৩০ মে ২০২০

সমস্যাটি মনস্তাত্ত্বিক; ছুটিজনিত নয়

-

প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ধন্যবাদ জানাতে হয় ভোটার বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য। গত ১৪ মার্চ তিনি চট্টগ্রামে একটি অনুষ্ঠানে মহানগরীর নির্বাচনে (২৯ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য, পরে স্থগিত) ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে সরকারি অফিসগুলো পুরো ছুটি না দিয়ে অর্ধদিবস খোলা রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কারণ, আগামী ২৯ মার্চের আগে টানা তিন দিন ছুটি থাকায় নগরের লোকজন ভোট দেয়ার চেয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়াকেই প্রাধান্য দিতে পারেন। অত্যন্ত চমৎকার চিন্তা। দেরিতে হলেও সিইসি উপলব্ধি করেছেন যে, ভোটার উপস্থিতির দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীদের নয়, নির্বাচন কমিশনেরও কিছু করার আছে।
তবে ভোটার উপস্থিতির জন্য নির্বাচন কমিশনের যা করার আছে সেগুলোই হলো আসল কাজ। কিন্তু শুধু সরকারি অফিস অর্ধদিবস খোলা রেখে কি ভোটকেন্দ্রে ভোটার টানা যাবে? সরকারি অফিসের ভোটার আর কতজন হবে? ভোটারের মূল অংশ তো সাধারণ নাগরিকরা। তারা কেন ভোটকেন্দ্রে আসছেন না? গত ১৩ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী-চাঁদগাঁও আসনে উপনির্বাচনে মাত্র ২২.৯৪% ভোটার ভোট দিয়েছেন। সেখানে কি এরকম ছুটির জট ছিল? তবে হ্যাঁ, গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দু’টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে একটি ছুটির জট ছিল। কিন্তু কতজনইবা এই ছুটিতে দেশের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন? আমরা ঈদের ছুটিতে ঢাকা মহানগরীর যে চিত্রটি দেখতে পাই সেরকমটি নিশ্চয় হয়নি ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে। তবে কেন মাত্র ২৭% ভোট পড়ল? বাকি প্রায় ৬০% নাগরিক কি ঢাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিল?
সিইসি নূরুল হুদা আরো একটি পদক্ষেপের কথা বলেছেন যে, সীমিত আকারে গাড়িঘোড়া চলার অনুমোদন দেবেন। অত্যন্ত ভালো চিন্তা। অনেক বয়স্ক, অসুস্থ এবং নারী ভোটার সহজেই কেন্দ্রে যেতে পারবেন। কিন্তু কত ভাগ লোক গাড়ি ব্যবহার করেন? আগের নির্বাচনগুলোতেও তো গাড়ি চলাচলে বিধিনিষেধ ছিল। এমনকি ২০০৮ এর সাধারণ নির্বাচনেও এমন বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু ভোট তো কম পড়েনি। আসলে গায়ে ফোঁড়া হলে শুধু ফোঁড়ায় মলম লাগালে রোগ ভালো হয় না। গায়ের ফোঁড়া বা এলার্জি কোনো একটা মূল রোগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কাজেই রক্তের কোনো সমস্যার কারণে বা শরীরের অন্য কোনো সমস্যার কারণে এই ফোঁড়াগুলো হচ্ছে তা বের করতে পারাটাই হলো রোগ মুক্তির প্রথম পদক্ষেপ।
আমাদের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ভোটার কমে যাওয়ার আসল কারণ কিন্তু টানা ছুটির জট বা গাড়ি চলাচলের নিধিনিষেধ নয়। কারণটি পুরোপুরি মনস্তাত্ত্বিক। সত্যিকারার্থে মানুষ বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর থেকে আস্থা হারাতে যাচ্ছে। কোনো ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা অর্জন করতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু আস্থা হারানোর কাজটি খুব অল্প সময়েই হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে ভোটারদের আস্থায় ভাটা পড়ছে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ব্যাপারটি কিন্তু এমন নয় যে, মানুষ হঠাৎ করেই নির্বাচন বিমুখ হয়ে পড়েছে। একটি সুদীর্ঘ নেতিবাচক প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছে নির্বাচনী ব্যবস্থা। এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ২০১১-২০১২ সালে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই। বাংলাদেশের মানুষ যখন খুবই দরিদ্র ছিল বা পেটে তিন বেলা ভাত জুটত না তখনো তারা ছিল নির্বাচন সচেতন মানুষ। কিন্তু আজ বাংলাদেশের মানুষের জীবন-যাত্রার মান অনেক উন্নত হয়েছে, তারা আরো সচেতন হয়েছে। কাজেই যখনই সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বিভিন্ন অজুহাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া হলো তখনি মানুষের টনক নড়া শুরু হলো। তদুপরি যেখানে সংক্ষিপ্ত রায় মোতাবেক পরবর্তী দু’টি নির্বাচনে পূর্বতন তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা রাখার সিদ্ধান্তকে বদলে ফেলে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন করার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হয়ে গেল তখন মানুষের অবশিষ্টটুকু বুঝতে আর বাকি রইল না। এরপর এলো ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচন। বিএনপির একগুঁয়েমি এবং একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষমতাসীনরা ১৫১টি আসনে নির্বাচনের আগেই নির্বাচিত হয়ে রইল যেন সরকার গঠনের কাজটিতে কোনো অসুবিধা না হয়। অবশ্য তৎকালীন এই অনন্য নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় একটি পটভূমি কাজ করছিল। ২০১৩ সালের তৎকালীন বিভিন্ন মহানগরী নির্বাচনগুলো রাকিব কমিশন মোটামুটি নিরপেক্ষভাবে সফলতার সাথেই সম্পন্ন করতে সক্ষমতা, দক্ষতা, পারদর্শিতা ও সাহস দেখিয়েছিলেন। ফলে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল এবং গাজীপুর মহানগরীর সব ক’টিতেই বিরোধী দল বা বিএনপি জয়লাভ করেছিল। বলা চলে এরপর থেকেই শুরু হয়েছিল আমাদের নেতিবাচক নির্বাচনী প্রক্রিয়া। জাতীয়তাবাদী দল এসব নির্বাচনে বিজয় লাভ করে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়ল। আর ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। এক দলের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আর অন্য দলের ক্ষমতা হারানোর ভীতি একটি অদ্ভুত নির্বাচনী রসায়ন সৃষ্টি করল। ফলে আওয়ামী লীগ কৌশলে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে একটি স্মার্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করল। এখানে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টির মঞ্চ কাঁপানো নাটক এবং একটি প্রতিবেশী দেশের কর্মকর্তাদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতাও জাতি অবাক বিস্ময়ে পর্যবেক্ষণ করেছে। অন্য দিকে জাতীয়তাবাদী দল মহা ভুল করে হটকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে বোকা বনে রইল। সেই জাতীয় নির্বাচনের পরপরই অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রক্রিয়াতেও জনগণ হতাশ হয়েছিল। বিভিন্ন ধাপে হওয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনগুলোর প্রথম ধাপগুলোতে যথারীতি বিরোধীদলগুলো বেশ ভালো করছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পরবর্তী ধাপের নির্বাচনগুলো চরিত্র এবং ফলাফল পুরোপুরি পাল্টে গেল। সেই নির্বাচনগুলো আর কোনোভাবেই নির্বাচনের প্রাকৃতিক গতির ছকে রাখা গেল না। এ সময় মজার ব্যাপার ছিল উপজেলা পরিষদ নির্বাচন শুরু করে দিয়ে তৎকালীন সিইসি রকিব উদ্দীন দীর্ঘ অবকাশ যাপনে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ফলে উপজেলা নির্বাচনের পরের ধাপগুলোতে অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা জন্ম দিয়েছে এবং প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।
এরপর এলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের টানা দ্বিতীয় মেয়াদকালীন বিভিন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এই নির্বাচনগুলোর পরিবেশ, চরিত্র, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ইত্যাদির মোটামুটি ইঙ্গিত দিলো পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে কী ঘটতে যাচ্ছে। বিশেষ করে, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতি বিভিন্ন নতুন স্ট্র্যাটেজি বা কৌশলের সাথে পরিচিত হতে থাকল।
