৩০ মে ২০২০

দি ব স : স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ ও জনগণের অধিকার

-

এ বছর ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালিত হচ্ছে যখন সারা বিশ্বে করোনাভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের দেশে যাদের আর্থিক সচ্ছলতা আছে তারা বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ পেলেও ব্যাপক সংখ্যক গরিব মানুষ চিকিৎসাসুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে প্রাকৃতিক চিকিৎসাপদ্ধতি (আয়ুর্বেদ ও ইউনানি) একটি ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমান দুর্যোগে এখন ঘরবন্দী জীবনযাপন এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। যেকোনো ধরনের মহামারী মোকাবেলার জন্য এমন দূরত্বের কথা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়ুর্বেদ চিকিৎসাবিজ্ঞানী চরক-সুশ্রুত আড়াই হাজার বছর আগে রোগজীবাণু মোকাবেলার যে পথ প্রদর্শন করে গেছেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান তা-ই বলছে এখন। তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, জীবাণু হামলায় যখন সভ্যতা বিপন্ন, তখন প্রতিটি রোগী ও তার সংস্পর্শে আসা মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, চীন করোনা সংক্রমণ মোকাবেলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভেষজ দ্রব্যাদি ব্যবহার করে সাফল্য অর্জন করেছে। করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে এ বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
আয়ুর্বেদ হচ্ছে পৃথিবীর প্রাচীন ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতি। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে, দেহ ও মন তথা সার্বিক সুস্বাস্থ্য রক্ষা করা। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন পদ্ধতির বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করা, যাতে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ব্যক্তিরা তাদের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করে চলতে পারেন এবং যারা সমস্যায় ভুগছেন তারা তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করতে পারেন।
আয়ুর্বেদের উল্লেখযোগ্য প্র্যাকটিসগুলো হলোÑ ধ্যান, যোগ ব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ব্যায়াম, পঞ্চকর্ম ও বিভিন্ন ওষুধ। আয়ুর্বেদ একটি প্রাকৃতিক বা ঐতিহ্যগত চিকিৎসাপদ্ধতি যেখানে মন, শরীর, আচরণ ও পরিবেশের বিষয়টি ব্যাপক একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করে সুস্থতা অর্জনে সহায়তা করা হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য এ চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ ধরনের উদ্ভিদ ঔষধি গুণসম্পন্ন বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহারের একটি সুবিধা হলো, ব্যয়বহুল বিদেশী ওষুধ আমদানির ওপর আমরা নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলতে পারি। তার পরিবর্তে আমরা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেরাই কম খরচের ওষুধ তৈরি করতে পারি।
আমরা ভারত ও চীনের দিকে তাকালে দেখতে পাই, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে তারা এই ঐতিহ্যগত পদ্ধতি অনুসরণ করে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। শ্রীলঙ্কা, ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তানেও এই চিকিৎসাপদ্ধতির জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
ভারত তার কমিউনিটি স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। শ্রীলঙ্কাতে বিকল্প চিকিৎসা বিষয়ে আলাদা একটি মন্ত্রণালয় রয়েছে। বাংলাদেশ যেসব স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলা করছে, এ ক্ষেত্রে সব চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্বেষণ ও উন্নয়ন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
এলোপ্যাথিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ডাক্তার, নার্স ও মিডওয়াইফের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। প্রাকৃতিক চিকিৎসার কর্মীবাহিনী ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের স্বাস্থ্য খাতে এ ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পারি।
আয়ুর্বেদ অ্যান্ড ন্যাচারোপ্যাথি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আয়ুন্স) ঐতিহ্যগত চিকিৎসাপদ্ধতির উন্নয়নে কাজ করে আসছে। এই খাতে উন্নয়ন সাধন করা গেলে আমরা স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নতি অর্জন করতে পারব। এ জন্য ‘আয়ুন্স’ এই চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে গবেষণা চালানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
আমাদের দেশে বেশ কিছু সমস্যা আছে যেগুলো দূর করতে পারলে আমরা এই সেক্টরে উন্নতি অর্জন করতে পারব। নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নিতে পারলে আমরা সুফল আশা করতে পারি : ওই ডিগ্রিধারীদের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিটি বিভাগে একটি করে আয়ুর্বেদ ও ইউনানি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন এবং প্রতিটি জেলায় ভেষজ বাগান তৈরি করতে হবে। ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ যাতে মানসম্মতভাবে তৈরি করা হয় সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আয়ুর্বেদ ও ইউনানি সিস্টেমকে মনিটর করার জন্য স্বতন্ত্র একটি কাউন্সিল গঠন করা দরকার। আমাদের দেশের বেশির ভাগ জনগণ গরিব। তাই তাদের পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসা করা দুরূহ ব্যাপার। ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতিতে একজন মানুষ অল্প খরচেই চিকিৎসাসুবিধা গ্রহণ করতে পারে। প্রাকৃতিক পদ্ধতি হওয়ায় এ পদ্ধতিতে চিকিৎসার কোনো নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। হ
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আয়ুর্বেদ অ্যান্ড ন্যাচারোপ্যাথি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।


আরো সংবাদ