২৭ মে ২০২০

সিরিয়া যুদ্ধ, করোনাভাইরাস অতঃপর

-

ইতিহাসের বইগুলো শিক্ষায় পরিপূর্ণ। আমরা অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীÑ স্প্যানিশ ফ্লু হিসেবে অভিহিত করা হতো, সেটির কারণে বিশ্বব্যাপী ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন অর্থাৎ পাঁচ থেকে ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। মোট প্রাণহানির এই পরিসংখ্যান এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের হতাহতের চেয়েও বেশি।
যুদ্ধের শেষ মাসেও কেবল মহামারীর ঘটনা যুগপৎভাবে ঘটেনি, বরং যুদ্ধের পর মানুষ যখন তাদের বাড়িঘরে ফিরে আসছিল এবং নতুন এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল, তখন তারা এসব দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছিল। এই রোগের বিস্তৃতি এবং তীব্রতার ক্ষেত্রে যুদ্ধকালীন অবস্থা একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। তাই যুদ্ধ ও মহামারী ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পর আন্তঃসম্পর্কিত। কেবল জনাকীর্ণ সামরিক ক্যাম্প বা শিবিরগুলোতেই এই সঙ্ঘাত সৃষ্টি হয় না, বরং যুদ্ধ এলাকায় আটকে পড়া জনসংখ্যার মধ্যেও সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হয়ে থাকে এবং তাদের প্রোটেকশনের জন্য ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থেকে বসবাস করতে বাধ্য করা হয়।
এমতাবস্থায় ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং এতে মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এমন পরিবেশে শত্রুদের গুলিতে যত সৈন্য মারা যায়, এমনকি ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়ায় তার চেয়েও বেশি সৈন্য মারা যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।
আমরা ‘গ্রেট ওয়ার’ তথা ‘বিশ্বযুদ্ধের’ কথা স্মরণ করলে সিরিয়ায় বর্তমানে প্রতিদিন যে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে তা ভুলে যাওয়া সহজ হবে। সিরিয়াবিষয়ক জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত গেইর পেডারসেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে করোনাভাইরাসের বিস্তাররোধের জন্য দেশব্যাপী ‘তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণরূপে’ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের গত সপ্তাহের একটি আহ্বানের কথা স্বীকার করে পেডারসেন বিশ্বব্যাপী যুদ্ধরত সবার প্রতি অভিন্ন শত্রু কোভিড-১৯-এর মোকাবেলা করার জন্য ‘মানবিক পরিবার’কে বিশেষ ক্ষমতাদানের লক্ষ্যে অবিলম্বে শত্রুতার অবসান ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ার করেছেন যে, যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করার ব্যর্থতা সিরিয়ার জন্য এবং বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস সঙ্কট মোকাবেলায় ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনবে। এ কারণে পেডারসেন জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২২৫৪ নং সিদ্ধান্তের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন দেশব্যাপী যুদ্ধবিরতি খুবই প্রয়োজন’ বলে উল্লেখ করেন এবং এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ৯ বছরের যুদ্ধে যে দেশটির অবকাঠামো, অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছেÑ সেখানে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে বিরাট বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে। পেডারসেন বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির কারণে সহিসংতা সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। যেহেতু বর্তমানে চুক্তিটি ভঙ্গুর অবস্থায় আছে, তাই যেকোনো মুহূর্তে সেখানে নতুন করে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যুদ্ধ ও সহিংসতার বিস্তার ঘটার পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে গৃহহীন হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে এবং দু’দেশ সরাসরি সঙ্ঘাতের মুখোমুখি হওয়ার পর গত ৫ মার্চ তুরস্ক ও রাশিয়া সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইদলিব অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বন্ধ করতে সম্মত হয়। যাই হোক না কেন, সিরিয়ার যুদ্ধ অব্যাহত থাকে; সৈন্য মোতায়েন করা হয়, ইরান এবং অন্যান্য দেশ থেকে ‘প্রক্সি মিলিশিয়া’দের সিরিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু ঘরবাড়ি হারা শরণার্থীরা তাদের সঙ্কট সমাধানের ব্যাপারে আশায় বুক বেঁধে রয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেরগেই শোইগো গত সোমবার দামেস্কে বাশার আল আসাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তারা ইদলিবে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এদিকে তুরস্ক ও রাশিয়ার সৈন্যরা মস্কো চুক্তি স্বাক্ষরের সুযোগের আওতায় ইদলিবের এম-৪ মহাসড়কে দ্বিতীয় দফা যৌথ টহল দিয়েছে। আলেপ্পো এবং লাতাকিয়ার মধ্যে সড়ক সংযোগের জন্যই এই টহলের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তবে নিরাপত্তার কারণে এই টহল সংক্ষিপ্ত করা হয় বলে জানা গেছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, গত ১৫ মার্চ তাদের প্রথম যৌথ টহল কিছুটা কাটছাঁট করা হয়। বিদ্রোহী তথা বাশার সরকারের বিরোধীদের ‘উসকানি’র কারণে যৌথ টহল সংক্ষিপ্ত করা হয় বলে মস্কো দাবি করেছে।
রাশিয়া এবং তুরস্ক যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর করার জন্য তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলে জানিয়েছে। সারা বিশ্ব যখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া মহামারীর ব্যাপারে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, তখন তাদের এই উদ্যোগ অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই চুক্তির লক্ষ্য হলো, শরণার্থীদের আবারো বন্যার মতো প্রবাহ রোধ করা এবং তুরস্কের আরো সৈন্যের মৃত্যু যাতে না ঘটে সে ব্যবস্থা করা।
করোনাভাইরাস সঙ্কটের মধ্যেই তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসো গ্লু ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে ‘সিরিয়ার ব্যাপারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষ্ক্রিয়তা মানবতার জন্য কলঙ্ক’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। ওই নিবন্ধে তুরস্কের এই শীর্ষ কূটনীতিক বলেন, তার দেশ সিরিয়া বা অন্য কোনো স্থান থেকে আর কোনো শরণার্থী গ্রহণের সামর্থ্য রাখে না।
তুরস্ক ৭০ বছর ধরে ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্র। তারা আশা করেন, সংস্থাটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সিরিয়ায় আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
শরণার্থী সঙ্কটের ব্যাপারে ইউরোপের নিষ্ক্রিয়তা এবং সিরিয়ার শরণার্থী সমস্যার ব্যাপারে ন্যাটোর কার্যকর ভূমিকা পালনে অস্বীকৃতি সিরিয়ার জনগণের দুর্দশায় কোনো সহায়ক ভূমিকা পালনে সহযোগিতা করতে পারবে না।
অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এই ভাইরাস জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অধিকতর কার্যকর ভূমিকা পালন করা উচিত বলে আমরা মনে করি।
যুদ্ধবিরতি কেবল সিরিয়ায় নয়, লিবিয়া ও ইয়েমেনসহ সব যুদ্ধরত দেশে কার্যকর করা প্রয়োজন। সাথে সাথে শরণার্থীদের এবং বাস্তুচ্যুত লোকদের সহায়তার জন্য এসব দেশে বিদেশী মিলিশিয়ার প্রবেশ বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এসব বিষয়কে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
১০০ বছর আগে বিশ্বব্যাপী যে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল কেউ সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি চান না। হ
লেখক : তুরস্কের রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মধ্যপ্রাচ্যের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ।
আরব নিউজ থেকে ভাষান্তর
মুহাম্মদ খায়রুল বাশার


আরো সংবাদ