অজানা কারণে বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের নির্বাচন কেন্দ্রে অনুপস্থিতি, অনেক এজেন্টের উধাও হয়ে যাওয়া, বিরোধী ভোট ব্যাংকের আবাসস্থলগুলোতে পিনপতন নীরবতা ইত্যাদি কেন হলো, কী কারণে হলো জাতি তা জানতে পারল না ঠিকই কিন্তু যে যার মতো করে বিষয়টি বুঝে নিলো; যাকে বলা যেতে পারে পাবলিক পারসেপশন। এছাড়া বিরোধী দলের নির্বাচনী প্রচারণা করতে সক্ষম ব্যক্তিদের অসংখ্য মামলা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো অথবা অত্যন্ত তৎপর ও ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন পুলিশ বাহিনীর দৌড়ের ওপর থাকার কথা সবাই দেখেছে। আরো একটি অদ্ভুত প্রক্রিয়া এই সময় দেখা গেছে যে, এর আগে যেসব বিরোধী দলের প্রার্থী বিভিন্ন সিটিতে বা পৌরসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের বেশির ভাগকেই বিভিন্ন অপরাধে জেল খাটতে হয়েছে অথবা প্রশাসনিক আদেশে বরখাস্ত হয়েছেন। যেগুলো বাংলাদেশের সরকারি বা বিরোধী সব ধরনের সমর্থক জনগোষ্ঠীর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এসব প্রক্রিয়ার মধ্যেই জাতি হঠাৎ আশার আলো দেখতে পেয়েছিল, যেদিন প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালে বলেছিলেন, আমি আর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন দেখতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী আবারো আশার আলো জ্বালিয়েছিলেন ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সব দল ও জোটের সাথে আলোচনায় বসে। কিন্তু এর পরই মানুষের আশাভঙ্গ হতে থাকল যখন দেখা গেল সারা দেশে গায়েবি মামলার জোয়ার বইতে থাকল।
এরপর নির্বাচনী প্রচারণায় প্রকাশ্যে বাধা দেয়ার ঘটনা আধুনিক মিডিয়ার কল্যাণে সবাই অবলোকন করেছে এবং যার যার মতো করে ধারণা নিজের মনে বদ্ধমূল করে রেখেছে। এমনকি বিরোধী পক্ষের হাই প্রোফাইল প্রার্থীও সরাসরি পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার চিত্র সবাই দেখেছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিএনপি ৩-৪ জন করে প্রার্থী দিয়ে একজন প্রার্থীর বৈধতাও নিশ্চিত করতে পারেনি।
মানুষের মনস্তত্ত্বে সবচেয়ে বড় নেতিবাচক ছাপ পড়ে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে। এই নির্বাচনটি বাংলার ঐতিহ্যকে ধারণ করে শত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে একটি উৎসবমুখর পরিবেশে হতে যাচ্ছিল। কিন্তু নির্বাচনের দিন সকালে ‘বিবিসি’ এর একটি সচিত্র সংবাদ দেখে দেশের জনগণ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। সংবাদে দেখা যায় আগেই ব্যালট পেপার ভর্তিকৃত স্বচ্ছ নির্বাচনী বাক্সটি কেন্দ্রে এনে রাখা হচ্ছে। এরপর দিন যতই গড়াতে থাকে ততই মানুষের কাছে পরিষ্কার হতে থাকে আগের রাতে কী ঘটেছে!
এরই মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ইভিএম’-এ ভোটদান প্রক্রিয়া। মানুষ সাধারণভাবে এই যন্ত্রের সাথে পরিচিত নয়। আর যারা পরিচিত তারা প্রশ্ন করেন মেশিনে যে প্রোগ্রাম সেট করে দেয়া হয়েছে তার নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা কী? আমি ভোট যে মার্কায় দেবো মেশিন সেটি কোন মার্কা হিসেবে রিড করবে তাতো বোঝার কোনো উপায় নেই। তা ছাড়া ‘ইভিএম’ এ ভোট দিতে সাহায্য করার নামে সাহায্যকারীর পছন্দের মার্কায় ভোট দিয়ে দেয়া অথবা জোর করে নির্ধারিত বোতামে চাপ দিয়ে সাহায্যকারীর সমর্থনের প্রতীকে ভোট দেয়া ইত্যাদি কারণে ভোটারের অনীহার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়া হয়েছে। এভাবেই একটি পাবলিক পারসেপশন সৃষ্টি হয়েছে যে, ভোট যাকেই দেই না কেন পাস তো করবেন একটি নির্দিষ্ট প্রতীকের প্রার্থী। তাই খামাখা কষ্ট করে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে কী লাভ?
মনে রাখতে হবে, এই আস্থার সঙ্কট যদি আমাদের পেয়ে বসে তবে তা মহাবিপদের কারণ হবে। তখন আস্থা হারাবে আমাদের পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা। কাজেই আসুন, নির্বাচনব্যবস্থায় আস্থার সঙ্কট কাটাতে মূল সমস্যা উপলব্ধি করে সেখানে মেরামতের কাজে হাত দিই। নইলে শুধু ছুটি বাতিল করে বা নির্বাচনের দিন রাস্তায় গাড়িঘোড়া চলার অনুমোদন দিয়ে ভোটারদের মনোজগতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলা সম্ভব হবে না।হ
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং পিএইচডি গবেষক, (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
Email: [email protected]

 


আরো সংবাদ