১৬ আগস্ট ২০২০

আপদ-বিপদের সাতকাহন

দেশ জাতি রাষ্ট্র
-
24tkt

বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের লোক। আইসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল ইংরেজ পরীক্ষকÑ ক্যান ইউ টেল মি দ্য ডিফরেন্স বিটুইন ‘আপড অ্যান্ড বিপড’। বঙ্কিম উত্তর করেছিলেন, সাহেব এই যে তোমরা আমাদের দেশটাকে দখল করে আছ, এটা আমাদের জন্য বিপদ। আর তুমি ইংরেজ হয়ে বাঙালি আমাকে জিজ্ঞাসা করছ ওই অর্থের পার্থক্য, এটা হচ্ছে আপদ। অবশ্য ওই তির্যক উত্তর তার ব্রিটিশ গোলাম হওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাধীনতার স্বাদ ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্য আমাদের ওপর শাসককুল যে আপদ-বিপদ চাপিয়ে দিয়েছে তা থেকে আমরা রক্ষা পাইনি। শাসকরা মনে করে, তাদের দলীয় আদর্শ-উদ্দেশ্য গলাধঃকরণের মাধ্যমেই স্বাধীনতার আস্বাদ পাওয়া সম্ভব। তারা একে বলে দেশপ্রেম। রাজনৈতিক বিরোধীদের চিহ্নিত করতে চায় স্বাধীনতার শত্রু বলে। আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে বলেন রাজনীতিকরণ। আধুনিক জগতে সেই রাজা নেই, রাজ্য নেই। রাজধানী আছে। রাজনৈতিক দল দখল করে রাজধানী। রাজার পাটে অভিনয় করে তারা। এই রাজনৈতিক দল চরম-পরম ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তখন অসহায় হয়ে পড়ে নাগরিকরা। পৃথিবী নাজিবাদ-ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে দেখেছে এ চরম ও পরম ব্যবস্থা।
ইতিহাসে দেখা গেছে, নিকৃষ্ট স্বৈরাচারের প্রকাশ ঘটে রাজনৈতিক দলের লেবাসে। ফ্যাসিবাদ ও নাজিবাদের জন্ম ওভাবেই। তারাও নির্বাচিত হয়েছিল জনগণের ভোটে। ১৯২২ সালে মুসোলিনি জয়লাভ করেন ইতালিতে। ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে হিটলার। উভয় নেতাই চরম জাতীয়তাবাদকে তাদের ক্ষমতার বাহনে পরিণত করেন। নির্বাচনই তাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। অবশেষে ঘোষণা করেন ‘এক নেতা-এক দেশ’। দলীয় ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে। নির্বাচন ‘দিবসে অথবা নিশীথে’ ওরাই একক প্রার্থী। জয় তাদেরই প্রাপ্য। এদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ ১. চরম জাতীয়তাবাদের কথা বলে; ২. মহত্ত্ব ঐতিহ্যের কথা বলে; ৩. জাতীয় বিশুদ্ধতা-দেশপ্রেমের ইজারা তাদেরইÑ অন্যেরা কেউ নয়। সবাই রাজাকার তারা ছাড়া; ৪. জাতীয় দুর্যোগ-দুর্ভোগের জন্য দায়ী প্রতিপক্ষ; ৫. পুঁজিবাদের বাহক হিসেবে গড়ে তুলে নিজ দল, গোষ্ঠী ও বিশেষ সম্প্রদায়কে; ৬. গড়ে তোলে সর্বাত্মকবাদী প্রবণতার কর্তৃত্ববাদী সরকার; ৭. ক্রমশ ধাবিত হয় বিকারগ্রস্ত ব্যক্তিতন্ত্রে; ৮. একদলীয় ব্যবস্থা হয় চূড়ান্ত লক্ষ্য; ৯. মাঝপথে একাধিপত্যবাদী দলীয় ব্যবস্থা ‘ওয়ান ডোমিন্যান্ট পার্টি সিস্টেম’ গড়ে তোলে; ১০. আইনসভা, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের ওপর প্রতিষ্ঠা করে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব; ১১. আজ্ঞাবহ করে তোলে গণমাধ্যমকে; ১২. স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত লালন করে নিজস্ব মতাদর্শ। প্রলুব্ধ থাকে বুদ্ধিজীবীরা; ১৩. প্রতিষ্ঠা ঘটে সহায়ক ধনিক-বণিক শ্রেণীর; ১৪. সম্মোহনী নেতৃত্বের সম্মোহনে সম্মোহিত রাখতে চায় গোটা জাতিকে। ১৫. এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য চরম নিপীড়নের পথ বেছে নেয় তারা। স্তব্ধ করে দিতে চায় যেকোনো প্রতিবাদী কণ্ঠ। সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করতে চায় নিজ স্বার্থে। অবশেষে আশা করে পতনের সময় রক্ষা করবে সামরিক বাহিনী। একই লক্ষ্যে আর সব আইন ও শৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় অবয়বে গড়ে তোলে। ফ্যাসিবাদের আরেকটি মারাত্মক প্রবণতা হলোÑ ‘জনগণকে পোষক-পোষ্য-প্যাট্রন-ক্লাইন্ড’ বিন্যাসে অভ্যস্ত করা। এসব প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্যের আলোকে ক্ষমতাসীন দলের ইতিহাসের দিকে চোখ বুলানো যাক।