১৪ জুলাই ২০২০

করোনাকালে মানবিক পুলিশ

-

পুলিশ জনগণের বন্ধু। জনগণের সেবক। এটা করোনার আগে অনুধাবন করা একটু কঠিনই ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের নিষ্ঠুরতায় পুলিশ বাহিনীর মানবিকতা ও উদারতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় এ বাহিনীর সুনাম যেমন আমাদের আলোড়িত করে, তেমনি এ বাহিনীর কিছু সদস্যের অপকর্মও আমাদের মনে দাগ কাটে। কারণ এ বাহিনী কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পদ নয়। অথচ পুলিশ বাহিনীর নিরপেক্ষতার বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, যারাই ক্ষমতায় থাকেন তারাই এ বাহিনীকে ভিন্ন মতের মানুষদের শায়েস্তা করতে কখনো মিথ্যা মামলা, কখনো গায়েবি মামলা দিয়ে এ বাহিনীর সুনামকে নস্যাৎ করেছে। সে কারণে এ বাহিনীর অনেক ইতিবাচক খবররেও সাড়া পড়ে না। বিশ্বজুড়ে করোনার নিষ্ঠুরতা থামবে কি থামবে না, এর গ্যারান্টি কেউ দিতে পারছে না। জ্যামিতিক হারে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এ ভাইরাসের নিষ্ঠুরতায় পুরো বিশ্ব যখন ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি করছে, সন্তান যখন মাকে জঙ্গলে কিংবা ঝোপঝাড়ে ফেলে রেখে যাচ্ছে, ঠিক সে সময়ে আমাদের পুলিশ বাহিনী পরিবার পরিজনের কথা না ভেবে জনগণের কল্যাণে নিজের প্রিয় জীবনকে বিলিয়ে দিচ্ছে অকাতরে। পুলিশ বাহিনীর এ ত্যাগের কথা হয়তো আমরা ভুলে যাব। কিন্তু ভুলে যাবে না বাংলাদেশ।
পুলিশ একটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য ট্রেনিং দেয়া হয়। অপরাধ ও অপরাধীর প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন এবং নিরপরাধ জনসাধারণের প্রতি কোমল হওয়া এবং তাদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা পুলিশের বিধিবিধানের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তা ভাটা পড়ে যায়। যে কারণে হাতকাটা তারা মিয়ার মতো মানুষকে গায়েবি মামলার আসামি হতে হয়। আইনের সুশাসন তথা ন্যায়বিচার বাস্তবায়নে এ বাহিনী লাখো মানুষের জীবন থেকে মিথ্যা মামলার গ্লানি দূরীভূত করতে পারে। ইচ্ছা করলে লাখো মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারে। মজলুম অসহায় মানুষের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে পারে। করোনা সঙ্কটকালে পুলিশ বাহিনীর যে মানবিকতা আমরা দেখেছি, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এ বাহিনীর সুনামের কথা তেমন একটা শোনা যেত না। কিন্তু এই করোনা সঙ্কটে তাদের মানবিকতা সত্যিই আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছে। মানবিকতার এ কাজ করতে গিয়ে হাজারো পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং বেশ ক’জন মারা গেছেন। এ বাহিনী করোনা প্রতিরোধ আন্দোলনে এক অনন্য ভূমিকার জন্য দল-মতের ঊর্ধ্বে আপাময় মানুষের ভালোবাসা অর্জন করে চলছে। কিন্তু সেই মুহূর্তেও কিছু কিছু স্থানে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা এ বাহিনীর অর্জনকে বিসর্জন দিচ্ছে।
দেশের নাগরিকদের মধ্যে পুলিশ সম্পর্কে একটি বিরূপ ধারণা আছে যে, পুলিশের কাছে সাহায্য চাওয়া মানে নিজের বিপদ নিজে টেনে আনা। সে জন্য মানুষ বাধ্য না হলে পুলিশের দ্বারস্থ হচ্ছে না। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশ বাহিনীর মানবিকতার বিষয়গুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। নতুন পথ দেখিয়েছে। আমরা নতুন এক পুলিশ বাহিনীকে চিনতে শুরু করলাম।
