০২ জুন ২০২০

করোনাভাইরাস : আমাদের করণীয়

-

করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক এখন বিশ্বব্যাপী। যারা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক হচ্ছেন তারাই করোনার ভয়াবহ ছোবল থেকে নিজেকে অনেকাংশে রক্ষা করতে পারছেন। কারণ আতঙ্ক কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না। কথায় বলে, ‘বনের বাঘে খায় না কিন্তু মনের বাঘই খায়।’ ভয় ও উৎকণ্ঠা থেকেই আতঙ্ক। আর আতঙ্ক থেকেই আসে হতাশা। হতাশাগ্রস্ত হলে সঠিক চিন্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কাজ করার ক্ষমতা থাকে না। আমরা যতটা না আতঙ্কগ্রস্ত হই সেই অনুসারে সতর্ক নই। এটাই মূল সমস্যা।
করোনাভাইরাস ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের ‘সাউথ চায়না সিফুড হোলসেল মার্কেট’ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই বাজারে বাদুড়, বনবিড়াল ও সাপের মতো বন্য প্রাণীগুলো খাওয়ার জন্য সেসব প্রাণী জীবন্ত বিক্রি করা হতো। এ জাতীয় প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে এ ভাইরাস ছড়িয়েছে বলে দাবি করছেন গবেষকরা। বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল সায়েন্সডাইরেক্ট ডটকমে ২০১২ সালের একটি গবেষণামূলক নিবন্ধে বলা হয়েছে, মুরগির ‘অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ইনফেকশন’ দেখা দিলে জানা যায় ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাসের (আইবিভি) মূল কারণ। আর বিগত ষাটের দশকে প্রথমবারের মতো মানুষের দেহে করোনাভাইরাস সংক্রমণের তথ্যও পেলেন বিজ্ঞানীরা।
সাধারণত সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে এবং পরিবেশের সাথে খাপখাইয়ে নিতে পারে ভাইরাস। ছড়িয়ে পড়ার সুবিধার্থে ভাইরাসগুলো পরিবর্তিত হতে পারে। তাই এ রোগের লক্ষণ নির্ণয়ে নির্ধারিত কোনো প্রোফর্মা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তবু চিকিৎসাবিদরা মনে করেন, এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শুরুতে সর্দি ও শুষ্ক কাশি হতে পারে। তৃতীয় দিনে হালকা জ্বর এবং সাথে কাশি ও গলা ব্যথা। পঞ্চম দিন পর্যন্ত মাথাব্যথা ও পেটের সমস্যা হতে পারে। ষষ্ঠ ও সপ্তম দিনে শরীরের ব্যথা বাড়বে, মাথাব্যথা কমতে থাকবে এবং ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অষ্টম ও নবম দিনে যদি এসব উপসর্গ কমে যায় বুঝতে হবে যে, এটি সাধারণ জ্বর। আর যদি এর সাথে শ্বাসকষ্ট কিংবা নিউমোনিয়া দেখা দেয় অবশ্যই পরীক্ষা করতে হবে।
করোনাভাইরাস ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। ফলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত লোকজনের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে থাকা পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরকেও সতর্ক থাকতে হবে। জনসমাগম পুরোপুরি এড়িয়ে চলুন।
সাবধানে হাঁচি-কাশি দিতে হবে। শরীরে না পড়ুক, পাশে থাকা অন্য কোনো বস্তু অর্থাৎ চেয়ার, টেবিল, বাড়ির সিঁড়ি বা অন্যের হাত যেখানে স্পর্শ করা হবেÑ এমন বস্তুর ওপর যেন না পড়ে, এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। হাঁচি বা কাশি দেয়ার সময় অবশ্যই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে টিস্যু ব্যবহার করতে হবে। আর সেই টিস্যু যেখানে-সেখানে না ফেলে শুধু ময়লা ফেলার জায়গায় ফেলুন। ভালো করে হাত ধুয়ে ফেলুন। সাবান ও পানি কাছে না থাকলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা হাত জীবাণুমুক্ত করার জেল ব্যবহার করুন। হাত পরিষ্কার হওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের নাক, কান, মুখ ও চোখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন।
কাশি, শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি কিংবা শ্বাসপ্রশ্বাসে কষ্ট বোধ করলে প্রথমেই হাসপাতাল, ক্লিনিক, ফার্মেসি কিংবা ডাক্তারখানায় ছুটে না গিয়ে ফোনে পরিচিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কাজ করুন। ‘আপনার শরীরে যদি উপসর্গ অর্থাৎ হাঁচি, শুকনো কাশির সাথে শরীরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং মাংসপেশিতে ব্যথা দেখা দেয়, তা হলে নিজেকে সবার কাছ থেকে আলাদা করে রাখুন। ভালোভাবে খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি বেশি তরল খাবার গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম করুন। যাদের শ্বাসকষ্ট সমস্যা আছে, তাদের বিষয়ে ‘অ্যাজমা ইউকে’ সংস্থা বলছে, ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে প্রতিদিন ইনহেলার (সাধারণত বাদামি) নিন। করোনাভাইরাস এবং অন্য কোনো ভাইরাসেও যদি আক্রান্ত হন তা হলে ইনহেলার অ্যাজমা থেকে আপনাকে রক্ষা করবে। তবে নীল রঙের ইনহেলারটি সবসময় সাথে রাখুন। যদি দেখেন শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাচ্ছে তখন এটি ব্যবহার করতে পারেন। আপনার শ্বাসকষ্ট যদি তীব্র হয় এবং আপনার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে তা হলে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন।
