১৪ জুলাই ২০২০

দৃষ্টিপাত : মাইরের উপর ওষুধ নাই!

-

এক গ্রামের চোর তাড়া খেয়ে অন্য গ্রামে পালায়! এ জন্য চোরকে দশ ঘাটের পথঘাট চিনে রাখতে হয়। গুটিকয়েক রাঘববোয়াল দেশের বারোটা বাজিয়ে ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করছেন। আবার দেখা যাবে এরাই জনদরদি! সরকারি, বেসরকারি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে নানা পর্যায়ে দেশের ব্যবসায়ীরা লোন নিয়ে ঋণখেলাপি সেজে থাকেন। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসার নামে টাকা পাচার নতুন কোনো খবর নয়। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যাবে, কী পরিমাণ বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন এসব ঋণখেলাপি। তাদের পরিবারের প্রতিজনের থাকে বিশ্বের সেরা মডেলের একাধিক গাড়ি-বাড়ি, ফ্ল্যাট। স্ত্রী, শ্যালক, শ্যালিকা, ভাগ্নে, ভাগ্নি, ছেলে, ছেলের বউয়ের নামে দেশে বিদেশের ব্যাংকে অঢেল টাকা। কিন্তু দেশের ব্যাংক টাকা চাইলে খেলাপি বলে দাবি করে। মাঝে মধ্যে তাদের নির্লজ্জ ও কদর্য অভিলাষের খবরও চাউর হয়ে থাকে।
সম্প্রতি এ রকমই একটি ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতে। ‘তোর কত বড় সাহস যে আমার কথা অমান্য করিস। গুলি করে জন্মের মতো খোঁড়া করে দিবো।’ বেসরকারি খাতের এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়াকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে, মোবাইল কেড়ে নিয়ে, বনানীর সিকদার হাউজের তিনতলায় ধরে এনে এভাবেই হুমকি দেয়া হয়। সেখানে তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ঋণ দেয়ার জন্য হুমকি দেয়া হয়।
ব্যবসায়ী গ্রুপের বাহাদুরি
এটাই কি দেশের বড় একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের এমডির পারিবারিক শিক্ষা? অস্ত্র দিয়ে অন্য একজনকে গুলি করে জন্মের মতো খোঁড়া করে দেবেন! তুই তুকারি করবেন! আটকে রেখে নির্যাতন করবেন! একটা ব্যাংকের এমডি ও অতিরিক্ত এমডিকেই যারা এভাবে নির্যাতন করতে পারেন; তা হলে ভাবা যায়! ছোটখাটো অফিসার কিংবা সাধারণ জনগণের ওপর তাদের কী ধরনের আচরণ ও নির্যাতন হতে পারে।
জানা যায়, গুলি করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা এক্সিম ব্যাংকের এমডির কানে বাতাস লাগিয়ে চলে যায়। এ ছাড়া ব্যাংকের অতিরিক্ত এমডিকেও গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। অতিরিক্ত এমডির উদ্দেশে বলা হয়, ‘প্রতি কাঠা জমির দাম আড়াই কোটি টাকা, আর তুই কেন বললি প্রতি বিঘার দাম আড়াই কোটি টাকা। এখনই তোকে শেষ করে ফেলব।’ এ সময় তাকে মারধরের চেষ্টা করা হয়। ব্যাংকটির এমডির কাছ থেকে সাদা কাগজে জোর করে স্বাক্ষর আদায় করা হয়। স্বাক্ষর না করলে ‘বিদেশী নিরাপত্তাকর্মী’ দিয়ে টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন চালানো হবে বলে হুমকিও দেয়া হয়। আবার এই স্বাক্ষরের সাক্ষী করা হয় অতিরিক্ত এমডিকে। মূলত এক্সিম ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ চেয়ে সময়মতো না পাওয়াতেই চলে এ নির্যাতন। ওই দিন দুপুর ১২টায় জিম্মি হওয়ার পর সন্ধ্যা ৭টায় মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পান শীর্ষপর্যায়ের এই দুই ব্যাংক কর্মকর্তা।
দেশের অগ্রগতি লাটে ওঠার উপক্রম
বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিকে ধ্বংস করার কোনো পরিকল্পনাকেই আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশ বাঁচলে, অর্থনীতি এগিয়ে গেলে, এমন অনেক শিল্পগ্রুপ তৈরি হবে। কিন্তু উদীয়মান অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্তকারীদের ছাড় দিলে দেশের অগ্রগতি লাটে উঠবে। দেশে ব্যাংক লুটের ঘটনা বহুকাল থেকে চলছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যাংক কখনো সজাগ নয়। কাকে, কে করবে অভিযোগ? চোরে চোরে মাসতুতো ভাই! এভাবেই চলছে... এবং চলবে...? এভাবেই কাটবে কি আমাদের! আইন কি আমাদের শাসন করছে, নাকি কয়েকটি ধনী গ্রুপ আমাদের শাসন করছে। দেশীয় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিও যাদের আস্থা নেই। আমরা মনে করি, যত দিন আইনের সঠিক এবং নির্ভেজাল প্রয়োগ না হবে, তত দিন দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন কিছুতেই সম্ভব হবে না।
যাদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তারা হলেনÑ অন্যতম ব্যবসায়ী গ্রুপের কর্ণধার। তাদের মধ্যে সংরক্ষিত আসনের এমপিও রয়েছেন। এদের পেছনে আরো অদৃশ্যরা রয়েছেন তারাই হচ্ছেন মূল হোতা। তাদের অপরাধের দায় সরকার বয়ে বেড়াবে কেনো? এ কথা ঠিক, এর পেছনের কলাকুশলীরাই এখন তাদের আগলে রাখবে। যেমনভাবে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।
চেতনা ও ক্ষমতা যাদের বাহানা
বাংলাদেশে যারা উঁচু পর্যায়ে আছেন, তারা নামেমাত্র জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ চাউর করে থাকেন। চেতনা ও ক্ষমতাকে মাধ্যম বানিয়ে টাকা হাতানোই তাদের মূল টার্গেট। চোর-ডাকাতের মতো টাকা লুকানোর দশ ঘাটের পথঘাটও তাদের অজানা নয়। আমরা শুধু পারি ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর’ তথা সাধারণ জনগণের ঘাড়ে চাপতে। ভ্যাটের বোঝা ছাড়াও পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের দাম বাড়িয়ে মধ্যম ও স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করতে। হয়রানি ও জেল হয় গরিব কৃষকদের কৃষিঋণের ১০-২০ হাজার টাকা না দিতে পারার জন্য। সত্যিকারে দেশের জন্য কেউ কিছুই করেন না। ত্রাণের নামে, সাহায্যের নামে, ক্যামেরা ট্রায়াল যেটুকু না করলে নয়, শুধু সেটুকুই। কারণ নির্বাচনী পোস্টারে ছবি ছাপাতে হবে।
দেশের কিছুু অসৎ ব্যবসায়ী বিদেশে ব্যবসার নামে টাকা পাচার করে ওইসব দেশে সেকেন্ড হোম আর টাকার পাহাড় গড়ে থাকেন, যা দেশের অর্থনীতিকে ফোকলা করে দেয়ার নামান্তর। তারা প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে কালিমা লেপনের কাজে লিপ্ত। একটা ব্যাংকের এমডি, ডিএমডিকে যখন হুমকি এবং হেনস্থা করা সম্ভব হয়, তখন সেটা সার্বিক সমাজব্যবস্থার একটি চিত্র বলেই প্রতীয়মান হয়। একে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বলপ্রয়োগের মোক্ষম প্রবাদ ‘মাইরের উপর ওষুধ নাই’ ও ‘জোর যার মুল্লুক তার’, এই নীতি থেকে বেরিয়ে সমাজে ন্যায্যতার প্রতিষ্ঠা জরুরি।
ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি রাজনীতি
