৩০ মার্চ ২০২০

ইতিহাসের কয়েকটি বিচার

-

দিল্লির লালকেল্লায় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ দু’টি বিচার হয়েছিল। এই বিচারকার্যক্রম ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেয়। একটি হলো, ১৮৫৮ সালের শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের প্রহসনমূলক বিচার। এই বিচারে ভারতের মুঘল শাসনের অন্তিম ঘণ্টা বাজে, প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য। একইভাবে ১৯৪৫ সালে আজাদ হিন্দ বাহিনীর ক্যাপ্টেন শাহনেওয়াজ খানের কথিত বিচার হয় ঐতিহাসিক লালকেল্লাতেই। ১৯৪৫ সালের আগস্টে জাপানের হিরোশিমায় আণবিক বোমাবর্ষণের পর অক্ষশক্তির যাবতীয় প্রতিরোধশক্তি চূর্ণ হয়ে যায়। সমাপ্তি ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। রহস্যজনক জাপানি ফৌজের আত্মসমর্পণের পর ধরা দিতে হয় আইএনএ’র অফিসার ও সেনানীদের। ১৮ আগস্ট এক বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু প্রাণ হারান। জাপানের আত্মসমর্পণ ও নেতাজীর মৃত্যুতে ইতিহাসের গতিপথ ঘুরে যায়। আজাদ হিন্দ বাহিনীর (আইএনএ) যে অফিসার ও সৈন্যরা ধরা পড়েছিলেন, তাদেরকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে তৎপর হয় ব্রিটিশ সরকার। কিন্তু মহাযুদ্ধ শেষ হতেই উপমহাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। একদিন-না-একদিন এ দেশ ছাড়তেই হবে সে কথা বুঝতে পারে ইংরেজ শাসকরা। তাই আইএনএ’র বিদ্রোহ ও আনুগত্যের শপথ ভাঙার অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়। নয়া দিল্লির লালকেল্লাকে আইএনএ’র অফিসারদের বিচারস্থল হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল। আর ব্যাপকসংখ্যক অফিসার নয়, বিচারের জন্য বেছে নেয়া হলো এক মুসলিম, এক হিন্দু ও একজন শিখকে। তারা হলেন ক্যাপ্টেন শাহনেওয়াজ খান, পি কে সায়গল ও গুরুবক্স সিংহ ধীলন। তারা যে আনুগত্যের শপথ ভেঙেছেন তা নয়, হত্যা ও অত্যাচারের অভিযোগে ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে তাদের দোষী সাব্যস্ত করাই ছিল মূল লক্ষ্য। সাথে সাথে এই তিন অফিসারের প্রতি সমবেদনা বেজে উঠল গোটা ভারতবর্ষে। অভিযুক্তদের পক্ষ সমর্থন করার ক্ষেত্রে জাতীয় কংগ্রেস একটা ভূমিকা পালন করেছে। কংগ্রেসের বিশিষ্ট আইনজীবীদের নিয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয় এ জন্য। পণ্ডিত নেহরু, স্যার তেজ বাহাদুর সপ্রু, আসফ আলী প্রমুখ কমিটির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশ শাসকদের হাতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের এটাই ছিল শেষ বিচার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকপর্যায়ে আইনি ইস্যুগুলোর দিক থেকে বলা যায় এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শাহনেওয়াজ খান সংক্ষেপে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধের সময় আমার দুটো পথ খোলা ছিল : রাজা অথবা দেশকে বেছে নেয়া। দেশের প্রতি অনুগত থাকার সিদ্ধান্ত নিই এবং নেতাজীকে জানিয়েও দিই যে, দেশের সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করতে আমি প্রস্তুত। সবশেষে এই বিষয়টি আপনার ও আমার দেশের জনগণের গোচরে আনতে চাইছি যে, আজাদ হিন্দ বাহিনী যেসব কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে, যে কষ্ট স্বীকার করেছে, তা কোনো ভাড়াটে বা ক্রীড়নক সেনাবাহিনীর পক্ষে সম্ভব হবে না। আমরা লড়ছি শুধু ভারতের স্বাধীনতার জন্য। লড়াইয়ে আমি ছিলামÑ সে কথা অস্বীকার করছি না। কিন্তু সভ্য জগতে যুদ্ধনীতি মোতাবেক মাতৃভূমিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকারের বাহিনীভুক্ত হওয়ার সুবাদেই সে কাজ করেছি। অতএব, আমি কোনো অপরাধ করিনি, যার জন্য ফৌজি আদালত বা অন্য কোনো আদালতে আমার বিচার হতে পারে।’ যা হোক, ১০টি অভিযোগের ভিত্তিতে আজাদ হিন্দ বাহিনীর তিন ক্যাপ্টেনের বিচার শেষ হয়।

দুই.
আজ আর ভারতবর্ষে সেই ব্রিটিশ সরকার নেই। বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় সমাজতন্ত্র পদ্ধতি ও আন্দোলন অনুপস্থিত, যা আছে, তা রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্রের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদের আন্দোলন। বাংলাদেশে এই জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার স্বপ্ন ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়ার নেতৃত্বে মাত্র সাড়ে চার বছরের মাথায় বাংলাদেশ স্বনির্ভর হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। কিন্তু এই সাফল্য বেশি দিন টেকেনি। দেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সামরিক স্বৈরতন্ত্র। এরপর দৃশ্যপটে হাজির হন এক ‘গৃহবধূ’, যার নেতৃত্বে হয়েছিল গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় গণতান্ত্রিক সরকার। বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরেই বাংলাদেশের নতুন পথচলা শুরু হয়েছিল; আর তাকেই ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে কাটাতে হচ্ছে। হ

 


আরো সংবাদ