে সকালে আমরা দু’জন রওনা হলাম শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলীর বাসভবনের দিকে। মন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশ কৃষক লীগের সম্পাদক রহমত আলীর সাথে খুব নিবিড় সম্পর্ক। পথিমধ্যে আমরা রহমত আলীকে আমাদের গাড়িতে উঠালাম। শিক্ষামন্ত্রী ইউসুফ আলীর বাসভবন থেকে কাজ শেষে আমরা গেলাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। এসব কাজ শেষ করতে তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। এমপি হোস্টেলে যখন ফিরলাম তখন বেলা ১টা বাজে। রওশন আলীর ওই দিন স্ত্রীকে ডাক্তার দেখানোর কথা ছিল। ডাক্তারের সাথে সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল বেলা ১১টা। কথা ছিল আমরা বেলা ১১টার আগেই ফিরব কাজ শেষ করে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। এ জন্য তার অসুস্থ স্ত্রী অনুযোগের সুরেই বললেন, ‘আমার চেয়ে তোমার কলেজের কাজই বড় হলো’। এর উত্তরে তিনি অকপটে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার কলেজের কাজই বড়।’ এ না হলে জনগণের নেতা হওয়া যায়? কলেজের কাজ নিয়ে তার কাছে যতবার গেছি তিনি হাসিমুখে সবার আগে সে কাজকে অগ্রাধিকার দিতেন। বঙ্গবন্ধু সবুজ বিপ্লবের ডাক দিলে তিনি সর্বপ্রথম কলেজের মাঠে ধানের চারা রোপণ করে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। বিধ্বস্ত কলেজ পুনঃসংস্কারের লক্ষ্যে ত্রাণ ও পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ অনুদান বরাদ্দের ব্যবস্থা করেন তিনি। তিনি যত দিন কলেজের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন, কোনো মন্ত্রী-নেতা নেই যে, ওই কলেজে পদধূলি দেননি। নজরুল ইসলাম কলেজের দু’পাশে বড় হৈবতপুর ও ছোট হৈবতপুর গ্রাম। পাক হানাদাররা ওই দু’টি গ্রামের সব ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। এই দু’টি গ্রামে ১৯৬টি বাড়ি প্রিন্স করিম আগা খান ফাউন্ডেশন তহবিল থেকে নির্মাণ করার ব্যবস্থার পুরো অবদানই এমপি রওশন আলীর। স্বাধীনতার পর যশোরের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট হাসান ইমামের স্ত্রী স্থানীয় মহিলাবিষয়ক অধিদফতরে নিয়োগ লাভ করেন। এতে তখন বাদ সাধেন যশোরের মহিলা আওয়ামী লীগের কিছু সদস্য। তারা রওশন আলীর কাছে এর বিরোধিতা করতে গিয়েছিলেন। রওশন আলীর সাফ জবাব, ‘তিনি তার যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পেয়েছেন। যারা তাদের দল করেন না তারাও তো এ দেশের মানুষ।’ এটি ছিল তার চরিত্রের বড় বৈশিষ্ট্য। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে সহায়তা করতেন।
দলীয় বা সাংগঠনিক ব্যাপারে তিনি সর্বসম্মত মতকেই বেশি গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিতেন। কখনো দায়িত্ব পালনের চেয়ে জনগণের সেবায় মানুষের কল্যাণে বেশি সময় ব্যয় করতেন। স্ত্রী যখন বলতেনÑ আজ বাজার নেই, বাজার না করলে চুলোয় হাঁড়ি উঠবে না, তিনি তখন জনগণের সমস্যা নিয়ে মহাব্যস্ত। এত নিরহঙ্কার সুজন, সদালাপী মানুষ এ যুগে আমাদের দেশে খুবই বিরল। তার মতো একজন উদার মহান নেতার আমাদের দেশে খুবই অভাব।
লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী


আরো সংবাদ