বর্তমানে দেশের রাজনীতি ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি। যে দেশের সংসদে রাজনীতিকের চেয়ে ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেশি, সে দেশে এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করা ভুল বলে মনে করে রাজনৈতিক সচেতন মহল। সিকদার গ্রুপের সাথে যেটা হয়েছে এটিই স্বাভাবিক ঘটনা। না হওয়াটা অস্বাভাবিক! এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। স্বাভাবিক ঘটনা দুর্ঘটনাক্রমে প্রকাশ হয়ে পড়েছে মাত্র! দেশের ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টরা এভাবেই ব্যাংকের সর্বনাশ করছে। দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতিই এ দেশের সব সমস্যার উৎস, এতে কারো দ্বিমত নেই। বাংলাদেশের ব্যাংক, বীমা, ব্যবসা, রাজনীতি ও ক্ষমতা কিছু দুর্বৃত্ত ও শক্তিশালী মাফিয়াচক্রের নিয়ন্ত্রণে। মতিঝিল পাড়ায় কোনো ব্যাংকে (বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক) ঢুকতে গেলে পোস্টার বা ব্যানার দেখে সেটা পার্টি অফিস মনে হবে, ব্যাংক মনে হবে না। ব্যাংক লুটকারীদের শাস্তি না দিয়ে যখন উল্টো নোমিনেশন দেয়ার মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয়। তখন খোদ ব্যাংকের এমডিকে গুলি করে, কিডন্যাপ করে, ঋণের নামে ব্যাংক লুট করা হবে এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে? পরিবারের কেউ যখন সংসদ সদস্য, তখন তো সবই পানি পানের মতো সহজ!
ব্যাংক খাত বলে কিছু নেই
এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে সাহসী কাজের জন্য শুভকামনার সাথে তাকে পুরস্কৃত করা উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ মাত্র ৫০০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে বন্ধকী সম্পত্তি পরিদর্শনে কোনো ব্যাংকের এমডি পর্যায়ের কর্মকর্তারা গেলেন কেনো? কেন এত হইচই! যেখানে হাজার কোটির ঋণখেলাপি সমাজে শত শত। একটা ক্লায়েন্টের এসেট দেখতে নিরাপত্তাহীনভাবে ব্যাংকের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাকেই কেন যেতে হলো? ব্যাংকার নির্যাতনের বহু ঘটনা আড়ালে পরে আছে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে দেশবাসীর কাছে ব্যাংকারই আজ ভিলেন! যদিও ঋণখেলাপির নাটের গুরু বেশির ভাগ ব্যাংক কর্মকর্তা। কেননা তারাই আইনের মারপ্যাঁচ বুঝিয়ে কাগজপত্র তৈরি করে দিয়ে থাকেন। যার কারণে ব্যাংক খাত বলে বাংলাদেশে কিছু নেই... দীর্ঘ দিন থেকেই নেই, যা আছে তা হলো লুটপাট খাত।
আতঙ্কিত ব্যাংকাররা
এক্সিম ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এমন নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের প্রকাশ্য ভূমিকা প্রয়োজন। নইলে কেউ কাজে মনোযোগ দিতে পারবেন না। করোনাভাইরাসের মহামারীর মধ্যে এমন নির্যাতনের ঘটনায় হতবাক হয়ে পড়েছেন তারা। গণমাধ্যমের সাথে কেউ প্রকাশ্যে বা নাম প্রকাশ করে কথা বলতে চান না। তবে তারা বলেছেন, ব্যাংকের ঋণ কিভাবে দেয়া হয় আর কেন আদায় হয় না, এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে। একজন এমডি বলেন, এভাবে নির্যাতিত হলে ব্যাংকগুলো কীভাবে চলবে। এর যথাযথ বিচার না হলে কেউ নিরাপদ নন।
ক্ষমতার শিখরে থাকা ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয় শেয়ারবাজার ও ব্যাংক লুটপাট করে, লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে কেউ নেতা, উপদেষ্টা, এমপি হওয়া ছাড়াও ক্ষমতাসীনদের সাথে দহরম মহরমকারী হাইপ্রোফাইল ডোনার! তাই এ কথা বললে মোটেই ভুল হবে না, সরকারের ব্যর্থতা অথবা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি চলছে। ব্যাংকিং খাতে সৎ ও যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। হ
ধনঁহড়সধহ১৯৭২@মসধরষ.পড়স


আরো সংবাদ