ডায়াবেটিকস রোগীদের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি। যারা টাইপ-ওয়ান বা টাইপ-টু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের বেলায় করোনাভাইরাসের উপসর্গ মারাত্মক রূপ নিতে পারে। ‘ডায়াবেটিস ইউকে’ নামের একটি সংস্থার কর্মকর্তা ড্যান হাওয়ার্থ বলেছেন, ‘যাদের ডায়াবেটিস আছে করোনাভাইরাস কিংবা কোভিড-১৯ তাদের শরীরে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।’ ডায়াবেটিস রোগীর কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টের উপসর্গ থাকলে রক্তে সুগারের মাত্রার ওপর বেশি সতর্ক নজর দিতে হবে।
যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুসে সমস্যা এবং দেহের রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা দুর্বল তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন এবং এ অসুস্থতা মারাত্মক রূপ নিতে পারে। ধূমপান ফুসফুস ও হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় বলে ধূমপায়ীদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। ‘যারা ধূমপান করেন তাদের করোনাভাইরাসের ঝুঁকি এড়াতে ধূমপান কমিয়ে ফেলা কিংবা পুরোপুরি ছেড়ে দেয়া জরুরি। কারণ ধূমপায়ীদের শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। তাদের নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যারা ধূমপান করেন না, তাদের চেয়ে দ্বিগুণ।’ গর্ভবতী নারীদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে বেশি। সংক্রমণ এড়াতে অন্যদের মতো গর্ভবতী নারীদেরও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা জরুরি।
খাবারের বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। পারতপক্ষে পোলট্রিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। খেতে হলে তা অবশ্যই বেশি করে সিদ্ধ করতে হবে। ফাস্টফুড বা প্রোসেসড ফুড এড়িয়ে চলতে হবে। ডিমসহ যেকোনো খাবার পুরোসিদ্ধ খেতে হবে। ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খেতে হবে। সেই সাথে ভিটামিন সি-জাতীয় খাবার, তরল পানীয় এবং সাধারণ স্বাভাবিক খাবার বেশি খেতে হবে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকাই এখন বড় দায়িত্ব। বাইরে না যাওয়াই উত্তম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি সব অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় নিজেকে গৃহবন্দী করে রাখুন। ছেলেমেয়েদের মোটেও বাইরে যেতে দেবেন না। বাজার কিংবা রেস্টুরেন্টে না খাওয়াই ভালো। গণপরিবহন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করবেন। হ্যান্ডশেক কিংবা কোলাকুলি করবেন না। বাইরে ব্যবহৃত পোশাক কিংবা জুতা ঘরে ব্যবহার করবেন না। বাসাবাড়ি পরিষ্কার রাখুন। সবসময় সাবান কিংবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।
আমাদের অমানবিক আচরণের কারণেই মহান আল্লাহ অনেক সময় ভারসাম্য রক্ষা করে থাকেন। তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা সবার বিশেষভাবে দরকার। সেই সাথে আমাদের দৃঢ় মনোবল ও সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। করোনাভাইরাসের কারণে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী দেশ ইতালি এখন বিধ্বস্ত। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও চীনও সময়ের হাতে নিজেদের সঁপে দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মসজিদ-মন্দিরে-গির্জা ও প্যাগোডায় একত্র হওয়া সীমিত করা হয়েছে। সৌদি সরকার ওমরাহ হজ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে। এক দেশের সাথে অন্য দেশের যোগাযোগ করা হয়েছে বিচ্ছিন্ন। এ অবস্থায় বিষয়টিকে হালকাভাবে গ্রহণ করার কোনো যুক্তি নেই। ঘরেই থাকুন, ওষুধ খান, প্রচুর পানি পান করুন, বিশ্রাম নিন। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হিফাজত করুন।হ
লেখক : কবি ও গবেষক; প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 


আরো সংবাদ