২৭ মে ২০২০

আত্মতুষ্টি নয়, প্রস্তুতি কতটুকু?

-

কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করে যাচ্ছে করোনা আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণের। পুরনো হাসপাতালগুলো পুনর্গঠন, সাময়িকভাবে নতুন হাসপাতাল তৈরি এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ করার চেষ্টা চলছে। সেনাবাহিনীকে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এ সবের মধ্যে স্বস্তির আলো দেখা যাচ্ছে। তবে সংক্রমণের ব্যাপকতা সীমিত করা না গেলে চিকিৎসার আয়োজনসহ সব চেষ্টাই অপ্রতুল হয়ে উঠতে পারে।
কী হবে ঠেকানো না গেলে?
রোগ বিস্তারের সামাজিক সংক্রমণের হার বাড়লে হাসপাতালভিত্তিক সেবার চাহিদা বাড়বে। চিকিৎসার কারণে ভর্তিকৃত প্রতিটি রোগীই দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন হবে। সাধারণভাবে আরোগ্য হওয়ার সময় দীর্ঘ হওয়ায় শয্যা সঙ্কট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হাসপাতালকেন্দ্রিক সংক্রমণ ঝুঁকি প্রতিরোধসহ ভর্তিকৃত রোগীদের নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। গ্লাভস, স্যানিটাইজার এবং পরিবেশ সুরক্ষার বৃহৎ ও টুকিটাকি সামগ্রীসহ ব্যাপক পরিমাণে, চিকিৎসা, পরিবেশ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর প্রয়োজন বাড়বে। হাসপাতালের প্রতিটি শয্যায় ন্যূনতম একটি সাকার মেশিন, অক্সিজেন সিলিল্ডার ও অক্সিজেন সম্পৃক্ততা মাপার যন্ত্র লাগবে। গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, সারি সারি নতুন চাদর মোড়ানো হাসপাতাল শয্যার চিত্র; জানান দেয়া হচ্ছে এগুলো বর্তমান ও সম্ভাব্য সংখ্যা। তবে সার্বিকভাবে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, সেবা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সুরক্ষা, পথ্যসহ নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মজুদ, জোগান ও সরবরাহ কতটা নিশ্চিত, তার কোনো বিশ^াসযোগ্য প্রমাণ কারো কাছে নেই।
সেবাকর্মীদের সেবা
শারীরিকভাবে কষ্টকর হওয়ায় সেবাকর্মীদেরও যথেষ্ট বিশ্রামের প্রয়োজন। তাদের বাঁচাতে হবে সংক্রমণ ও অবসাদের উভয় সঙ্কট থেকে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও মনোবল সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। কাছাকাছি,উপযুক্তমানের হোটেলে এর ব্যবস্থা নেয়া হলেও তাদের জন্য লাগবে যথাযথ ও নিরাপদ পরিবহনের ব্যবস্থা। প্রয়োজন হবে এক দীর্ঘমেয়াদি, ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রাণশক্তিক্ষয়ী কর্মযজ্ঞের। শ্রমসাধ্য সেবার শেষ পরিণতি রোগীর মৃত্যু হলে হতাশায় ভেঙে পড়তে পারেন সেবাকর্মীরাও। কারা এসব নাজুক সেবাকর্মীদের মনোবল জোগাবেন, সেই মনোবিদদের কিভাবে সেবায় অঙ্গীভূত করা যায়Ñ সে বিষয়ে কে ভাবছেন?
সেবার প্রস্তুতি কতটুকু?
