২৬ মে ২০২০

বিশ্বের করুণ পরিস্থিতি

-


শিরোনামে ‘করুণ’ শব্দটি ব্যবহার করেছি। এর মানে এই নয় যে, করোনার জন্য করুণ শব্দ ব্যবহার করেছি। করোনাভাইরাস আর করুণ শব্দদ্বয় কাছাকাছি মনে হলেও আমার ব্যবহৃত করুণ শব্দের অর্থ হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি সার্বিক বিবেচনায় আসলেই করুণ। করোনাভাইরাস সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে। যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ২১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। কয়েক লাখ মানুষ আক্রান্ত। তবে আশার কথা হচ্ছে, এক-দুই লাখ মানুষ সুস্থ হয়েছেন। যা হোক, এটাকে বিশ্বব্যাপী করুণ পরিস্থিতি বলা যায়। এখন আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, এক দিকে সতর্কতা অবলম্বন এবং অন্য দিকে আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা চাওয়া। অমুসলিমরা তাদের নিজ নিজ ধর্মের নৈতিকতা অনুসরণ করতে পারেন। নাস্তিকরা কী বলেন জানি না; তবে সব বিশ্বাসী মানুষ এই বিপদকে মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে সতর্কবাণী মনে করছে।
এর সামগ্রিক ফলাফলটা কী সেটাও আমাদের বিবেচনা করতে হবে। করোনার কারণে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি যেটা হবে তাতে বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। সে ক্ষেত্রে বলা যায়, বিশ্বের প্রায় সব অর্থনীতির অবস্থা হবে একই। কোনোটা কম আর কোনোটা বেশি। ইতোমধ্যে চীনের অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়ে গেছে। এই ক্ষতি তারা কত দিনে পূরণ করবে তা আমরা বলতে পারব না। তেমনিভাবে করোনা ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বিশ্বব্যাপী দেখা দেবে মন্দা। এতে আমদানি-রফতানি কমে যাবে। এ রকম একটা পরিস্থিতি যখন বিশ্বব্যাপী বিরাজ করবে তখন দেশগুলোর দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের অবস্থা খুবই মারাত্মক হবে। মধ্যবিত্তরা হয়তোবা কোনো রকমে টিকে থাকতে পারেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষগুলোর অবস্থা খারাপ হয়ে পড়বে। সে জন্য বিশ্বব্যাপী এখন থেকেই দরিদ্র মানুষের বিষয়ে ভেবে দেখা দরকার এবং তাদের সঙ্কট সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পুঁজিবাদের মাধ্যমে দরিদ্রদের সমস্যার সমাধান হবে না। এর জন্য দরকার এমন একটা কল্যাণমূলক অর্থনীতি বা ইসলামী অর্থনীতি যার মাধ্যমে রাষ্ট্র দরিদ্রদের সব দায়িত্ব বহন করবে, এতে যত কষ্টই হোক না কেন। অন্য সব খরচের আগে দরিদ্র মানুষদের বাঁচাতে হবে। বিশেষ করে তাদের খাবার, চিকিৎসা এবং থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত যে বিষয়টি বলছি তা হচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় সীমাহীন অত্যাচার, জুলুম নিপীড়ন চলছে। যেমন চীনের উইঘুর মুসলিমদের ওপর কী ধরনের নির্যাতন কয়েক বছর ধরে চীন কর্তৃপক্ষ করছে, তা বিশ্ববাসী জানে। ফিলিস্তিনে ইহুদিদের একটি গোষ্ঠী এবং তাদের সহযোগীরা ৭০ বছর ধরে কী ধরনের নির্যাতন মুসলিমদেরকে করছে তাও আমরা জানি। আবার বার্মা বা মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্মম নির্যাতন চলছে। মুসলমানদের ওপর নির্যাতন সবখানেই বেশি। সেই তুলনায় অন্য ধর্মের লোকদের ওপর এত নির্যাতন কোথাও হচ্ছে বলে আমাদের জানা নেই। এই নির্যাতনের শিকার প্রধানত মুসলিমরাই। এসব নির্যাতন রোধে বিশ্বের দায়িত্ব রয়েছে অবশ্যই।