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্ম ১৯৪৮ সালে ২৩ জুন। খাজা-গজাদের বাদ দিয়ে আওয়ামী অর্থাৎ সাধারণ মুসলিম লীগ গঠনই ছিল লক্ষ্য। সেই সাধারণ মুসলিম লীগ আরেক ধরনের অসাধারণদের কবলে নিপতিত হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জিতেছে মুসলমানদের সাধারণ দলÑ আওয়ামী মুসলিম লীগ। নির্বাচনের পরপরই আসল চেহারায় ফিরে গেল তারা। মুসলিম শব্দটি খসে পড়ল। ১৯৫৪-৫৬ সাল পর্যন্ত প্রদেশ ও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন থেকে বিরোধীদের পেটানোর ফ্যাসিবাদী হাতেখড়ি তাদের। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগের মূল প্রতিষ্ঠাতা মওলানা ভাসানীকে তাড়িয়ে দেয় তারা। তখন মওলানা গঠন করলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিÑ ন্যাপ। খোদ সোহরাওয়ার্দী এন-এ-পি বা ন্যাপকে বললেনÑ নেহেরু এইডেড পার্টি। আইউবের সামরিক শাসন অবসানে ১৯৬২ সালের সংবিধান রচিত হয়। প্রবর্তিত হয় তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্র। শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমউদ্দিনসহ শীর্ষ ৯ নেতা এ সময়ে এক বিবৃতি দেন। এটি ৯ নেতার বিবৃতি বলে পরিচিতি লাভ করে। তারা বললেন, প্রকৃত গণতন্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত তারা দলীয় রাজনীতিতে ফিরে যাবেন না।
গঠিত হয় ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক এলায়েন্সÑ এনডিএ। কিন্তু আওয়ামী লীগের অন্যদের ক্ষমতাই যেন লক্ষ্যÑ গণতন্ত্র নয়। সোহরাওয়ার্দীর বারণ সত্ত্বেও পূর্বাঞ্চলের নেতা দলকে পুনরুজ্জীবিত করলেন। আইউবের জেল আর এদের জেদ শেষ করে দেয় সোহরাওয়ার্দীর জীবন। ১৯৬২ সালে সুদূর বৈরুতে নীরবে-নিভৃতে জীবন অবসান ঘটে তার। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার কাছে পাঠানো শেষ চিঠিতে তিনি লেখেনÑ ‘জনগণের কাজেই যদি না আসি, তাহলে কী হবে এ জীবন দিয়ে’। এরপর একহাতে পরিচালিত হয় দল। নীতিনির্ধারণ বা কর্মসূচি প্রণয়নে সমষ্টি পরাজিত হয় ব্যষ্টির কাছে। ব্যক্তিত্বের সঙ্ঘাতে দল ছাড়লেন আতাউর রহমান খান, সালাম খান, মাওলানা তর্কবাগীশ ও আমেনা বেগমরা। কোনো রকম রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই ব্যর্থ হলো গোলটেবিল বৈঠক। অনিবার্য হয়ে উঠল ইয়াহিয়ার সামরিক শাসন। এটি ছিল রাজনীতিকদের সামষ্টিক ব্যর্থতা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ। সব বিরোধী দলের মিটিং মিছিল পিটিয়ে দেয় তারা। বিপুল সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল জনগণের পক্ষ থেকে। কিন্তু নেতাকর্মীরা একে পৌঁছে দেয় নিরঙ্কুশে। বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তা পরাজিত হয় কপট ভুট্টোর ষড়যন্ত্রে। ‘একসাগর রক্তের বিনিময়ে’ অর্জিত হয় স্বাধীনতা। বিজয়ের পরে ভাসানী, মণি সিংহ ও অধ্যাপক মোজাফফরসহ সব রাজনৈতিক নেতৃত্ব দাবি করেন ‘জাতীয় সরকার’। একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে জাতীয় সরকারের দাবি ছিল অনিবার্য। প্রত্যাখাত হলো সে দাবি। ১৯৭৩ সালের নির্বাচন ছিল ২০১৪ বা ২০১৮-এর নির্বাচনের প্রাথমিক মহড়া।