অভূতপূর্ণ ও কল্পনার অতীত এই বিশাল ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মযজ্ঞ এবং হাসপাতাল-কেন্দ্রিক সংক্রমণের ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে প্রয়োজন বিপুল সংখ্যায় সুদক্ষ, অভিজ্ঞ ও নিবেদিত চিকিৎসক, নার্স, গবেষণাগার প্রযুক্তিকর্মী, সেবাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রসদ সরবরাহকারীসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পাওয়া পেশাজীবী দল গঠনের। সেই লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ ও মহড়ারই বা কী হাল? দক্ষতা ও মনোবলে অপ্রস্তুত সেবাকর্মীরা সেবা দিতে গিয়ে কী ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া হবে, তা অনুমানযোগ্য নয়। এ সবকিছু সংগঠনে আর সবার মধ্যে সমন্বয়ের জন্য প্রয়োজন অব্যর্থ ও উদ্বুদ্ধকারী নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার। সে ব্যক্তিরা কারা? প্রয়োজনীয় সব লোকবল নিয়ে দল ও নেতৃত্ব গঠনের প্রচেষ্টা কি খুব একটা দেখা যাচ্ছে? তবে কি আশা করা হচ্ছে, সবকিছু ব্যাঙের ছাতার মতো রাতারাতি গজিয়ে উঠবে? মনে রাখা প্রয়োজন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিতব্যকে মানুষ যুক্তি, উদারতা ও ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখতে প্রস্তুত থাকে; তবে উদাসীনতা, অবহেলা ও বিভ্রান্তিকে নয়।
সেবাকর্মীদের সুরক্ষা?
সংক্রমণরোধে নিজের, সহকর্মীদের ও পরিবেশের সুরক্ষায় সামগ্রিক লোকবলের প্রশিক্ষণের অভাব এই সম্প্রদায়কে উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন করে তোলে। তবে, দৃশ্যমান কোনো মাত্রার সেবা কর্মকাণ্ড ঘটার আগেই চিকিৎসক ও সবাকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব দেখা দিয়েছে। সুরক্ষা সামগ্রী যথাযথ মানের কি না, সে বিষয়েও অনেকের সন্দেহ। পর্যাপ্ত পরিমাণে সুরক্ষাসামগ্রী মজুদ থাকার প্রমাণ মাঠ চিত্রে নেই। এই পরিস্থিতিতে প্রারম্ভিকভাবে আক্রান্তদের তালিকায় তুলনামূলক অনুপাতে চিকিৎসক ও নার্সদের উচ্চ ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিষয়টি তাদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে। এ নিয়ে চিকিৎসক ও অন্যান্য সেবাকর্মীর মধ্যে অসন্তোষের খবরও আসতে শুরু করেছে। এসব ঘটনা সার্বিক প্রস্তুতিতে ঘাটতি ও সমন্বয়ের অভাব এবং লোকবল সমস্যাকে প্রকট করে তোলার সম্ভবনাপূর্ণ।
ব্রতের বাস্তবতা?
সম্ভাব্য লোকবল সমস্যার ইঙ্গিত পেয়ে মাত্র দুই দিন আগে প্রধানমন্ত্রী বিএমএকে আহ্বান জানিয়েছেন ৫০০ চিকিৎসককে প্রস্তুত রাখতে। সারা দেশের ও সম্ভাব্য চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এই সংখ্যা কতটা অপ্রতুল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। চিকিৎসক সংগঠনগুলোর সাথে আলোচনারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত নিবেদনে প্রস্তুত না থাকলে তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী নিরাপত্তার অভাবসহ নানা সঙ্গত কারণ ও অজুহাত মিলিয়ে এই লোকবলকে কিভাবে উদ্বুদ্ধ করা যাবে, সে বিষয়ে সংশয় জাগাই বাস্তব। চীনের উহানে সঙ্কটের মাত্রা ও আত্মত্যাগের প্রয়োজন অনুধাবন করে যেভাবে নারী সেবাকর্মীদের সেবার প্রস্তুতি নিতে বহু দিনের পরিচর্যায় সজ্জিত চুল কেটে ফেলতে দেখা গেছে, সে ধরনের গভীর উপলব্ধি ও আত্মোৎসর্গের সাড়া একটি সামাজিক নিরাপত্তাহীন মধ্যবিত্ত মানসিকতায় কী মাত্রায় আশা করা যায়, তা’ও প্রশ্নযোগ্য।