বিশেষ করে লকডাউন শুরুর দিন থেকে পুলিশ বাহিনীর কর্মতৎপরতা ছিল চোখেপড়ার মতো। এই দুঃসময়ে তারা মাস্ক, স্যানিটাইজার ও খাবারের প্যাকেট বিলি করছে। রাতের আঁধারে অনাহারীর মুখে খাবার তুলে দিয়েছে। প্রসববেদনায় ছটফট করা নারীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছে। তাদের মধ্যেও যে মানবিকতা, উদারতা, মনুষ্যত্ববোধ আছে তা করোনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে। নিচে এ বাহিনীর কয়েকটি ত্যাগের ঘটনা উল্লেখ করলাম। নিকট অতীতে কুমিল্লায় পারভেজ মিয়া নামে হাইওয়ে পুলিশের এক কনস্টেবল সাহসিকতা ও মানবসেবায় এক অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডোবায় পড়ে গেলে পুলিশ কনস্টেবল পারভেজ মিয়া যাত্রীদের জীবন রক্ষায় ছুটে যান। পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত ডোবার পানিতে যেখানে সাধারণত মানুষ নামতে চায় না, সেখানে পচা ডোবায় কনস্টেবল পারভেজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। নিমজ্জিত বাসের ভেতর ঢুকে একাই পানির নিচ থেকে একে একে ২২ যাত্রীর জীবন বাঁচিয়েছেন। মানুষের জীবন বাঁচানোর এ দৃশ্য ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল। চার দিকে যখন খাবারের আর্তনাদ, তখন মানুষের পাশে ভিন্ন এক উদ্যোগ নিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ দাঁড়িয়েছে। মানুষকে ঘরে রাখতে তারা পৌঁছে দিচ্ছে খাবার সামগ্রী। তাও আবার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। স্লোগান দিচ্ছে বাসায় থাকুন, দোকানই যাবে আপনার কাছে। লকডাউনে যখন পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ তখন পুলিশ পৌঁছে দিচ্ছে ডাক্তার-নার্সদের হাসপাতালে। বিদেশফেরত ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা নিশ্চিত করতে বাড়িতে বাড়িতে খাবার সামগ্রী পাঠিয়েছে। বিদেশীদের হোম কোয়ারেন্টিনে রেখেছে কড়া নজরদারিতে। করোনায় মৃত ব্যক্তিদের দাফনে স্বজনরা এগিয়ে না এলেও পুলিশ আসবে এ আস্থা অর্জন করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। করোনাভাইরাসে মৃত্যু হয়েছে সন্দেহে গাজীপুরের সাইনবোর্ড এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে পড়ে থাকা লাশের কাছে কেউ যায়নি। অবশেষে পুলিশ কনস্টেবল রুবেল লাশটি রিকশাভ্যানে তুলে থানায় নিয়ে যান। পুলিশের বিরুদ্ধে মানুষের যে ক্ষোভ ও অনাস্থা ছিল তা অনেকটাই করোনায় কেটে গেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আস্থার সঙ্কট দূর হবে।
কোথাও সংঘর্ষ-মারামারি কিংবা দুর্ঘটনা যাই ঘটুক সব জায়গায় মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায় কে? এমন প্রশ্নের উত্তর আসবেÑ পুলিশ। আমরা কিছু পুলিশের নিষ্ঠুরতার খবর যখন গণমাধ্যমে দেখি তখন ঘৃণা-ধিক্কার জানাই। অথচ এ বাহিনীর হাজারো সদস্য ২৪ ঘণ্টায় ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা ডিউটি করে আমাদের নিরাপত্তার জন্য। আমরা যখন রাতে ঘুমিয়ে পড়ি তখন তারা রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়ে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সামান্য একটু রোদে কিংবা বৃষ্টিতে আমরা যখন নিরাপদ আশ্রয়স্থলে চলে যাই তখন তারা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দায়িত্ব পালন করে। দেশের জনগণের কথা বিবেচনা করে পরিবার-পরিজন রেখে শুধু দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই এ বাহিনীর সদস্যরা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। করোনা হয়তো চিরদিন থাকবে না। কিন্তু আমরা চাই করোনা-পরবর্তীতে ও জনগণের পুলিশ জনগণের আস্থার স্থান ধরে রাখুক। হ


আরো সংবাদ