১৯৭৩-এর ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়নের ভরাডুবি ঘটে জাসদ ছাত্রলীগের বিপুল জনপ্রিয়তার কাছে। সন্ধ্যায় আমাদের চোখের সামনে ছিনতাই হয় সে ব্যালট বাক্স। পরাজয়কে লুকানোর জন্য। চোখ বুজলে প্রলয় বন্ধ হবে যেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত ছিল শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের। জাসদের রাজনীতি হয়তো সঠিক ছিল না যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশে। তা সত্ত্বেও নাগরিক অনুভব এরকমÑ গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক সমঝোতার পরিবর্তে সহিংসতা প্রদর্শিত হয়। অবশেষে লাল ঘোড়া দাবড়িয়ে দেয়া হয়। জাসদের অভিযোগÑ ৪০ হাজার কর্মী নিহত হয় রক্ষীবাহিনীর হাতে। তারা গঠন করে গণবাহিনী। রক্তাক্ত পন্থায় সরকারপতনের কাজ করে তারা। ৭ নভেম্বর, ৭৫’-এর প্রমাণ। ওই সময়ে বিপ্লবী সিরাজ সিকদার নিহত হন। আজকের বহুল উচ্চারিত বন্দুকযুদ্ধের সূচনা এভাবেই। গণতন্ত্রের শত্রুদের অব্যাহত প্ররোচণা ও পরামর্শে সব শেষে বাকশাল বা একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তীত হয়। সামরিক বাহিনীসহ পুলিশ ও আমলাতন্ত্রকে বাকশালে শামিল করা হয়। এই সময়ের এ ধরনের সম্পৃক্ততার উৎস সম্ভবত বাকশাল। এভাবেই জ্ঞাতে অথবা অজ্ঞাতে নাজিবাদ ও ফ্যাসিবাদের মহড়া চলে বাংলাদেশে। যে পরিবর্তন কাক্সিক্ষত ছিল ব্যালটের মাধ্যমে তা হলোÑ নির্মম বুলেটের আঘাতে। ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত অধ্যায় কামনা করেনি কেউ।
পৃথিবীর কোথাও কখনোই সামরিক বাহিনী গণতন্ত্রের সহায়ক হয়নি। নিপাতনে সিদ্ধ ঘটনার মতো জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তারপরও অপ্রিয় সত্য এই, তিনি ছিলেন একজন সমরিক শাসক। যখনই তিনি প্রত্যাবর্তন করেছেন গণতন্ত্রে বাদ সেধেছে সামরিক বাহিনী। এ দ্বন্দ্বে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। অবশেষে স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী। দীর্ঘ ৯ বছর গণতন্ত্র প্রত্যাশী মানুষ শাসিত হয়েছে স্বৈরাচার দ্বারা। থেমে থাকেনি মানুষ। আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে চেয়েছে স্বৈরাচারের অবসান। সেখানেও দেখা গেছে দলীয় স্বৈরাচার ও সামরিক স্বৈরাচারে আঁতাত। সামরিক হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছিল তারা। ১৯৮৬ সালে নির্বাচন দেয় সামরিক সরকার। কথা ছিল নির্বাচনে অংশ নেবে না কেউই। আগ বাড়িয়ে একজন বললেন, ‘নির্বাচন করবে যারা, বেঈমান হবে তারা’। অবশেষে সেই খেতাব আপনি ধারণ করলেন অবলীলাক্রমে।
সামরিক শাসন অবসানে ১৯৯০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এই নির্বাচনটি ছিল বিগত ৫০ বছরের শ্রেষ্ঠ নির্বাচন। সবাই আশঙ্কা করছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। নীরবে জনগণ মন ঠিক করেছিল, তাদের ক্ষমতায় আসতে না দেয়ার। জয় হলো মানুষের। ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’ দেখলেন আওয়ামী শীর্ষ নেতৃত্ব। স্বাভাবিকভাবে দলীয় ক্ষমতাসীনদের দিয়ে বাংলাদেশে নির্বাচন নিরপেক্ষ হয় না। এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। আওয়ামী লীগ সর্বাত্মক আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে। রক্তক্ষয়ী আর সহিংসতার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ১৯৯৬ এর নির্বাচনে জয় লাভ করে আওয়ামী লীগ। বিভাজন ও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারে কুশলতা দেখায় তারা। ২০০১ সালের নির্বাচনও আওয়ামী লীগ প্রার্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়। ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করে বিএনপি। এবার ‘স্থূল কারচুপি’ পরিদৃষ্ট হয়। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দীন ‘বিশ^াসঘাতক’ হিসেবে অভিহিত হন, যখন তিনি নির্বাচন বাতিলের আওয়ামী আবেদন অগ্রাহ্য করেন।
আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ‘নির্বাচন ব্যবস্থা’ তথা জনগণের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়ে ফেলে। তারা বুঝতে পারে, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে তাদের ক্ষমতাসীন হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনাই নেই। সুতরাং আওয়ামী লীগ ‘নির্বাচনবিহীন’ জনগণের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে বিজয়ের ব্যাপারে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও কৌশলে নিয়োজিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালের লগি-বৈঠার তাণ্ডব ঘটে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে হটিয়ে সামরিক সমর্থিত তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয় লাভ করে আওয়ামী লীগ । বিরোধীরা নির্বাচনে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এরপরও গণতন্ত্রের স্বার্থে সামরিক থেকে বেসামরিকে ক্ষমতার হস্তান্তর মেনে নেয় সবাই। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য এবার আওয়ামী লীগ নিজেদের প্রবর্তিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। উচ্চ আদালতের পরামর্শ ছিল আরো দু’টি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা। কিন্তু এর ফলাফল কী হবে আওয়ামী লীগ তা ভালো করেই জানে। এরপর ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন আওয়ামী স্টাইলে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল অপ্রতিনিধিত্বমূলক। অর্ধেক আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয় দেখিয়ে এবং বাকিগুলোতে নামকাওয়াস্তে নির্বাচন করে মূলত নির্বাচন ব্যবস্থাকে তামাশায় পরিণত করা হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানে প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু কার্যত ভোটের আগের রাতেই বাক্স ভর্তি করে রাখা হয়। দেশে-বিদেশে এটি ‘নিশীথ নির্বাচন’ বলে ব্যাপক পরিচিতি পায়।
এভাবে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে তারা নির্বিকারভাবে ‘বিপুল বিজয়’-এর বড়াই করে। এ পরিহাস নির্মম, কিন্তু নিরর্থক নয়। তার কারণ, তাদের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ দীর্ঘ বছরে তারা ফ্যাসিবাদী প্রবণতা দিয়ে প্রভাবিত হয়েছে। তাদের গভর্ন্যান্স বা শাসনব্যবস্থা সুশাসনের সব মানদণ্ড অতিক্রম করে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বড় অভাব দেখা দেয়। দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি, অন্যায়-অনিয়ম ‘নিয়মে’ পরিণত হয়েছে। শুধু ভোট নয়, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ পরিত্যক্ত হয়েছে সর্বত্র। এমনকি ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়’ গ্রামগুলোকে দলীয় আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। এখানে নির্বাচন হয় দলীয় প্রতীকে। সুতরাং কারো কিছু বলার নেই। কারো কিছু করার নেই। এত প্রবল বিপত্তির মুখেও যারা বিরোধী দল থেকে ছিটেফোঁটা নির্বাচিত হয় তাদের টিকতে দেয়া হয়নি। মামলা, হয়রানি ও পদচ্যুতি ঘটছে অহরহ। শক্তি প্রয়োগে গোটা দেশ যেন নীরব-নিস্তব্ধ ও নির্বিকার হয়ে আছে। তবুও আশায় আশায় বেঁচে থাকে মানুষ। তেমনি আশা করেন বাংলাদেশের বিবেকের প্রতিনিধিত্বশীল একজন বুদ্ধিজীবীÑ আবুল কাসেম ফজলুল হক। তার সন্তান চরমপন্থীদের হাতে খুন হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না’। এটি ছিল সমাজ ও সরকারের প্রতি এক বলিষ্ঠ চপেটাঘাত। অবশেষে তার ভাষায় বলতে চাই, ‘আশা করা যায়, অন্যায়-অবিচার-অত্যাচার সইতে সইতে একসময়ে অবশ্যই মানুষ রুখে দাঁড়াবে। চলমান প্রক্রিয়াকে বদলে দেবে। ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে এটা বিশ^াস করার কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। জনসাধারণকে নিজেদের ভেতর থেকে নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।’ সেই আশায়-ভরসায় বেঁচে আছে মানুষ। হ
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 


আরো সংবাদ