২৬ নভেম্বর ২০২০

স্ম র ণ : মাওলানা আলাউদ্দিন আল আজহারী

-

বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার সংস্কার ও বিকাশে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকারী এক নির্ভীক ব্যক্তিত্ব মাওলানা আলাউদ্দিন আল আজহারী। এ দেশে আধুনিক আরবি ভাষার প্রচলন এবং এর ব্যাপক অন্যতম প্রসারেও তিনি ছিলেন পথিকৃৎ।
মাওলানা আজহারী ১৯৩০ সালে মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার সাহেবরামপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুন্সী আবদুল করিমের সাথে ১৯৫৬ সালে তিনি মিসর থেকে গিয়ে পবিত্র হজ পালন করেন। ছাত্রজীবনে মাওলানা আজহারী সব পাবলিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৫০ সালে ঢাকা আলিয়া মাদরাসা থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে মিসরের বিশ্বখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত বছর অবস্থান করে তিনি এম.থিওলজি এবং স্পেশালিস্ট ইসলামিক ল’ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি কায়রোর আমেরিকায় ইউনিভার্সিটি থেকে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রিও লাভ করেন এবং অধ্যাপনায় যোগ দেন। তিনি কায়রো বেতারের সাথেও সংশ্লিষ্ট হন। তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ও পড়িয়ে যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন ১৯৫৭ সালে দেশে এসে তার সদ্ব্যবহার করেছেন।
দেশে ফিরে তিনি তৎকালীন কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডে অনুবাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় ‘লেকচারার ইন মডার্ন অ্যারাবিক’ হিসেবে যোগ দেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সাথে তিনি ওই মাদরাসায় উর্দু ডিপ্লোমা বিভাগের অধ্যাপক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেন।
মাওলানা আজহারী ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালের ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ বেতারের বহির্বিশ্ব কার্যক্রমের আরবি অনুষ্ঠানের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি উপস্থাপকের ভূমিকা পালন করেন এবং আরব বিশ্বে বাংলাদেশের মানুষের ঈমান-আকিদা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা অপনোদন করেন। পাকিস্তান আমলে রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র থেকে তার ‘কুরআনে হাকিম ও আমাদের জিন্দেগি’ শীর্ষক কথিকা ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত হতো।
আরবি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষায় তার অগাধ দখল ছিল। ১৯৫৯ সালে মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের ঢাকা সফরে এলে ঢাকা স্টেডিয়ামে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয়। প্রেসিডেন্ট নাসের ওই সভায় যে ভাষণ দেন, দোভাষী হিসেবে তার যথাযথ বাংলা অনুবাদ করায় আজহারীর খ্যাতি চার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মাওলানা আজহারী বহু দেশ সফর করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ৩৬টির মতো মুসলিম দেশ। আন্তর্জাতিক একটি ইসলামী সম্মেলনে যোগদান করার জন্য বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নও সফর করেন।
বহু সংগঠনের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর সদস্য, বাংলাদেশ ইসলামী শিক্ষা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিপুল অবদান রেখেছেন আরবিতে প্রকাশিত আস সাকাফাহ পত্রিকার তিনি ছিলেন সম্পাদক ও পরিচালক। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশকে আরব বিশ্বে পরিচিত করার ক্ষেত্রে ওই পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া আরবিতে প্রথম প্রকাশিত তার ‘হাজিহি হিয়া বাংলাদেশ’ পুস্তিকাটিও পত্রিকাটির মতো ঢাকার আরব দূতাবাসগুলোতে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর কথোপকথন আকারে সমীক্ষাও প্রণয়ন করেছিলেন, যা বাংলাদেশ বেতারের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়েছিল।
মাওলানা আজহারী ছিলেন সুদক্ষ বক্তা এবং তাফসিরকারক। তিনি বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় মাহফিলে বক্তব্য অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরতেন। তেজস্বী বক্তা হিসেবে তার সুখ্যাতি চার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। স্পষ্টবাদিতার জন্য তিনি তৎকালীন সরকারের বিরাগভাজন হন এবং তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। কিন্তু তিনি হাইকোর্টে রিট করে আইনি লড়াইয়ে জয়ী হন। তার যুক্তি ছিল, তাকে মডার্ন অ্যারাবিকের শিক্ষক হিসেবে ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যা অন্য কোনো মাদরাসা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই। তিনি প্রতি রমজান মাসে কালকিনি থানাধীন কয়ারিয়া ঈদগাহ ময়দানে কুরআনের তাফসির করতেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানেরা যাতে কুরআনের অর্থ ও মর্ম বুঝতে পারে।
মাওলানা আজহারী একজন সুলেখক হিসেবে স্বল্পসময়ে প্রায় দু’ডজন গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ আরবি-বাংলা অভিধান, উর্দু-বাংলা অভিধান, বাংলা-আরবি অভিধান, তাফসিরে আজহারী, ইসলামের ইতিহাস, বাংলাদেশ পরিচিত (আরবি), উম্মুল কুরআন, বাংলাদেশের মুসলমান (আরবি), আল-আজহারের ইতিহাস, বায়তুল মোকাদ্দাসের ইতিহাস, মাদরাসা-ই-আলিয়ার ইতিহাস (আরবি), আরবি শিক্ষা-বাংলা ভাষায় আরবি ব্যাকরণ, ইংরেজি ভাষা ও এর প্রয়োজনীয়তা, কুরআনে বিজ্ঞান, অমুসলিমদের জন্য ইসলামের নির্দেশনাবলি (ইংরেজি), ইনসাউল আসরি (আরবি), আদদিরাসাতুল ইসলামিয়াহ (আরবি), ইসলামি শিক্ষা (আরবি), লোগাতুল কুরআন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইসলাম, হিন্দুধর্ম ও দর্শন (আরবি), ইসলামিয়াত (সহগ্রন্থকার)। তার রচনা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক, সুবক্তা, সংগঠক, বহু ভাষাবিদ মাওলানা আজহারী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৮ সালের ২৭ মার্চ ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। হ

লেখক : বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব


আরো সংবাদ

প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্টদের ব্যাংক হিসাব তলবে বিএফইউজে’র প্রতিবাদ ও নিন্দা করোনায় মৃতের সংখ্যা সাড়ে ৬ হাজার ছাড়ালো গ্যাস সিলিন্ডার কেটে ফেনসিডিল উদ্ধার, চালক আটক জুরাইনে যুবকের শরীরে আগুন লাগিয়ে হত্যার চেষ্টা : গ্রেফতার ৩ সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলা : অভিযোগ গঠন শুনানি শুরু ফেসবুক থেকে নিজের পোস্ট অপসারণ নিয়ে যা বললেন আজহারি ‘অপরাধীদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নিন’ অপরাধের দায় ব্যক্তির, দলের নয় : ওবায়দুল কাদের গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মীদের স্বজনদের মাঝে ইশরাক ভারতের হায়দ্রাবাদে ভোটে হঠাৎ ইস্যু ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ ও রোহিঙ্গা উঠানে পড়তে থাকা শিশুটির প্রাণ গেলো শিকারীর গুলিতে

সকল