১৫ আগস্ট ২০২০

শুকরিয়া

-
24tkt

২০১৪ সালের এপ্রিলের একটি রাতের শেষ প্রহর। করাচির আগা খান হাসপাতালে আমি চোখ খুলতেই দেখলাম, আমার ছোট ভাই আমার দিকে ঝুঁকে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। সে বলল, আপনি ঘুমের ভেতর কার সাথে যেন কথা বলছিলেন। আমি আমার আশপাশে সেই মহীয়সী নারীকে খুঁজছিলাম, যিনি একটু আগে আমার সাথে কথা বলছিলেন। আমি মস্তিষ্কে জোর নাড়া দিলাম এবং স্মরণ করতে চেষ্টা করলাম, সাদা কাপড় পরিহিত নারী কে ছিলেন, যিনি আমাকে বারবার বলছিলেন, ঘাবড়াবে না। এটা তোমার দেশ। তোমার পূর্বসূরিরা এ দেশের জন্য বহু ত্যাগ করেছেন। তুমি এ দেশ ছেড়ে কোথাও যাবে না। আমি আমার চোখ আবার বন্ধ করলাম। ওই মহীয়সী নারীর কোমল চেহারা আমার সামনে দেখতে পেলাম।
ওই নারী ছিলেন ফাতেমা জিন্নাহ। এখন আমার স্বপ্নে তার সাথে হওয়া কথাগুলো বেশ মনে পড়ছে। ওই স্বপ্নের প্রেক্ষাপটটা হলো, ১৯ এপ্রিল, ২০১৪ সালে করাচিতে আমার ওপর আত্মঘাতী হামলা হয়েছিল। ওই হামলায় আমাকে ছয়টি গুলি আঘাত করে। এর মধ্যে দু’টি গুলি রীতিমতো দেহের মধ্যে ছিল। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এ ঘটনার তদন্তের জন্য সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতিবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে দেন। কিন্তু তার ক্যাবিনেটের এক মন্ত্রী সস্ত্রীক হাসপাতালে আসেন এবং আলাদাভাবে আমাকে বলেন, যাদের আত্মঘাতী হামলার জন্য দায়ী করা হচ্ছে, তারা নির্দোষ। ডাক্তার ইনআম পাল আমার সাথে সাক্ষাতের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন; কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ওই নিষেধাজ্ঞা ভেঙে আমার মাথার কাছে আসছিলেন এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই সময় পরিস্থিতি এমন ছিল যে, বিছানায় এপাশ-ওপাশ করা তো দূরের কথা, হাত-পা নড়ানোও কঠিন ছিল। কাঁধ, পেট ও দুই পায়ে বিদ্ধ হওয়া গুলির কারণে বিছানা থেকে উঠে চলাফেরা করাও অসম্ভব মনে হতো। সুতরাং বিদেশ চলে যাওয়ার পরামর্শদাতাদের আমার চিকিৎসক কড়া ভাষায় বলতে শুরু করলেন, আপনারা রোগীকে বিরক্ত করবেন না।
এক সন্ধ্যায় আমাকে বলা হলো, কাল এক বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স দুবাই থেকে করাচি আসছে। আর আপনি বিদেশ যাচ্ছেন। আমি আমার চিকিৎসককে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। তিনি আমাকে আশ্বাস দিচ্ছিলেন, আমার চিকিৎসা পাকিস্তানে পুরোটাই সম্ভব। আমি ধীরে ধীরে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব। আমার এমনটা মনে হলো যে, আমাকে চিকিৎসার জন্য নয়, বরং দেশের বাইরে পাঠানোতে এ জন্য জোর দেয়া হচ্ছে যে, যাতে করে সুপ্রিম কোর্টের তদন্ত কমিশন আমার অনুপস্থিতির কারণে কাজ করতে না পারে। এক সুহৃদ তো এ কথাও বললেন, প্রধানমন্ত্রী আপনাকে তো দেখে গেছেন এবং খোঁজখবর নিয়ে গেছেন, কিন্তু এখন তারই সরকার আপনার বিরুদ্ধে গাদ্দারির মামলাও বানাবে। এ কারণে তদন্ত কমিশনের কাছে কোনো ভরসা রাখবেন না। এটা এমন এক মানসিক চাপ ও টানাপড়েন ছিল, যে অবস্থায় ফাতেমা জিন্নাহর সাথে স্বপ্নের মাঝে আমার দেখা হয় এবং তিনি বলেন, দেখ, এই লোকেরা আমার সাথে কী না করেনি। এরা আমাকে গাদ্দার অভিহিত করেছে। আমার সাদা চুল নিয়ে মশকারা করেছে। কিন্তু আমি আমার ভক্তদের হৃদয়ে আজো অমর হয়ে আছি। যারা আমাকে গাদ্দার বলেছে, তাদের তো তাদের সন্তানরাই ভুলে গেছে। তার এ বাক্যটাও আমার মনে পড়ছিল- ‘তাদেরকে বলে দাও, তুমি পাকিস্তানে থাকবে। কোথাও যাবে না।’ হতে পারে আমার অভ্যন্তরীণ অনুভূতি ফাতেমা জিন্নাহর রূপ ধরে স্বপ্নে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ওই স্বপ্নের পর আমি বেশ শান্তি অনুভব করি। ভোর হতেই নার্স আমার ব্যান্ডেজ বদলে দিতে আসেন। এটা এক কষ্টদায়ক বিষয় ছিল। ব্যথার চোটে আমার চিৎকার বেরিয়ে আসত। কিন্তু ওই সকালে আমার কোনো চিৎকার বের হয়নি। ডাক্তার ও নার্সরা অবাক হয়ে যান। সকাল প্রায় ৭টার সময় আমার এক ভাই বাইরে থেকে ঘুরে এসে জানালেন, হাসপাতালের লনে অনেক মানুষ জায়নামাজ বিছিয়ে আপনার জন্য দোয়া করছেন। আর এক প্রবীণ মহিলা আপনার জন্য ‘ইমাম জামেন’ পাঠিয়েছেন। (ইমাম জামেন হচ্ছে মূল্যবান বস্তু, যা কাপড়ে পেঁচিয়ে অসুস্থ ব্যক্তির বাহুতে বেঁধে দেয়া হয়। এরপর সুস্থ হওয়ার পর তা দান-খয়রাত করে দেয়া হয়।