২৬ নভেম্বর ২০২০

সুপরিচিত শব্দ পরিবর্তনের অপচেষ্টা

-

বহু দিন ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে, বাংলাদেশে পরিকল্পিতভাবে বাংলা ভাষা থেকে ইসলামী ও সুপরিচিত কিছু শব্দ পরিবর্তন করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। এ অপচেষ্টার মূল নায়ক কিছু সেক্যুলার ও বামপন্থী লেখক, যারা ইসলামের ঐতিহ্যকে সহ্য করতে পারেন না। ইসলামের ঐতিহ্যের বিরোধিতা করাই তাদের অন্যতম প্রধান কাজ। বামদের করার মতো পজিটিভ এখন আর কিছু নেই। তাই বাংলাদেশে তাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ইসলামবিরোধিতা এবং ইসলামী শক্তিকে জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক বলে বদনাম করা। অথচ ইসলাম সবার অধিকারেই বিশ্বাস করে এবং মানবাধিকারে বিশ্বাস করে। ফিতনা বা সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি করাকে ইসলাম অবৈধ মনে করে। এ দেশের মূল ইসলামী শক্তি, তা বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দল হোক, ‘হেফাজতে ইসলাম’ হোক বা কওমি মাদরাসা হোক, তারা সন্ত্রাসে বা কথিত জঙ্গিবাদে বিশ্বাস করে না বলে প্রমাণিত। কিছু দিগভ্রান্ত ব্যক্তির কাজ, যারা হয়তো কোনো বিদেশী গোয়েন্দা চক্রের এজেন্ট, তাদের চরমপন্থী কাজকে ইসলাম বা মূল ইসলামী শক্তির ওপর চাপানো যায় না। রাসূল সা: প্রতিষ্ঠিত মদিনার রাষ্ট্রে তিনি যে সংবিধান দিয়েছিলেন, যাকে ‘মদিনার সনদ’ বলা হয়, তাতে মুসলিমও অমুসলিম সবার অধিকার সমান বলা হয়েছিল (দ্রষ্টব্য-মদিনার সনদ)।
এখন আসল আলোচনায় আসি। যেমন ‘লাশ’ শব্দ। হাজার বছর ধরে এ শব্দ বাংলা ভাষায় ব্যবহার হয়ে আসছে। এর উৎস ফারসি ভাষা, যা কয়েক শ’ বছর ভারতের রাজভাষা ছিল। যেমন ভারতে ইংরেজ শাসনের কারণে বহু ইংরেজি শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছে, তেমনি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অনেক আরবি-ফারসি শব্দও বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছে এবং সবার দ্বারাই গৃহীত হয়েছে।
এখানে উল্লেখ করা যায় যে, বাংলা ভাষার উন্নয়ন হয়েছে মুসলিম সুলতানদের হাতে। ইংরজদের প্রতিষ্ঠিত, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অপচেষ্টা না হলে বাংলা ভাষার রূপ ভিন্ন হতো এবং তাতে সংস্কৃতের পরিবর্তে আরবি-ফারসির প্রভাব বেশি থাকত।
যা হোক, এখন ‘লাশ’ শব্দটি বদলে ফেলা হচ্ছে। বেশির ভাগ পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে আমরা দেখছি ‘মরদেহ’। ‘মরদেহ’ শুনতেও খারাপ লাগে। এর চেয়ে মৃতদেহ অনেক ভালো। ‘লাশ’ শব্দ আরো সুন্দর। সরকারের কর্তৃপক্ষ এবং বাইরের নিরপেক্ষ চিন্তাবিদদের অনুরোধ জানাই, যেন এ প্রবণতা রোধ করা হয়।
আরেকটি শব্দ মরহুম (পুরুষের জন্য) ও মরহুমা (নারীর জন্য)। এর অর্থÑ যার ওপর রহম বা দয়া করা হয়েছে। এটি মৃত ব্যক্তির জন্য একটি দোয়াও। কিন্তু বর্তমানে এর পরিবর্তে ‘প্রয়াত’ ব্যবহার করা হচ্ছে। এ রকম একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত ও ইসলামী ভাবধারার শব্দের পরিবর্তন কিভাবে মানা যায়? যদি অমুসলিম ভাইবোনদের অপছন্দ হয়, তাহলে তাদের ক্ষেত্রে মৃত ব্যবহার করা যায়। কিন্তু মুসলিমদের ক্ষেত্রে মরহুম অব্যাহত থাকা উচিত।
একটি ইংরেজি শব্দ ‘ভাইস চ্যান্সেলর।’ এটিকে পরিবর্তন করে ‘উপাচার্য’ করা হয়েছে। উপাচার্য শব্দটি আচার্য, তথা পূজা পরিচালনার সাথে যুক্ত। সুতরাং তা বেশির ভাগ বাংলাভাষীর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনেও ভাইস চ্যান্সেলর রাখা হয়েছে। বহু ইংরেজি শব্দের মতো এটিকেও বাংলা ভাষায় গ্রহণ করে নেয়া যায় এবং লেখা যায়। একইভাবে সুপরিচিত ইংরেজি শব্দ, যেমন স্কুল-কলেজ, টেবিল চেয়ার ইত্যাদি অব্যাহত থাকতে পারে।
গত ২০-২৫ বছরে সুপরিচিত ‘গোশত’ শব্দটি ‘মাংসে’ পরিণত হয়েছে। অথচ অল্প বয়সে (১৯৫০-১৯৮০ সাল) আমি গোশত ছাড়া কিছুই শুনি নি। কিছু হিন্দু ভাই বোন গোশত শব্দ ব্যবহার না করে ‘মাংস’ ব্যবহার করতেন। আর কেউ করতেন না। এখানে বলে রাখতে পারি যে, সারা মধ্যভারতে উর্দু বা হিন্দিভাষী এলাকায় হিন্দু মুসলিম সবাই ‘গোশত’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন।
এই পরিবর্তন এলো কিভাবে? প্রথমত কিছু লোক পরিকল্পিতভাবে গোশতের পরির্বতে মাংস শব্দ ব্যবহার শুরু করে। পরবর্তীকালে স্কুলের বাংলা পাঠ্যবইয়ে গোশত শব্দ পরিত্যাগ করে মাংস শব্দ ব্যবহার করা শুরু হলো। স্কুলের ছাত্রীরা এখন ‘গোশত’ শব্দ জানে না এবং তাদের প্রায় সবাই মাংস শব্দ ব্যবহার করে। একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত শব্দ যা হয়তো বা ফারসি ভাষা থেকে এসেছে তাকে পরিকল্পিতভাবে পরিবর্তন করা সঠিক হতে পারে না। সর্বশেষে বলব, সব আরবি-ফারসি শব্দ বাংলা ভাষায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে শত শত বছর ধরে, তার পরিবর্তন করা কিছুতেই উচিত হতে পারে না।
সব চিন্তাশীল নিরপেক্ষমনা ব্যক্তিকে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলোর কর্তৃপক্ষেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বিশেষ করে সংবাদপত্রগুলো যদি গোশত শব্দটি ব্যবহার করে তাহলে সাধারণ মানুষ আবার জেনে যাবে যে, আগে মাংস শব্দটি ব্যবহার করা হতো না, গোশত শব্দ ব্যবহার করা হতো। মাংস ব্যবহার করলে ইসলামের কোনো ক্ষতি হয় না, তথাপি কেন আমরা ঐতিহ্যমণ্ডিত শব্দ পরিত্যাগ করব? হ
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার


আরো সংবাদ