তৃতীয়ত আমি বলব, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সঙ্ঘাত বা যুদ্ধ চলছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইয়েমেন যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই চলছে। রয়েছে সিরিয়া যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই চলছে। এমন পরিস্থিতি কিছুটা ইরাকেও। লিবিয়াতেও সঙ্ঘাত চলছে। লিবিয়াতে একজন সামরিক নেতা বৈধ সরকারকেও মানছেন না। এটা একটা অদ্ভুত কাণ্ড যে, সামরিক বাহিনীর কমান্ডার দেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছেন। সুতরাং এটাও একটা বড় সমস্যা যে, বিভিন্ন দেশে প্রচণ্ড সঙ্ঘাত চলছে। যেমন ইয়েমেনের কথা বললাম, সিরিয়ার কথা বললাম। সে দিক থেকে আমরা জানিÑ সিরিয়াতে একটি একনায়কত্ব ও স্বৈরতন্ত্র কায়েম রয়েছে। যখন তিউনিসিয়াতে গণ-অভ্যুত্থান দেখা দেয় তখন আরব বিশ্বে এর প্রভাব পড়ে। তখন সিরিয়ার জনগণ গণতন্ত্র দাবি করলেন এবং নির্বাচনের দাবি জানান। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ এ দাবি না মেনে নির্যাতন চালান। ফলে সিরিয়াবাসী বিদ্রোহ করল এবং সরকার পতনের চেষ্টা করতে লাগল।
এর ফলে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সেখানে সঙ্ঘাত চলছে এবং বলা হয়, প্রায় পাঁচ লাখ লোক ভাতে মারা গেছে। এরা সবাই মুসলমান। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, যেখানে মানুষ মারা যাচ্ছে সেখানে মুসলমানই মারা যাচ্ছে। ইয়েমেনেও যারা মারা গেছে, তারা মুসলিম। সিরিয়াতে যারা মারা গেছে, তারাও মুসলিম। আবার আফগানিস্তানে যারা মারা গেছেÑ আমরা জানি ১০ লাখের মতো লোকÑ তারাও মুসলিম। এ দিকে কাশ্মিরে এক লাখ থেকে দুই লাখের মতো মারা গেছে; তারাও মুসলিম। ইরাকে আমেরিকার আক্রমণে প্রায় ১০ লাখের মতো লোক মারা গেছেÑ তারাও মুসলিম। এটি খুবই দুঃখজনক যে, প্রধানত মুসলিম দেশেই এসব ঘটছে।
বিশ্ব পরিস্থিতির আর একটি দিক হচ্ছে, বিভিন্ন যোদ্ধাগোষ্ঠী বিভিন্ন জায়গায় সংগ্রাম সঙ্ঘাত করছে। যেমন নাইজেরিয়ায় বোকোহারাম, সোমালিয়ায় আল শিহাব, ইরাকে আইএসআইএল ও আফগানিস্তানে তালেবান। তারা ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি এটা নয়।
কিন্তু এসব গোষ্ঠী ইসলামের নামে গণতন্ত্রকে ‘হারাম’ মনে করে। অথচ বিশ্বব্যাপী সব ইসলামী দল এবং আলেমরা গণতন্ত্রকে ও নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বদলকে ইসলামসম্মত বলেছেন। ইসলামের সাথে এসব সন্ত্রাসের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম সন্ত্রাসকে সমর্থন করে না।
এগুলোর বাইরেও বিশ্বের সমস্যা আছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, বিশ্বের পরিস্থিতি খুবই করুণ। আশা করি, চিন্তাশীল লোকেরা যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন, তারা এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবেন।হ
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার


আরো সংবাদ