-অনুবাদক) আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ মহিলা কে? ভাই বললেন, তিনি বেলুচিস্তান থেকে এসেছেন। আমি অনুরোধ করলাম, ওই মহিলাকে আমার কাছে নিয়ে আসুন। কিন্তু ওই সময় জানতে পারলাম, করাচি পুলিশপ্রধান শাহেদ হায়াত আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসছেন। আমি ওই প্রবীণ মহিলার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারলাম না। এ মহিলাও জাতির একজন মা, যিনি আমার জন্য দোয়া করছিলেন। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি আমার এই প্রিয় মানুষদের ছেড়ে কোথাও যাবো না।
২০১৪ সালে আমার শরীরে গুলির যে আঘাত লেগেছে, সেগুলোতে এখনো ব্যথা ওঠে। কিন্তু ফাতেমা জিন্নাহ আমাকে ওই ব্যথা সহ্য করতে শিখিয়েছেন এবং তিনি ওই তীব্র যন্ত্রণা থেকেও উদ্ধার করেছেন, যা দেশ ত্যাগের বিষয়ে আমাকে সর্বদা পীড়া দিত। আশ্চর্যজনকভাবে এটা মিলে গেছে যে, ফাতেমা জিন্নাহর মৃত্যুদিবস ৯ জুলাই, আর আমার পিতা প্রফেসর ওয়ারিস মীরের মৃত্যুদিবসও ৯ জুলাই। ফাতেমা জিন্নাহকে আমরা জাতির জননী বলে থাকি। করাচির আগা খান হাসপাতাল থেকে রিলিজ হওয়ার পরও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকেছি। ওই দিনগুলোতে আমি ফাতেমা জিন্নাহ সম্পর্কে কয়েকটি গ্রন্থ পড়ে ফেলি। গ্রন্থগুলো পড়তেই জানতে পারলাম, পাকিস্তানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গাদ্দার ও দেশবিরোধী আখ্যায়িত করার ধারা তো বেশ পুরনো।
এ দেশের এক সেনা স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় লাভ করার জন্য পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সহোদরা ফাতেমা জিন্নাহকে ভারতের এজেন্ট অভিহিত করেছিলেন। শাকের হোসাইন শাকের তার ‘মাদারে মিল্লাত মুহতারামা ফাতেমা জিন্নাহ’ গ্রন্থে আইয়ুব খানের পক্ষ থেকে ফাতেমা জিন্নাহর বিরুদ্ধে প্রকাশিত ওই সব পোস্টারের ছবি যুক্ত করেছেন, যেখানে জাতির জননীকে গাদ্দার খান আবদুল গাফ্ফার খানের পৃষ্ঠপোষক অভিহিত করা হয়েছে। চিন্তা করুন, ১৯৬৫ সালের জানুয়ারির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাওলানা আবুল আলা মওদূদী থেকে নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান এবং খান আবদুল গাফ্ফার খান থেকে নিয়ে নওয়াবজাদা নাসরুল্লাহ খান পর্যন্ত সব জ্ঞানী বোধসম্পন্ন ব্যক্তি মাদারে মিল্লাত-জাতির জননীর সাথে ছিলেন। আফসোস জুলফিকার আলী ভুট্টো আইয়ুব খানকে সমর্থন দেন এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নেতা মওলানা ভাসানী তার সাথে নিজ বিশ্বাসের সওদা করেন। রাষ্ট্রীয় শক্তির সর্বাত্মক প্রয়োগ ও অনিয়মের এক ইতিহাস রয়েছে সিনেটর আনওয়ার বেগের কাছে, যিনি ১৯৬৫ সালে ব্যাসিক ডেমোক্র্যাসিসের মেম্বার ছিলেন। তিনি করাচিতে ফাতেমা জিন্নাহকে ভোট দিয়ে আইয়ুব খানের ক্ষোভ ও ক্রোধকে আমন্ত্রণ জানান। এমন কাহিনী অনেক। যদি ফাতেমা জিন্নাহর সাথে কারচুপির ঘটনা না ঘটত, তাহলে পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হতো না। তাকে গাদ্দার আখ্যায়িতকারীরাই মূলত পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হওয়ার জন্য দায়ী। কিন্তু আফসোস, রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে গাদ্দার আখ্যায়িত করার ধারা এখনো বিদ্যমান। প্রতি বছর ৯ জুলাই জাতির জননীর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। আর আমি তো ক্ষমাপ্রার্থনার পাশাপাশি তার শুকরিয়াও আদায় করি। কেননা তিনি এক কঠিন মুহূর্তে আমাকে দেশত্যাগে বাধা দিয়েছেন।হ
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ০৯ জুলাই, ২০২০ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
[email protected]
লেখক : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট, প্রেসিডেন্ট জি নিউজ নেটওয়ার্ক (জিএনএন)


আরো সংবাদ