অক্সিজেনকে মনে আছে কি?
স্পেন ও ইতালির অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সেবার চাহিদা সক্ষমতা ও প্রস্তুতির মাত্রা অতিক্রম করলে সামগ্রিক সেবা উপকরণ ও পরিবেশের ওপর চাপ বাড়াবে। শয্যা সংখ্যা অতিক্রান্ত হলে বহু রোগীকে মেঝে ও অন্যান্য স্থানে জায়গা করে দিতে হবে শুধু অক্সিজেন প্রদানে জীবনরক্ষার খাতিরে। স্বল্প সম্পদের দেশ হিসেবে দেশের হাসপাতালগুলোতে বাড়তি চাহিদাকালীন পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। প্রস্তুত করার বড় ধরনের প্লান্ট ও সীমিত। স্থানীয়ভাবে তা কোনো হাসপাতাল উৎপাদন করে না। অক্সিজেনের পুরো সরবরাহটি করা হয় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। বেশির ভাগ চাহিদাই পূরণ করা হয় তুলনামূলকভাবে ছোট সিলিন্ডারের মাধ্যমে। এমন চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সিলিন্ডারের সরবরাহ অপ্রতুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুততার সাথে সরবরাহ বৃদ্ধিরই বা উপায় কী, সে বিষয়গুলো কার মাথায় খেলছে, কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, নাকি সবাই হয় সন্তোষে নয় হতাশায় ভুগছেন, তা’ও অজানা। এসব কারণে অব্যাহত জোগান নিশ্চিত করা হতে পারে দুরূহ। সময়ের পেছনে পড়ে গেলে কোনো উদ্যোগই জীবন বাঁচাতে কাজে আসবে না। সব চিকিৎসাসামগ্রী ও উপকরণের মধ্যে অক্সিজেনের অভাবই দেখা দিতে পারে সবার আগে, হতে পারে সবচেয়ে বিব্রতকর ও বঞ্চনামূলক। বিষয়গুলো কে দেখছেন, কে সমন্বয় করছেন তা জানা না থাকায় উদ্বেগ দানা বাঁধছে।
প্রস্তুতি কতটা?
হাসপাতালে ভর্তি বেশির ভাগই হবেন উচ্চ সেবার চাহিদাসম্পন্ন রোগী যাদের শ^াসনালীকে বারবার যান্ত্রিকভাবে পরিষ্কার রাখতে হবে। এতে প্রয়োজন হবে অধিক সংখ্যক সাকার মেশিনের এবং ন্যূনতম দক্ষতায় প্রশিক্ষিত লোকবলের। এ রোগীদের চিকিৎসাসেবাসহ পথ্যগ্রহণ ও প্রাকৃতিক প্রয়োজন সম্পন্ন করাতেও লাগবে সাহায্য। বর্জ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি ও চাপ বাড়লে সংক্রমণ ছড়ানোর বেহাল অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। বাড়তি চাহিদায় সাড়া দেয়ার সামর্থ্য না থাকলে মানবেতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তখন আতঙ্কিত না হয়ে কি উপায় থাকবে?
নিদারুণ সঙ্কট, উপায়?
সঙ্কট অতি নির্মম। সীমাবদ্ধতা তার বিবেচনার বিষয় নয়। তা মোকাবেলার প্রস্তুতির মাত্রা হওয়া দরকার প্রকৃতই ও সব আঙ্গিকে পূর্ণ, প্রজ্ঞাপ্রসূত, আবেগ ও সাধারণ ধারণাপ্রসূত নয়। বহুদিনের তোষামোদির সংস্কৃতি চর্চায় পুরো জাতি অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতানির্ভর। করোনাসঙ্কট এক অভূতপূর্ণ অভিজ্ঞতা, ফলে আনুষ্ঠানিকতা হয়ে উঠতে পারে আত্মপ্রবঞ্চনামূলক; গুনতে হতে পারে বিরাট মাশুল।হ

লেখক : সাবেক ডিন, সার্জারি অনুষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়

 


আরো সংবাদ